bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney













দেশের কথা - স্বাধীনতার কথা

রফিক হক



“...স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।”

কবি শামসুর রাহমানের “স্বাধীনতা তুমি” কবিতার এই শেষ কয়েকটি ছত্র আমার কাছে মনে হয় যেন স্বাধীনতার দার্শনিক বিশ্লেষণের উপসংহার। মাত্র কয়েকটি শব্দে আবহমান বাংলার অবারিত প্রকৃতির সাথে মুক্ত চিন্তার এক অপূর্ব সমন্বয়ের অনুভূতি প্রতিফলিত হয়েছে। 'স্বাধীনতা' শুধু একটা শব্দ নয়, একটা ভূখণ্ড বা দেশের সাথে একটা একাত্মতার অনুভূতি- সেই অনুভূতিটিকে সঠিক ভাবে চেতনায় উপলব্ধি করা আজ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর শুভ লগ্নের বিশেষ আহবান।

একটা ভূখণ্ড থেকে একটা সার্বভৌম দেশ বা রাষ্ট্রের জন্মের পদ্ধতিগত পটভূমি কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে পরিষ্কার ভাবে প্রতিফলিত হয় নাই। মনে রাখা প্রয়োজন, একটি স্বাধীন দেশের জন্ম মানেই অপর একটি সার্বভৌম দেশের ভূখণ্ড হারানো। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী একটি দেশ যেমন তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার অধিকার সংরক্ষণ করে, আবার ঠিক তেমনিভাবে একটি ভূখণ্ডের জনসাধারণও তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার রাখে। এই দ্বিমুখী নীতিতে বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় জটিল এবং তার সমাধান হয়ে যায় দুঃসাধ্য-ফলশ্রুতিতে স্বাধীনতাকামী মানুষকে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হয় তাদের স্বাধীনতার অধিকার। বিষয়টি অবশেষে বিশ্ব-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপরে গিয়ে বর্তায়, জাতিসংঘের সদস্যদের স্বীকৃতি, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়। এই জটিল পরিস্থিতির শিকার হয়ে সাবেক রাশিয়ার কয়েকটি রিপাবলিক অনেকদিন থেকে স্বাধীন ভাবে পরিচালিত হলেও আজ পর্যন্ত সার্বভৌম দেশের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত রয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের এই জটিল পরিস্থিতির মুল কারণ- এই আইনগুলি মানব ইতিহাসের এক বিশেষ ক্রান্তি-লগ্নে প্রণীত হয়েছিল। ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলি তখন তাদের কলোনি সমূহে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বেলিত গণআন্দোলনে প্রায় দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। কলোনির মুক্তিকামী জনগণ দীর্ঘ দিনের অত্যাচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে তখন রুখে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং তড়িঘড়ি করে এই সব কলোনি থেকে পাততাড়ি গোটানোই ছিল বৃহৎ শক্তিগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য। যথোপযুক্ত নীতিনির্ধারণ এবং আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে চিন্তা-ভাবনা করার চাইতে জনগণের আন্দোলনে লুকিয়ে থাকা প্রতিক্রিয়াশীল তাবেদার গোষ্ঠীর সাথে সাম্রাজ্য ভাগবাটোয়ারা করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। সুতরাং তৎকালীন সময়ে প্রণীত এইসব আন্তর্জাতিক নিতিমালা আন্তরিকতা এবং বাস্তবতা বিবর্জিত হেঁয়ালি ও ধোঁয়াশা হয়েই রয়ে গিয়েছে।

মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে দেশ (Country) বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধ্যান-ধারনা বা কনসেপ্টের জন্ম দিয়েছে। একটা স্বাধীন দেশের চেতনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক গেয়ারটজ (C. Geertz) একটা অন্তর্নিহিত উপলব্ধি বা একটা অনুভূতির কথা বলেছেন। তার মতে দেশ বলতে আমরা একটা ভূখণ্ডের ভৌগলিক পরিমাপ, আঞ্চলিক সীমারেখা, জনসাধারণের পরম্পরার সাথে একাত্মতা, আশ্রয় এবং আবাস, ইত্যাদি অনুভব করে থাকি। অন্যদিকে রুডলফ স্টেইনার (Rudolf Steiner) মনে করেন স্বাধীনতা মানুষের মুক্ত চিন্তা আর কর্মের একটা সমন্বয়। তিনি আরও বলেন,
“The free man lives in confidence that he and any other free man belong to one spiritual world, and that their intentions will harmonize. The free man does not demand agreement from his fellow man, but expects to find it because it is inherent in human nature.”

এই প্রসঙ্গ নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করলে অস্ট্রেলিয়ান এবরিজিন-দের প্রতি যুক্তি সংগত কারণেই শ্রদ্ধা জানাতে হয়। প্রকৃতির সন্তান আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ান-রা প্রাচীন সময় থেকে তাদের ভূমির (Country) সাথে আধ্যাত্মিক ভাবে একাত্ম। ভূমিই তাদের বেঁচে থাকা, তাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ, পূর্বপুরুষদের সাথে তাদের আত্মিক সংযোগ। তাই সেই ভূমি ও প্রকৃতির কোন কিছু তাদের কাছে বাজারজাত করার সম্পদ নয়। অন্যদিকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে রহস্যঘন Terra Australis বা The Great Sothern Land খুঁজতে আসা সুযোগসন্ধানী ইয়োরোপীয়-দের উদ্দেশ্য ছিল একবারেই বিপরীতমুখী। তারা এসেছিল মূলত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ সেই অবারিত ভূমি দখল করে অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হবার জন্য। আদিবাসীদের হাজার-হাজার বছরের প্রকৃতি নির্ভর আধ্যাত্মিক চেতনাকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রয়োজন মত শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তারা তাদের এই সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী স্বার্থ-কেন্দ্রিক চেতনার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। বর্তমান সময়ে তাই অস্ট্রেলিয়ান-আধ্যাত্মিকতার কোন নির্দিষ্ট দার্শনিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া জটিল এবং কষ্টসাধ্য। ব্রিটিশ কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশ হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানে কোথাও বলা নাই অস্ট্রেলিয়া একটা স্বাধীন রাষ্ট্র। বিগত 'প্রজাতন্ত্র না রাজতন্ত্র' বিষয়ক গণভোটের ফলাফল থেকে প্রতীয়মান হয় যে অস্ট্রেলিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে বিষয়টি আসলে তেমন কোন মাথা-ব্যথার কারণ নয়।

মিশ্র-সংস্কৃতির দেশ অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় বাংলাদেশের পটভূমি কিন্তু একে বারেই অন্যরকম। বাংলাদেশের জনগণ অতি উচ্চমাত্রায় জাতিগত ভাবে হমোজেনিয়াস (Ethnically Homogeneous) বা সমজাতীয়। বাংলাদেশের ৯৮% জনসাধারণ প্রাচীন বাংলা ভাষা-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী বা Ethno-linguistic Race। ধর্মীয় জাতিসত্তা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর উপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে থাকে ঠিকই তবে সেই বিভাজন বাংলাদেশীদের Homogeneity বা সমজাতীয়তার বন্ধনকে স্থায়ী ভাবে বিভাজন করতে কখনই সক্ষম হয় নি। উপমহাদেশের ইতিহাস থেকে বারবার এই কথারই প্রমাণ মেলে। সুতরাং এই ভূখণ্ডের সাথে জনসাধারণের একাত্মতার অনুভূতি (Sense of belonging) প্রসূত স্বাধীনতার মূল্যবোধ গভীর এবং আন্তরিক। স্বাধীনতার সাথে মানুষের এই Spiritual বা আধ্যাত্মিক সম্পর্ক থেকেই মূলত দেশপ্রেমের উন্মেষ হয়ে থাকে। সেই হিসাবে এই ভূখণ্ডের জনগণের দেশপ্রেম গভীর এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। আমাদের গৌরব-দীপ্ত মুক্তিযুদ্ধ সহ ইতিহাসের অগণিত ঘটনা সেই দেশপ্রেমেরই জ্বলন্ত উদাহরণ।

ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে স্বাধীন এবং সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসাবে কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ সমর্থন করা বা বিশ্বাস করা আন্তর্জাতিক নীতিমালায় নাগরিক অধিকার হিসাবেই গণ্য হয়ে থাকে। তবে এই সমর্থন বা বিশ্বাস চরম পর্যায়ে পৌঁছিয়ে অনেক সময় একটা নেতিবাচক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাতে পারে। এই পরিস্থিতি একটা অবাস্তব, উদ্ভট এবং অসুস্থ একাত্মতার অনুভূতি বা Sense of belonging সৃষ্টি করতে সক্ষম- যার ফলশ্রুতিতে মানুষের মুক্ত-চিন্তা প্রচণ্ড-ভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং তারা তখন সত্য বা বাস্তবতা-কে পরিহার করতে শুরু করি। প্রথিতযশা মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা লব্ধ ফলাফলের মাধ্যমে এই ধরনের মানসিক অবস্থাকে একটা মনস্তাত্ত্বিক-ব্যাধি হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। হুগো মেরসিয়ার (Hugo Mercier) এবং ড্যান স্পিরবার (Dan Sperber) তাদের বহুল আলোচিত The Enigma of Reason বইটিতে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে প্রফেসর জেয় ভ্যান বাভেল (Jay Van Bavel) বলেছেন,
“Our desire to hold identity-consistent beliefs often far outweigh our goals to hold accurate beliefs. This may be because being a part of a political party or social group fulfills fundamental needs, like the need for belonging, which supersede our need to search for the truth.” (in Psychology Today)।

অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী পশ্চিমা শাসনের নেতিবাচক প্রভাব জনিত কারণে কলোনিয় সময়ের স্বার্থান্বেষী চিন্তা-ভাবনা এখনও মাঝে মাঝে আমাদের সুস্থ চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আমরা তখন পার্থিব চিন্তায় বিভোর হয়ে দেশ এবং তার পরিবেশের সাথে আমাদের আধ্যাত্মিক সংযোগের অনুভূতিটি হারিয়ে ফেলি। কলোনিয় শাসকদের মতই আমাদের কাছে তখন দেশ হয়ে যায় রূপকথার সোনার ডিম-পাড়া একটা রাজহাঁস এবং দেশপ্রেম হয়ে যায় সেই রাজহাঁসটির পেট কেটে সবগুলি সোনার ডিম আত্মসাৎ করার স্বার্থপর এবং অসুস্থ লালসা। আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই দেশ কোন পৃথক তৃতীয়-পক্ষ নয়, দেশের মাঝেই আমাদের বসবাস- তাই দেশপ্রেম আসলে নিজের অস্তিত্বের সাথেই প্রেম করার অপর নাম।

মনে রাখা প্রয়োজন- দেশের সম্পদ বাঁচলে যেমন দেশের জনগণ বাঁচে, ঠিক তেমনিভাবে স্বাধীনতার সুস্থ চেতনা বাঁচলে দেশ বাঁচে। জয় হোক মাতৃভূমির, জয় হোক স্বাধীনতার!!




রফিক হক, সিডনি




Share on Facebook               Home Page             Published on: 10-Mar-2021

Coming Events: