bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney













সুলতান কাবুস ইউনিভার্সিটি - মাস্কাট:
এক সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ
পুরুষোত্তম চক্রবর্তী



গৃহবন্দি অবস্থায় নানা কথা মনে পড়ছে। আরব সাগরের পারে অবস্থিত মাস্কাট (ওমানের রাজধানী) এক অতীব সুন্দর শহর। অবিশ্যি গালফ-কান্ট্রির সব শহরগুলোই সাজানো। ওখানকার বিখ্যাত 'সুলতান কাবুস ইউনিভার্সিটি' তে ছ-মাস ছিলাম। ওরকম জায়গায় যে কোনদিন যাবো বা পড়াবো, স্বপ্নেও ভাবিনি। ঐ ইউনিভার্সিটি থেকে আগেও অর্থাৎ আমার সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, কলকাতায় কর্মরত অবস্থায় একবার আমন্ত্রিত হয়েছিলাম, কিন্তু যেতে পারিনি টিচিং ও রিসার্চ-বিষয়ক অনেকগুলো কমিটমেন্ট থাকায়। কয়েকবছর পরে আবার যখন ডাক পেলাম, আর না করিনি। তিন বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৭ তে, ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। সেবছরই ওরা MSc তে Materials Science (special paper) বিষয়টি শুরু করেছিল, যার জন্য আমার ওখানে যাওয়া।

সুলতান কাবুস ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের বেশীর ভাগ ফ্যাকাল্টিদেরকে খুব সপ্রতিভ ও প্রাণবন্ত লেগেছিল। তাঁদের overall smartness, ঝরঝরে ইংরেজি, গভীর পাণ্ডিত্য ও অনুসন্ধিৎসা দেখে মুগ্ধও হয়েছিলাম। Join করার কিছুদিন পরেই ওখানকার কেমিস্ট্রি বিভাগের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত একটি সেমিনারে বক্তৃতা (colloquium) দিয়েছিলাম। ফিজিক্স বিভাগে অত বড় সেমিনার রুম ছিলনা, তাই সবচেয়ে বড় 'লেকচার হল' টিতেই আমার সেমিনারের বন্দোবস্ত হয়েছিল। অনেকেই এসেছিলেন বক্তৃতা শুনতে, এমনকি, 'ডিন অফ দি ফ্যাকাল্টি অফ সায়েন্স' 'ডিরেক্টর অফ দি সেন্টার ফর ন্যানোসায়েন্স', প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, প্রমুখ। এমনিতেই আমি বক্তৃতা দিতে শুরু করলে বিষয়বস্তুর প্রতি খানিকটা ইমোশনাল হয়ে পড়ি, তাই কখনও কখনও অতিরিক্ত বলা হয়ে যায়। মনে আছে, টানা প্রায় দু-ঘণ্টা বক্তৃতা দিয়েছিলাম, কিন্তু উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে সামান্যতম ধৈর্যচ্যুতি চোখে পড়েনি। সেমিনারে কেমিস্ট্রি ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগেরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন, তাই হয়তো সেই কারণেই কেমিস্ট্রি বিভাগের অনেকের সাথেও কিছুটা সখ্যতা গড়ে উঠেছিল।

ইউনিভার্সিটির প্রতিটি মানুষ আরবিতে কথা বলেন আবার ইংরেজি টাও তুখোড় বলেন। খুব সহজেই ছাত্র-ছাত্রীদের প্রিয় হয়ে উঠেছিলাম। ওদের অকুণ্ঠ ভালবাসা ও শ্রদ্ধা আমাকে স্পর্শ করেছিল। ওরা আমাকে নিয়ে যে কি করবে, ভেবে পেত না। প্রতি সপ্তাহের শনিবার এক এক জন ছাত্র পালা করে আমাকে নিয়ে গাড়ী করে ঘুরতে বেরুত। এই ভাবে গোটা ওমান দেশটাই একরকম দেখা হয়ে গিয়েছে। সুলেমান নামের এক ছাত্র তার এই মাস্টারমশাই টিকে এত ভালোবেসে ফেলেছিল যে এক ছুটির দিন আমাকে তার গ্রামের বাড়ীতে নিয়ে যাবার জন্য সাতসকালে আমার গেষ্টহাউসে এসে হাজির। হঠাৎ তার আগমনে একটু বিস্মিত হয়েছিলাম কিন্তু তার আবেগ মথিত আমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে পারিনি। প্রায় তিন ঘনটা তার ঢাউস গাড়ীর আরামদায়ক সীটে বসে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করতে করতে অবশেষে সুলেমানের বাড়ীতে পৌঁছেছিলাম। একেবারে আরবি স্টাইলের গোটা বাড়ীটাই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। খাবারের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল জলখাবার থেকে শুরু করে একেবারে রাত্রের ডিনার পর্যন্ত। একরকম গভীর রাতে আমাকে গাড়ী করে গেষ্টহাউজে আবার পোঁছে দিয়েছিল সুলেমান।

আমার পড়ানো ওদের খুব পছন্দ হতো। চলে আসবার সময় ওরা বেশ দু:খ পেয়েছিল। কয়েকজনের অশ্রুসিক্ত চোখও দেখেছিলাম। আসবার সময় ওদের মধ্যে কেউ একজন এক বস্তা খেজুর উপহার দিয়েছিল। শুধু খেজুর গাছ আর খেজুর গাছ; ওমানের যে কোন রাস্তার দু-পারে সারিবদ্ধভাবে খেজুর গাছ! এক অতীব মনোরম দৃশ্য! সাধারণভাবে ওমানিরা খুব আন্তরিক, আবেগ পরায়ণ ও অতিথিবৎসল। ওরা যেখানেই বসে থাকে, সামনে একটি সুদৃশ্য প্লেটে খানিকটা খেজুর রাখা থাকে। কারও সঙ্গে আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে দু-চারটে খেজুর মুখে পুরে দেয়। মুহূর্তে প্লেট খালিও হয়ে যায়। এইভাবে আমার নিজেরও খেজুর কম খাওয়া হয়নি। যে কোন অনুষ্ঠানে হরেকরকম আইটেমের মধ্যে খেজুর, খেজুরের হালুয়া আর খেজুরের কেক থাকবেই। কতরকমের হালুয়া যে দেখেছি বা স্বাদ গ্রহণ করেছি, তা আর কি বলবো!

ওখানে দুপুরে ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে খেতাম। এলাহি খাবার, পাঁঠার মাংসের ছড়াছড়ি। রোজ বিরিয়ানি আর অতীব সুঘ্রাণ যুক্ত মাটন। সেই মাংসের কি অসাধারণ স্বাদ! ঘন ঝোল অর্থাৎ গ্রেভি আর তার মধ্যে ছোট ছোট ভিন্ডি (বাচ্চা ঢ্যাঁড়স)। বিচিত্র combination, কিন্তু অপরূপ বাহার আর স্বাদ! ভিন্ডিগুলো মুখে দিলে নিমেষে মুখের মধ্যে মিলিয়ে যেত। মাটন এখানেও খাই, কিন্তু ঐ ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনের রান্না করা মাংস যে কতটা সুস্বাদু হতে পারে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না! রোজই এত বেশি খেয়ে ফেলতাম যে রাত্রে খাবার স্কিপ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। এক কাপ ইওগোর্ট আর খানিকটা ফল খেয়ে ডিনার সারতাম। বিশাল এক বিলাসবহুল গেষ্টহাউজ দিয়েছিল থাকবার জন্য এবং আমার সমস্ত খরচ ইউনিভার্সিটিই বহন করতো। পারিশ্রমিকও মন্দ ছিলনা। কিন্তু এই বয়সে বিদেশ বিভূঁইয়ে যতই কেতাওয়ালা ঘরে থাকি না কেন, একটু একাকীত্ব লাগে।

উপরের প্রথম ছবিতে আমার সঙ্গে রয়েছেন 'সেন্টার অফ ন্যানোসায়েন্স' এর অধিকর্তা প্রফেসর সালিম আল-হারথি এবং আরেকটি ছবিতে সুলতান কাবুস ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর, যিনি আমাকে ইউনিভার্সিটির বিশেষ পদক দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন।

এর পরেও পি-এইচ-ডি থিসিসের পরীক্ষক হওয়ার সুবাদে এই ইউনিভার্সিটিতে একাধিক বার ভিজিট করবার সুযোগ হয়েছে। প্রতিবারই ওরা আমাকে চূড়ান্ত সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যা আমার স্মৃতিপটে অমলিন হয়ে আছে। এই একটি দেশে যতবারই আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছি, ততবারই এমিরেটস এয়ারলাইন্সের প্লেনের বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করেছি। সেটাও আমার কাছে কম উপভোগ্য ছিল না!




প্রফেসর পুরুষোত্তম চক্রবর্তী, কলকাতা থেকে




Share on Facebook               Home Page             Published on: 13-Sep-2020


Coming Events: