bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia












উল্টো পিঠের সোজা কথা (১৫)
রিয়াজ হক


কাঁঠালের আমসত্ত্ব ও বাংলাদেশের টি-টুয়েন্টি





Photo credit: CricketTimes.com
বল আছে, মাঠ আছে, খেলোয়াড় আছে, প্রতিযোগিতা আছে তাই আপনাকে খেলতে হবেই। কিন্তু আপনি যদি মাঠে ভালো খেলতে না পারেন তাহলে কি মাঠের বাইরে খেলবেন! এটা কখনো হয়! বাংলাদেশে কিন্তু তাইই হচ্ছে। বলছি গত ১৮ই অক্টোবর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে শুরু হওয়া ৭ম টি-টুয়েন্টি বিশ্ব কাপ ক্রিকেটের কথা।

স্কটল্যান্ডের মত একটি নবিশ টি-টুয়েন্টি দলের কাছে বাংলাদেশের লজ্জাজনক পরাজয়ের পর ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট, কোচ, খেলোয়াড়, খেলোয়াড়দের স্ত্রী-ভাই সহ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী সবাই মিলে নেমে পড়েছেন বাক্‌-যুদ্ধে। ফলে সঙ্গত কারণেই মাঠে নয়, খেলা জমে উঠেছে মাঠের বাইরে। কথার তুবড়ি ছড়িয়ে সবাই জানিয়ে দিচ্ছেন তাদের অনিমেষ যন্ত্রণা, নিদারুণ হতাশা, কষ্ট ও ক্রোধ।

বাছাই পর্বে স্কটল্যান্ডে কাছে হারার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের সমালোচনা করে বলেছেন যে সিনিয়ররা দায়িত্বশীল ভাবে খেলেন না। তার নিজের কথায়; “প্রথম ৬ ওভারের সুবিধা কাজে লাগাতে হয়। কিন্তু ২ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা যেভাবে ব্যাটিং করেছে, আমার মনে হয়, আমরা ম্যাচটা সেখানেই হেরে গেছি। ১৪১ রান তাড়া করার মতো ব্যাটিং তারা করেনি। তারা তো জানত ওভাবে খেললে আমরা জিততে পারব না”।

বিসিবি বসের কথা মিডিয়ায় প্রচার হতে না হতেই এর স্টেক-হোল্ডার যারা যারা আছেন তারা সবাই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন কথার লড়াইয়ে। আমরা বাঙালিরা এ কাজে বরাবরই পটু। এবারেও তার ব্যতিক্রম হবে কেন, হোক না তা প্রতিযোগিতা চলার মাঝখানেই! ‘দেশ-জাতির ভাবমূর্তি’ এসবে কার কি যায় আসে, গায়ের ঝাল মেটাতে পারলেই হল। বাঙালি প্রভাবে প্রভাবান্বিত বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের সাউথ আফ্রিকান কোচ রাসেল ডমিঙ্গো তাই চুপ করে থাকার মানুষ নন। ওমানের বিপক্ষে ম্যাচটিকে সামনে রেখে ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ-সম্মেলনে কথা বলতে এসে পাপনের উপর উল্টো ক্ষোভ ঝেড়েছেন তিনি। বললেন, “খেলোয়াড়রা রোবট না, তারা রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। ফলে ভুল হতেই পারে”।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দেশের মাটিতে সর্বশেষ সিরিজটা খেলতে পারেননি অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে দুই ইনিংসে অপরাজিত ছিলেন, তবে ৫ ইনিংসে করেছিলেন মাত্র ৩৯ রান। বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৬ রান করলেও জেতাতে পারেননি দলকে। পরের ম্যাচে ওমানের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে নেমেছিলেন ৮ নম্বরে। মুশফিকুর রহিমের ওপর একটা চাপ ছিল ভাল খেলার। সহ্য করতে হয়েছে সমালোচনাও। তাই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৭ বলে ৫৭ রান করা মুশফিক সমালোচকদের ‘আয়নায় নিজেদের মুখ’ দেখতে পরামর্শ দিলেন।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের একজন বড় দিকপাল মাশরাফি। সুতরাং তাকেও কিছু বলতে হয়। তবে তিনি ‘কিছু’ না, একটু যেন বেশিই বললেন। তিনি বললেন, “এখন টিম ম্যানেজমেন্ট দেখলে মনে হয় একটা পুনর্বাসন-কেন্দ্র, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার সব চাকরি না পাওয়া কোচ একসঙ্গে আমাদের পুনর্বাসন-কেন্দ্রে চাকরি করছে। এদের বাদ দেওয়া আরও বিপদ। কারণ, চুক্তির পুরো টাকাটা নিয়ে চলে যাবে। তাহলে দাঁড়াল কী, তারা যত দিন থাকবে আর মন যা চাইবে, তা-ই করবে”।

বাংলাদেশ দলের বাজে ফিল্ডিংয়ের দায় ফিল্ডিং কোচকেও নিতে বলছেন তিনি, “লিটনের ক্যাচ মিসের কোনো অজুহাত দেব না, এমনকি লিটন নিজেও দেবে না। তবে ক্যাচ মিস খেলার একটা অংশই। কিন্তু ফিল্ডিং কোচের কাছে কি এ বিষয়গুলো নিয়ে জানতে চাওয়া হয়? ক্যাচ মিস কি এই প্রথম হলো? ২০১৯ বিশ্বকাপের পর ম্যানেজমেন্টের প্রায় সবাই চাকরি হারিয়েছে, স্রেফ বর্তমান ফিল্ডিং কোচ ছাড়া। তাহলে আমরা বিশ্বকাপে বা তারপর কি সেরা ফিল্ডিং দল হয়ে গিয়েছি”?
“দেখুন, ২০১৯ বিশ্বকাপে আমি ভালো পারফর্ম করতে পারিনি। ফলে, আমাকে দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আমি বিষয়টাকে খুব পেশাদারির সঙ্গেই নিয়েছি। নিজেকে প্রমাণ না করতে পারলে আপনাকে সরিয়ে দেওয়া হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুই বছর ধরে ফিল্ডিং এমন হওয়া সত্ত্বেও ফিল্ডিং কোচ রায়ান কুক দলের সঙ্গে আছে এবং এর প্রমাণ আমরা আজকেও পেয়েছি”।
“আমার কাছে মনে হয় বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যেকোনো টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব খেলোয়াড়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম নিষিদ্ধ করা উচিত। আমি এটা আমার সময়ে করতে পারিনি, তাই হয়তো বলা ঠিক না। কিন্তু বিসিবি থেকে কঠোর নিয়ম করা উচিত এ বিষয়ে। কারণ, যে চাপগুলো আসে, এগুলো সম্পূর্ণভাবে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম থেকে আসে। আজকাল খুব বাজে ভাবে ক্রিকেটারদের আক্রমণ করা হয়। যদি ক্রিকেটাররা সেটা সহ্য করতে পারত, তখন ভিন্ন হিসাব হতো। কিন্তু এখন তো ক্রিকেটাররা এগুলো নিতে পারছে না। ফলে, এটা করা উচিত”।
‘তামিম ইকবাল শো’ তে মাশরাফি আরো বললেন, ‘এখন আপনি ১২ লাখ টাকা দিয়ে ফিল্ডিং কোচ রেখে যদি একটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচে পাঁচটি ক্যাচ ড্রপ হয়..আমি আগে প্লেয়ারের দোষ কেন দেবো, বলেন তো।’

এসব প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে পেস বোলিং কোচ ওটিস গিবসন বললেন, “এ ব্যাপারে আমি কিছুই ভাবছি না। আমার এসবে কোনো আগ্রহ নেই। দলের বাইরে কে কী বলল না বলল, এসব নিয়ে আমরা ভাবি না। মানুষ কী বলছে, সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম কী বলছে, আমরা এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। আমাদের দলের মধ্যে যা হচ্ছে, সেটি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। আমরা জানি কোচিং দল হিসেবে আমরা এখানে কী করছি”।

উনি না ভাবলেও যাদের ভাবার কথা তারা তো নিশ্চুপ থাকতে পারেন না। মাশরাফির কথার সূত্র টেনে তাই সাকিবের স্ত্রী উম্মে শিশির বললেনঃ
“Can we talk about 2019 World Cup for a bit I wonder how we couldn’t manage to win against bigger teams like India, Pakistan, England, Australia, New Zealand while we had our speed stars and best opening partnership! What went wrong in those matches curious mind wants to know! Why so much of talking now while the structure is still the same. I wish we had some talk shows back then to discuss some of those mistakes so we didn’t have to fail today”! (‘আমরা কি ২০১৯ বিশ্বকাপ নিয়ে একটু কথা বলতে পারি। ভাবতে অবাক লাগে, আমরা কীভাবে ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো বড় দলকে হারাতে পারিনি, যখন আমাদের গতি তারকা ও সেরা উদ্বোধনী জুটি ছিল। সেসব ম্যাচে কী ভুল হয়েছিল, আমার কৌতহূলী মন তা জানতে চায়। সেই একই অবকাঠামো এখনো আছে, তাহলে এখন এত কথা হচ্ছে কেন। তখন যদি টকশোতে সেসব ভুল নিয়ে আলোচনা হতো, তাহলে এখন ব্যর্থ হতে হতো না।’)

শিশিরের ওই স্ট্যাটাসের জবাব দিয়েছেন মাশরাফির ছোটভাই মুরসালিন বিন মুর্তজা। তবে শিশিরের নাম উল্লেখ না করলেও তাকেই যে ইঙ্গিত করে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন মাশরাফির ভাই মুরসালিন, তা সবাই বুঝে গেছেন। ক্রিকেট-জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুরসালিন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “আমি একটা বিষয় নিয়ে কথা বলার আগে আমাকে জানতে হবে যে, সেই বিষয় নিয়ে কথা বলার মতো জ্ঞান আমার আছে কি না। হাত ঠেলার অভ্যাস সবারই থাকে, কিন্তু নিজের জ্ঞানের পরিসীমা বুঝে কথা বলার অভ্যাস সবার থাকে না”।

ব্যাপারটা হল এই যে যখন মাঠে পারফর্ম করতে আমরা অক্ষম তখন মাঠের বাইরে আমরা এভাবেই পারফর্ম করতে থাকব। তবে আমার নিজের বোধ এক্ষেত্রে পরিষ্কার। কাঁঠালের যেমন আমসত্ত্ব হয়না তেমনি বাংলাদেশকে দিয়ে টি-টুয়েন্টি হবে না। কেন হবে না?

(এক) আমাদের ক্রিকেট কাঠামোর সাথে টি-টুয়েন্টি যায় না। এমন কি টেস্টও যায় না। যা যায় তা হল ওয়ান-ডে ইন্টারন্যাশনাল (৫০ ওভারের খেলা)। আমরা প্রতিপক্ষের সাথে যে কোন ভাবে জিততে চাই। তাই আমরা স্পিন বিষ-মাখা পিচ বানাই। এর বাইরে বাউন্সি, প্রতিযোগিতা মূলক মানসম্মত (ব্যাটিং-বোলিং দু’দুক থেকেই) পিচে আমরা খেলতে পারি না। কারণ আমরা তাতে অভ্যস্ত নই।

(দুই) টি-টুয়েন্টিতে বাংলাদেশের ঘরের মাঠে জয়-পরাজয়ের অনুপাত ১.৬। আর প্রতিপক্ষের মাঠে সেটা ০.৪৬৬। অর্থাৎ প্রতিটি জয়ের বিপরীতে দুটি হার। ঘর ও প্রতিপক্ষের মাঠের পারফরম্যান্স যোগ করলে এই বিশ্বকাপে শুধু ওমান ও শ্রীলঙ্কাই বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ ছিল।

(তিন) টি-টুয়েন্টি ব্যাটসম্যানদের কাছে দ্রুত রান তোলার দাবী করে। এ জন্য আপনার ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট হতে হবে কমপক্ষে ১৪০ এর উপর। যেমন অস্ট্রেলিয়ার গ্ল্যান ম্যাক্সওয়েল (১৫৯), ওয়েস্ট-ইন্ডিজের ইভান লুইস (১৫৬), নিউজিল্যান্ডের কলিন মানরো (১৫৬), আফগানিস্তানের হজরতুল্লাহ জাজাই (১৫৫)। অথচ আমাদের সেরা ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইক রেট দেখুন, সাকিব আল হাসান (১২০), মাহমুদউল্লাহ (১১৯), মুশফিকুর রহিম (১১৫) ও তামিম ইকবাল (১১৬)।

(চার) টি-টুয়েন্টি মারকুটে ব্যাটসম্যানদের খেলা। প্রতিটি টিমে অন্তত এমন একজন-দুজন খেলোয়াড় থাকতে হবে যারা তাদের মারমুখী খেলা দিয়েই টিমকে সাফল্যের দরোজায় নিয়ে যাবে। যেমন পাকিস্তানের আসিফ আলী। আফগানিস্তানের বিপক্ষে যখন পাকিস্তানের দুই ওভারে ২৪ রান দরকার তখন সে ১৯তম ওভারেই চার ছক্কা মেরে খেলা শেষ করে দেয়। এমনকি নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩ ছক্কায় ২৩ বলে তার ২৭ রানই দলকে জয়ের মঞ্জিলে পৌঁছে দেয়। বা ধরুন সাউথ আফ্রিকার মিলারের কথা। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে জিততে দরকার ৬ বলে ১৫ রান। শেষ ওভারের ২য় ও ৩য় বলে মিলারের দুই ছক্কা গুড়িয়ে দেয় শ্রীলঙ্কার আশার সৌধ। তার ১৩ বলের ২৩ রানই ছিল সাউথ আফ্রিকার জয়ের মূল কারণ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের বাটলারের বিধ্বংসী ব্যাটিং দেখুন। অন্যরা যখন সহজে আউট হচ্ছে সেখানে তার ৬৭ বলের ১০১ রানই ইংল্যান্ডকে জিতিয়ে দেয়। আমাদের তেমন ব্যাটসম্যান কই!

(পাঁচ) আমরা ‘উইকেট হাতে রেখে’ খেলতে চাই। ‘পরে মেরে খেলব’ মানে শেষের দিকের ওভারে খেলতে চাই। এ সবই ওয়ানডের জন্য ঠিক আছে কিন্তু টি-টুয়েন্টির জন্য না। টি-টুয়েন্টি তে শুরু থেকেই ঝড়ো ব্যাটিং দরকার। নির্ভয়ে মেরে খেলা দরকার। আমাদের সে প্রস্তুতি ও ক্ষমতা নেই।

তাই আমরা মাঠে খেলছি না। খেলছি মাঠের বাইরে।




রিয়াজ হক, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
Jsfn21@gmail.com




Click for details



Share on Facebook               Home Page             Published on: 3-Nov-2021

Coming Events:
আঙ্গিক থিয়েটার প্রযোজিত সিডনিতে প্রথমবার
লাইভ মিউজিক সহ যাত্রা-পালা