bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



ইচ্ছে করলেই আমরা পারি, ইচ্ছে কেন করিনা!
কাজী সুলতানা শিমি



বিষয়টা শুরু করছি লা মন্টেজ এর এক বিয়ের অনুষ্ঠান দিয়ে। লা মন্টেজ অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়াস ফাংশন ভ্যেনু। আগত অতিথিরাও যথেষ্ট সুশীল। সোনালী বিকেল। ঝলমলে পরিবেশ। চমৎকার এক বিয়ে-উত্তর সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান। বাইরে এক আশ্চর্য সুন্দর সময়। সবকিছুকে ম্লান করে দিয়ে, সুদর্শনা সব ললনারা তাদের সহচর-সহচরী নিয়ে নানা ছবির ভঙ্গিমা আবিষ্কারে ব্যস্ত। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও রঙ্গিন পোশাকে মোড়ানো যেন এক একটা প্রজাপতি। চারপাশে শুধু আনন্দ আর আনন্দের ঝিলিক। পলকে পলকে হাসির মহড়া। কমতি নেই পারস্পরিক খুনসুটির ও। মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো সন্ধ্যা নামার পর।

বর-কনে ও তাদের পরিজনেরা একে একে অভ্যাগত অতিথিদের সামনে দিয়ে স্টেজে আসার পর এক পর্বে শুরু হল তাদের বক্তৃতা। সোজা কথায় যাকে বলা যায় বিদায়ী স্মৃতিচারণ। এ পর্বটি বিয়ের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়। এতকাল ধরে যে মেয়েটি তার নিজের বাড়িতে আধিপত্য নিয়ে বড়ো হয়েছে আজ তার বিদায়ী মুহূর্ত। মেয়েটির বাবা, মা ও ভাইবোনেরা তাকে বিদায় জানাতে গিয়ে স্মৃতিচারণ করছে। আবেগাপ্লুত হয়ে নানা কথার অবতারণে মেয়েটির আগামী দিনগুলো সুন্দর হবার শুভকামনা করতে যাচ্ছে। বিপত্তিটা ঠিক সে সময়ই। শুরু হল সেলফি তোলার হিড়িক। সেইসাথে নিজেদের মধ্যে নৈমিত্তিক আলাপনের মহরত। সেলফি-মহড়া আর মা-বাবাদের গল্পের হল্লা-চিল্লা দেখে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও শুরু করে দিয়েছে দৌড়-ঝাঁপ। অভ্যাগত অতিথিদের মধ্যে কেউ কেউ হাত নেড়ে কিংবা হাতের ইশারায় থামাতে চেষ্টা করছে এসব হট্টগোল। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সেলফি তুলনেওয়ালা কিংবা গল্পকারদের কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। বলা বাহুল্য এরা টিন-এজার নয়। সবাই প্রাপ্তবয়সী, সুশিক্ষিত ও যথেষ্ট প্রাজ্ঞ। যারা নিজেরাই অন্যদের নীরব থাকতে উৎসাহিত করার কথা তারাই করছে এই অসঙ্গত ও অসৌজন্যমূলক আচরণ। অথচ সে সময় থাকার কথা পিনপতন নীরবতা। এই যে পরিবেশ অনুযায়ী আমাদের যথাযথ আচরণের অভাব তা কি আমাদের সুস্থ সংস্কৃতির অংশ নাকি খাম-খেয়ালী! যথাযথ আচরণের মানসিক দীনতা আমাদের ঘুচবে কবে!

পরিবেশ, পরিস্থিতি ও আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী যথাযথ ব্যাবহার আমাদের ছেলেমেয়েরা শিখবে আমাদের আচরণ দেখে। আমরা নিজেরাই যদি এসব আচরণের ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন না হই তাহলে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের কি শিখাবো! প্রায় সময় আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে দুঃখবোধ বা অভিযোগ করি তারা বড়োদের সাথে শোভন ও শ্রদ্ধা নিয়ে আচরণ করা জানেনা। কিন্তু আমরা কি শেখাচ্ছি তাদের! বাংলার কৃষ্টি ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে আমরা যতোটা না আপ্লুত এর চেয়ে আচরণ ও যথাযথ ব্যবহারের ব্যাপারে কতোটা নিষ্ঠাবান ও সৎ তা-কি একবারও ভেবে দেখেছি? সময়ের সাথে পরিবেশ ও বদলায়। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে আচরণের ও পরিবর্তন করা দরকার। দেশ ছেড়ে আমরা প্রবাসে এসেছি। পোশাক-পরিচ্ছেদ, বাড়ি-গাড়ি, পেশা-প্রতিপত্তিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে কিন্তু ব্যাবহার ও আচরণে! এখনো রয়ে গেছি পুরনো পরিচয়ে। আমরা কি ভুলে যাচ্ছি যে আমরা আমাদের আচরণের মাধ্যমে আমাদের পুরো জাতিসত্তাকে তুলে ধরছি। উন্মোচন করছি আমাদের মানসিকতা।

এরপর আসি কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনে। আজকাল বাংলাদেশী কোন অনুষ্ঠানে গান শুনতে গেলে উপস্থাপক এবং শিল্পীকে উপস্থিত দর্শকদের নীরবতার জন্য বার বার অনুরোধ করতে দেখা যায়। এতে শিল্পী ও অনুষ্ঠানের আয়োজকদের যে কতখানি অসম্মান করা হয় তা কি একবার ও মনে হয় আমাদের। আড্ডা ও অনুষ্ঠান এক বিষয় নয়। অনুষ্ঠান বিরতিতে আড্ডা কিংবা সেলফি তোলার যথেষ্ট সময় থাকে। নীরব থাকার প্রবণতা অভ্যাস করা হলো মূলত শিল্পীদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। তাদের গান বা অনুষ্ঠানকে মর্যাদা দেয়া। কিন্তু তা না করে হৈ চৈ বা অহেতুক গল্পে মশগুল হয়ে তাদের প্রতি কি নিদারুণ অসম্মান করছি সেটা একবার ভুলেও ভাবছিনা। অনুষ্ঠান শেষে খাবারের লাইনে ও দেখা যায় এমন অসঙ্গতি। এমনকি শোকের অনুষ্ঠানেও দেখা যায় একই পরিস্থিতি।

যথাযথ আচরণের মাধ্যমে সুন্দরের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। সম্ভব পরিস্থিতি পরিবর্তনে জোরালো ভূমিকা রাখা। সব রকমের মহৎ কাজকে শ্রদ্ধা জানানো যায় আচরণ দিয়ে। ভালো কাজে সবাইকে সম্পৃক্ত করার চমৎকার মাধ্যমও যথোপযুক্ত আচরণ। একটু সচেতনতা ও সহনশীলতাই আনতে পারে বৃহৎ পরিবর্তন। অথচ আমরা কেউ এ ব্যাপারে মনোযোগ না দিয়ে মেতে আছি শুধু নিজেদের নিয়ে আর অপরের দোষারোপে।

ছোট ছোট সচেতনতা আমাদের নিজেদের যেমন পরিবর্তিত হতে সহায়তা করে তেমনি প্রেরণা যোগায় অন্যদেরও। পরিবেশ অনুযায়ী যথাযথ আচরণ চর্চা করা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিবেচ্য হওয়া খুব দরকার। বিয়ের অনুষ্ঠান, গানের অনুষ্ঠান, সভাসমিতিতে বা শোকের পরিবেশে কখন কি আচরণ প্রযোজ্য সেটা আমরা বড়োরাই যদি সচেতন না থাকি তাহলে বাংলাদেশী কালচার বা সংস্কৃতিতে চিরকালই কিছু একটা অপূর্ণ থেকে যাবে। এ অপূর্ণতা দুর করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। বিশেষ করে প্রজন্মর কাছে জবাবদিহি না করার মতো কিছু একটা তো অন্তত অর্জন করা যাবে। এ জন্য প্রয়োজন সকলের সদিচ্ছা। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

কৌতূহল হয় এসব কি আমরা ইচ্ছে করে করছি নাকি বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে মনে করছি। এসব খেয়াল না করার কারণে আমরা আসলে অন্যান্য পরিমণ্ডলেও নিজেদের ছোট করছি। বাদামি চামড়া কিংবা এশিয়ান হিসেবে আমরা অন্যদের কাছেও তাচ্ছিল্যর বিষয়ে পরিণত হচ্ছি। কেননা কোন কোন অনুষ্ঠানে অন্যান্য দেশের অতিথিও থাকে তখন তারা এধরণের আচরণ কতোটা নিগ্রহের দৃষ্টিতে দেখে সেটা বিবেচনায় রাখছিনা। অথচ এসব করে পুরো জাতীকে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন করা ছাড়া মানসিক কোনো প্রশান্তি মেলে না। জাতী হিসেবে ক্ষতিটা হয় মূলত আমাদের সকলের। তবে আশার কথা এই যে, আমরা ইচ্ছে করলেই এটা সমাধান করতে পারি। তার প্রমাণ মেলে কিছুদিন আগে একটি মঞ্চ নাটক প্রদর্শনীতে। পঞ্চ নারী আখ্যান- নামে সিডনীতে একটি একক নাটক মঞ্চায়নের সময় সকল দর্শক এক ঘণ্টা তিরিশ মিনিট নিরবচ্ছিন্ন নীরবতায় থেকেছে। এ থেকে বুঝা যায় যে, আমরা ইচ্ছে করলে অনেক কিছুই পারি। কিন্তু ইচ্ছে কেন করিনা!



কাজী সুলতানা শিমি, সিডনি




Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 9-Nov-2017