bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



‘সত্য যে কঠিন..’
আবু এন এম ওয়াহিদ



আরবিয় সংস্কৃতিতে একটা কথা বেশ মশহুর। ‘আল্ হাক্কু র্মুরুন’। অর্থাৎ ‘সত্য কথা শুনতে কর্কশ’। এটা হতে পারে নবী করিম (সঃ) এর হাদিস, হতে পারে হজরত আলী (রাঃ) এর অমর বাণী, হতে পারে তারও আগে থেকে প্রচলিত আরবিয় বচন। এ ব্যাপারে আমি ষোল আনা নিশ্চিত নই। রবি ঠাকুর এটা জানতেন কিনা তা আমি জানি না, তবে তিনি হাজার বছর পরে তাঁর একটা বিখ্যাত কবিতায় বিষয়টার আরেকটু বিস্তারিত অবতারণা করে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সত্য যে কঠিন/ কঠিনেরে ভালবাসিলাম/ সে কখনো করে না বঞ্চনা..।’ কবির কবিতাখানার এ চরণটার অর্থ নিশ্চয়ই অনেক ব্যাপক ও গভীর। অনেকে এর অনেক ধরণের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও করেছেন। আমি সাদামাটা ভাবে যা বুঝি, তাতে শব্দগত ভাবে এখানে দু’টো বিষয় ধরা পড়ে। প্রথমত: ‘সত্য কঠিন।’ দ্বিতীয়ত: ‘কঠিন কাউকে বঞ্চনা করে না।’ এ দু’টোর যোগসূত্র থেকে যৌক্তিকভাবে একটা উপসংহারও টানা যায় এই বলে যে, সত্য যেহেতু কঠিন, তাই সত্যও কাউকে ঠকায় না। ব্যাস, কথাটা ঠিক। যাহা সত্য, তাহা খাঁটি; যাহা সত্য, তাহা নির্মল। সত্যের মধ্যে কোনো ভেজাল নেই, ছলচাতুরী নেই, ভণ্ডামি নেই। সে সব জায়গায় সব সময়ই সত্য। তার মাঝে কোনো লুকোচুরি নেই, নেই প্রতারণার লেশমাত্র। সত্য সব সময় সত্য হিসেবেই আমাদের মাঝে এসে ধরা দেয়। কিন্তু অনেক সময় আমরা আমাদের অপারগতা ও কু-প্রবৃত্তির কারণে সত্যকে সত্য হিসেবে বোঝতে চাই না, বুঝি না, গ্রহণ করতে চাই না এবং করি না।

নামটা যদিও মনে নেই, তবু আরো এক কবির কবিতায় পড়েছিলাম, ‘সত্য! সে তো দুর্বল, তাকে আদালতে প্রমাণ করতে হয়!’ ওই কবি অত্যন্ত হতাশার সুরে বলতে চেয়েছেন। ‘সত্য, সে তো চিরকালীন সত্য, সর্বদা দিনের আলোর মত উদ্ভাসিত হয়ে থাকবে। তাকে সাক্ষীসাবুদ দিয়ে আদালতের সামনে প্রমাণ করতে হবে কেন? তিনি আরো বলেছিলেন, উপযুক্ত তথ্য উপাত্ত, যুক্তির জোর, এবং সাক্ষী-প্রমাণ না থাকলে সত্য চাপা পড়ে থাকে আড়ালে আবডালে, হারিয়ে যায় মিথ্যার মরীচিকায়। আপন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সত্য কেন নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে না? সে এত দুর্বল কেন? কবির এতসব আফসোসের উত্তরে আমি শুধু একটা কথাই বলতে চাই, ‘সত্য সর্বদাই আলোয় উদ্ভাসিত। আমাদের চোখের কৃত্রিম আবরণের জন্য আমরা তাকে দেখতে পাই না, মগজের কমজোরির জন্য বুঝতে পারি না, এবং কল্বের কালিমার জন্য মেনে নিতে পারি না। সত্যকে অনেক সময় দেখেও দেখি না, বুঝেও না বোঝার ভান করি। আর এসব ঘটে আমাদের তথ্য উপাত্তের ভেজালের কারণে, যুক্তির দুর্বলতায়, এবং ইবলিসের কুমন্ত্রণায়।

ফিরে আসি রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতিতে। এ ব্যাপারে আমি আজ আপনাদের নজরে আনতে চাই তৃতীয় আরেকটা বিষয়। সেটা হল মানুষের ভালোবাসার ধরণ, চরিত্র, ও তার বৈশিষ্ট্য। কবি বলছেন, মানুষ কঠিনকে ভালোবাসে, কারণ কঠিন বঞ্চনা করে না। তার মানে কি এরকম, যে কঠিন নয়, সে বঞ্চনা করতে পারে। উচিত কী উচিত, সেটা অন্য কথা, তবে বঞ্চনা করতে পারে বৈকি। কথাটা অন্যভাবে বলতে গেলে বলা যায়, জীবন জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন কত মানুষের সাথেই তো আমরা মোয়া-মেলাত করে থাকি। তার মধ্যে কেউ না কেউ আমাদেরকে ঠকাতে পারে, আমাদের সাথে প্রতারণা করতেই পারে। অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার খাতিরে এটাকে আমরা অনেকটা স্বাভাবিকভাবে মেনেও নেই, কিন্তু যাকে আমরা ভালোবাসি, যে আমাদের নিখাদ ভালোবাসার পাত্র, যে আমাদের নিজের, একান্তই আপন, তার কাছ থেকে আমরা কোনো ধরণের প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা আশা করি না। অন্যেরটা পারলেও প্রিয়জনের প্রবঞ্চনা আমরা মেনে নিতে পারি না, হজম করি না, সহ্য করি না। এরও অনেক গভীর দার্শনিক এবং মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য থাকতে পারে, কিন্তু এটাও আমার আজকের লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নয়।

আজ আমি যা নিয়ে লিখতে চাই তার সঙ্গে ‘কঠিন সত্যের’ একটা ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে বটে, কিন্তু সেটা একটু অন্য রকমের। তাই আমি বলতে চাই, আমাদের জীবনে চলার পথে সত্য প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়ে। কখনো সজোরে কখনো নীরবে। কোনো সময় আমরা সত্যের উপস্থিতি অনুভব করি, কোনো সময় করি না। স্বাভাবিক জীবনের স্বাভাবিক ব্যস্ততার মধ্যে সত্য আমাদের সামনে প্রতিদিনই হাজির হয়ে তার অস্তিত্বের জানান দেয়। সত্য দুয়ারে এসে বলতে থাকে, ‘আমি কঠিন, আমি সুখ, আমি দুঃখ, আমি বাস্তব, আমি সত্য, আমি হাজির, আমি আছি তোমাদেরই আশেপাশে ছায়ার মতন, আমার দিকে তাকাও, আমাকে দেখ, আমাকে বোঝার চেষ্টা কর, আমাকে বোঝ, আমাকে স্মরণে রাখ, আমাকে ভুলে যেও না’। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে এ জানান দেওয়ার একটাই মানে হতে পারে। আর তা হল, আমাদের জীবনকে সহজ, সরল, সঠিক পথের ওপর নিরন্তর ধরে রাখা। সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর শক্তভাবে কায়েম রাখা।

আমার পারিবারিক জীবনের একটা বাস্তব উদাহরণ দিলেই বিষয়টা আপনাদের সামনে খোলাসা হয়ে যাবে। আজ সকালে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমি তাঁর ডাক্তারের অফিসে গিয়েছি ডাউন টাউন ন্যাসভিলে। ফ্রন্টডেস্কে রিপোর্ট করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর ডাক পড়েছে, তিনি ভেতরে গেছেন, আমি ওয়েটিং এরিয়াতে বসে আছি একা একা। আমার ছোট মেয়ে নায়লা তার অফিসে কাজ করছে সাত শ’ মাইল দূরে ওয়াশিংটন ডিসিতে। হঠাৎ কী মনে করে আমি নায়লাকে একটা এসএমএস পাঠালাম। মাঝে মধ্যেই আমি তা করে থাকি। কোনো কোনো সময় আবার উল্টা পাল্টা তালগোলও পাকিয়ে ফেলি। সেদিন নায়লাকে টেক্সট করতে গিয়ে ভুল বশতঃ করেছি আমার বড় মেয়ে নাজলাকে। নাজলা বলছে, ÔAbbu, you sent text to your wrong daughterÕ । আমি উত্তরে বললাম, ÔNone of my daughters is wrong, both of them are rightÕ । বাবার এমন জবাবে, মেয়ের কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, ভেবে নিন। আমার মেয়েদের সঙ্গে এ জাতীয় টেক্সট আদান প্রদান আমার হর হামেশাই হয়ে থাকে। যাই হোক, এবার কিন্তু ভুল হল না। নায়লার টেক্সট নায়লার কাছেই গেল। বললাম, ÔMaamoni, how busy are you today? Did your Mom tell you that she was going to Dhaka? Õ ঘণ্টা দেড়েক পরে নায়লা আমার এসএমএস এর জবাব দিল। ততক্ষণে আমরা চলে এসেছি ড্রাইভারস টেস্টিং সেন্টারে। আমার স্ত্রী তাঁর ড্রাইভারস লাইসেন্স রিনিউ করছেন। তিনি ফরম ফিলআপ করছেন, ছবি তুলছেন। আমি আবার ওয়েটিং এরিয়াতে। এখানে মানুষের ভিড়ে বসার জায়গা নেই। অগত্যা দাঁড়িয়ে সময় পার করা ছাড়া উপায় কী! নায়লার এসএমএস খুলে দেখলাম দারুণ এক করুণ সুর! সে বলছে, ÔI asked Ammu, are you excited that you are going to Dhaka? She said, No, this is the first time, none of my parents would be there to welcome me!Õ

পাঠকগণ বুঝতেই পারছেন, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি দু’জনই মারা যাওয়ার পর, এটাই হতে যাচ্ছে আমার স্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর। এই ছোট্ট বাক্যের মধ্যে সে তার মা-বাবা হারানোর বেদনার সুর এত তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলেছে, যা কিনা আমার মেয়েকে বেশ গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। নায়লাকে উত্তরের জন্য এ রকম একটা টেক্সট তৈরি করলাম, ÔYes, Maamoni, this is indeed very sad, but at the same time, a reality of life. Some time in the future, you would not like to come home, because none of your parents would remain alive!Õ তারপর ভাবলাম ‘সপ্তাহের প্রথম দিন, মেয়েটা অফিসের কাজে ব্যস্ত। এমন করুণ এসএমএস পাঠিয়ে তার তরুণ মনটাকে খারাপ করে দিয়ে লাভ কী’। তাই টেক্সট রিভাইজ করলাম এভাবে, ÔYes, Maamoni, this is very sad, but is a reality of life, and nothing around us is perpetual, except the presence of Allah - the Almighty!Õ



লেখক: অর্থনীতির অধ্যাপক - টেনেসী স্টেইট ইউনিভার্সিটি;
এডিটর - জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ Email: wahid2569@gmail.com





Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 3-May-2017