bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



আদিবাসীদের ঘুম পাড়ানী গান ও
ম্যালকম টার্নবুলের কান্না

ড. রতন কুন্ডু


ম্যালকম টার্নবুল অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। গত ১লা মার্চ ২০১৬ NITV’র ষ্টান গ্রান্ট এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে অতীতে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ভাষা-সংস্কৃতির অবলুপ্তির কথোপকথনের এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মসভেল এলাকার এক বৃদ্ধা আদিবাসী রমণী যখন তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বললেন যে তিনি যখন কিশোরী ছিলেন তখন তার স্নেহময়ী মা রাতে সুর করে Ngunnawal (নগুন্নাওয়াল) ভাষায় লালাবাই (Lullaby) বা ঘুম পাড়ানী গান গেয়ে ঘুম পাড়াতেন। তিনি সুর করে সেই গানটি প্রধানমন্ত্রীকে শোনানোর এক পর্যায়ে ম্যালকম কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার কান্নার কারণ হল ঐ আদিবাসী ভাষাটি মাত্র দুবছর আগে এ পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। এখন আর ঐ ভাষায় কেউ কথা বলে না। ভাষাটির লিখিত রূপ কবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তা কেউ মনে করতে পারছে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী পৃথিবীর সবচে' পুরাতন জনগোষ্ঠী বলে বিবেচিত। ব্রিটিশরা ১৭৮৮ খৃস্টাব্দে এই মাটিতে প্রথম পা রাখে। ক্যাপ্টেন কুক নামে এক নাবিক তার নৌবহর নিয়ে প্রথমে কুক দ্বীপ ও পরবর্তীতে বোটানি বে’র "লা পেরাউজ" এ আস্তানা গাড়েন। ঐ সময়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরো অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ৩৮টি বড় আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস ছিল। এছাড়াও অসংখ্য ছোট ছোট উপজাতি গোষ্ঠীও ছিল বিভিন্ন এলাকায়। প্রত্যেকটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল। প্রথমে ইউরোপীয় ও পরবর্তীতে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর অভিভাষণ এর ফলে আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি ক্রমে ক্রমে বিলুপ্ত হতে থাকে। ইংরেজি হয় অস্ট্রেলিয়ার অফিসিয়াল ভাষা। কালক্রমে দু’শতক ধরে ভাষা ও সংস্কৃতির আগ্রাসনের ফলে আদিবাসীদের নিজস্ব সত্ত্বা ক্রমে ক্রমে বিলুপ্ত হতে থাকে।

শুধুমাত্র ভাষা-সংস্কৃতির আগ্রাসনই নয়। ইউরোপীয়ান শাসকরা জাতি গঠনের এবং আদিবাসীদের আলাদা অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে দেয়ার জন্য তাদের প্রজন্মকে অধিগ্রহণ করে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের অস্ট্রেলিয়া গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প গ্রহণ করে। এতে করে আদিবাসীদের মধ্যে এক Generation Gap বা প্রজন্ম শূন্যতা দেখা দেয়। এই প্রজন্ম কোনদিন তাদের পূর্বপুরুষদের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে পারেনি। আদিবাসীদের ভাষা সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার এটাও একটা মূল কারণ। দীর্ঘ ২টি শতক পরে বিগত ১৩ই ফেব্রুয়ারি ২০০৮ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মি কেভিন রাড অফিসিয়ালি এই প্রজন্ম চুরির (Stolen Generation) জন্য আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তার ভাষণের কিয়দংশ এখানে তর্জমা করা হল-
"আজ আমি শ্রদ্ধাভরে এই বিশাল রাজ্যের মালিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদানের কথা স্মরণ করছি। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী সংস্কৃতি পৃথিবীর সবচে পুরাতন। আমরা অতীতে তাদের প্রতি অনেক অন্যায়-অবিচার করেছি। আমরা ভুল করেছি। এখন সময় এসেছে সে ভুল শোধরানোর। তাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, আমি সারা অস্ট্রেলিয়ার জনগণের পক্ষ থেকে তাদের কাছে আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা করছি ........।"

এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই নয়, সারা বিশ্বে এই আগ্রাসী ভূমিকার ফলে হাজার হাজার ভাষা এই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং অনেক ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার পথে। সবচে' প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাংলা ভাষা। ব্রিটিশ ভারত থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর পাকিস্তান নামের একটি রাষ্ট্রের উত্থান হয়। পাকিস্তানের দু’টো প্রদেশ। একটি পশ্চিম পাকিস্তান ও অন্যটি পূর্ব পাকিস্তান। উত্তর ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তানে কথ্য ভাষা এক হলেও ভারত অংশে সেটি লিখিত হয় দেবনাগরী বা সংস্কৃত হরফে এবং পাকিস্তানে লিখিত হয় আরবি হরফে। এই অফিসিয়াল স্ক্রিপ্ট প্রণয়নের ফলে উত্তর ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তানের নিজ নিজ আঞ্চলিক লিখিত-রূপ বা মুল স্ক্রিপ্ট বিলুপ্ত হয়ে যায়। দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতীয়তারা এই সরকারি আদেশ প্রত্যাখ্যান করে। এজন্য দক্ষিণ ভারতে, দেবনগরী স্ক্রিপ্ট ও হিন্দি ভাষা অনুপ্রবেশ করতে পারেনি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ ভারতীয় জনগোষ্ঠীই ইন্ডিয়ার আদিবাসী বলে স্বীকৃত। সেখানে এখনো মালয়ালম, কেরল, তেলেগু, তামিল ও স্থানীয় ভাষা চালু আছে ও তাদের নিজস্ব লিখিত রূপ আছে। একই সাথে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম বঙ্গ, বর্তমান ঝাড়খণ্ড (বিহার) এর কিছু অংশ, আসাম, ত্রিপুরা, উড়িষ্যার উত্তর ভাগে বাংলা ভাষা চর্চা হতে থাকে ও বাংলা স্ক্রিপ্টে লিখন প্রক্রিয়া চালু থাকে। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো পাকিস্তান নামে আলাদা রাষ্ট্র তৈরি হওয়ার পরপরই। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী প্রথম আঘাত হানে বাংলা ভাষার উপর। তারা উর্দুকে পাকিস্তানী রাষ্ট্রভাষা করার জন্য বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তব্য প্রদান সহ সংসদে একটি বিল উত্থাপন করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী এটা মেনে নিতে পারেনি এবং প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। কোন ভাষা সংরক্ষণের জন্য আন্দোলন মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটাই প্রথম। রাজপথে প্রাণ বিসর্জন দিল বাঙলার সন্তানেরা। এ ইতিহাস কমবেশি আমরা সবাই জানি। আমি বিস্তারিত ইতিহাসে যাব না। ২১শে ফেব্রুয়ারি হয় আমাদের ভাষা শহীদ দিবস।

এই দিনটিকে স্মরণে রেখেই এবং ভাষা ভিত্তিক আন্দোলনের মূল সুরটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কানাডার কৃতি বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম অক্লান্ত পরিশ্রম করে জাতিসংঘে একটি বিল উত্থাপনে সমর্থ হয়। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- শেখ হাসিনা তাদেরকে তথ্য উপাত্ত, নৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দিয়ে সাহায্য করেন। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯৯ সালের নভেম্বর অধিবেশনে UNESCO ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বা International Mother Language Day (IMLD) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাঙালি জাতি হিসেবে এটা আমাদের বিশাল অর্জন। এর পাশাপাশি শ্রী নির্মল পালের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া একুশে একাডেমী ও এসফিল্ড কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে ২০০৬ সালে এসফিল্ড পার্কে তৈরি হয় বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতি সৌধ বা IMLD Monument.

এই মূল সূর সংরক্ষণ ও বিশ্বায়নের জন্য তৈরি হয় MLC বা Mother Language Conservation Movement. কতগুলো বিশেষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এ আন্দোলন বেগবান হয়ে দশ বছর পার করল। IMLD’র দশ বছর পূর্তিতে এসফিল্ড কাউন্সিল ও বিশ্বের প্রায় ৩০টি ভাষার প্রতিনিধিরা একটি সেমিনারে সমবেত হন। প্রধান অতিথি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার কাজী ইমতিয়াজ হোসেন। সেখানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও প্রাক্তন সচিব জনাব এন.আই খান। জনাব খান আলোচনায় জানালেন যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও এই দিবসটিকে আরও মর্যাদাবান ও এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছেন এবং বাজেট বরাদ্দ করেছেন। দেশের প্রথিতযশা ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিবর্গকে এ কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছেন। জনাব এন.আই খান আরও জানালেন যে, বাংলাদেশ বর্তমান সরকারের প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট UNESCO কর্তৃক ক্যাটাগরি-২ লেভেলে প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছে। এ আন্দোলনের সর্বশেষ সাফল্য MLC Movement কর্তৃক এসফিল্ড লাইব্রেরীতে একুশে কর্নার উদ্বোধন। পর্যায়ক্রমে এটিকে বিস্তৃত করে অস্ট্রেলিয়া ও জাতিসংঘ-ভুক্ত দেশগুলোতে এই একুশে কর্নার স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ পর্যায়ে বর্তমান সরকারের পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীদের ভাষা সংরক্ষণ ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার জন্য বর্তমান সরকারকে সাধুবাদ জানানো হয় এবং MLC আন্দোলনের অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করা হয়।

ফিরে আসি আবার ম্যালকম প্রসঙ্গে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি, প্রজন্ম ও জীবনাচরণ নিয়ে এ যাবতকাল যত অন্যায় করা হয়েছে তার প্রায়শ্চিত্ত করা দরকার। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত প্রতিটি অভিবাসী জনগণ ও এ যাবত যত সরকার প্রধান ছিলেন সবার প্রতি তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান এই ঋণ স্বীকার করে আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা ও তাদের ভাষা-সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশে সাহায্য করা। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য ২ কোটি বা ২০ মিলিয়ন ডলার অনুদান প্রদান করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নিবন্ধ লেখকের অনুপ্রেরণায় MLC Movement প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে একটি স্মারক লিপি পেশ করে গত ৩রা এপ্রিল ২০১৬. স্মারক লিপিতে শ্রী নির্মল পাল অস্ট্রেলিয়া সরকারের এ সংক্রান্ত কার্যকলাপে MLC'র সম্পৃক্ততা ও কিছু নির্দেশনা পেশ করেন। তিনি এতদসংক্রান্ত একটি জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য সরকারী পর্যায়ে একটি অবকাঠামো তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদী একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এটিকে পরবর্তীতে জাতিসংঘ-ভুক্ত সমস্ত দেশগুলোকে উদ্বুদ্ধ করে একই কর্মসূচী প্রণয়নে উৎসাহিত করতে পারে। সেক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া এই আন্দোলনের সূত্রধর ও কাণ্ডারি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এই আন্দোলনকে বিশ্বায়নের জন্য Conserve Your Mother Language স্লোগানটি গ্রহণ করা যেতে পারে। খুশির বিষয় হল অস্ট্রেলিয়া প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর উক্ত পত্র প্রাপ্তি স্বীকার করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস প্রদান করেছে।

একটি স্মৃতিচারণ দিয়ে নিবন্ধটি শেষ করতে চাই। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় আমার এক ভাগ্নিকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করাই। তার পাশের বিছানায় নারায়ণগঞ্জের এক শিশু চিকিৎসাধীন। সে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। তার দেহের রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়াতে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। শুধু রক্তশূন্যতাই নয় ভেঙে যাওয়া রক্তকণিকার হিমোগ্লোবিন যকৃৎ এ প্রদাহ সৃষ্টি করলে জন্ডিস এ আক্রান্ত হয়। ডাক্তারদের বোর্ড মিটিং এ শিশুটির বাঁচা-মরা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয় ও তার অভিভাবকদের জানিয়ে দেয়া হয়। পরিবারটি কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিশুটি মার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আবদার করে তাকে সেই ঘুমপাড়ানি গানটি শোনানোর জন্য। মা করুণ সুরে গান গাইছে আর শিশুটি চোখ বন্ধ করে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাচ্ছে কিন্তু শিশুটি দেখেনি যে গানের সাথে সাথে মায়ের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পরছে। স্নেহের পরশ তাকে স্পর্শ করেছে কিন্তু কান্নার পরশ তাকে স্পর্শ করেনি। জানিনা ছেলেটি কি আরোগ্য লাভ করেছে না পরপারে চলে গেছে। আজও আমার কানে সেই কান্না-মিশ্রিত স্নেহাদ্র সুর অনুরণন তোলে- "চন্দ্র যে তুই মোর সূর্য যে তুই। আমারই আঁখিতে তারা যে তুই- "



ড. রতন কুন্ডু, সিডনি



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 6-May-2016