bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney













একজন রণ, মনিকা ও আমি
ড. রতন কুন্ডু



প্রিন্স অফ ওয়েলসের নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগের রোগী-তৈরি-করণ কক্ষে একটি রিক্লাইনার সোফায় আরাম করে বসে আছি। প্রফেসর ম্যান্ডিন এলেন সাথে এক জুনিয়র, নাম রডনি।
- কেমন আছো আজ?
- ভালো। তুমি কেমন আছো প্রফ?
- আমিও ভালো। আজ তোমার জন্য এক সুদর্শনা নার্সকে নিয়োগ করেছি। নার্সিং কাউন্টারে অঙ্গুলি নির্দেশ করে একজনকে দেখালো। ও হলো মনিকা।

মনিকা আমার চেয়ারের কাছে চলে এলো। হাই, আমি মনিকা বলে হাতটা বাড়িয়ে দিলো। আমি যথারীতি আলতো করে মর্দন করলাম।
- তোমার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগলো।
- আমারো। তুমি কি ইন্দোনেশিয়া থেকে এসেছো?
- আমি বলি না, কেনো বলোতো?
- তোমাকে দেখতে অনেকটা ওখানকার মতো!
- হ্যাঁ, লন্ডনে একটি পার্টিতেও দুটো ইন্দোনেশিয়ান মেয়ে আমাকে একই প্রশ্ন করেছিলো!
- তুমি নিশ্চই ইন্দোনেশিয়ান?

মনিকা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। মেয়েটি ফর্সা, সুন্দরী, মাঝারি গড়ন যেমন এশিয়ানরা হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো ওর চোখগুলো খুব সুন্দর, টানা টানা। তাঁর কথায় সম্বিৎ ফিরে পেলাম।
- তোমার অপারেশন রিপোর্ট দেখলাম। দুটো অপারেশনই নিখুঁত হয়েছে। যেহেতু খারাপ কোষগুলো আশেপাশে ছড়িয়ে গেছে ডাক্তার তোমাকে কেমো দেবে। আমি নার্সিং করবো। আর তোমাকে ফাইনাল করার জন্য তৈরি করবো।

আমার হাসি পেলো। কি বলছে মেয়েটি; আমাকে ফাইনাল করে দেবে! আমি মজা করলাম:
- তোমার মতো মেয়ের হাতে ফাইনাল হতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার।

মেয়েটি লজ্জিত হলো। আমার ভাষা হয়তো ঠিক হয়নি। আমি বলতে চেয়েছিলাম -
আমি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম
- আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি অনেক সুন্দর করে কথা বলো। মেয়েটি লজ্জিত হলো।
- আর কিছু?
আমি উৎসাহিত হলাম বললাম
- তুমি দেখতেও অনেক সুন্দর! তোমার ব্যবহারও খুব ভাল।
মেয়েটি কাছে এসে আমার বাহুতে রক্তচাপ মাপার গাস্কেটটি মোড়াতে মোড়াতে বললো
- আমার আর কি কি সুন্দর?
- তোমার সবকিছুই সুন্দর! মেয়েটি নিজেকে একটু সরিয়ে নিয়ে বললো
- গ্লেন ও ঠিক একই কথাই বলতো!
- গ্লেন কে?
- ও আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড, ব্যাক প্যাকার, লন্ডন থেকে এসেছিলো। কয়েকটা মাস ভালোই ছিলাম। তারপর থেকেই খিটিমিটি শুরুকরে দিলো। আমার অনেক দোষ; আমি কাপড় চোপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখি, বাসন পত্র সিংকে ফেলে রাখি, প্লাস্টিক ব্যাগ, কার্টুন ডাম্প করে রাখি, টয়লেটে বদনা ব্যবহার করি, বিড়ালের মতো গুটি মেরে ঘুমাই! আমি বলেছি, তুমি এক দেশের আমি অন্য দেশের। আমি আস্তে আস্তে শিখে যাবো। সে আমার কথার কোনো উত্তর দিলোনা। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। রাতে আলাদা ভাবে শোয়া শুরু করলো। বাইরে থেকে খেয়ে আসতো। বুঝতাম আমাকে আর সে ভালোবাসেনা! আমার রান্না সে খেতে পারেনা! আমার সব কিছুই তার অপছন্দ! একদিন বললাম - গ্লেন আমি বুঝতে পারছি তুমি আমাকে নিয়ে হ্যাপি না! তুমি ইচ্ছে হলে লিয়ানার কাছে চলে যেতে পারো। সে চমকে উঠলো!
এর মধ্যে রেজিস্টারার চলে এলো।
- সিস্টার, ক্যানুলা লাগিয়েছো?

প্রথম ইনফিউশন দেবো। মনে রাখবে একটি ইনজেকশনের দাম ৩,৭৮৬ ডলার। ড্রিপ এ দিতে হবে। একঘণ্টা রুগীর পাশে বসে তাঁর বিপি, হার্ট-রেট, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া, অক্সিজেন লেভেল মনিটর করতে হবে। কোনো সমস্যা হলে আমাকে কল করবে।

রেজিস্ট্রারার চলে যেতেই ইনফিউসন রেডি করে আমার পাশে এসে বসলো। আমার হাতটা তাঁর হাতে তুলে নিয়ে পালস দেখতে লাগলো। আমি সেখানে অন্তরঙ্গতার ছোঁয়া অনুভব করলাম। হয়তো এমন হতে পারে আমি তাঁর জীবনের গল্প শুনতে শুনতে অনেকটাই বিমোহিত হয়েছিলাম। আমি বললাম - হ্যাঁ তারপর বলো। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো
- না ও কথা থাক। আমি তোমাকে তোমার ইনফিউশনের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। তোমাকে গত পরশু আর গতকাল দুটো ইনজেকশন দেয়া হয়েছে না? আমি বলি হ্যাঁ। সে বললো এই ইনজেকশন দেয়াটা আমাদের দেশে বিয়ের কনে প্রস্তুত করার মতো। আমি বললাম
-ভেরি ইন্টারেস্টিং তো! আচ্ছা তুমি ইন্দোনেশিয়ার কোন প্রদেশ থেকে এসেছো?
- বালি থেকে।
- তুমি কি হিন্দু? শুনেছি বালিতে অনেক হিন্দু আছে! সে ইতিবাচক উত্তর দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকালো। তুমি?
- হ্যাঁ আমিও। জন্মসূত্রে।
- জন্মসূত্রে বলছো কেনো?
- না, হয়কি এই প্রবাসে ধর্মীয় আচার আচরণ তো সঠিক ভাবে পালন করা হয়না! এই আর কি!

আচ্ছা তোমার কনে প্রস্তুত করার গল্পটা শুনি? মনিকা মুচকি হাসলো
- আমাদের বালিতে একটা মেয়ে যুবতী হলে তাকে এক বসনে প্রামবানান মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন মন্দিরের পুরোহিত ধুপ মোমবাতি জ্বালিয়ে কামদেবীর পূজা করেন। মেয়েটিকে ডিম আর নারকেলের জল দিয়ে স্নান করানো হয়। তারপর সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে মেয়েটি শিব নামের একটি পাথরের উপর গাভীর দুধ আর জল ঢেলে প্রার্থনা করে। খুব মজার না? আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিতে সে আরো উৎসাহিত হয়। হ্যাঁ, তারপর কি হয় জানো! মেয়েটির সম্বন্ধ ঠিক করে সমাজ। বিয়ের কয়েকদিন আগে হয় অভিষেক। বেন-সাইতিয়েন মন্দিরে নেয়ার আগে তাকে মহিলা নর-সুন্দর দিয়ে তার বগল ও গোপনাঙ্গ পরিষ্কার করা হয়। হাউ ফানি! আমি হেসে উঠতেই সে বলে এটা সামাজিক রীতি। অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। বিয়ের একদিন আগে হয় অধিবাস। ওই সময় তাকে দুধ হলুদ দিয়ে স্নান করানো হয়, মেহেন্দি লাগানো হয়, আরো কত কি! আমি বললাম -এগুলো করা হয় কেন? সে বললো তাকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে বাসর রাতের জন্য তৈরি করা হয়। আমি বললাম -এবার বুঝতে পেরেছি। তোমরা আমার ফাইনাল করার আগে এই নানা প্রকার ইনজেকশন দিয়ে তৈরি করছো।
মনিকা এবার হেসে ফেললো - এক্সাক্টলি!

এর মাঝে টেলিফোন বেজে উঠতেই সে মাফ করো বলে টেলিফোন রিসিভ করতে উঠে গেলো। ফোন সেরে পাশের চেয়ারে এসে বসলো। আমার সেই বুড়োটা আসছে! ৯৭ বছর বয়স এখনো প্রেমের পাগল!
- কেনো কি হয়েছে?
- কাছে গেলেই হাত ধরে টেনে নিয়ে সুড়সুড়ি দেয়। বালিশ থেকে মাথা তুলতে পারে না তাই ঠোঁট সরু করে দূর থেকে চুমু খায়।
আমি তার কথার ভঙ্গিতে না হেসে থাকতে পারিনা!
- এতে দোষের কিছু নেই আমার মনে হয়! যে দেশের যে কালচার! আমার ডিপার্টমেন্টের অনেক মেয়ে সহকর্মী তো আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়! তার মধ্যে মধ্য প্রাচ্যের মেয়েরা বেশি খায়। তোমাকে খায়না কেউ?
- খায়না আবার! সুযোগ পেলেই খায়। তার কথা শেষ না হতেই এক বুড়োকে নিয়ে একটা জমকালো ট্রলি আমার বেডের ঠিক পাশেই এনে পার্ক করলো। ওই বেডটাই একটা আইসিইউ। হার্ট, পালস, অক্সিজেন, স্নাযুক্রিয়া মনিটরিং-সংযোগ দেয়া আছে। আছে ব্লাড প্রেসার, তাপমাত্রা মাপার অত্যাধুনিক ডিভাইস। মনিকা বললো এই বেডগুলো এম্বুলেন্সে ব্যবহৃত হয়। ট্রানজিট ইমার্জেন্সি কভার করার জন্য।

বুড়ো আসতেই মনিকা জিজ্ঞেস করলো
- কেমন আছো রণ?
- ভালো আছি । থ্যাংকস লাভ বলেই যথারীতি ঠোঁট সুচালো করে চুক করে শব্দ করলো। মনিকা তার দিকে পেছন ফিরে বসে অহেতুক আমার হাতটা টেনে নিয়ে পালস গুনতে লাগলো। এর মধ্যে বুড়োটা হাই হাই বলে আমার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলো। তার দিকে ফিরলেই সে ফ্যাসফেসে গলায় বলে উঠলো
- হাই আমি রণ। তোমার নাম কি? আমি বললাম
তোমার নামের মাঝে একটা ত বসিয়ে দাও। সে বললো দুর্ভাগ্য জনক ইংরেজিতে ত নামের কোনো বর্ণ নেই। আমরা টি দিয়েই সব চালিয়ে দেই। আমার বয়স এখন ৯৭। আমি মরতে চাই কিন্তু রোজ এর জন্য মরতে পারিনা! এইতো সে এসে গেলো! হাই ডার্লিং তুমি এসে গেছো! আমি মনে মনে তোমাকেই খুজছিলাম।

রণকে আমার কাছে খুব অদ্ভুত মনে হলো। মনে হচ্ছিলো সে মানুষের মন পড়তে পারে এবং ভবিতব্য দেখতে পায়। রোজ যখন কাছে থাকেনা তখন সে কারুর কাছে না বলা কথা, তার জীবন সংগ্রাম, তাঁর তৃপ্তি, তাঁর অতৃপ্তি নিয়ে কথা বলতো। তাঁর কিছু আপ্ত বাক্য আমি আমার মনের খাতায় লিখে রেখেছি:

-তোমার ঘা কারো সামনে উম্মোচন করবেনা কারণ পৃথিবীতে খুব কম লোকই আছে যারা তোমার সেরে উঠা কামনা করে।

-কখনো ইতর প্রাণীর সাথে লড়াইয়ে যাবেনা। তুমি জিতলেও তোমার বদনাম হবে। লড়াই যদি করতেই হয় তাইলে সিংহের সাথে লড়াই করে জিতে আসো। সুনাম ছড়িয়ে পরবে।

-বিজ্ঞ জনেরা যে গুহায় ঢোকার চিন্তাও করেনা ইতর প্রাণী সেখানে অবলীলায় ঢুকে যায়।

-একটা জিনিস মনে রাখবে তোমার চরিত্র তৈরি করবে তুমি, ভালো কাজ করবে তুমি, তখনই অন্য সবাই সুনাম করবে।

-জীবনটা একটা বইয়ের মতো। এর অনেকগুলো চ্যাপ্টার আছে। সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, সাফল্য, ব্যর্থতা। ওই বইয়ের পাতা তোমাকে উল্টিয়ে তার চ্যাপ্টার পরিবর্তন করতে হবে।

-মানুষের চোখ সব দেখতে পায় কিন্তু চোখের ভেতরে কিছু প্রবেশ করলে তা দেখতে পায়না। সেরকম মানুষের ভেতরকার পশু-প্রবৃত্তি নিজে দেখতে পায়না। তাই তাঁকে অন্যের সমালোচনা গ্রহণ করে নিজেকে শোধরাতে হবে।

একজন পোর্টার এসে রণকে বললো তোমার টেস্টগুলোর রেজাল্ট ভালোনা। তোমাকে আইসিইউ তে যেতে হবে। রণ বললো আমি জানি। রণ ধরা গলায় স্ত্রীকে ডাকতে লাগলো
- রোজ কোথায় গেলে তুমি? তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। একবার কাছে এসো হানি। আমার হাতটা ধরো। আমাকে ওরা নিয়ে যাচ্ছে। আমার হাতটা ধরো। আই লাভ ইউ রোজ। আই লাভ ইউ।

রোজকে কোথাও পাওয়া না। পোর্টার তাঁর বেডটি ঠেলে আইসিইউতে নিয়ে যাচ্ছে আর রণ ডিমেনশিয়ার রোগীর মতো বলেই যাচ্ছে - কোথায় গেলে রোজ! আই লাভ ইউ রোজ। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর আকুতি শুনতে লাগলাম।

ইন্সটিটিউট অফ নিউরোলজিক্যাল সাইন্স এ আমার মস্তিষ্কের কার্যক্রম পরীক্ষার জন্য ইইজি করা হলো। স্পেকট্রাম এ গিয়ে এমআরআই করিয়ে যখন ফিরে আসলাম তখনই দুঃসংবাদটা পেলাম। মনিকা বললো
- আইসিইউতে নেয়ার আগেই রণ চলে গেছে। আমার গলা দিয়ে একটি শব্দই বেরুলো - ও মাই গড! বলো কি!
আর বেশিক্ষণ কথা হলোনা মনিকার সাথে। পোর্টার এসে আমাকে লেভেল ৮ এ আইসোলেশন রুমে নিয়ে আসলো। প্রফেসর ম্যান্ডিন, ড. রডনি সহ দুজন নার্স এসে কেমো ক্যাপসুল গিলিয়ে গেলো। নিশ্চিত হয়ে তাঁরা বের হয়ে দরজা লক করে দিলো। এখানে একা তিনদিন তিন রাত কাটাতে হবে।

তিন দিন পরে ছাড়া পেয়ে আমি নিচে গেলাম রেডিয়েশন চেক করতে। রোগী তৈরি করার রুমটির দরজা বন্ধ। কিন্তু তার মধ্য থেকে আমি রণের আর্তি শুনতে পেলাম
- ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আই লাভ ইউ হানি! আই লাভ ইউ! আই লাভ ইউ! সন্দেহ হলো মনিকা তাইলে আমাকে মিথ্যা বলেছে! রণ তাহলে মারা যায়নি! আমি সন্তর্পণে দরজা ঠেলে দেখি ভেতরে কেউ নেই! সন্দেহ হলো এটা কি হেলুসিনেশন! কাউন্টারে মনিকার সাথে দেখা হলো।
- হাই মনিকা, আজ আমি বাসায় চলে যাচ্ছি!
- আমি জানি। একটু দাড়াও রণ তোমার জন্য একটা বই রেখে গেছে। বইটা দিয়ে মনিকা আমাকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেলো। বাই হানি!

কয়েকটি স্টেপ পার হতেই অনুভব করলাম আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। কারণটা খোঁজার চেষ্টা করলাম। আমার চোখের জল কার জন্য! মনিকা, রণ না সবার জন্য!



স্থান: প্রিন্স অফ ওয়েলস হাসপাতাল, আইসোলেশন ওয়ার্ড, সিডনি
তারিখ: ২১ শে ফেব্রুয়ারি ২০২১




ড. রতন কুন্ডু, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া






Share on Facebook               Home Page             Published on: 28-Feb-2021

Coming Events: