bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney













আমাদের “যুক্তি তক্কো আর গপ্পো”
রিয়াজ হক



পূর্ব কথাঃ
“যুক্তি তক্কো আর গপ্পো” নামে বরেণ্য চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটকের একটি ছবি আছে। এটি তার জীবনের শেষ ছবি। বিদগ্ধ চলচ্চিত্র আলোচকদের নির্ণয়ে এটি পরিচালকের নিজস্ব ব্যক্তি জীবনের চলচ্চিত্রায়ন বলে চিহ্নিত। কারণ এ চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র “নীলকণ্ঠ” একজন শিক্ষিত, মার্ক্সবাদী ও পাঁড় মাতাল। ব্যক্তি জীবনে ঋত্বিক কুমার ঘটকও স্বয়ং তাই ছিলেন বলে প্রচলিত আছে। চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখা যায় যে ছ’সাত বছরের একটি পুত্র সন্তান (সত্য) সহ প্রায় মাঝ বয়সী নীলকণ্ঠের সাথে তার স্ত্রীর (দুর্গা’র) আপাত বিচ্ছেদ (Separation) ঘটছে। তার স্ত্রী বীরভূমের কাঞ্চনপুর নামের মফস্বলের এক স্কুলে চাকরি নিয়ে পুত্র সন্তান সমেত চলে যাচ্ছে। ভাড়া বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে নীলকণ্ঠকেও। আজই। স্ত্রীর প্রত্যাগমনের পর পরই উন্মুক্ত সদর দরোজা ঠেলে আচমকা ঘরে ঢুকে পড়ে এক তরুণী। নাম বঙ্গবালা। ১৯৭১ এর মার্চে পাক সেনাবাহিনী কর্তৃক বর্বরতার স্বীকার হয়ে তদানীন্তন পূর্ব বাংলা থেকে আশ্রয়ের ও কাজের সন্ধানে সে এসেছে শহরে।

ফলে ভাড়া বাড়ি ছেড়ে পাড়ার তরুণ নচিকেতা ও বঙ্গবালাকে কে সঙ্গে করে অজানার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরেন নীলকণ্ঠ। মাঝ পথে দেখা মেলে এক টোলের পণ্ডিতের সাথে। দু’পক্ষের খুনোখুনিতে গায়ের স্কুল বন্ধ বলে জীবিকার সন্ধানে বেড়িয়েছে সেও। তাই সেও হয় নীলকণ্ঠ দলের সাথী। এক সময় তারা এসে পৌঁছায় পুরুলিয়ায়। সেখানে তারা আতিথ্য নেয় এক আদি বাসীর ঘরে। তখন সেখানে চলছিল ভূমি দখল কারীদের সাথে আদিবাসী সংস্কৃতির প্রাণ “ছৌ নাচের” শিল্পীদের লড়াই। লড়াইয়ে সামিল হয়ে এক পর্যায়ে গুলিতে নিহত হয় পণ্ডিত।

অবশিষ্ট তারা তিন জন যায় নীলকণ্ঠের স্ত্রীর বসত এলাকা কাঞ্চনপুরে। স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে সে ভাল হয়ে যাবে, কোন একটা কাজ খুঁজে নেবে; অনুরোধ করে তাকে আবার গ্রহণের জন্য। কিন্তু স্ত্রী জানে এ সবই মূহুর্তের আবেগের কথা যার কোন সারবত্তা নেই। স্ত্রী সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে তার অনুরোধ। ফলে স্থির হয় যে কাছের এক শাল বনে রাত কাটিয়ে পরদিন চলে যাবে নীলকণ্ঠ। শর্ত হল যাবার আগে স্ত্রী যেন ছেলেকে নিয়ে সকালে একবারের জন্য হলেও ঐ শালবনে আসে। বনের ভেতর নীলকণ্ঠ মুখোমুখি হয় নকশালদের। তাদের পথ-মত নিয়ে যুক্তি তর্কে মেতে উঠে নীলকণ্ঠ। ভোর বেলা যখন দুর্গা তার সন্তান সত্য কে নিয়ে শাল বনে এসে পৌঁছায় তখনই পুলিশ আক্রমণ করে নকশালদের। দু’পক্ষের গোলাগুলিতে নিহত হয় নীলকণ্ঠ।

এখানে যুক্তির দিক হল জীবনের সারল্য ও বাস্তবতা। গল্পকার/চিত্রনাট্যকার/পরিচালক ঋত্বিক বলছেন, হ্যাঁ, তিনি মদ খান কিন্তু কেন খান তা জানেন না। এ খাওয়ার পেছনে তার নিজস্ব কোন যুক্তি নেই। বলছেন যে তার জেনারেশনের প্রায় সবাই হল চোর, বিভ্রান্ত ও কাপুরুষ। তিনি শিক্ষিত। এম এ পাশ। প্রচুর বই-পত্র পড়েছেন। তারপরও তিনি দ্বিধান্বিত। তার মতে, তিনি পচে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবীদের একজন মাতাল প্রতিনিধি।

এখানে তর্কের দিক হল সমাজ পরিবর্তনে নকশালদের আদর্শগত বিভ্রান্তি। তারা মাও সেতুং এর লাল বই, চে গুয়েভারার ডায়েরীর কথা নিয়ে বিপ্লবের ফানুস উড়াচ্ছে কিন্তু মাঠের সাথে তার সম্পর্ক কতটুকু তা নিয়ে কোন বিশ্লেষণে যাচ্ছে না। পুরনো বিশ্বাস, ধ্যান-ধারনা সব কিছুই প্রতিক্রিশীল ও বাতিল যোগ্য বলে তারা বানী দিচ্ছে কিন্তু তার যৌক্তিকতা নির্ধারণে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা, বিতর্ক বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে না। তারা বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর কিন্তু তার পথ নির্ধারণের কষ্টে নিজেদের মেধা ও শ্রম বিনিয়োগে ধীর ও একনিষ্ঠ নয়। বরং সব খতম করে স্বপ্নের ইউটোপিয়া সমাজের অযাচিত নেশায় মজে আছে।

এখানে গল্প আছে জীবনের বিপর্যয়ের। বাস্তুহীনতার। আশ্রয়ের। গ্রামীণ আদি সংস্কৃতির। তার লড়াইয়ের। গল্প আছে নারীর জীবন যুদ্ধের। তার অমিত শক্তির। বুদ্ধির ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার। কিন্তু তার পরও কোথাও স্বস্তি ও আনন্দ নেই। তাই নীলকণ্ঠের মুখ থেকে বার বার উচ্চারিত হয়, “ সব পুড়ছে, ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে, আমি পুড়ছি। আমি হামবাগ তবে সৎ।“ কিন্তু এ ধরনের সততায় নিজের আত্মার অসুস্থতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া গেলেও তাতে সমাজের খুব একটা উপকার হয় না ! পৃথিবী পুড়তেই থাকে। এটাই হল সাদামাটা ভাবে এ গল্পের মোদ্দা কথা। তবে গভীর ভাবে দেখলে এতে প্রতিটি চরিত্রের রূপক নাম সহ গ্রাম-শহরের রাজনীতি ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব, দেশ ভাগের শুভ-অশুভের বাস্তবতা, শিল্পী-লেখকদের সুবিধাবাদ, মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও তার নিষ্ঠুর পরিণতি সবই লক্ষ্য যোগ্য ভাবে দৃশ্যমান। এবং তা সবাইকে ভাবায়ও।



এখন আমাদের কথাঃ

আমরা এখন একটা জন-তুষ্টির যুগে বাস করছি। আমাদের চারপাশে সম্পন্ন বা আদর্শ মানুষ নাই বা থাকলেও তার সংখ্যা খুবই কম। কোন কিছুকে তলিয়ে, যুক্তি দিয়ে দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আমরা প্রথমেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে তারপর যুক্তির তালাশে অস্থির হয়ে পড়ি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়ঃ
“মত বলে যে-একটা জিনিস আমাদের পেয়ে বসে সেটা অধিকাংশ স্থলেই বিশুদ্ধ যুক্তি দিয়ে গড়া নয়, তার মধ্যে অনেকটা অংশ আছে যেটাকে বলা যায় আমাদের মেজাজ। যুক্তি পেয়েছি বলে বিশ্বাস করি, সেটা অল্প ক্ষেত্রেই; বিশ্বাস করি বলেই যুক্তি জুটিয়ে আনি, সেইটেই অনেক ক্ষেত্রে। একমাত্র বৈজ্ঞানিক মতই খাঁটি প্রমাণের পথ দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছয়; অন্য জাতের মতগুলো বারো আনাই রাগ-বিরাগের আকর্ষণে ব্যক্তিগত ইচ্ছার কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে”। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রবন্ধ- স্বরাজ সাধন। বই-কালান্তর)।

আমার বাবা মোহামেডান ফুটবল দল কে সমর্থন করতেন তাই আমিও তার সমর্থক। তিনি “ক” দল করেন তাই আমার দলও “ক”। আবার আমার বাবা আবাহনী ফুটবল দলকে সমর্থন করতেন তাই আমিও তার সমর্থক। তিনি “খ” দল করতেন তাই আমার দলও “খ”। এখানে আমার নিজের কোন সিদ্ধান্ত নেই। না জেনে, না বুঝেই আমরা আমাদের বাবাদের ভেড়ার পালের মত অনুসরণ করছি! সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হল এ নিয়ে আমাদের আদৌ কোন চিন্তা বা প্রশ্ন নেই। অথচ জীবনের অগ্রগতি, উন্নয়ন, দর্শনের জন্য প্রশ্নের প্রয়োজন। অন্যদিকে আমরা এই বাবারা সন্তানদের ঐ অনুসরণ কে নিজের বিজয় ভেবে আত্মস্লাঘা অনুভব করছি! এটা বুঝছি না যে আমাদের সন্তানদের নতুন চিন্তা ও বিবেচনার পথ কে আমরা নিজেরাই রুদ্ধ করে রেখেছি। হাতের কাছে উদাহরণ হিসেবে তিন জন ছাত্র-শিক্ষকের কথা বলি। ছাত্র প্লেটো নিজে কেবল শিক্ষক সক্রেটিসের দর্শন কে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসে প্লেটো হননি, হয়েছেন বস্তুর “ফর্ম” বা রূপের নিজস্ব দর্শন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তেমনি এরিস্টটল তার শিক্ষক প্লেটোর ”ফর্ম” কে ভেঙ্গেচুরে বাস্তবতার নিরিখে নিজের দর্শন দাঁড় করিয়েছেন। তাই প্লেটো যদি হন আদর্শ বা ভাববাদী (Idealist) সেক্ষেত্রে এরিস্টটল হচ্ছেন বাস্তব বাদী (Realist)।

সপ্তদশ শতাব্দীর একজন নামকরা বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও দার্শনিক হচ্ছেন রেনে ডেকার্ট (Renes Descartes-1596-1650)। যারা বিজ্ঞানের ছাত্র তারা জানেন যে Coordinate Geometry, যাকে Cartesian Geometry বলেও উল্লেখ করা হয়, তা তারই উদ্ভাবন। তার নামেই এর নামকরণ করা হয়েছে। তিনিই প্রথম এলজাবরার বিশ্লেষণী সূত্রকে জ্যামিতির কাজে লাগান। এই দুয়ের সমন্বয় সাধন করেন। দর্শনের উপর লেখা তার বই “Meditations on first philosophy” বিগত চারশ বছর ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশ্য পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃত।

ডেকার্ট এর দর্শনের মূল নীতির শুরু একটি মাত্র বাক্য দিয়ে, “আমি চিন্তা করি (I think)”। চিন্তাকে যেহেতু ব্যক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না তাই যৌক্তিক ভাবেই “আমি আছি (I exist)” এ কথা অবশ্যম্ভাবী। ফলে এই দু’য়ের সম্মিলনেই দাঁড়িয়েছিল তার সেই বিস্মরণযোগ্য উক্তি, “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি”। “I think, therefore I exist.” (ল্যাটিন ভাষায় ডেকার্ট যাকে বলেছিলেন, “Cogito ergo sum.”)। চিন্তা করেন বলেই ডেকার্ট ঘোষণা দেন, “Doubt is the origin of wisdom.”।

ডেকার্ট এর জন্মের আরো দুই হাজার বছর পিছনে ফিরে যাই। খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে। তার নাম আমরা সবাই জানি। এরিস্টটল। যার সম্পর্কে রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি সিসেরো (Cicero, সময়কালঃ খৃষ্ট পূর্ব ১০৬ থেকে ৪৩ পর্যন্ত) বলেছিলেন, “যদি প্লেটোর রচনাকে আমরা রূপার ধাতুর সঙ্গে তুলনা করি তাহলে এরিস্টটলের রচনা হচ্ছে নদী দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বর্ণের প্রবাহ।“
এহেন ব্যক্তি এরিস্টটল তার পর্যবেক্ষণ থেকে আমাদের চার পাশের প্রাণী জগৎ কে চার ভাগে ভাগ করেছিলেনঃ

এক) উদ্ভিদ, যে নিজের বেঁচে থাকার জন্য শক্তির ব্যবহার করে। নিজের খাবার নিজে তৈরি করে। প্রজননে অংশ নেয়।

দুই) মানুষ ব্যতীত অন্য প্রাণী বা জীবজন্তু, যার মধ্যে উদ্ভিদের সব গুনই আছে। বাড়তি হিসেবে আছে তার ইন্দ্রিয় বোধ ও পরিবেশ গত ধারনা। তার আছে চলাচলের ক্ষমতা।

তিন) মানুষ, অন্য প্রাণীকুলের সব গুনই তার আছে। বাড়তি হিসেবে আছে পারস্পরিক ভাব বিনিময়ে ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতা। আছে যুক্তি ও বুদ্ধির কার্যকরী প্রয়োগ।

চার) বিধাতা বা ঈশ্বর।

মানুষ অন্য সব কিছু থেকে তার কার্য কারণে আলাদা বলেই তার নিজের পরিপূর্ণ বিকাশের উচ্চতর উদ্দেশ্য রয়েছে বলে এরিস্টটল বিশ্বাস করতেন। একটি ভাল বাড়ীর কার্যকারিতা ও সাফল্য যেমন তার স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তায় তেমনি একজন মানুষের সাফল্য ও সার্থকতা হচ্ছে তার বোধ ও জ্ঞানের বিকাশের মাধ্যমে জীবন কে মহিমান্বিত করা। জগৎ সংসারের সমৃদ্ধিতে শিল্পকলা, দর্শন, বিজ্ঞানে তাকে কাজে লাগানো।

আপনি বলবেন, এসব অসাধারণ মানুষদের কাজ, আমাদের মত ছাপোষা মানুষের নয়। ভুলটা এখানেই। কারণ মানুষের অমিত শক্তিকে চিরদিনই আমরা হেলাফেলা করে এসেছি। মানুষ যদি বিধাতার প্রিয় প্রতিনিধি হয় তা হলে তার (বিধাতার) ক্ষমতার দিকে তাকিয়ে দেখুন। তার সৃষ্টির একটি জিনিসও যুক্তি ও বুদ্ধির বাইরে নয়। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড-গ্রহ-নক্ষত্র-চন্দ্র-সূর্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে মেনেই নিজের নিজের কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে। এখানেই বিজ্ঞান ও যুক্তি হাত ধরাধরি করে কাজ করছে। আর আমরা মানুষ, কক্ষপথহীন-যুক্তিহীন-আবেগে থৈ থৈ। করুন অশ্রুর বৈভবে তা পূর্ণ। যুক্তি সেখানে অচল। তাই কোন কিছু যুক্তি দিয়ে বিশ্বাসে আমরা অনাগ্রহী। সে জন্যই রবীন্দ্রনাথ বলছেন, যুক্তি দিয়ে বিশ্বাস নয়, “বিশ্বাস করি বলেই যুক্তি জুটিয়ে আনি”। আর বলা বাহুল্য অনেক ক্ষেত্রেই তা কু-যুক্তিতে পূর্ণ।

বিদ্যাসাগর যখন ১৮৫৪ সালে “তত্ত্ববোধিনী” পত্রিকায় “বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা” শীর্ষক প্রবন্ধ লিখেন তখন সমাজে তা ভূমিকম্পের মত আলোড়ন সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ সে সম্পর্কে লিখেছেনঃ

“বিধবা বিবাহের আন্দোলনে দেশের পুরুষেরা বিদ্যাসাগরের প্রাণ-সংহারের জন্য গোপনে আয়োজন করিতেছিল, এবং দেশের পণ্ডিতবর্গ শাস্ত্র মন্থন করিয়া কুযুক্তি এবং ভাষা মন্থন করিয়া কটূক্তি বিদ্যাসাগরের মস্তকের উপর বর্ষণ করিতেছিলেন”। (চরিত্রপূজা/বিদ্যাসাগরচরিত)
কাজেই “কুযুক্তি” (ill-formed argument) তে বাঙ্গালির ঐতিহ্য বহু পুরনো।

খৃষ্টের জন্মের প্রায় সাড়ে চারশ বছর আগে জন্ম নেওয়া চৈনিক চিন্তাবিদ-দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছিলেন, The superior man understands what is right, the inferior man understands what will sell. সে হিসেবে আমাদের সমাজ আজ সুবিধাবাদী দুর্বল চিন্তার লোকে ভরে গেছে। আমাদের সবার চিন্তা আজ যা তা ঠিক বা বেঠিক নয়, চিন্তা হলো, আমার কথা লোকে নিবে কিনা বা অশ্লীল অর্থে জনগণ খাবে কি না! অর্থাৎ, শুরুতেই যা বলেছি তা হল, “মন-তুষ্টি” বা “লোকরঞ্জন-বাদ” আমাদের চিন্তাকে আজ গ্রাস করে ফেলেছে। তাই আমাদের সমাজে আজ আর কোন চিন্তাবিদ, দার্শনিকের দেখা মিলে না। যা মিলে তা হল বাজারে বিক্রির পণ্য-রূপ অনুগত চিন্তা-সওদাগর।

এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল, “সবগুলো জানালা” খুলে দেওয়া। ভিন্ন মত কে সাদরে আহবান করা, একে যুক্তির নিরিখে চলতে দেওয়া। জেনে বুঝে কথা বলা, তর্ক-বিতর্ক করা। এর মধ্য থেকেই হয়ত বেড়িয়ে আসবে সরল সত্য বা কোন অভূতপূর্ব ধারনা বা গল্প। একটি সুন্দর, যুক্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্যও তা প্রয়োজন। তা না হলে আমাদের পড়ে থাকতে হবে নিরাপদ ফুল-লতা-পাখি নিয়ে, নেশাগ্রস্থের মত গাঁজাখুরি গল্প গাঁথা নিয়ে, মজে থাকতে হবে দেহ সর্বস্ব ইন্দ্রিয়-পরায়নতা নিয়ে আর বোধহীন তুষ্টির ঢেঁকুর তুলে পরস্পরের পিঠ চাপড়ানিতে সময়ের নিদারুণ অপচয়ে।





রিয়াজ হক, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া, Jsfn21@gmail.com




Share on Facebook               Home Page             Published on: 7-Jan-2021


Coming Events: