bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia













রাজা বিনিময়
আহমেদ সাবের





আমরা সবাই সিপাহী বিদ্রোহ সম্পর্কে কম-বেশী জানি। ভারতের বিভিন্ন স্থানে, দখলদার ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ অফিসারদের সাথে স্থানীয় সিপাহীদের ছোট খাট সমস্যা চলছিলো অনেক দিন ধরেই। তারই প্রেক্ষাপটে, ১৮৫৭ সালের ১০ই মে কোম্পানির বেঙ্গল আর্মি ইউনিটের মীরাট গ্যারিসনের সিপাহীরা কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অশীতিপর জরাগ্রস্ত বাহাদুর শাহ জাফর তখন দিল্লীর মসনদে আসীন। পরদিন বিদ্রোহী সৈন্যদের একটা দল দিল্লী পৌঁছে সম্রাট বাহাদুর শাহের সাথে দেখা করে তাকে তাদের নেতা এবং ভারত সম্রাট বলে ঘোষণা দেয়। প্রসঙ্গতঃ বলে রাখা দরকার, সেই সময় দিল্লী ছাড়া ভারত বর্ষের আর কোন স্থানে সম্রাটের কর্তৃত্ব ছিলো না।

মীরাট বিদ্রোহ সারা ভারতের সিপাহীদের অন্তরে লালিত স্বাধীনতা স্পৃহার সুপ্ত আগ্নেয়গিরিকে জীবন্ত করে দেয়। লহমায় সেনা বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, বাংলা, বিহার, গুজরাট এবং পাঞ্জাবে। ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রায় চার মাসের মধ্যে বেশীর ভাগ স্থানের বিদ্রোহ নির্মম ভাবে দমন করে।


জীবন সায়াহ্নে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর

নীচে বিদ্রোহের ঘটনাপঞ্জি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো –

১৬ মে ১৮৫৭ – মীরাটে বিদ্রোহের শুরু। পরের কয়েক মাসে আউধ, রোহিলাখন্ড, বুন্দেলখন্ড, লখনৌ, ঝাঁসি, বেরিলী, ফৈজাবাদ ও বিহারে ব্যাপক আকারে এবং বাংলা, বিহার, পাঞ্জাব ও গুজরাটে সীমিত আকারে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

আগস্ট ১৮৫৭ – ব্রিটিশ বাহিনীর দিল্লী দখলের প্রস্তুতি গ্রহণ। দিল্লী তখনো ব্রিটিশদের করতলগত ছিল না।

২০ শে সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ - ব্রিটিশ বাহিনীর দিল্লী দখল।

২০ শে সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ – ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হডসন কর্তৃক হুমায়ুন স্মৃতিসৌধ (Humayun’s Tomb) এর লুকানো স্থান থেকে সম্রাট বাহাদুর শাহকে গ্রেফতার। সেখানে সম্রাটের দুই পুত্রকে হত্যা করা হয়।

৩০ শে নভেম্বর ১৮৫৭ – ব্রিটিশ মিলিটারি কমিশন কর্তৃক সম্রাট বাহাদুর শাহের বিচারের সিদ্ধান্ত।

২৭ শে জানুয়ারি ১৮৫৮ – বিদ্রোহীদের সাহায্য ও প্ররোচনা, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং দিল্লীতে বসবাসকারী ইংরেজদের হত্যার সহকারী হবার অভিযোগে সম্রাট বাহাদুর শাহের বিচার শুরু।

৯ শে মার্চ ১৮৫৮ – বিচারের রায় ঘোষণা। সম্রাট বাহাদুর শাহকে বার্মার রেঙ্গুনে (বর্তমানে মায়ানমারের ইয়াঙ্গুনে) নির্বাসন দণ্ড প্রদান।

৭ শে অক্টোবর ১৮৫৮ – সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর স্ত্রী-পুত্র সহ সমুদ্র পথে রেঙ্গুনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

৮ ই জুলাই ১৯৫৯ – প্রায় ৬ (মতান্তরে ৪০) হাজার ব্রিটিশ সৈন্য ও সাধারণ মানুষ এবং ২ লক্ষ (মতান্তরে ১০ লক্ষ) স্থানীয় সিপাহী ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর মাধ্যমে সিপাহী বিদ্রোহের সমাপ্তি।

যারা সিপাহী বিদ্রোহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান, উইলিয়াম ডেলরিম্পল এর (William Dalrymple) “দি লাস্ট মোঘল” (The Last Mughal) বইটা পড়তে পারেন।

অন্তর্জলের কল্যাণে লুসিন্ডা বেল (Lucinda Bell) এর ২০০৪ সালে লেখা “The 1858 Trial of the Mughal Emperor Bahadur Shah II ‘Zafar’ for ‘Crimes Against the State’ (‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ’ এর জন্য মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ ২ ‘জাফর’ এর ১৯৫৮ সালের বিচার।)” শিরোনামে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পিএইচডি থিসিস আমার চোখে পড়েছে। তিন শত পৃষ্ঠার এই থিসিসে সম্রাটের আত্মসমর্পণ এবং বিচার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। উৎসাহী পাঠকরা http://hdl.handle.net/11343/39304 লিঙ্ক থেকে থিসিস ডাউন-লোড করে পড়তে পারেন।

প্রবন্ধের আয়তন সংক্ষিপ্ত রাখার স্বার্থে সম্রাটের বিচারের বিস্তারিত আলোচনায় না গেলেও লেখিকার উপসংহারের কিছু লাইন উদ্ধৃত না করে পারলাম না।
“the trial of the deposed and protected King of Delhi, Bahadur Shah, by a British court-martial in 1858, was both invalid according to the international law of the time and heralded an emerging international trend in favour of Head of State accountability”.
ক্ষমতাচ্যুত এবং রক্ষিত দিল্লির সম্রাট বাহাদুর শাহের ১৮৫৮ সালের কোর্ট-মার্শাল সে সময়ের আন্তর্জাতিক আইনানুসারে ছিলো অবৈধ এবং রাষ্ট্র প্রধানদের জবাবদিহিতার প্রশ্নে উদীয়মান আন্তর্জাতিক প্রবণতার নিদর্শন।

১৮৬২ সালের ৭ই নভেম্বর, শুক্রবার ভোর ৫টায় রেঙ্গুনে ভারতবর্ষের নির্বাসিত শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ব্রিটিশরা বিকাল চারটার দিকে তড়িঘড়ি করে সিউদাগন প্যাগোডার কাছাকাছি জি-ওয়াকা রাস্তার পাশে একটা কবরে সম্রাটকে দাফন করে। কালক্রমে, ঘন জঙ্গলে সেই কবরের চিহ্ন হারিয়ে যায়।

অবশেষে ১৯৯১ সালে ওই এলাকায় ড্রেন খোঁড়ার সময় স্থানীয় শ্রমিকরা একটা ইটের প্রকোষ্ঠে একটা মানুষের কঙ্কাল খুঁজে পায়। সেটা পরে সম্রাট বাহাদুর শাহের বলে চিহ্নিত করা হয়। সেই স্থানের কাছে সম্রাটের স্মরণে ভারত সরকারের অর্থানুকূল্যে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয় এবং সম্রাটের মৃতদেহের অবশিষ্টাংশ সেই স্মৃতিসৌধে পূনঃসমাহিত করা হয়। স্থানটি বর্তমানে বাহাদুর শাহ জাফরের দরগাহ (Dargah of Bahadur Shah Zafar) নামে পরিচিত। পাক-ভারত উপমহাদেশের কোন সরকারী কর্মকর্তা ইয়াঙ্গুন (রেঙ্গুন) গেলে এই স্থানটিও সফর করে লোকান্তরিত সম্রাটের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং মনোমোহন সিং তাদের অন্যতম।


ইয়াঙ্গুন (রেঙ্গুন) ‘এ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দরগাহ

ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির “ন্যায়” বিচারের ফলশ্রুতিতে ভারতবর্ষ হারায় তার সম্রাটকে। তবে সান্ত্বনার কথা হলো, ব্রিটিশরা আমাদের রাজার বদলে ২৩ বছর পর আমাদেরকে আরেকটি রাজা উপহার দিয়েছিলেন। সেই গল্পটাই এখানে বলবো।

বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক অমিতাভ ঘোষ এর “দা গ্লাস প্যালেস” উপন্যাসের কল্যাণে ২০০৮ সালে রাজা থি-ব মিন এর সাথে আমার পরিচয়। অমিতাভ ঘোষ ভারতীয় সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কার সহ বিভিন্ন বিখ্যাত সাহিত্য পুরষ্কার প্রাপ্ত একজন বাঙ্গালী উপন্যাসিক, যিনি ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস রচনা করেন। বর্তমানে তিনি সপরিবারে আমেরিকা প্রবাসী।


রাজা থি-ব মিন
আমাদের সম্রাট বাহাদুর শাহ এর মতো থি-ব মিন ছিলেন বার্মার (বর্তমান মায়ানমার) শেষ রাজা। দা গ্লাস প্যালেস উপন্যাসে অমিতাভ ঘোষ স্বাধীন বার্মার তৎকালীন রাজধানী মান্দালয়ে ব্রিটিশ বাহিনীর আক্রমণ, শহর দখল এবং রাজা থি-ব মিন এর আত্মসমর্পণ থেকে শুরু করে ভারতের গোয়ার কাছে রত্নগিরিতে নির্বাসনের পটভূমিকায় আমাদের চট্টগ্রামের রাজকুমার রাহা নামের এক যুবকের জীবন কাহিনী বর্ণনা করেছেন।

ব্রিটিশ সৈন্যরা ১৮৮৫ সালের ২৯ শে নভেম্বর মান্দালয়ে বার্মার রাজকীয় সৈন্য বাহিনীকে পরাজিত করে সারা বার্মায় তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং রাজা থি-ব মিন কে সপরিবারে ভারতের রত্নগিরিতে নির্বাসন দেয়। ১৯১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর, ৫৭ বছর বয়সে রাজা থি-ব মিন রত্নগিরিতে পরলোক গমন করেন। তাকে সেখানকার একটি কবরস্থানের পাশে সমাহিত করা হয়।


মান্দালয়ে রাজা থি-ব মিন এর প্রাসাদ সংলগ্ন সুবর্ণ প্রাসাদ মঠ

এই হলো রাজা বিনিময়ের নির্মম ইতিহাস। কালের যাত্রা পথে রেখে যাওয়া এক খণ্ড ঝরা পালক। ব্রিটিশদের বদান্যতায় দু’জন সম্রাটকে তাদের নিজ জন্মভূমি ছেড়ে পরদেশে স্বজন-পরিজন বিহনে তিলে তিলে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়েছে।

আমি ২০১৭ সালে দু’ সপ্তাহের জন্য মায়ানমার বেড়াতে গেলে মান্দালয়ে অবস্থিত রাজা থি-ব মিন ‘এর প্রাসাদ এবং ইয়াঙ্গুনে অবস্থিত সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দরগাহ পরিদর্শনের সৌভাগ্য হয়। যখন ইয়াঙ্গুনের জি-ওয়াকা রোডে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দরগাহ পৌঁছি, তখন শেষ বিকেল। সম্রাটের কবর দেখে মনে পড়ে যায়, ভারতের মোঘল সম্রাটদের গৌরবময় দিনগুলোর কথা। অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস। মনে পড়ে যায়, রাজা থি-ব মিনের কথাও। বিনয়াবনত চিত্তে স্মরণ করি দু’জন দুর্ভাগা সম্রাটকে।




আহমেদ সাবের, সিডনি



Click for details



Share on Facebook               Home Page             Published on: 20-Oct-2021

Coming Events: