bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney













আমি, নদী ও নীরা
আহমেদ সাবের


এই জলার দেশে হুট করে একদিন বুবুর বিয়ে হয়ে গেলো। আমি তখন সবে এস এস সি পাশ করে আই এ ভর্তি হয়েছি। বিয়ের মাস দুয়েক পর বুবুর বাড়ী বেড়াতে আসি। গঞ্জ থেকে আমাকে নিয়ে যাবার জন্যে আসেন বুবু আর দুলাভাই। ছোট্ট একটা পাল তোলা নৌকায় আমরা। এক কোনে বুবু আর দুলাভাই। মাঝে মাঝে হু হু করা বাতাস জলের গায়ে আঁকিবুঁকি আঁকে। ছোট্ট নৌকা কলার ভেলার মতো দুলে উঠে। বুবুর ভয় দেখে দুলাভাই হাসে। বুবু ওনার হাত আঁকড়ে ধরে থাকেন পরম নির্ভরতায়। আর আমি ভয়ে নৌকার ছই ধরে বসে থাকি এক কোনে, চোখে মুখে ভয়ের উল্কি এঁকে। আমার ভয় নিয়ে দুলাভাই 'এর রসিকতার বল্গা টেনে ধরেন বুবু। আমরা তোমাগো মত পানির দেশের মানুষ নি গো?

বাড়ী ফিরে এসে মাকে বলি পানির কাহিনী। মা অনুযোগ করেন বাবার কাছে, আমার মাইয়াডারে বিয়া দিবার আর যায়গা পাইলানা। ওই সাগরের মাঝখানে মাইয়ারে দ্বীপান্তর দিলা। না না, এখন মোটে বর্ষা শেষ হইলো বইলা এমন অবস্থা। কদিন পর ভ্যানগাড়ী চলবো পাল্লা দিয়া। মাকে আশ্বস্ত করেন বাবা। আর আমি বুবুর বাড়ীর দু রাতের স্বপ্নের ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কিশোর থেকে যুবা হয়ে যাই সোনার কাঠির ছোঁয়ায়। সোনার কাঠি যে রাজকন্যার হাতে ছিলো তার নাম নীরা; দুলাভাই'এর ছোট বোন। এস এস সি পড়ে তখন। সম্পর্কের খাতিরে বান্ধবীদের নিয়ে আমার উপর কি যে উৎপাত! বড়দের মৃদু বারণ অগ্নিতে ঘৃতাহুতি। আমি এমনিতে আধা শহুরে পরিবেশে বড় হওয়া সাধাসিদে ছেলে। গ্রামীণ রসিকতার ছোবলে নাস্তানাবুদ। ফিরে এসে কিছুই মনে থাকেনা। শুধু একটা প্রশ্ন ছাড়া - আবার আসবেন তো? মনের মধ্যে আমার হয়ে কেউ হাজার বার বলে উঠে, আসবো, আসবো... আসবো। কিন্তু বলা আর হয়না। সেই শেষ দেখা। এর পর দেনা পাওনা নিয়ে কি একটা সমস্যা হয়। চিঠির পর চিঠি আসে। বাবা সব খুলে বলেন না। একবার একাই যান বাবা। মাঝখানে বুবু আসেন একবার; ফিরে যান খালি হাতে নয়। আবার কিছু অর্থ হাত বদল হয়। যাবার সময় বুবু একান্তে ডেকে আমাকে বলে, নীরা তোরে যাইতে বলছে একবার। মাইয়াডা খুব ভালা রে।

এর বছর খানেক পর দেনা-পাওনা নিয়ে বাবার সাথে দুলাভাই-আপার ফোনে কথা কাটাকাটি হয়। তারই ফলশ্রুতিতে সে বাড়ীর সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেবার কয়েক দিন পরেই স্ট্রোকে বাবা বিছানায় পড়ে যান। চিকিৎসার পেছনে বানের জলের মতো টাকা খরচ করেও ওনাকে ধরে রাখা গেলনা। জমি বন্ধকে চলে যায়; নড়বড়ে সংসার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একদিন বসে পড়ে রাস্তার বিকল গাড়ীর মতো। সংসারের বড় ছেলে; বি, এ পরীক্ষা আর দেয়া হয়না। বাবা মারা যাবার পরও বুবু আসেন না বা তাকে আসতে দেয়া হয়না। মা কপাল চাপড়ান। মাইয়াডারে বুঝি আর দেখলাম না।

আমি চাকরী খুঁজি। মাস ছয়েক চেষ্টার পর, কপাল গুণে একটা প্রসাধনী কোম্পানির ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধির সামান্য কাজ জুটে যায়। আজ এখানে, কাল ওখানে, ভাসতে থাকি কচুরিপানার মতো। এমনি করে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ করে একবার দাউদকান্দি যেতে হয়। পরদিন সেখানে হরতালে আটকা পড়ে যাই। বুবুর কথা এবং নীরার কথা মনে পড়ে। দাউদকান্দি থেকে লঞ্চ আর নৌকায় মেঘনা আর গোমতী নদী পাড়ি দিয়ে বুবুর বাড়ী যাওয়া যায়। অন্য সময় হলে আমাকে সেদিনই কর্মস্থলে ফেরত যেতে হতো। এখন আমি হরতালের অজুহাতটা কাজে লাগানোর সুযোগটা ছাড়তে চাইলাম না।

দুলাভাই 'এর মোবাইলে ফোন করে কোন উত্তর মিলে না। নাইবা সংবাদ দেয়া গেলো, বড় বোনের বাড়ী গেলে তো আর ফেলে দেবেনা। আশ্রয় তো একটু মিলবে অবশ্যই। লঞ্চের ধকল পেরিয়ে গঞ্জে পৌঁছে আমি নৌকা খুঁজি। বাড়ীর নাম বলতে মাঝি চিনতে পারে। আমি এখন নৌকায়। বর্ষার পানিতে নদী টইটুম্বুর। গতবার যখন এসেছিলাম, নদী, খাল আর ডাঙ্গার পার্থক্য চিহ্নিত ছিলো। মাঝে মাঝে মাঠের মাঝখান দিয়ে ইঁদুরে খাওয়া ফিতার মতো বয়ে যাওয়া রাস্তাগুলো সগৌরবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলো। এখন সব চিহ্ন একাকার। মনে হয়, একটা সাগরের মাঝখান দিয়ে পাড়ি দিচ্ছি। মাঝে মাঝে দমকা বাতাস বয়। নিজের অজান্তে হাত দুটো নৌকার ছই 'এর দিকে এগিয়ে যায়। ভট ভট ভট, একঘেয়ে আওয়াজ। দেখতে দেখতে নৌকা বড় নদী ছেড়ে একটা খালে ঢুকে। জোয়ারের পানির তোড়ে খালে প্রচণ্ড স্রোত; খাল আর জমির সীমানা বিলীন। আমি স্রোত দেখি। গাছ পালা ভেসে যাচ্ছে। কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে কিসের অদম্য আকর্ষণে। হঠাৎ করে দূরে ভেসে যাওয়া একটা ভাঙ্গা ডালের সাথে একটা কমলা শাড়ীর আঁচলের মতো কিছু একটা চোখে পড়ে। মাঝির দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করলে সে যা বলে, তার মর্মার্থ হলো, বর্ষার বানে গরু, ছাগল, কাপড়-চোপড় কতো কিছুই তো ভেসে আসে। স্রোতের টানে সেই ডাল কাপড় সহ মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যায়।

নৌকা একটা বাঁক ঘুরতেই প্রায় চার বছর আগে দেখা বুবুর বাড়ীটা চোখে পড়ে। পড়ন্ত বিকেল। মাঝি আমাকে নামিয়ে দিয়ে ফিরে যায়। আমি খালের পাড় থেকে কাদা মাটির পথটুকু পেরিয়ে ঘরের দরজায় এসে বুবু বলে জোরে হাঁক দিয়ে উঠি। কোন সাড়া শব্দ নেই। বিকেলের পড়ন্ত রোদে ঘরের ভিজা চালে বসে কাক কা কা করে ডেকে চলে। খোলা বিলের দিক থেকে শো শো করে বাতাস আসে। জলের সোঁদা গন্ধ নাকে ধাক্কা দেয় গোঁয়ারের মতো। আমি আবার ডাকি, বুবু, বু......বু ...উ ... উ। ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা ভাঙ্গে। চলাচলের শব্দ পাওয়া যায়। একটা মাথা দরজার বাইরে গলা বাড়িয়ে ধরে, কচ্ছপের মতো। বর্ষার বিকেলের দিবা-নিদ্রা ভাঙ্গা বুবুর শ্বশুরের আরক্ত চোখে একরাশ প্রশ্ন এবং বিরক্তি। তিনি আমাকে চিনতে পারেন না। যথারীতি সালাম আদান-প্রদানের পর পরিচয় পর্ব শেষে আমি অন্দরে প্রবেশাধিকার পাই। আমার চোখ বুবুকে খোঁজে, নীরাকে খোঁজে। মুখে প্রশ্ন, বুবু কই? বুবুর শাশুড়ি অনুযোগ করেন, আমি জানিয়ে আসলাম না কেন? বড় মেয়ের বাচ্চা হবে দু'এক দিনের মধ্যে। বুবু গেছে গতকাল সকাল বেলা। দুলাভাই কই প্রশ্নের উত্তরে বুবুর শ্বশুর বলেন, মামলার তদবিরে মনে হয় গঞ্জে গেছে; রাইতে ফিরবো। এবং নীরা কই? সঙ্কোচে প্রশ্নটা মুখে আনতে পারিনা।

সন্ধ্যার একটু আগে নীরা আসে। ভেজা শাড়ী গায়ে লেপ্টে আছে। হাতে এক গোছা শাপলা ফুল। আমাকে দেখে লজ্জা পেয়ে ঘরের পেছনে চলে যায়। আমি বসে থাকি। সময় আর কাটতে চায়না। একটা মুহূর্ত যেন একটা যুগ। একটু পরে নীরা ফিরে কাপড় বদলিয়ে। আসার পথে নৌকায় আমার আর নীরার অনর্গল প্রশ্নোত্তরের মহড়া ব্যর্থ হয়ে যায়। মনের মধ্যে সাজানো প্রশ্নগুলো কোন এক অদৃশ্য বোলারের বলের আঘাতে ক্রিকেটের ষ্ট্যাম্পের মতো ছিন্ন ভিন্ন। নীরা আপন মনে ঘুরে বেড়ায়। আমার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে মুচকি মুচকি হাসে। আবার তাকায় অভিব্যাক্তিহীন মৃত মাছের চোখে। সে কি আমাকে চিনতে পারেনি? না কি উপেক্ষা? না কি লজ্জা? না, এও তার আরেক খেলা। ঝানু শিকারির মতো শিকারকে নিয়ে খেলা।

ধীরে ধীরে আম, জাম, বাতাবী লেবু, নারিকেল, সুপারির গাছ থেকে কেউ দিনের আলো শুষে নেয় অদৃশ্য ব্লটিং পেপারে। অন্ধকারের ধোঁয়াশা পর্দা কেউ ধীরে ধীরে নামিয়ে দেয় ষ্টেজের ড্রপ-সিনের মতো। আমাকে একঘেয়েমিতে পেয়ে বসে। দুর ছাই, কেন যে আসলাম? হরতাল হলেও চেষ্টা করে ফিরে যেতে পারতাম। এখন এখানে এই স্বজন বিহীন জনপদে আমি একা। আসে পাশে কোন বাড়ী নেই। একেকটা বাড়ী জলের উপর মাথা তুলে আছে দ্বীপের মতো; মাঝে জল-তরঙ্গের অন্তহীন বিস্তার। নীরার সাথে এক আধটু কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু তার উপেক্ষায় ফল মিলে শুধু ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা। নীরার বড় বোনের ঠিক ঠাক মতো বাচ্চা প্রসব হলে বুবুর আজই ফিরে আসার কথা। আমি মনে মনে প্রার্থনা করি, বুবু যেন আজই ফিরে আসতে পারে। ধীরে ধীরে আঁধার গাঢ় হয়।

বাড়ির পেছনে গোয়াল ঘর, খড়ের স্তূপ। পাশে বাঁশের তৈরি একটা বেঞ্চ। আমি সেখানে এসে বসি খাল নামের সমুদ্রটাকে সামনে রেখে। সাথে সাথে আকাশের মেঘ চিরে থালার মতো বিরাট একটা চাঁদ ফিক ফিক করে হেসে উঠে। খালে দলছুট জোনাকির মতো বাতি জ্বলে এখানে সেখানে। মাছের ঘেরের হ্যাজাক লাইট নিজের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আলো ছাড়ায়। গরুর গোয়ালের গন্ধ, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা ভাতের আর মাছের ভাজার গন্ধ, খালের জলজ গন্ধের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। বাড়ীর পেছনে খাল। খালের পাড়ে ঘাট। আকাশ জুড়ে বিরাট একটা চাঁদ; মনে হয় আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। আমি নিজেও হাসি। আমি স্মৃতির সাগর হাতড়ে বেড়াই। নীরার সাথে প্রথম সাক্ষাতের দিনে ফিরে গিয়ে তন্ময় হয়ে পড়ি। নীরার হাসি কাঁচের চুড়ির মতো আমার কানে বিরতিহীন বাজতে থাকে।

এখানে ক্যান আসছেন? নীরার গলার শব্দে চমকে উঠে আমার তন্ময়তা ভাঙ্গে। কখন সে বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পদচারণায় গোয়ালের পাশের বাতাবি লেবু গাছটার নীচে এসে দাঁড়িয়েছে, আমি জানতে পারিনি। নীরার সারা বিকেলের অপেক্ষা বোধ হয় এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্যেই। তাই, বাবা-মার সামনে ওর দৃশ্যতঃ উপেক্ষার নাটক। আমার বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ লাভার মতো ছড়িয়ে পড়ে। আমি এসেছি তোমার জন্য নীরা, শুধু তোমার জন্যে। আমার চার বছরের অপেক্ষা শুধু তোমার জন্যে। তোমার প্রশ্ন ছিলো, আবার আসবেন তো? বুবুর কাছে তুমি আমাকে আসতে বলেছিলে। তোমার ডাক কি করে উপেক্ষা করি? তাই আমি এসেছি। আসতে একটু দেরী হয়ে গেলো নীরা। কিন্তু কেউ আমার জিভের ডগায় অন্য উত্তর তুলে দেয়। বুবুকে দেখতে। অনেকদিন বুবুর কোন খবর পাইনা। মুখ ফসকে কথাগুলো বেরিয়ে যাওয়াতে নিজের কাছেই খারাপ লাগে।

চন্দ্রালোকে নীরার চোখ বিড়ালের চোখের মতো জ্বলে উঠে। সে আমার বুকের কাছে এগিয়ে আসে। একটা কথা কমু আপনেরে। আমার চোখের উপর চোখ রেখে ফিস ফিস করে বলে উঠে নীরা।

বলো নীরা বলো। একটা কেন, হাজার কথা বলো। যে কথাটা সঙ্কোচে তোমাকে বলতে পারিনি, কিন্তু সেটা শোনার জন্যে আমি উন্মুখ হয়ে আছি। আমার সকল ইন্দ্রিয় উন্মুখ হয়ে আছে। আমি মনে মনে বলতে থাকি। ইচ্ছা হয় নীরাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলি, না নীরা, তোমার বলতে হবেনা। তুমি কি বলবে, তা অনেক আগেই আমার জানা হয়ে গেছে। ইচ্ছার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে আমি নীরার চোখের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টি মেলে বলি, কি কথা?

ভাবী নাই। আমার কথা শেষ হবার আগেই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আবার ফিস ফিস করে বলে উঠে নীরা।

আমিও জানি বুবু নাই। বুবু আপনের বড় আপার বাড়ীত গেছে। আইজ কালকের মধ্যে ফিরা আসবো।

মিছা কথা; ভাবী আর কোন দিন ফিরা আসবোনা। আমি নীরার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারিনা।

কেন আসবোনা?

ভাবী যেখানে গেছে, সেখান থেইকা কেউ আর ফিরা আসে না।

কই গেছে?

আমার প্রশ্নের উত্তরে দিগন্ত বিস্তারী জলরাশির দিকে তর্জনী তুলে ধরে নীরা। মুখে বলে, ভাইয়া সকালে ভাবীরে মাইজ গাঙ্গে নিয়া নৌকা থেইকা ধাক্কাইয়া ফালাই দিছে।

কী! আমার বুকের গহীনে একটা আর্ত চিৎকার ঘূর্ণিঝড় হয়ে যায়। বিলের শো শো শব্দ আবার বুকে কাঁপন জাগায়। কিন্তু আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয়না। বোবায় ধরার মতো নীরার মুখের দিকে তাকিয়ে না, না, না করে গোঙাতে থাকি। নৌকা থেকে দেখা স্রোতে কমলা রঙ'এর শাড়ী ভেসে যাওয়ার দৃশ্য আমার চোখের সামনে বারবার রিপ্লে হতে থাকে। এস এস সি পরীক্ষা দেবার পর আমি কিছুদিন প্রাইভেট পড়িয়েছিলাম। সেই আয় থেকে বুবুকে একটা কমলা রঙের শাড়ীটা প্রেজেন্ট করি; তার প্রিয় রঙ। বুবুর বিয়ের কথা-বার্তা তখন পাকা হয়ে গেছে। পুরো শাড়ীটা আমার চোখের সামনে পর্দার মতো ঝুলতে থাকে সারা আকাশ জুড়ে। এটাই কি সেই শাড়ী? বুবুর মুখ অসংখ্য তারার মতো ভেসে উঠে শাড়ীর জমিনে। টাকার জন্যে শেষে ওকে প্রাণ দিতে হলো। হায়রে টাকা! হায়রে লোভ! লোভের বলি হতে হলো বুবুকে।

আমার প্রচণ্ড ভয় আর ঘৃণা হতে থাকে। এ বাড়ীতে আমি কি করে রাত কাটাবো? আমি পালাবো। আমাকে পালাতেই হবে। এখনি পালাতে হবে। জলমগ্ন এই দ্বীপ থেকে না পালালে আমার নিস্তার নেই। আমি বুবুর মতো মরতে চাইনা।

আপনি চইলা যান। আমার মনের কথার প্রতিধ্বনি নীরার মুখে। আমি কৃতজ্ঞতা বোধ করি।

কি কইরা যামু।

আমি নৌকা কইরা আপনেরে গঞ্জে নামাইয়া দিয়া আসুম।

আমি ভাবতে থাকি। এটাও কি আরেকটা চাল? আমি সাঁতার জানিনা। না, না, নীরা মেয়েটা ভালো বলেই তো সত্য কথাটা আমি জানতে পারলাম। আমি দোটানায় পড়ে যাই।

হঠাৎ খালের দিকে চোখ পড়ে। একটা আলোর বিন্দু ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আমার চোখ সেই আলোতে স্থির হয়ে যায়, উত্তরে স্থির হওয়া কম্পাসের কাঁটার মতো। আলোটা আসে, এগিয়ে আসে। আমার কাছে সেই আলো ছাড়া এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের আর সব কিছুই অদৃশ্য। ধীরে ধীরে নৌকাটা বাড়ীর ঘাটে এসে থামে। একজন পুরুষ আর বোরখাবৃতা এক মহিলা নামেন নৌকা থেকে। লোকটা নৌকাটাকে ঘাটে বাঁধার জন্যে বা অন্য কোন কারণে ঘাটে থেকে যান। খাল পাড়ের কর্দমাক্ত পথ পেরিয়ে সেই মহিলা আমাদের দিকে এগিয়ে আসেন। দূর থেকে আমাকে দেখে মুখের উপর বোরখার ঢাকনা টেনে দেন তিনি। কাছে আসতেই, মুখের ঢাকনা সরিয়ে রাজু, তুই বলে, দু চোখে রাজ্যের বিস্ময় ফুটিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বুবু। জলজ্যান্ত আমি বসে আছি, এটা যেন তার বিশ্বাস হতে চায়না। কবে আইলি? কোনখান থেইকা আইলি? একটা খবর দিয়া আইলিনা ক্যান? প্রশ্নের তুবড়ি ফুটতে থাকে। আমি বিস্ফারিত চোখে বুবুর মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বোবা হয়ে যাই।

কিরে কথা কছনা ক্যান? কি হইছে? ......... বাড়ীর খবর ভালা ত? ......... মা'র কিছু হইছে নি কোনো? ......... মা কেমুন আছে? ......... কি রে, তোর কি হইছে? কথা কছনা ক্যান? আমি বুঝছি; মা আর নাই, বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বুবু।

না, না বুবু, আম্মা ভালা আছে। অ... নে... ক... ক্ষ... ন পরে আমার মুখে বোল ফুটে। বুবু, এইডা কি আসলেই তুমি? কিন্তু ............ কিন্তু, তুমি ক্যামনে আসলা? তোমারে ... তোমারে না দুলাভাই মাইজ গাঙ্গে ধাক্কাইয়া ফালাই দিছে?

ধুর! কি কছ সব অলুক্ষনে কথা। কেডা কইছে তোরে?

আমি নীরার দিকে তর্জনী তুলে ধরি।

হি হি হি ...... হি হি হি করে খালের ধার ধরে বাঁশ বন পেরিয়ে গাছের অন্ধকারে ছুটে যায় নীরা। খালের জলে তার হাসির কাঁপন লাগে। ধীরে ধীরে চাঁদটা আশ্রয় নেয় মেঘের আড়ালে। হি হি হি ...... হি হি হি। খালে জোয়ার আসে। নীরার হাসির শব্দ স্রোতের গর্জনে চাপা পড়ে যায়।

আহারে! মাইয়াডার মাথাডা পুরাই আউলাইয়া গেছে। এমন একটা ভালা মাইয়া। আল্লাতালা তারে এই গজবডা ক্যান দিলো? অন্ধকারের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন বুবু।


সিডনী, এপ্রিল ১১-১৩, ২০১৪






Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 12-May-2015