bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia












মিস লিলি
রিয়াজ হক



লিলি চঞ্চল; অস্থির। লিলি বোধে বিনয়ী; গতিতে ক্ষিপ্র। লিলি গভীর অর্থপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকায়; চোখে চোখ রাখে। কি যেন বলতে চায়। তার অস্ফুট কথা তরঙ্গের মতন আছড়ে পড়ে হৃদয়ের শুকনো বালুচরে! ঘরের ভেতরের বন্ধ দরোজার পাশে বসে বাইরের আকাশকে সে দেখে। তারচেয়ে বেশি দেখে বাতাসে গাছের পাতার দোল খাওয়া ও পাখিকুলের ওড়াউড়ি। তার কৌতূহলের শেষ নেই। যে দুয়ার বন্ধ তাকে খুলে, খুঁজে দেখতে তার তীব্র আগ্রহ অখণ্ড মনোযোগী ছাত্রকেও হার মানাবে। সে কেবল সমতলে পরিভ্রমণে আগ্রহী নয়, সে উঁচুতে, আরও উঁচুতে উঠতে চায়। সে মেঝে থেকে সোফায়, সোফা থেকে ওয়ারড্রোবে, তার উপর থেকে পারলে দরোজার পাল্লার ওপর যেয়ে বসতে চায়। সে সন্তর্পণে অলি-গলি, গলি-ঘুপচি পার হয়ে হলেও নতুনের অন্বেষণে নিজেকে সদা ব্যস্ত রাখতে চায়।

আমার মেয়ে বলল, “বাবা, আগামী একমাস লিলি তোমার কাছে থাকবে। ওকে সকাল সাতটা, দুপুর একটা ও সন্ধ্যে সাতটায় খাবার দিবে। এক মাসের পর্যাপ্ত খাবার আমি আলাদা আলাদা করে ব্যাগে গুছিয়ে রেখেছি যাতে তোমার কোন অসুবিধা না হয়। সকালে দিবে Dine ব্রান্ডের Classic collection slices with succulent Chicken। দুপুরে ওয়ান-ফোর্থ কাপ ‘Taste of the Wild’। এটা Roasted Quail ও Duck এর Grain-free diet। এটা ও খুব পছন্দ করে। রাতে দিবে Fancy Feast এর Beef Feast in Gravy। ভালো কথা, সকাল ও রাতের খাবারের সাথে অল্প একটু পানি মিশিয়ে দিবে যেন ওর প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পানির চাহিদাও তাতে মিটে যায়”।

আমি দেখলাম সকাল ও দুপুরের খাবার দুটো টুনা মাছের ক্যানের মতই একই ধরনের ক্যানে প্রক্রিয়াজাত করা আছে। দুপুরের খাবারটা শুধু একটা বেশ বড় ব্যগে আছে। তবে আমার মেয়ে তা থেকে পাঁচশ গ্রামের মত নিয়ে একটি খুব ট্রান্সপারেন্ট ফ্যান্সি কন্টেইনারে রেখেছে। ওখান থেকেই আমাকে এক কাপ (এটি বড় এক কাপের চারভাগের এক ভাগ মাত্র) করে নিয়ে লিলিকে দিতে হবে।

লিলির খাবার পরিবেশনার জন্য ঐ বিড়ালের মাথার আদলে তৈরি চামচ সহ দু’সেট ‘Tilt cat plate feeding’ এর ব্যবস্থা আছে। ওখানেই একটি হালকা আকাশী রঙের রাবারের ম্যাটের ওপর ঐ টিল্ট প্লেটে তার খাবার দিতে হবে। ম্যাট পরিষ্কারের জন্য Antibacterial multipurpose biodegradable wipes মজুদ আছে। এমনকি লিলির প্লেট পরিষ্কারের জন্য আলাদা ফোম ও ডিটারজেন্টের ব্যবস্থাও সে করে রেখেছে। আমাকে সবকিছু দেখিয়ে, বুঝিয়েও সে শান্ত হল বলে মনে হল না। সবশেষে বলল, কোন সমস্যা হলে আমাকে মেসেজ করবে, নতুবা মেসেঞ্জারে কল করবে। মাত্র তো একটি মাস বাবা!

তার মা বলল, এতো চিন্তা করো না তো, অনেক দিন পর ঘুরতে যাচ্ছ, যাও, ঘোরাটা এনজয় করো। অযথা লিলি লিলি করে নিজেদের ঘোরাটা মাটি করো না। মেয়ে সে কথায় খুব একটা আমল না দিয়ে বলল, লিলি খুব লক্ষ্মী, ও ওর নির্দিষ্ট জায়গায়ই টয়লেট করবে, আম্মু তোমার দায়িত্ব হলো, তা দেখে নিয়মিত পরিষ্কার করা। ওটা কোন ভাবেই ফেলে রাখা যাবে না। তার মা বলল, হবে, সব হবে। আমি কাজে যাওয়ার আগে সকালে ও অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যায় ওর টয়লেট পরিষ্কার করব। এ নিয়ে চিন্তা করো না।

দু’বছর হয় আমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এ সময়ের ছেলে-মেয়েদের প্রিয় সখ। প্রতি বছর একবারের জন্যে হলেও ওরা বাইরের কোন দেশে যাবে, ঘুরে দেখবে, নানা এক্টিভিটিতে নিজেদের জড়িয়ে অফুরন্ত আনন্দে সময় কাটাবে। নানা আবহাওয়া, নানা বর্ণ, ধর্ম সংস্কৃতির মানুষের ভিড়ে নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করবে। এই ওদেরই পিতা-মাতা আমরা! বছরের পর বছর চলে যায়, আমাদের মাথা খুলে না, হৃদয়ে ভাব জমে না, পা চলে না। আমরা বহু পুরনো অশ্বত্থ বৃক্ষের মত এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমাদের আগ্রহ নেই, ‘বহুধা বিচিত্র এই ধরণি’ দেখার ইচ্ছে নেই, আনন্দে বাঁচার কোশেশ নেই। আমরা যেন সময় পার করার জন্য বেঁচে আছি; জীবনকে অর্থপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করার জন্য নয়!

আমার মেয়ে যখন স্কুলে পড়ে সেই তখন থেকে ওর সখ ও একটি বিড়াল পুষবে। এ ব্যাপারে তার মাকে সে বারবার বলেও রাজি করাতে পারে নি। তার মা’র সাফ কথা। আমার বাসায় ওসব হবে না। কোন দিন নিজের সংসার হলে তখন তোমার সখ পূরণ করো। মেয়ে বিয়ের ছ’মাসের মাথায়ই লিলিকে ঘরে নিয়ে এল। ওর বরও তাতে সায় ও আগ্রহ দেখানোয় ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেল। আমার মেয়ে মেডিকেল প্রফেশনে যুক্ত থাকায় ওকে নিয়মিত কাজে যেতে হয়। কিন্তু ওর হাসবেন্ড আইটির লোক হওয়ায় বাসায় বসে কাজ করে ফলে সুবিধা এই যে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ও লিলির সেবায় সময় দিতে পারে। লিলির সঙ্গে ওর খেলা ও খুনসুটি দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না! লিলিকে সে কোলে-ঘাড়ে নিয়ে ঘুরাবে, ওকে খোঁচাখুঁচি করবে, লিলিও মাঝে মাঝেই ওকে আঁচড় দিয়ে ওর প্রতিদান দিবে। তা নিয়ে আমরা যতটা শঙ্কিত, আমাদের জামাই তা নিয়ে ততটাই গ্রাহ্য-হীন, নির্বিকার। ওরা এ প্রজন্মের মানুষ। ওদের ইচ্ছা, লক্ষ্য ও সাহস দেখলে আমাদের আঁতকে উঠতে হয়!

মেয়ে-মেয়ে জামাইকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফিরে মূল দরোজা খুলতেই দেখি লিলি গুটিসুটি মেরে টাইল ফ্লোরে বসে আছে। ভাবে মলিন, চেহারায় করুন; যেন কারও অভাবে বেদনায় আদ্র। চোখ তার ছলছল বললেও কম বলা হয়। আমরা যত তার কাছে যেতে চাই, সে তত দূরে সরে যায়! এভাবেই দু’দিন যাওয়ার পর সে যখন দেখল যে আমি ও আমার স্ত্রী ছাড়া তাকে সঙ্গ দেওয়ার ও দেখভাল করার আর কেউ নেই তখন সে কিছুটা সন্দেহ নিয়ে হলেও আমাদের আশেপাশে ঘুরতে লাগল। খাবার সময় যখন আমি বলি, Come Lilly, come সে তখন বিনয়ের সঙ্গে আমার অনুসরণ শুরু করল। ক্যান থেকে খাবার প্লেটে ঢালা পর্যন্ত তার চঞ্চলতা তখন দেখার মত।

লিলি যেমন আমার মেয়ের প্রিয়, তেমনি লিলির প্রিয় আমার মেয়ে। আমার মেয়ে সামান্য প্লাস্টিকের প্যাকেট ছুঁড়ে দিলেও লিলি তাকে দৌড়ে যেয়ে ধরবে, দুমড়ানো মুচড়ানোর চেষ্টা করবে। সহজ সরল অবারিত আনন্দ কাকে বলে! তার জন্য খেলনার কমতি নেই। Cat wand, ball, climbing frame, scratching post, Tree house সহ নানা খেলনায় তার ঘর পরিপূর্ণ। এই Tree House যেদিন বাসায় ডেলিভারি হল, সে এক মহা অভিজ্ঞতা বটে। নকশায় আঁকা বিড়ালের মাপের চারতলা সে বাড়ি। লিলিকে ছেড়ে যাওয়ার আগে তাকে সন্তুষ্ট করতে তার জন্য এল এই বাড়ি। অন্তত ত্রিশটি ডিফারেন্ট পার্টস এ তা বাসায় এল। এখন তাকে এসেম্বল করতে হবে। আমি আর আমার মেয়ে প্রায় দু’ঘন্টা খেটেখুটে তাকে পূর্ণ রূপ দিতে সমর্থ হই। কখনও ডান দিকের পার্টস বা দিকে লাগিয়ে ফেলি তো বা দিকেরটা ডান দিকে। সংযোগ করি, স্ক্র লাগাই। খুলি। আবার লাগাই। সে এক ধৈর্যের পরীক্ষা।

লিলি অসম্ভব মানুষ-প্রিয়। লিলি যাকে পছন্দ করে সবসময় তার কাছাকাছি থাকতে চাইবে। লেজ উঁচিয়ে তার চারপাশে ঘুরতে থাকবে। এমনকি তার লেজের মাধ্যমে আপনার পায়ে হালকা ছোঁয়া দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইবে যে তুমি আমার প্রিয়। লিলি তার আহারের সময়ও আপনার সান্নিধ্য চাইবে। কাছে থাকলে সে দ্রুত খাবার শেষ করবে, নয়ত দীর্ঘ সময় নিবে, সহজে খাবার শেষ করবে না। মাঝে মাঝে ‘মিউ’ ‘মিউ’ স্বরে আপনাকে ডাকবে।

আমার মেয়ে লিলিকে তার ব্যাপারে এত অভ্যস্ত করে ফেলেছে যে রাতে ঘুমানোর সময়ও লিলির তাকে চাই। তাদের বেডরুমেই সে জায়গা নিবে। এমনকি এক ফাঁকে সুযোগ বুঝে তার পায়ের কাছে যেয়েও ঘুমাতে তার কোন দ্বিধা নেই।

আমার স্ত্রী যখন লিলির পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, সে তখন আহ্লাদে শুয়ে পড়ে। এ না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তবে আমার স্ত্রী বলল, আর যাই কর, লিলিকে আমাদের বেডরুমে ঢুকতে দিও না। আমি চাই না যে সে আমাদের বেডে এসে বসে বা শুয়ে পড়ুক। আমি বললাম, আমিও তা চাই না। ওর জন্য যা যা করার সব করব কেবল তার জন্য বেডরুম Out of bounds থাক।

