bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney













সেই নীল বাড়ী
ফওজিয়া সুলতানা নাজলী



তিনি আমার মুগ্ধ বিস্ময়! বেদনার পেয়ালায় ঠোট ছুঁয়ে ছুঁয়ে আস্তে আস্তে পান করেছেন শিল্পিত হেমলক। এ বছরের শুরুতে ঠিক করলাম South America যাবো ওদের গ্রীষ্ম এর সময়ে। যাওয়ার খুশীতে মনটা নেচে উঠেছিল। সেই মুহূর্তে আমার মনের ভাবটা ঠিক কিরকম হয়েছিল তা বর্ণনা করার আমার সাধ্য নেই কিন্তু কোভিড-১৯ আমাদের যেতে দিলো না। খুব ইচ্ছে করেছিল মেক্সিকোতে তার নীল বাড়ীটা দেখে ফ্রিদাকে নিয়ে লিখবো, যেখানে তার জন্ম এবং মৃত্যু। কবে কখন মনে করতে পারিনা এক আর্ট ম্যাগাজিনে ‘The Wounded Deer’ চিত্রকর্মটি দেখেছিলাম। জোড়া ভ্রু’র একটি তরুণী হরিণ তার শরীরে নয়টি তীরে ক্ষত বিক্ষত হয়ে বিধ্বস্ত অবস্থা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারপাশে লালাভ রঙের মাটিতে ঝড়া পাতার মৃত গাছের সারি এবং অদূরে আশাজাগানিয়া নীল আকাশ। তার সম্পর্কে আগ্রহ তখন বেড়ে যায় শতগুণ। সালমা হায়েক অভিনীত অসাধারণ চলচ্চিত্র ‘ফ্রিদা’ দেখে যার পর নাই মুগ্ধ হয়েছি। এক শিল্পী যেন আর এক শিল্পীর সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তিনিও একজন মেক্সিকান বলে হয়তো! ভাবতে সত্যিই অবাক লাগে কেন সালমা হায়েক একাডেমী এওয়ার্ড পেলেন না!

‘Nothing is absolute. Everything changes, everything revolves, everything flies and goes away’

আমার ছেলে শাফিন আর তার স্ত্রী নাতাশা, তাদের বিয়ের পরের বছর মেক্সিকো গিয়েছিল সেই নীল বাড়ীটা দেখবে বলে। লম্বা কিউতে শিল্প-রসিকদের সঙ্গে তারা অধীর আগ্রহের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর তারপর ঢুকতে পেরেছিল, ফ্রিদার নিজের জন্ম শৈশব ও মৃত্যুর স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি ‘লা কাসা আজুল’ বা নীল বাড়ীতে। বাড়ীটার বিভিন্ন কক্ষের মধ্য দিয়ে ফ্রিদার অতীতে হেটে গেছে দুজনা। ফিরে এসে যখন গল্প বলছিল মুগ্ধভাবে শুনছিলাম, আর তখন আমার মনের আকাশটা সমস্ত নীল রঙ নিয়ে ছড়িয়ে গেল। আমি এখানে, অথচ এখানে নেই। আর আমি আমাকে দেখতে পাচ্ছিলাম ফ্রিদা কাহলোর সঙ্গে ফ্রিদার নীল বাড়িতে। মুহূর্তে সে এক অদ্ভুত অনুভূতি!

‘The most important part of the body is the brain. Of my face, I like the eyebrows and eyes’

ফ্রিদা কাহলোর শিল্পকর্ম অর্থই তার প্রতিকৃতি যা জগত বিখ্যাত। যিনি শৈল্পিকরূপে তাকে এবং তার জীবনকে নানাভাবে ক্যানভাসে উপস্থাপন করেছেন। যেখানে ঠাই পেয়েছে মেক্সিকান শিল্প, স্বামী দিয়েগো রিভেরা’র সংগে সম্পর্কের টানাপোড়ন, প্রেম, রঙিন গাউন, ফুল পাতা, সর্বোপরি সন্তান ধারণে অক্ষমতার হতাশা। তিন এঁকেছেন স্নেহময়ী নার্সের কোলে দুধ পানরত ছোট্ট ফ্রিদা। আবার তুলির অনবদ্য আঁচড়ে ফ্রিদা নিজেকে এঁকেছেন ফুলের পোশাক সজ্জিত, কালো চুল, জোড়া ভ্রু আর পুরুষালি গোঁফ যা তাকে ঘিরে একধরনের রহস্যময়তা তৈরি করেছে।

‘I paint flowers so they will not die’

১৯০৭ সালের ৬ জুলাই মেক্সিকান বিপ্লবের শুরুতে, শহরের অদূরে কয়োয়াকান নামে এক ছোট্ট শহরে ফ্রিদার জন্ম। তার পারিবারিক নাম মাগদালেনা কারমেন ফ্রিদা কাহলো ই কালদেরন। আর যে বাড়ীতে ফ্রিদার জন্ম তা নীল বাড়ী (Casa Azul) নামে খ্যাত আর তার শেষ যাত্রাও হয়েছিল এখান থেকেই।

‘I was born a bitch. I was born a painter’

ছয় বছর বয়সে ফ্রিদা পোলিওতে আক্রান্ত হন যার ফলে ডান পা, বাঁ পা থেকে সরু আর খাটো হয়ে যায়। আর তা ঢেকে রাখতে তিনি সবসময় কালারফুল লম্বা স্কার্ট পরতেন। ১৯২৫ সালে একটি দুর্ভাগ্যজনক বাস দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন ফ্রিদা এবং অলৌকিক ভাবে বেঁচে যান। এবং যা তার জীবনের আলো কেড়ে নেয় আর জীবদ্দশায় তাকে মোট ত্রিশবার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল। এই সময় ফটোগ্রাফার বাবা ফ্রিদার হাতে রঙ তুলি তুলে দেন। মা তাকে বানিয়ে দেন বিশেষ ধরনের ইজেল যেন তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছবি আঁকতে পারেন। যদিও কোন লক্ষ্য ছাড়াই তিনি রঙ তুলি হাতে তুলে নিয়েছিলেন, ১৯২৬ সালে তার আঁকা প্রথম চিত্রকর্মটি ক্যানভাসে বন্দী হয়। চিত্রটির শিরোনাম Self Portrait in Velvet dress। দৃঢ় মনের অধিকারী ফ্রিদা কাহলো মৃত্যু অবধারিত জেনেও লড়তে থাকেন আজীবন সংশপ্তকের মতো।

‘Feet, what do I need you for when I have wings to fly?’

ফিদ্রা কাহলো সারাজীবন ১৪৩টি ছবি এঁকেছেন। এই ছবিগুলোর মধ্যে ৫৫টি ছবি তিনি এঁকেছেন নিজেকে নিয়ে। আর একারণেই তাকে বলা হয় আত্মজৈবনিক শিল্পী। তিনি নিজের জীবনকে করেছেন শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু। প্রতিধ্বনি যেভাবে ধ্বনিকে খোঁজে সেভাবেই ফ্রিদা খুঁজেছিলেন শরীরকে। তিনিই প্রথম মেক্সিকান যার ছবি প্যারিসের লুভ মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। ফ্রিদা কাহলো’র সৃষ্টি তাকে শিল্পের রাজদরবারে অমর করে রেখেছে,

‘I paint self-portraits because I am so often alone, because I am the person I know best’

তিনি নিজেই বলেছেন পেইন্টিং এর অনুপ্রেরণার মূলে রয়েছে যাতনা। মন ভাঙ্গার যাতনা, অসুস্থতার যাতনা, বিশ্বাসঘাতকতার যাতনা ব্যক্তিজীবনের তীব্র দহন, ভাঙ্গন, অসুস্থতা ফ্রিদার দেহ থেকে তা ক্যানভাস পর্যন্ত সঞ্চারিত হয়েছিল। ফ্রিদা মনে করেন যদিও তার ছবিগুলো বেদনার প্রকাশ-বাহক তবু চিত্রকলাই তার জীবনকে পূর্ণতা দিয়েছে।

‘I never paint dreams or nightmares. I paint my own reality’

ফ্রিদা যখন কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন, চেষ্টা করেন স্বাভাবিক জীবন যাপনের। পড়াশোনার পাশাপাশি মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯২৭ সালে বিখ্যাত মেক্সিকান পেইন্টার কমিউনিজমে বিশ্বাসী দিয়েগো রিভেরা’র সংগে পরিচয় হয়। ফ্রিদার পেইন্টিং তাকে মুগ্ধ করে। ফ্রিদা তার অনুপ্রেরণায় প্রচুর ছবি আঁকেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে মুগ্ধ ফ্রিদা এবং দিয়েগোর ভেতরে একটা গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়।

‘I love you more than my own skin’

১৯২৯ সালে মায়ের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুজনের মিলিত জীবনের শুরুতে বেশীর ভাগ সময়েই দিয়েগোর সাথী হিসাবে বিভিন্ন জায়গায় ছুটতে হয়েছে ফ্রিদাকে। তাদের এই মিলিত জীবন সুখকর হয়নি কোনদিন। বহুবার তারা বিচ্ছেদে গেছেন আবার মিলিত হয়েছেন। ১৯৩৯ সালে তারা বিবাহ বিচ্ছেদে গেলেও ১৯৪০ সালে তারা আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দিয়েগোর সাথে তার জীবনকে এঁকেছেন এভাবে - যেন সে দীর্ঘ রঙিন গাউন-পরা এক কংকাল।

‘There have been two great accident in my life, one was the trolley and the other was Diago. Diago was by far the worst’

সম্পর্কের ঝঞ্ঝা তাদের দু’জনকেই করেছে বিক্ষুব্ধ। যন্ত্রণার আবর্তে ছিটকে পড়েছেন বারবার। যদিও তাদের রাজনৈতিক আদর্শের মিল ছিল। তারা তাদের বিয়ের একবছরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ হন রাশান কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও রেড আর্মির প্রতিষ্ঠাতা লিও ট্রটস্কির সাথে। জোসেফ স্টালিনের মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ট্রটস্কি সোভিয়েত রাশিয়া থেকে পালিয়ে মেক্সিকোতে এসেছিলেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য। যে ট্রটস্কি সারা সোভিয়েত রাশিয়াকে নাড়া দিয়েছিলেন, ফ্রিদা কাহলো সেই ট্রটস্কির হৃদয় দোলা দিয়েছিলেন। ট্রটস্কির কাছেও ফ্রিদা এক মুগ্ধ বিস্ময়ের নাম।

‘I am that clumsy human, always loving, loving. And loving And never leaving’

১৯৩৯ ফ্রিদা কিছুদিন বাস করেন প্যারিসে এবং ছবি প্রদর্শনী করেন। এ সময় তিনি পরিচিত হন পাবলো পিকাসোর সংগে, সেই সময় তিনি আঁকেন তার ডাবল সেলফ পোট্রেটটি। যেখানে সম্পূর্ণ হার্টসহ কালারফুল গাউনে ঢাকা ফ্রিদা আর অন্যটিতে সাদা কাপড়ে ঢাকা ভাঙ্গা হার্ট নিয়ে রক্তাক্ত ফ্রিদা।

১৯৫০ সালে ফ্রিদার গ্যাংরিন হয়ে ডান পা একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়। এক বছর পড়ে থাকেন হাসপাতালে। চলতে থাকে অপারেশনের পর অপারেশন। কিন্তু কিছুই থামিয়ে রাখতে পারেনি তার পেইন্টিং থেকে। এবং একসময় ডান পা টিকে কেটে ফেলতে হয়।

‘I am not sick, I am broken, but I am happy as long as I can paint’

১৯৫৩ তার প্রথম এক একজিবিশন হয় মেক্সিকোতে এবং ফ্রিদা হাসপাতাল থেকে এম্বুলেন্স করে স্পেশাল বেডে শুয়ে আসেন তার ছবির প্রদর্শনীতে। ১৯৫৪ তে আবার হাসপাতালে আসেন, বলা হয়ে থাকে এই সময় তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। দু’মাস পরে আবারো আসেন ব্রংকিয়াল নিউমোনিয়া নিয়ে। মৃত্যুর আগে ২ জুলাই তিনি এসে দাঁড়ান রাজপথে মানুষের অধিকারের পক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ৪৭তম জন্মদিনের মাত্র ৭ দিন পরে ১৩ জুলাই তার অতি প্রিয় নীল বাড়ীতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ফ্রিদা কাহলো। মৃত্যুর কারণ বলা হয় Pulmonary Embolism। কিন্তু অনেকে বলেও থাকেন ফ্রিদা কাহলো আত্মহত্যা করেছেন। সারাজীবন যাকে নানা অঘটন আর আকস্মিকতায় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার বেদনায় নীল হয়ে কাটাতে হয়েছিল। নীল বাড়ীর নীল রঙটাও যেন তার সেই শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বেদনার সঙ্গে মিলে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

‘I hope the end is joyful and i hope never to return’

নিজের আত্মজীবনীতে দিয়েগো রিভেরা লিখেছিলেন, যেদিন ফ্রিদা মারা গিয়েছিলেন, সেই দিনটি তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক দিন ছিল। তিনি আরও বলেছিলেন যে, খুব দেরি হয়ে গেছে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তার জীবনের সুন্দরতম অংশ ছিল তার জন্য ফ্রিদার ভালবাসা।

মেক্সিকোর কয়োআকান শহরে সেই নীল বাড়ী ফিদ্রার স্মৃতিময় মিউজিয়াম হিসেবে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পী, শিল্প-রসিকের স্বপ্ন সেই বাড়ীতে যাওয়া - যে বাড়ীতে ফ্রিদা এই পৃথিবীকে প্রথম দেখেছিলেন।

‘I leave my portrait so that you will have my presence all the days and nights that I am away from you’

ফ্রিদা ডানা মেলে উড়ে বেড়িয়েছেন তার স্বপ্নের আকাশে। কখনো উড়েছেন আবার কখনো পড়ে গেছেন। তার এই ডানা ঝাপটানো জীবনের বর্ণাঢ্য রঙ এর বিন্যাস তার চিত্রকলায়।

তিনি বলেছেন আমি ফুল আঁকি যেন ফুল মরে না যায়। ফ্রিদা কাহলো নিজেকে ফুল দিয়ে সাজাতে ভালোবাসতেন। আর তা হতো সবার থেকে ভিন্ন। চোখে ভেসে উঠে মাথায় লাগানো থোকা থোকা ফুল শোভিত ফ্রিদা, আর সেই ফুলের সৌরভ চারিদিকে ছড়িয়ে অকালে হারিয়ে গেছেন তিনি। মিশে আছেন নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায়।

‘হে বন্ধু তোমাকে ফিরতে হবে
আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকবো - কেইসড্রাট গাছের নিচে
জলপোতের অধিপতির কাছে আমি এই গোপন কথা বলেছি
অনেক প্রতিশ্রুতি নিয়ে তুমি ফিরে আসবে। সূর্য ডুবে গেলে
ম্লান রাত্রি যখন ভর করে বাড়ির ছাদে
সেই কি তোমার ফিরে আসার চিহ্ন?’



ফওজিয়া সুলতানা নাজলী, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া



Share on Facebook               Home Page             Published on: 9-Oct-2020


Coming Events: