bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












স্বপ্না ভট্টাচার্য
(এক অসমাপ্ত মহাকাব্য)

রতন কুণ্ডু


অবশেষে একদিন যাযাবর জীবনকেই বেছে নিলাম। কেন বেছে নিলাম সে বিতর্কে আজ যাবনা। শতাব্দীর শুরুতে যাযাবর জীবনে প্রথম পা রেখেই যে অভিজ্ঞতা, সত্যি বলতে কি- যে করুণ অভিজ্ঞতা এবং তার কারণে যে মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং তার থেকে কিভাবে উত্তরণ হয়েছে সে কাহিনীই বলব। বৈরী পরিবেশে প্রথম যেদিন অনেক আশা নিয়ে সিডনী বিমান বন্দরে নামলাম আমাদের বরণ করার জন্য কেউই সেখানে উপস্থিত ছিলেননা। যখন ঘন্টাখানেক বিমান বন্দরে অপেক্ষা করেও কারুর দেখা পেলামনা তখন নিতান্ত নিরুপায় হয়ে ট্যাক্সির শরণাপন্ন হলাম। জানতাম না আমরা যেখানে যাব তা বিমানবন্দর থেকে কতদূর। পুরো ব্যাপারটা ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলাম। ভাগ্য ভাল যে সেই আশ্রয়দাতার বাসা এয়ারপোর্ট থেকে অনেক দূরে ছিলনা। যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন পড়ন্ত বিকেল। ট্যাক্সি থামতেই দেখলাম আমার আশ্রয়দাতার স্ত্রী তার মেয়েকে নিয়ে ইভনিং ওয়াক করছেন। আমাদের দেখেই উল্লাসিত হলেন। কুশলাদি বিনিময় করে বললেন আসতে কোন অসুবিধা হয়নি! ইত্যাদি ইত্যাদি।

যেহেতু আমরা আশ্রিত তাই সংগত কারণেই কাজে লেগে গোলাম। বাজার করা, বিন পরিষ্কার করা, ভ্যাকুম করা - বাসার নানা ধরণের কাজ। আর আমার স্ত্রী, যিনি বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের একজন প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড অফিসার এর স্ত্রী ছিলেন, ঘরে যার কাজের লোক ছিল তিনিও বাসন-কোসন ধোয়া মোছা, কাপড় কাচা, বাইরে কাপড় শুকানো, রান্না-বান্না, টয়লেট পরিষ্কার করা থেকে সব কাজই হাত দিলেন। একদিন বিকেলে মালিক আমাকে ডেকে বললেন শুধুমাত্র অর্ধেক খাবার খরচ দিলেই তো হয়না। আমি সংসারে একা আয় করি। বাসা ভাড়াটা যদি শেয়ার করতেন। আমি বললাম - তথাস্তু।

তার দুই বেড-রুমের ইউনিট। আমরা তার মেয়ের বেডরুমের মেঝেতে রাস্তা থেকে যোগাড় করা একটি ম্যাট্রেসে ঘুমাই। অভিবাসী জীবনের শুরুটা অনেক ক্ষেত্রেই সহজ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী বাংলাদের সরকারের একজন প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হয়েও আজ এ কি পরিণতি! কেন জানি খুব কষ্ট হত। মাঝে মাঝে এনজ্যাক প্যারেডে'র বাসস্টপে গিয়ে কাঁদতাম, আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভয়ে শিউরে উঠতাম। একদিন আবিষ্কার করলাম দেশ থেকে অর্থ যা কিছু নিয়ে এসেছিলাম তা প্রায় শেষ। অন্যের বাসায় কতদিন আর থাকা যায়। তাদেরও অসুবিধা হচ্ছে বুঝতে পারছি কিন্তু কি করবো ভেবে কোন কুল কিনারা পাচ্ছি না এর মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত আমাদের আশ্রয়দাতা তার অপারগতার কথা জানিয়ে দিলেন। আমরা এক অথৈ সাগরে পড়লাম। এখন কি করি!

হঠাৎ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু-ছোটভাই পরমেশ ভট্টাচার্যের কথা মনে পড়ল। সেই রাতেই হাটতে হাটতে তার মারুবরা রোডের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। দরজা নক করতেই পরমেশ নিজেই দরজা খুলে আমাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাল। একেবারে বুকে জড়িয়ে ধরল।
-দাদা, কতদিন পর আপনার সাথে দেখা। টেনে বাসার মধ্যে নিয়ে গেল। পরিচয় করিয়ে দিল তার স্ত্রী স্বপ্না ভট্টাচার্যর সাথে। নমস্কার বিনিময় করতেই বৌদি বললেন-
-আপনাদের কথা শুনছি আপনারা আসছেন। সুরঞ্জন-দার বাসায় দুইদিন আসছেন। আমি বাসা থেইকা দেখছি । একদিন সবাইরে নিয়া আমাদের বাসায় আসেন। প্রথম পরিচয়েই বৌদির সাদর সম্ভাষণ আমার কষ্ট অনেক হালকা করে দিল। তাদের একমাত্র মেয়ে রিতু সান-রুমে খেলছে। বৌদি তাকে নিয়ে এলেন - এই যে আমার মেয়ে রিতু। আমি রিতুকে কোলে নিলাম। বৌদি রান্না-ঘরে গিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা শুরু করে দিলেন। ফাঁকে ফাঁকে লউঞ্জরুমে এসে কুশলাদি বিনিময় করছেন। যেখানে উঠছেন থাকতে কোন অসুবিধা নাইতো? চাকরির কোন ব্যবস্থা করতে পারলেন? চা'য়ে চিনি কয় চামচ খান ইত্যাদি ইত্যাদি।
বৌদি কিচেনে থাকাকালীন আমি সুযোগ করে নিলাম পরমেশের সংগে কথা বলার জন্য। যথাসম্ভব নিচু স্বরে বললাম -পরমেশ আমার ল্যান্ড-লর্ডতো আমাদের বাড়ী ছাড়ার নোটিশ দিয়েছে। এখন কি করি?

ছাত্রজীবন থেকেই পরমেশ একটু উচ্চস্বরে কথা বলে। এজন্য সবাই তার নাম দিয়েছে বজ্রকন্ঠ। তার স্বভাবসুলভ বজ্র কণ্ঠে বলে উঠল
-বলেন কি!
বৌদি রান্না ফেলে কিচেন থেকে লাউঞ্জরুমে চলে আসেন। কথোপকথনের কিছুটা শুনতে পেয়েই সব আঁচ করে নিয়েছেন। উত্তেজনায় তার শ্বাস ঘন হয়ে গেছে। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন -
-কোন চিন্তা করুইননা যে, ভগবানই মাইনসেরে বিপদে ফালায় আবার ভগবানই তারে বিপদ থাইকা উদ্ধার করে। আপনি কাইলই সবাইরে নিয়া চইলা আসেন। যতদিন দরকার আমাগোর বাসার থাকবাইন। আমরা খাইলে আপনরাও খাবাইন। কষ্ট অইবো কিন্তু অযত্ন অইবোনা।
পরমেশ ও আমি বিস্ময়ে থ হয়ে গেলাম। বৌদিকে মন হল- বিপদ নাশিনী দেবী ভগবতী স্বয়ং উপস্থিত হয়ে আমাদের উদ্ধার করতে এসেছেন।

পরমেশ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি যখন একটি ছাত্র সংগঠনের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল শাখার সভাপতি, পরমেশ তখন ঈশা খা হল শাখার সভাপতি। আমি জানি বিপদে আপদে সে আমাকে সাহায্য করবেই। কিন্তু তাঁর স্ত্রী, যার সাথে কিছুক্ষণ আগে পরিচয় হল, আন্তরিকতা আমাকে অবাক করে দিল। আমরা যেন অকুলে কুল পেলাম। বৌদির অবয়ব, চোখের দৃষ্টি, শরীরের দৃঢ়তা তাঁকে নারী থেকে দেবীতে পরিণত করেছে। তার দৃঢ় কণ্ঠের উচ্চারণ-
-বিপদ কারুর চিরদিন থাকে না। আপনি চিন্তা করুইননা যে। পরমেশও স্ত্রীর সমর্থন পেয়ে দৃঢ়-কণ্ঠে বলল-
-দাদা আপনি যখন মনে করেন তখনই চলে আসেন। কিন্তু সমস্যা হল আমারতো গাড়ী নাই। জিনিষপত্র আনবেন কিভাবে? আমি বললাম সুরঞ্জন ও রজত এর সাথে আমার কথা হয়েছে। ওরা আমাকে সাহায্য করবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সুরঞ্জন সাহা ও রজত পণ্ডিত আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচ-মেট। পরদিন ওরাই আমাদের পরমেশের বাসায় নিয়ে এসেছিল এবং আমার সমস্ত মালামাল, লাগেজ , বেডিংপত্র নিজেরা বহন করে দোতলায় তুলে দিয়েছিল। বৌদি আমাদের জন্য একটা রুম ছেড়ে দিলেন। সারাদিন নিজহাতে রুমের সবকিছু পরিষ্কার করে আমাদের বিছানাপত্র ঠিকঠাক করে দিয়ে লাগেজ বিছানার নীচে ঢুকিয়ে রুমটাকে ছিমছাম করে দিলেন। বৌদি আগে সামলাতেন নিজের ছোট্ট একটি সংসার। এখন সামলাচ্ছেন দুটো সংসার। সত্যি কথা বলতে কি, অনেকে হয়ত মনে করতে পারেন আমি বাড়িয়ে বলছি। আসলে তা নয়, যা সত্যি তাই বলছি। আমি আমার স্ত্রীকে অনুরোধ করলাম বৌদিকে কিচেনে, লন্ড্রীরুমে সাহায্যের জন্য। বৌদি দৃঢ়-কণ্ঠে বললেন- বৌদি আপনে টিক মাইরা বইয়া থাহুইন যে, চিন্তা করবাইন না।
আমি বললাম আমরাতো এখন আর অতিথি না। সংসারে একজন আর একজনকে সাহায্য করতেই হয়। বৌদি বললেন, -সাহায্য লাগলে আমি কইয়ামনে। আপনে পটর পটর করুইননা যে।
আমি বাজার করার প্রস্তাব দিলে পরমেশ আমার হাত চেপে ধরে
-না দাদা এটা কোনদিন সম্ভব না, আপনারা এমনিতে আমার বাসায় বেড়াইতে আসেন নাই। একটা বিপদে পইরাই আসছেন। এই কথা আর কোনদিন মুখে উচ্চারণ করবেন না। আমি বুঝে নিলাম রাতে বৌদি তাকে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়ে থাকবে। আমার অস্বস্তি অনেকটা কেটে যেতে লাগল।

আমার বাল্য বন্ধু পান্নার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাই আমাকে অস্ট্রেলিয়া অভিভাষণ নিতে উৎসাহিত করেছে। চাকুরীর ব্যাপারে তথ্য উপাত্ত ও উপদেশ দিয়ে ও আমাকে সাহায্য করেছে। অনেক জায়গায় রেজুমি দিলাম, দরখাস্ত করলাম। কিন্তু সমস্যা হল, আমি তখন পর্যন্তও কোন মোবাইল ফোন কিনতে পারিনি। তাই বায়ো-ডাটায় পরমেশ এর বাসায় ল্যান্ড লাইন নম্বরটাই দিতে হয়েছিল। তাতে সুবিধা হয়েছে এই যে, আমি বাসায় না থাকলেও বৌদি সেই টেলিফোন রিসিভ করতেন আর আমি বাসায় আসলে সব খবর জানাতেন।

-দাদা আগামী সোমবার সকাল দশটায় ইষ্ট গার্ডেন ডেভিড জোনস্ এ, শুক্রবার ৯ টায় গ্রানাডিয়ার কোটিং এ, আর পরের সপ্তাহের সোমবার ফায়ার সার্ভিসে ইনটারভিউ। তিনি ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে বিস্তারিত লিখে রাখতেন, পরে ইন্টারভিউ দিয়ে আমি গ্রানাডিয়ার কোটিং এ জয়েন করলাম। এই মহীয়সী নারীর অবদান আমি ভুলব কি করে? উল্লেখ্য আমার চাকুরীর ইন্টারভিউর জন্য যাওয়া আসার ব্যাপারে হরিদাস পাল দা, স্বপন দা, সুরঞ্জন ও রজত আমাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করত। কিছুদিন পরে ইস্টলেকস এর মাসকট ড্র্রাইভে একটি অপেক্ষাকৃত পুরনো বাসা সন্ধান পেয়ে গেলাম, আমি পরমেশকে বললাম-
-পরমেশ, আমারতো এবার চাকুরী হয়েছে। বাসাও পেয়েছি তোমার রেফারেন্স এ । আগামী সপ্তাহে আমরা নতুন বাসায় উঠতে চাই। বৌদি বেডরুমে ছিলেন। তিনি লাউঞ্জরুমে এসে বললেন-
-খুব উতলা অইয়া পরছুইন যে, চাকুরী অইচে বেতনডাতো পান নাই। বেতনডা পাইয়া লউনযে, তারপর নতুন বাসায় উডুইন যে। আমরা তার স্নেহের নির্দেশের কাছে হার মানলাম। আরও দু সপ্তাহ থেকে পরের সপ্তাহে বাসা শিফট করার কাজে লেগে গেলাম। আবার সেই রজত, সুরঞ্জন আমার মালামাল নিয়ে নতুন বাসা সাজিয়ে দিল। এদিকে বৌদি আমাদের নতুন বাসার জন্য হাড়ি, সসপ্যান, ফ্রাইংপ্যান, হাতা চামচ থেকে শুরু করে মশলার কৌটা, বাটা, প্লেট, গ্লাস এর এক বিরাট বাক্স রেডি করে বললেন নতুন সংসার, এ সব লাগবো। আরো যা যা লাগে আমি পরে দিমুনে। বৌদিকে দেখে তখন আমার মায়ের মুখটা ভেসে উঠল। মা যেমনি বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে দরকারি সব জিনিস গুছিয়ে দিতেন এও তেমনি। আমি ভেতরে ভেতরে কাঁদতে লাগলাম। কষ্টে নয়, কৃতজ্ঞতায়। এই মহিলা কি মানুষ না দেবী! আমার ছেলে-মেয়ের সকালের ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ-বক্স রেডি করে দেয়া, আমাদের নাস্তা, দুপুরের খাবার তৈরি করা থেকে সব কাজ করেছেন। আমি জানি এর পেছনে কোন স্বার্থ ছিলনা, ছিলনা কোন প্রত্যাশা। পৃথিবীতে কিছু কিছু ক্ষণজন্মা মানুষের জন্ম হয় শুধু দেওয়ার জন্য। পাওয়ার আশা তাঁরা কোনদিনও করেননা। বৌদি তাঁদেরই একজন।

আমদের ভাগ্য বারবার আমাদের বিড়ম্বিত করেছে। এক বিকেলে আগুন লেগে আমাদের ইউনিটটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেদিনও আমার কাছের বন্ধুবান্ধব সবাই এগিয়ে এসেছিল সাহায্যের হাত নিয়ে। সোসাল সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট থেকে সেদিন মারুবরা হোটেলে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হলেও খাওয়ার কোন বন্দোবস্ত ছিলোনা। আবার পরমেশ, পাল দা, স্বপন দা, সুরঞ্জন, রজত, বিধান প্রমুখেরা পালাক্রমে আমাদের দুপুরের আর রাতের খাবারের বন্দোবস্ত করলেন। আগুন লাগার পরের দিন সিডনীর হিন্দু কমিউনিটির অনেকেই এসেছিলেন, সাহায্য করেছিলেন।


বাকি অংশ পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন >







Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 30-Nov-2014