এভাবেই সপ্তাহ দুয়েক কেটে গেল। একদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে লিলিকে লিভিং রুমে সোফায় তন্দ্রাচ্ছন্ন রেখে আমরা বেডরুমে চলে গিয়েছি। কিচ্ছুক্ষণ পর দেখি আমাদের বেডরুমের দরোজায় খোঁচাখুঁচির শব্দ, সেই সাথে ‘মিউ’ ‘মিউ। আমি স্ত্রীকে বললাম, মহা যন্ত্রণা হল, এভাবে তো ঘুমানো যাবে না। স্ত্রী দয়াপরবশ হয়ে বলল, ঠিক আছে দরোজা খুলে দাও। ভেতরে এসে খাটের নিচে ঘুমাক। আমি দরোজা খুলে দিলাম। সে সটান এসে আমার স্ত্রীর সোফা চেয়ারে বসে আমাদের দিকে রাজ্য জয়ের খুশি নিয়ে তাকাতে লাগল। লাইট নিভিয়ে কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না। হঠাৎ গভীর রাতের দিকে আমার স্ত্রী আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, দেখ তো লিলি কি আমার পায়ের কাছে ঘুমাচ্ছে কি না। আমি টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে দেখি লিলি কম্বলের উপর মাথা গুঁজে গভীর প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছে। আমার স্ত্রী বলল, সর্বনাশ, যা ভেবেছিলাম তাই হয়েছে। রাতে হঠাৎ পায়ের সঙ্গে নরম কিছু ঠেকল বলে মনে হয়েছিল, তখনই ভেবেছিলাম, এ লিলি ছাড়া আর কেউ নয়। আমাদের কথাবার্তায় লিলি জেগে উঠল ঠিকই কিন্তু বিছানা থেকে তার নড়াচড়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না।

আমার মেয়ে সারাক্ষণ লিলির খোঁজ নিচ্ছে। ও কেমন আছে, খাওয়া-দাওয়া ঠিক মত করছে কিনা। সে ‘মিউ’ ‘মিউ’ করে কি না ইত্যাদি। সে অভিযোগ করল যে যাওয়ার সময় তারা লিলির ঘরে একটি ক্যামেরা ফিক্স করে গিয়েছে তাকে দেখবে বলে, কিন্তু তেমন দেখতে পাচ্ছে না! কি করে দেখবে লিলি তো আমার সঙ্গে সারাদিন লিভিং রুমে নয়ত বেডরুমে। এমনকি আমার মেয়ের সাধের চারতলা বাড়িতেও লিলি কদাচিৎ পা দেয়!

আমার ছেলে এক উইক-এন্ডে আমাদের সাথে দেখা করতে এসে লিলিকে একটি খেলনা দিয়ে গেল। সেটা রিঙয়ের মত পেঁচানো একটি টাওয়ার। তার এক মাথায় একটি ইঁদুর বাঁধা। লিলির খুশি দেখে কে! টাওয়ারের মধ্য দিয়ে বারবার দৌড়াতে থাকল। আর ইঁদুরটিকে দুই পায়ের থাবা দিয়ে নিজের আয়ত্তে নিতে উদ্যম চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকল। আমাদের আত্মীয় স্বজনদের কাছেও খবর রটে গেছে যে, যে আমরা কোনদিন কোন পোষা প্রাণী বাসায় রাখতে রাজি ছিলাম না, সেই আমরাই লিলিকে ঘরে জায়গা দিয়েছি! এ কিভাবে সম্ভব!

এখন ফোন করেই সবাই অন্য খবরের সাথে লিলির খবর নেয়, লিলি আপা কেমন আছে? লিলি ম্যাডাম ভালো তো?
আমার এক বন্ধু সেদিন ফোন করে জিজ্ঞাসা জিজ্ঞাসা করল, “সুন্দরী মিস লিলি ভাল তো, তোর সঙ্গে কি মহব্বত হইছে?”
সেই থেকে অন্য প্রাণীকুল ও মানুষের বন্ধুত্ব নিয়ে অনেক ভাবছি। তবে তল পাচ্ছি না। কেবল নজরুলের ঐ গানটির কথা মনে পড়ছে, “খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে। প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে প্রভু নিরজনে”।





রিয়াজ হক, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
Jsfn21@gmail.com




Share on Facebook               Home Page             Published on: 25-Aug-2025

Coming Events: