bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



আগাথা ক্রিস্টি!
আবু এন. এম. ওয়াহিদ



শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে আমি যে এত বড় নাদান, তা কিছুদিন আগেও আমার জানা ছিল না! সে দিন ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে গিয়ে হঠাৎ নজর কাড়লো আগাথা ক্রিস্টি-র ওপর একটি লিঙ্ক। আগাথা ক্রিস্টি-র নাম আমি শুনেছি, কিন্তু কেন তিনি এত বিখ্যাত, সেটা আমার অজানা; কোনো দিন জানার চেষ্টাও করিনি। পড়াশোনার অভ্যাস আমার একেবারেই কম, তবু কী মনে করে সেদিন ভাবলাম, দেখি তো - আগাথা ক্রিস্টি কে ছিলেন? কোন জগতের মানুষ ছিলেন তিনি? কী এমন মহৎ কাজ করে অমর হয়ে আছেন আজো? লিঙ্কটি ক্লিক করে, তাঁর জীবনীর ওপর মাত্র দু’মিনিট চোখ বুলিয়েই আমি বিস্মিত ও অভিভূত না হয়ে পারলাম না! কম্পিউটার বন্ধ করে সোফায় গিয়ে বসলাম, কতক্ষণ চোখ বুঁজে ভাবলাম, এক জীবনে একজন মানুষের পক্ষে এ-ও কী সম্ভব! কী করে!

যাঁরা জানেন, তাঁরা তো জানেনই; যাঁরা আগাথা ক্রিস্টি-র খবর রাখেন না, তাঁদের জন্য বলছি, তিনি সাহিত্য জগতের একজন অসাধারণ সৃষ্টিশীল, জনপ্রিয়, সার্থক ও খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। তিনি লিখেছেন ৬৬টি গোয়েন্দা উপন্যাস, ১৪টি ছোট গল্প সংকলন, ১টি কাব্যগ্রন্থ, ১৬টি নাটক এবং ১টি সম্পাদিত বই। এ ছাড়াও, মেরি ওয়েস্টম্যাকট ছদ্মনামে তিনি রচনা করেছেন আরো ৬টি রোমান্টিক উপন্যাস, ২টি করে কবিতা ও আত্মজীবনী মূলক বই। আপনারা বলতে পারেন, এতে আবার অবাক হওয়ার কী আছে? এর চেয়ে বড় লেখক তো দেশবিদেশে আরো অনেকই আছেন। এমন কী বাংলা সাহিত্যেও এমন একাধিক লেখক আছেন যাঁদের বই, সংখ্যার দিক থেকে আগাথা ক্রিস্টিকে ছাড়িয়ে গেছে।

মানলাম আপনাদের কথাই ঠিক, তবে অন্যান্য সফল লেখকদের সাথে আগাথা ক্রিস্টির পার্থক্য ও কৃতিত্ব কেবল মাত্র তাঁর লিখিত ও প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না। তাঁকে মূল্যায়ন করতে হলে জানতে হবে পাঠকদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা কতখানি ছিল। আমি নিশ্চিত, আপনারা আমার মতই শুনে আশ্চর্য হবেন যে, এ পর্যন্ত আগাথা ক্রিস্টির বই বিক্রি হয়েছে দু’ শ’ কোটি কপির ওপরে (Yes, over 2 billion copies)! কোনো কোনো জরিপ অনুযায়ী, কাটতির হিসেবে, বাইবেল এবং শেক্সপিয়ারের বইয়ের পরেই আগাথা ক্রিস্টির স্থান। আবার কারো কারো মতে, গুণেমানে শেক্সপিয়ারের সাহিত্যকর্ম যত উঁচুতেই থাকুক না কেন, তাঁর বই আগাথা ক্রিস্টির মত বাজারে এতটা চলেনি। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, বাইবেল এ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে চার শ’ কোটি কপির মত (About 4 billion copies)। আগাথা ক্রিস্টির সবচেয়ে জনপ্রিয় বই অহফ And Then There Were None বিক্রি হয়েছে ১০ কোটি কপি। পৃথিবীর অন্য কোনো লেখকের কোনো একটি বই এত কপি বাজারে বেচাকেনার কোনো নজির নেই! এখানেই শেষ নয়, ‘দি মাউসট্র্যাপ’ শিরোনামে আগাথা ক্রিস্টির একটি নাটক লন্ডনের বিখ্যাত Ambassador’s Theatre Hall-এ প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৫২ সালে, এবং বিরতিহীনভাবে এর শো এখনো চলছে। ২০০৯ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে ২৫ হাজার বারেরও বেশি (Over 25 thousand times)! সেক্সপিয়ার বাদে দুনিয়ায় অন্য কোনো নাট্যকারের নাটক, দর্শকরা দর্শনীর বিনিময়ে এভাবে পাগল হয়ে দেখছে বলে আমার জানা নেই। তাঁর বিভিন্ন বই ১০৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ ব্যাপারেও তাঁর রেকর্ড এখনো কেউ ভাঙতে পারেননি।

১৮৯০ সালে ইংল্যান্ডের টর্কি-তে অবস্থিত অ্যাশফিল্ড ম্যানশনে এক ধনাঢ্য পরিবারে আগাথা ক্রিস্টির জন্ম হয়। তাঁর মা, ক্ল্যারা বোহমার ছিলেন আইরিশ বংশোদ্ভূত, বাবা ফ্রেড্রিক বোহমার জন্মসূত্রে আমেরিকান, যিঁনি যথেষ্ট টাকাপয়সার মালিক একজন সফল স্টক ব্রোকার ছিলেন। বিত্তশালী বাবার সন্তান হিসেবে আগাথা ক্রিস্টি প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হয়েছেন। গৃহশিক্ষকের কাছে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। ইংরেজি ও অঙ্কের সাথে সাথে বাবা-মা তাঁকে মাস্টার রেখে সঙ্গীতও শিখিয়েছেন। তিনি পিয়ানো এবং ম্যান্ডেলিন বাজাতে পারতেন। ছোটবেলা থেকে পড়ালেখার পরিবেশে একজন বই-পাগল মানুষ হিসেবেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তিনি হাতের কাছে যা পেতেন তাই পড়তেন। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালেও বাল্যকালের সুখের জীবন তাঁর বেশি দিন টেকেনি, কারণ তাঁর বাবা ছিলেন হার্টের রোগী। একাধিকবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। এমনি এক প্রাণঘাতী আক্রমণে ১৯০১ সালে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তখন আগাথা ক্রিস্টির বয়স মাত্র ১১।

পরবর্তী কয়েক বছর আগাথা ক্রিস্টির মা, বোন ও তাঁর খুব খারাপ সময় কেটেছে। সঙ্কট কাটিয়ে তাঁর মা যখন সব কিছু গুছিয়ে আনেন তখন তিনি (আগাথার মা) অসুস্থ হয়ে পড়েন। সময়টা ১৯১০ সাল। এ অবস্থায় হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যে পুরো পরিবার, অর্থাৎ মা ও দুই মেয়ে মিশরের রাজধানী কায়রোতে চলে যান এবং ৩ মাস কায়রোর ‘গেরিজা প্যালেস হোটেল’-এ অবকাশ যাপন করেন। কায়রোতে থাকার সুবাদে তিনি গিজা অঞ্চলে গিয়ে কাছ থেকে পিরামিড দেখার সুযোগ পেয়েছেন। এ থেকেই হয়তো বা প্রতœতত্ত্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও কৌতূহল জন্মে।

কায়রো থেকে ফিরে এসে তিনি তার লেখালেখির জগৎকে কবিতা এবং সঙ্গীতে বিস্তৃত করেন, এবং অপেশাদার শিল্পী হিসেবে থিয়েটারে অভিনয় করতে শুরু করেন। নিজের লেখা কবিতা ও উপন্যাস ছাপাবারও চেষ্টা করেন। এ কাজে প্রথম দিকে সফলতার চেয়ে তাঁর ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি ভারী, তবে তিনি নিরাশ হননি। চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এর মাঝে আগাথা ক্রিস্টি বিয়ের জন্য মনের মানুষও খুঁজতে থাকেন, এবং এক জনকে পেয়েও যান। ১৯১৪ সালে আগাথা ক্রিস্টি বিয়ে করেন আর্চিবল্ড ক্রিস্টি নামে ‘রয়েল ফ্লাইয়িং কোর’-এর এক বৈমানিককে। আর্চিবল্ড-এর জন্ম ব্রিটিশ ভারতে, তাঁর বাবা তখন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের অধীনে জজিওতি করতেন। ফ্লাইয়িং কোর-এ যোগ দেওয়ার আগে আর্চিবল্ড ব্রিটিশ আর্মিতে ছিলেন।

তাঁদের বিয়ের কিছু দিন পরই প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মিত্রশক্তির হয়ে জার্মানদের বিরুদ্ধে লড়তে আর্চিবল্ড ফ্রান্সে চলে যান। এদিকে আগাথা ক্রিস্টিও স্বদেশের মাটিতে থেকে যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সম্মুখ সমরে নার্স এবং ফার্মাসিস্ট হিসেবে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে যুদ্ধাহত সৈনিকদের সেবাযত্ন করতে শুরু করেন। কত দিন তিনি এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন সেটা তাঁর জীবনী পড়ে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারিনি। পরবর্তী কালে অনেক নামদাম কামানোর পরও আগাথা ক্রিস্টি তাঁর জীবনের ওই সময় ও স্বেচ্ছাশ্রমকে বহুবার গর্বভরে স্মরণ করেছেন। বিনে পয়সায় মানুষের সেবা করে কোনো মানুষকে আমি আফসোস করতে শুনিনি। ‘মানুষের জন্যই মানুষ’, কথাটা বার বার প্রমাণিত হওয়ার পরও ‘আমরা সবাই মানুষ হতে পারি না!’ এখানে বড় মাপের আফসোস থেকেই যায়। খুব আগ্রহ নিয়ে বিয়ে করলেও আর্চিবল্ড-আগাথার বিবাহিত জীবন বেশি দিন টেকেনি। বিয়ের বারো/তেরো বছরের মাথায় আর্চিবল্ড-এর পরকীয়া প্রেমের কথা জানাজানি হওয়ার পর ১৯২৮ সালে আগাথা ক্রিস্টি একতরফাভাবে বিয়ে ভেঙ্গে দেন।

যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে আগাথা ক্রিস্টি-র বোন তাঁর প্রতি গোয়েন্দা উপন্যাস লেখার এক অভিনব চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। আগাথা ক্রিস্টি সাহসের সাথে বোনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং লিখেন, The Mysterious Affair at Styles। এটা তাঁর প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস। বইটি পর পর দুই প্রকাশক নাকচ করে দেওয়ার পর, তৃতীয় জনের অনুগ্রহে ১৯২০ সালে ছাপা হয়, কিন্তু বাজারে খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি, তবে হতাশায় তিনি দমে যওয়ার পাত্র নন। আগাথা ক্রিস্টি একের পর এক লিখে যেতে থাকেন।

লেখালেখির ব্যস্ততার মাঝে আগাথা ক্রিস্টি ১৯৩০ সালে মেসোপটামিয়ার (বর্তমানে ইরাকের অন্তর্গত) ‘ঊর’ অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য দেখতে যান। সেখানে তাঁর সাথে ম্যাক্স ম্যালোওয়ান নামে এক তরুণ প্রত্নতত্ত্ববিদের পরিচয় হয়। সে পরিচয় থেকে তাঁদের পারষ্পরিক ভালোলাগা, এবং অল্প দিনেই সে ভালোলাগা বিয়েতে গিয়ে পরিণতি পায়। জীবনীকারকদের মতে, তাঁদের এ বিয়ে সুখের হয়েছিল, কিন্তু আগাথা ক্রিস্টির একমাত্র মেয়েসন্তান রোজালিন্ড হিক্স-এর জন্ম হয় তাঁর প্রথম স্বামী আর্চিবল্ড ক্রিস্টি-র ঔরসে। ‘ঊর’ থেকে আগাথা ক্রিস্টি তাঁর Murder in Mesopotamia (1936) and Death on the Nile (1937) বই সমূহের প্লট পান। ওই সময় তিনি সিরিয়া সফর করেন। তাঁর সিরিয়া অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে তিনি লিখেছেন Come, Tell Me How You Live (1946)। তারপরে আগাথা ক্রিস্টি তুরস্কেও গিয়েছেন। সেখানে তিনি ইস্তাম্বুলের ‘পেরা প্যালেস হোটেল’কক্ষে বসেই লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস, Murder on the Orient Express (1934)।

আগাথা ক্রিস্টির সৃষ্ট বিপরীতধর্মী দু’টি চরিত্র জনপ্রিয়তায় সকল কালের সকল রেকর্ড ভাঙতে সফল হয়। এর মধ্যে প্রথমটি হলো, হারকিউল পয়ওয়ারো - যুদ্ধতাড়িত এক বেলজিয়ান শরণার্থী এবং দ্বিতীয়টি, ‘মিস্ জেইন মার্পল্’ - ঐতিহ্যবাহী এক গেঁয়ো ব্রিটিশ নারী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আগাথা ক্রিস্টি লন্ডন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করেন। এতে করে তিনি বিভিন্ন ধরণের বিষ (Poison) জাতীয় রাসায়নিক বস্তুর সাথে পরিচিত হন। পরে গোয়েন্দা উপন্যাস লিখতে তিনি তাঁর এ বিষ- জ্ঞান সফলতার সাথে প্রয়োগ করেন। আগাথা ক্রিস্টি-র জীবনীতে তাঁর খুব জনপ্রিয় দু’টি বই সম্বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারাগ্রাফ পড়ে আমি অর্থ উদ্ধার করতে পারিনি। ইংরেজিতে হুবহু তুলে দিলাম। অপনারা পড়ে দেখুন বুঝতে পারেন কিনা।
"During the Second World War, Christie wrote two novels, Curtain and Sleeping Murder, intended as the last cases of these two great detectives, Hercule Poirot and Jane Marple. Both books were sealed in a bank vault for over thirty years and were released for publication by Christie only at the end of her life, when she realized that she could not write any more novels. These publications came on the heels of the success of the film version of Murder on the Orient Express in 1974."

১৯৭১ থেকে আগাথা ক্রিস্টির শরীর ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে। তিনি বুঝতে পারেন তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই। অবনতিশীল শরীর নিয়েই তিনি লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন। কারো কারো মতে ওই সময় তিনি অলজাইমার এবং ডিমেনশিয়ায় ভুগছিলেন। ১৯৭৬ সালের ১২ জানুয়ারি ৮৫ বছর বয়সে আগাথা ক্রিস্টি মারা যান। এই কীর্তিমান মানুষটি দীর্ঘ দিন বর্নাঢ্য জীবনযাপন করেছেন। সাফল্য আর সার্থকতা জীবনভর দু’হাতে কুড়িয়েছেন। মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও প্রশংসায় সিক্ত হয়েছেন বার বার, কিন্তু দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, নীরবে-নিঃস্তব্ধে, অত্যন্ত সাদামাটাভাবে! তাঁর শব শোভাযাত্রায় লক্ষকোটি ভক্ত-অনুরাগীর কেউই ছিলেন না। মাত্র ২০ জন সাংবাদিকের উপস্থিতিতে এত বড় মাপের একজন মানুষের কফিন কবরে নামানো হয়। নিশ্চয়ই, এ ছিল তাঁর অন্তিম ও ঐকান্তিক ইচ্ছা! আগাথা ক্রিস্টি কেন এমন অনাড়ম্বর শেষ বিদায় বেছে নিলেন, সে রহস্য সবার কাছে অজানাই রেখে গেলেন!



লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক - টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি;
এডিটর: দি জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ; Email: wahid2569@gmail.com




Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 11-Sep-2018