bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney















রানী এলিজাবেথ, গিরগিটি ও বাংলার বাঘ
রফিক হক



৭ই সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ায় একটা বিশেষ দিন, ১৯৩৬ সালের এই দিনে তাসমানিয়ার হোবারট চিড়িয়াখানায় সর্বশেষ তাসমানিয়ান টাইগারটি মারা যায় এবং সেই সাথে এই বাঘের প্রজাতিটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়। তখন থেকে এই দিনটিকে জাতীয় ‘বিপন্ন-প্রজাতি দিবস’ বা THREATENED SPECIES DAY হিসাবে পালন করা হয়ে থাকে। বস্তুত: এই দিনটিতে বিলুপ্ত-প্রায় প্রজাতি সম্পর্কে জনগণকে তাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিটি স্টেট আর টেরিটোরিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়ে থাকে। বরাবরের মত আমার কর্মক্ষেত্রের মাধ্যমে আমি নিজেও এই বিষয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকি। এবছর বিপন্ন-প্রজাতি দিবস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য ইন্টারনেট ঘাটতে যেয়ে ২০০০ সালের একটা ঘটনা নজরে পরল। সুন্দরবন এর সন্নিকটে বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক ‘রামপাল কোল-ফায়ার পাওয়ার স্টেশন’ নির্মাণ করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি প্রসঙ্গে এই ঘটনাটি স্মরণ করা সকলের জন্যই মনে হয় সময়োপযোগী।

২০০০ সালের মার্চ মাসের ঘটনা, রানী এলিজাবেথ ক্যানবেরা যাবেন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ক্যানবেরার জনগণ এবং রাজনীতিবিদরা তাই অধীর আগ্রহে রানী এলিজাবেথ এর আগমনের প্রতীক্ষা করে আছেন। তৎকালীন ক্যানবেরার ছোট্ট বিমানবন্দরে রানীর রাজকীয় উড়োজাহাজ বোইং ৭৪৭ অবতরণের জন্য রানওয়ে দুপাশে ৭.৫ মিটার করে চওড়া করা দরকার। ব্রিটিশ কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশ অস্ট্রেলিয়া, দেশের রাষ্ট্র-প্রধান ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ, গভর্নর জেনারেল তাঁরই প্রতিনিধিত্ব করেন। কাজেই এ আবার এমন কি কাজ হোল, রাষ্ট্রপ্রধান রানীর জন্য এই সামান্য কাজটুকু করা-তো কিছুই না। কিন্তু অবাক কাণ্ড, রানীর উড়োজাহাজ ক্যানবেরা বিমানবন্দরে অবতরণ করার ব্যবস্থা করা কোনমতেই সম্ভব হোল না। রানীর আগমন রিপাবলিকান আন্দোলনকারীরা যথানিয়মে প্রথম থেকেই তির্যক দৃষ্টিতে দেখছিলেন। কিন্তু তাদের আন্দোলন নয়, রানীর উড়োজাহাজ ক্যানবেরায় অবতরণ করতে বাধ-সাধল মাত্র আট ইঞ্চি লম্বা একটা গিরগিটি (লিজারড)। একটু ধৈর্য ধরুন, বিস্তারিত বলছি।

এই গিরগিটির নাম EARLESS DRAGON. না, রূপকথার আগুন-মুখী ড্রাগন নয় যে আগুন ছুড়ে রানীর রথ-কে ভস্ম করে দেবার ভয় ছিল। আসলে এই গিরগিটি অস্ট্রেলিয়ার আইনে বিলুপ্ত-প্রায় প্রজাতি এবং এদের চিহ্নিত বাসস্থানগুলির মধ্যে ক্যানবেরা বিমানবন্দরের ঘেসো জমিগুলি অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং, রানওয়ে চওড়া করা হলে এই গিরগিটির বাসস্থান নষ্ট হতে পারে মনে করে রানীর উড়োজাহাজ ক্যানবেরা বিমানবন্দরে অবতরণ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হোল। ঘটনা চক্রে রানী পরাজিত হলেন, আর বিজয়ী হলেন মহাবীর কান-বিহীন ড্রাগন মহোদয়।

রানী পরবর্তীতে সিডনী বিমানবন্দরে অবতরণ করে ছোট একটা বিমানে যোগে ক্যানবেরা এসেছিলেন। সব চাইতে মজার কথা কি জানেন, মহাবীর কান-বিহীন ড্রাগন মহোদয়কে কিন্তু ক্যানবেরা বিমানবন্দর এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় নাই, কিন্তু বিজ্ঞানীদের বিচারে ওই এলাকা এই প্রজাতির গিরগিটিদের জন্য আদর্শ হেবিটেট হিসাবে বিবেচিত। কাজেই পাছে এই বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সম্ভাব্য হেবিটেট বিনষ্ট হয়, সেই ভয়ে অস্ট্রেলিয়া তাঁর রাষ্ট্রপ্রধানের বিমানকে ক্যানবেরা এয়ারপোর্টে অবতরণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাল।

এটি কোন গল্প নয়, এটি একটি সত্য ঘটনা, বিবিসি এর একটা রিপোর্ট-এর ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। বাংলাদেশের ‘রামপাল কোল-ফায়ার পাওয়ার স্টেশন’ নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। বাংলাদেশের বিজ্ঞ পরিবেশবিদরা এই প্রসঙ্গে নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত স্বাধীন পরিবেশে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার যোগ্যতা রাখেন। তাদের সিদ্ধান্তের উপরে সুন্দরবনে বাংলার বাঘ এবং তাদের উপযুক্ত হেবিটেট এর দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। বাংলার বাঘ আমাদের গর্ব, আমাদের জাতীয় প্রতীক। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও বাংলার বাঘ সেই একই মর্যাদায় মহীয়ান থাকুক তাঁর নিশ্চয়তা আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়টির গুরুত্ব সকলেরই অনুধাবন করা আশু প্রয়োজন। সেই কারণে এই প্রাসঙ্গিক ঘটনাটি গল্পের আকারে সকলের জন্য উপস্থাপন করলাম।

পরিশেষে মানব সভ্যতার বর্তমান সময়ে দালাই লামার অমূল্য উপদেশটি সকলকে মনে রাখতে বিনীত অনুরোধ জানাবো, “We have the responsibility, as well as capability, to protect the Earth’s habitats, its animals, plants, insects and even microorganisms. If they are to be known by future generations, as we have known them, we must act now. Let us work together to preserve and safe guard our world.”


সূত্রঃ http://news.bbc.co.uk/2/hi/asia-pacific/667556.stm, ফটো ক্রেডিটঃ Anna MacDonald



রফিক হক, সিডনি



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 19-Sep-2016