bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



নারীর ‘ক্ষমতায়ন’ ও আমার ভাবনা
আবু এন এম ওয়াহিদ



নারী জন্মদাত্রী মা, নারী পুরুষের তামাম প্রেরণার উৎস, নারী দুর্দমনীয় ‘হিম্মত’-এর অধিকারিণী। কী সেই ‘হিম্মত’, সে-কথায় আসব পরে। ইতিমধ্যে যা বললাম, এর সবইতো সুন্দর, সবইতো সত্য। তার চেয়েও বড় সত্যটি বড়ই কুৎসিত, বড়ই কদাকার। বিষয়টি আর দশ-পাঁচ জনের মতো আমাকেও পীড়া দেয়, ব্যথিত করে। আর সেটা হলো - যুগে যুগে, দেশে দেশে নারী লাঞ্ছিতা, নারী বঞ্চিতা, নারী কর্মক্ষেত্রে দারুণ বৈষম্যের শিকার। কিন্তু কেন? কী এ-সবের প্রতিকার? এই ‘কেন’-র উত্তর পাওয়া গেলেও আজ অবধি ‘কী’-র কোনো সমাধান মিলছে না। সমস্যার যতই গভীরে যাই, দেখি - অনেক কিছুই বুঝি না, যা বুঝি তা আমাকে আরেক ধন্দে ফেলে দেয়, কারণ নারী-বৈষম্যের জটিল অঙ্কগুলো ছোট ছোট, অথচ প্রত্যেকটির সমীকরণ মানব ইতিহাসের মতই বিস্তৃত। এ ব্যাপারে যে প্রসঙ্গই উঠুক না কেন, তার জটিলতা ও গভীরতা যেন মহাসাগরের গহিনে গাঁথা, আমার মতো আ’ম মানুষের নাগালের বাইরেতো বটেই, ডুব দিয়ে এত নিচে গিয়ে মুক্তো তুলে আনার মতন লম্বা দম আমার নেই। তবুও, নারী-জীবনের এ দুর্বোধ্য বিড়ম্বনাগুলো আমার পিছু ছাড়ে না, আমাকে যখন তখন তাড়া করে, ভাবায়। কারণ, আমিতো নাড়ির বন্ধন ছিঁড়ে নারীরই পেট থেকে বেরিয়ে আসা নর, আমিও যে নারীর স্বামী, নারীর পিতা, নারীর ভাই, নারীর আরো কত কিছু। তার ওপর হাল আমলে নারী-জীবনের টানাপোড়েন আমি খুব কাছে থেকে হামেশাই দেখি, গভীরভাবে অনুভব করি, অনেক সময় কষ্টও পাই, এ-সবের মাঝেই আমার বাস। তাইতো আজ নারী নিয়ে লিখতে বসা। লেখার মূল বিষয়বস্তুটি গুছিয়ে ওঠার আগেই ভাবলাম, একটু পেছন ফিরে তাকাই, ইতিহাস খুলে দেখি - দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক ও জ্ঞানী-গুণী জন নারী নিয়ে কে কী বলে গেছেন। ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে এ বিষয়ে বড় বড় মানুষের অসংখ্য মূল্যবান উদ্ধৃতি পেলাম। সবগুলো পড়া হয়নি, যেক’টাতে চোখ বুলিয়েছি, তাতে চার জনের চারটি উক্তি বিশেষভাবে আমার নজর কেড়েছে। এঁদের তিনজনই পুরুষ, একজন নারী। আর এখান থেকেই পেয়ে গেলাম আমার আজকের টপিক।

প্রথম পুরুষের কথাটি আমি যদি ঠিকঠাক বুঝে থাকি তাহলে এটি একেবারেই হালকা, এ নিয়ে আর বেশি কথা বলে লাভ নেই:

1. “After about 20 years of marriage, I’m finally starting to scratch the surface of what women want. And I think the answer lies between conversation and chocolate.”

দ্বিতীয় জন নিজেই নারী, তাঁর বাণীটি যথার্থ, অর্থবহ এবং ওজন ও তাৎপর্য মাঝারি গোছের:

2. “Woman is the dominant sex. Men have to do all sorts of stuff to prove that they are worthy of woman’s attention.”

তৃতীয় জন আবার পুরুষ, তাঁর কথাটি ভারী, বেশ ওজনদার, আমার কাছে গভীর ও সুদূরপ্রসারী অর্থ বহন করে। এই উক্তির মূল বক্তব্যই হতে পারে আমার আজকের লেখার কেন্দ্রবিন্দু:

3. “There are two powers in the world; one is the sword and the other is the pen. There is a great competition and rivalry between the two. There is a third power stronger than both, that of the women.”

চতুর্থ জনও পুরুষ, তিনি নতুন কথা কিছু বলেননি, তৃতীয় জনের বক্তব্যকে আরেকটু খোলাসা করেছেন মাত্র, তবে অত্যন্ত চাঁছাছোলা ভাষায়, নগ্ন ভাবে। তাঁর বক্তব্যের সুর ও লয় আমার একেবারেই পছন্দ হয়নি, নারীর জন্য বিব্রতকরও বটে। এ জন্য ওই বিজ্ঞ জনের উক্তিটি আমি পুনরুক্তি করতে চাই না, তার পরও পথ চলতে চলতে দরকার হলে এই জায়গায় আবার ফিরে আসব। বিষয়টি আলগোছ ছুঁয়ে যাব। এখানে একটি কথা বলে রাখি, উদ্ধৃতিগুলোর উপস্থাপনায় আমি সময়ের ক্রমানুসরণ মানিনি। নারী সম্পর্কে মনীষীদের বক্তব্যের এ অতি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নও আমার নিজের - একান্তই ব্যক্তিগত। এখানে আপনারা আমার সঙ্গে একমত হতে পারেন, নাও পারেন। আমাদের আজকের আলোচনার জন্য এতে কিছু যায় আসে না। কথোপকথন তার আপন গতিতে চলবে - যতখানি চালিয়ে নিতে পারি। যেখানে গিয়ে আটকে যাব সেখানেই ইতি টানব। উত্তর টেনে আনতে না পারলে, প্রসঙ্গ পালটাবো নয়তো প্রশ্নবাণ আপনাদের দিকেই ছুঁড়ে দেব। ভেবে দেখার ফুরসৎ হবে তো?

ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই আপনারা লক্ষ করেছেন, যাঁদের কথা আমি যত্ন করে বাছাই করে এখানে তুলে এনেছি, তাঁদের নামগুলো কিন্তু আমিই সযত্নে মুছে দিয়েছি। এরও একটি কারণ আছে। ‘কে বললো’, তাঁর ওপর আমি দৃষ্টি ফেলতে চাই না, বরং আমার কাছে মূল বিবেচ্য বিষয়, ‘কী বলা হলো’, তার একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ। এ কাজটি আমি যতই কঠিন মনে করি না কেন, বাস্তবে এর কাঠিন্য তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কারণ, আধুনিক মানুষের জীবন ও জীবনযাত্রা যার পর নাই জটিল ও কঠিন হয়ে গেছে। আজকাল নারী-পুরুষের সম্পর্ক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে অনবরত দুলতে থাকে। তাদের এক জনের হাত অন্য জনের হাতের সাথে, চিকন রঙ-বেরঙের অজস্র নরম সুতোয় বাঁধা, কখন কোনটা ছিঁড়ে যায়, আওয়াজ ওঠে না, কেউ টেরও পায় না, ছিঁড়ে গেলে আর জোড়াও লাগে না। যখন সবগুলো সুতো কাটা পড়ে তখন আকাশে পরাজিত পড়ন্ত ঘুড়ির মতন জীবনে ডিগবাজি ছাড়া তাদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

তার ওপর নতুন এই শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে আমরা এমন এক জমানায় বাস করছি যেখানে সমাজ ও সমাজের মানুষ দারুণভাবে দ্বিধাবিভক্ত। সহমর্মিতা ও সহানুভূতির বদলে ঘৃণা ও বিদ্বেষের দ্বারা নিছক আবেগ তাড়িত হয়েই আমরা কথা বলি - পথ চলি যার যার মতো করে। এই বাস্তবতায় নারীর মতন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো কথা বলার আগে চৌদ্দবার চিন্তা করা উচিৎ। আর কাউকে পরওয়া করি বা না করি, আমার প্রিয় পাঠকদের আমি বড়ই ভালোবাসি। নারী প্রসঙ্গে এমন কোনো ভুল কথা আমি ভুলেও বলতে চাই না যাতে তাঁরা আমাকে ভুল বুঝতে পারেন। আর তাইতো মনে রাখবেন, যা বলছি তা নির্ভয়ে নয়, সাবধানতার সাথে ভয়ে ভয়েই বলছি। নারীর সাথে পুরুষের সম্পর্ক হতে পারে মামুলি - দেওয়া-নেওয়ার (প্রথম উদ্ধৃতি); হতে পারে গভীর প্রেম-ভালোবাসার (দ্বিতীয় উদ্ধৃতি); আবার এমনও হতে পারে - নারী এ-সবেরই ঊর্ধ্বে, অনেক উপরে। স্বাভাবিক আপন অন্তর্নিহিত শক্তিতে সে এতই বলীয়ান যে, সহসা সবাইকে চমকে দিতে পারে, জগতকে বদলে দিতে পারে (তৃতীয় উদ্ধৃতি);!

যে নারী এতই শক্তিমান তাকে আরেকটু ভালো করে চিনে নেওয়া দরকার না? নারীর সাথে নরের সম্পর্ক বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যে ভরা। ব্যক্তি নারী সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা থাকতেই পারে, তথাপি নারীজাতি এক ও অভিন্ন। বিবাহিত জীবনে কোনো পতিই নারীচরিত্রের যাবতীয় মধুময় উষ্ণতার ছোঁয়ায় সিক্ত হতে পারে না। নারীর হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার টান যেমন তীব্র, তেমনি তার আবেগ-আবদারও কম নয় এবং তা উপেক্ষা করার মতো-তো নয়-ই। তার আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেমন উত্তাল সাগরে ঢেউয়ের মতন খেলে, তার মান-অভিমান ও মনের মতিগতিও তেমনি ”চঞ্চল - ঝড়ো হাওয়ার মতন নিরন্তর বয়ে চলে। যে-সব আদম-সন্তান নারীর রূপ-মাধুর্যের একাধিক মাত্রা স্পর্শ করে, হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, উপভোগ করে, তারা সুখী কি না জানি না, তবে নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। নারী রহস্যময়ী, সে সবার কাছে সমানভাবে ধরা দেয় না। স্ত্রী সংস্পর্শের নির্মল প্রসাদ পেতে হলে স্বামীকে না কি স্বামী হওয়ার আগে ‘পুরুষ’ হতে হয়। রবি ঠাকুরের লেখায় এমন আভাস পাওয়া যায়। নারীর ব্যক্তিত্ব যেমন বিচিত্র তার চাহিদাও তেমনি বহুমাত্রিক ও পরিবর্তনশীল। এক সময় নারীরা স্বামীকে পতিদেবতা হিসেবে মেনে নিত অথবা নিতে বাধ্য হতো, আজ তারা স্বামীকে কেবল স্বামী হিসেবেই দেখে না, তাকে বন্ধু হিসেবেও পেতে চায়। নারীর এ আকাঙ্ক্ষা যথার্থ এবং যৌক্তিক। বুঝতে পারি, দিনে দিনে, দিকে দিকে এ ধারণার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। এখানে সমাজ পরিবর্তনশীল, সমাজ অগ্রসরমান।

অন্যদিকে এই আধুনিক সমাজের একটি অন্ধকার দিকও আছে। এই নারী কেন তার যথাযথ মর্যাদা পায় না, সে কেন অবহেলিত, সে কেন বার বার অপমানিত? সে কি দুর্বল? তার দৈহিক শক্তি কম হতে পারে, তার মনের জোরতো কম নয়। পুরুষের যেমন ছেলেমেয়ে আছে, মা-বাবা-আত্মীয়পরিজন আছে, নারীরও তো তাই। পুরুষের হাতে যত ক্ষমতাই থাকুক, দিনের শেষে সে-তো নারী-প্রেমের শক্ত বাঁধনে বাঁধা; নারীর কাছে সে ভালোবাসার কাঙ্গাল নয় কি? এ-জন্যই বলা হয়ে থাকে, ‘রাজা শাসিছে রাজ্য, রাজারে শাসিছে রানী’। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? নারীকে তার পূর্ণ মানবিক মর্যাদা ও বিষয়সম্পত্তিতে ন্যায্য হিস্যা দিতে সমাজের এত অনীহা কেন? এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, তাবৎ দুনিয়ায় কমবেশি সর্বত্র একই হাল। নারীর প্রতি কেন এই অবিচার? দুঃখিত, এর জবাব আমার কাছে নেই। আগে যা বলেছিলাম, উত্তর-বিহীন এই প্রশ্নটিকে এখানেই ধামাচাপা দেওয়া অথবা আপনাদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো গতি নেই। লেখাটির প্রথম মুসাবিদা পড়ে আমার অগ্রজপ্রতিম বন্ধু ড. আর.আই মোল্লা এ প্রসঙ্গে একটি মন্তব্য করেছেন। আমি যদি সঠিকভাবে তাঁর কথা বুঝে থাকি, তাহলে তিনি বলতে চেয়েছেন, ‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে নারীর মর্যাদার জায়গাটুকু তৈরি করে নিতে হবে’। কথাটি ষোল আনা সঠিক, তথাপি আমার একটি প্রশ্ন, এত নারীবাদী সংগঠন ও কর্মতৎপরতা থাকতে এতদিনে কেন কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না?

মুহূর্তের জন্য নারী থেকে একটু ছুটি নেই, প্রসঙ্গ পাল্টাই। মনে রাখবেন, সঙ্গে সঙ্গেই আবার ফিরে আসব এই জায়গায় - তিন নম্বর উদ্ধৃতিতে, যা কি না আমার আজকের রচনার বিষয়বস্তু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বিশ লাখ মানুষের শহর ন্যাশভিল। এখানে বেশ পুরনো একটি কলেজ আছে যেটা এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কলেজটির এই করুণ দশার অন্যতম প্রধান কারণ - বছর বছর ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা নিম্নগামী। শত চেষ্টা করেও যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। আমার বলতে দ্বিধা নেই, কলেজের জন্য এটা কোনো সমস্যাই ছিল না, যদি এ শহরে আমার মায়ের মতন আরো ৩০০ নারী থাকতেন। বলাই বাহুল্য, আমার মা তাঁর জীবনে ১০টি সন্তান জন্ম দিয়েছেন। মানুষ করতে পেরেছেন কি না জানি না, তবে বড় করেছেন বড় মায়ামমতা দিয়ে, আদর দিয়ে। তাঁর মতো আরো ২৯৯ জন নারী থাকলে, তাঁদের গর্ভজাত ৩,০০০ ছেলেমেয়ের পদভারে বনের নানা রঙের ফুল ও লাফালাফি করা চঞ্চল পাখির মতনই কলেজ-প্রাঙ্গণ প্রাণোউচ্ছ্বাসে ভরে উঠত। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যেত, কিন্তু তাতো হওয়ার নয়, যা হওয়ার তাই হবে।

এবার শুনবেন, একটু আমার মায়ের কথা যদি বলি? তিনি যখন আমার বাবার সংসার করছেন তখন বাংলাদেশে ‘নারী ক্ষমতায়ন’-এর কোনো আন্দোলন ছিল না, তেমন কোনো সম্ভাবনাও ছিল না। অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া মা আমার বাড়ির কোণায় একটি ছোট্ট বালিকা বিদ্যালয় চালাতেন। তাঁর নিয়মিত কোনো বেতন-ভাতা ছিল না। তিন-চার বছর পর পর সরকার বাহাদুর এককালীন ‘থোক বরাদ্দ’ দিতেন, তাও সাকুল্যে তিন, কি সাড়ে তিন শ’ টাকা। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে এটাও কম ছিল না, কিন্তু হলে কি হবে, মা কোনো দিন তাঁর কামাই থেকে পছন্দমত একটি কানা কড়িও খরচ করতে পারেননি। এতে তাঁর জীবনে যে কোনো দুঃখ ছিল না তা বলা যায় না, তবে এ নিয়ে আমার আম্মার মনে সামান্যতম হতাশা কিংবা দ্রোহ-বিদ্রোহ দানা বাঁধেনি, এ কথা আমি দৃঢ়তার সাথে বলতেই পারি। কেন বাঁধেনি, ছোটবেলা তার একটা কারণ জানতাম - ‘সবর’। ইদানীং আমি এর অন্য একটি ব্যাখ্যাও দাঁড় করিয়েছি। ওই টাকার বিনিময়ে যৌথ পরিবারে থেকে মা তাঁর ছেলেমেয়েদের পেলে-পুষে বড় করেছেন। তিনি হয়তো ভেবেছেন, ‘আমার সন্তানরাই তো আমার উপার্জন, এরাই তো আমার সঞ্চয়, এরাই তো আমার পুঁজি, এরাই তো আমার বিনিয়োগ, এখানেই আমার আনন্দ, এখানেই আমার জীবনের সফলতা ও সার্থকতা।

আমার মায়ের আপন প্রত্যক্ষ আয়ের ওপর তিনি ছিলেন ‘অসহায়’, ‘ক্ষমতাহীন’। এটা হলো তাঁর জীবনের একটি দিক। অন্যদিকে, তিনি ছিলেন মাতৃত্বের মহিমায় উদ্ভাসিত। মাতৃত্বই তাঁকে করে গেছে বলীয়ান, মহীয়ান, বিশাল ভাবে ‘ক্ষমতায়িত’। মায়ের উৎপাদিত পুঁজি-পণ্যরা আজ দুনিয়ায় ছড়িয়ে গেছে। তাঁর সন্তানেরা যে যেখানে গেছে সে-ই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অবদান রাখছে। তাঁর উৎপাদিত পণ্যের মুনাফা তিনি তেমন একটা ভোগ করতে পারেননি, অন্যেরা তো করছে। এখানে তিনি যেমন ‘ক্ষমতায়িত’, তেমনি ‘মহান’। আমার মায়ের মতন জগতের সকল মা আপনা থেকেই ‘ক্ষমতায়িত’। নারীজাতির জন্য মাতৃত্বজাত ‘ক্ষমতা’, চাকরি-কালীন ক্ষমতা থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সমাজ ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব ও ফলাফল অনেক বেশি টেকসই এবং সুদূরপ্রসারী! এ কথা এর চেয়ে আর বেশি খোলাসা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। উপরোক্ত তৃতীয় উদ্ধৃতিটিকে আমি এভাবেই ব্যাখ্যা করতে চাই। কারো দ্বিমত থাকলে অবশ্যই আমাকে লিখবেন।

আমার মা তাঁর স্বাধীন ইচ্ছে প্রয়োগ করে ১০ সন্তানের জননী হননি, এটা যেমন সত্যি - তেমনি যা হয়েছে তাতে যে তাঁর খুব একটা অমত ছিল, সেটাইবা বলি কি করে। ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একবার বলেছিলেন, ‘ছেলেমেয়ে উৎপাদনে আমার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকলে আমি ১০ বার মা হতাম’। শ্রীমতী গান্ধী ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দুইয়ের অধিক মানবশিশু জন্ম দিতে পারেনি। আমার মা ইচ্ছা না থাকলেও ‘নিমরাজি’তে ১০টি ছেলেমেয়ে পেটে ধরেছেন। আমি যদি বলি, মাতৃত্বের গৌরবে আমার মাতা ইন্দিরাজীর চেয়েও বলীয়ান, তাহলে কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায়? একজন পল্লীবধূর সঙ্গে একজন প্রধানমন্ত্রীর তুলনামূলক বৈষম্য টানাটানির জন্য আমি লজ্জিত এবং দুঃখিত। দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না।



পরের অংশ




Share on Facebook               Home Page             Published on: 21-Oct-2019


Coming Events:









Concert date has been moved forward...