bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia












আমার প্রিয় সাইদুর রহমান ভাই আর নেই!
ড. মুনির আহমেদ খান



মরহুম ড. সাইদুর রহমান
গত ২৯ অক্টোবর ২০২২ সাইদুর রহমান ভাই না ফেরার দেশে চলে গেলেন! আগের দিন বাসায় তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। কথা বলতে পারেন না তখন। ভাবীর নিষেধ ছিল কোন ভিজিটর না যাওয়ার। তবুও গিয়েছিলাম। অন্তত নাসেরা ভাবীর সঙ্গে একবার দেখা করে আসতে। সাইদুর রহমান ভাই আমার একজন শ্রদ্ধেয় বড়ভাই ও ভালো বন্ধু ছিলেন। তাঁকে আমি সব সময় বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করতাম, ভালবাসতাম। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা হতো। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি দেশে ছিলেন না। তাই সেসময়ের কথা এবং পরবর্তীতে ঘটনা প্রবাহ এবং অনেক সমসাময়িক বিষয় নিয়ে মতামত, আলোচনা শুনতে চাইতেন আমার কাছ থেকে। তিনি খুবই ভালো, ভদ্র, বিনয়ী এবং একজন ভালো মানুষ ছিলেন। অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। ধর্ম, কর্ম এবং নামাজ নিয়মিত পড়তেন। তবে তিনি ধর্মান্ধ বা রক্ষণশীল ছিলেন না। তিনি নারী-পুরুষ ছোট-বড় সবার সঙ্গে উদার মন নিয়ে সকলের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রেখে গল্প, সমসাময়িক বিষয়, খেলাধুলা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করতেন। কারো সঙ্গে কখনো উচ্চ কণ্ঠে বা রাগ হয়ে কথা বলতে দেখিনি। কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কখনো উত্তেজিত হতে দেখিনি। সাইদুর রহমান ভাই অনেক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে তাঁর আন্তরিকতা এবং স্নেহ মমতা দিয়ে অনেককেই আপ্যায়ন করেছেন এবং আনন্দ দিয়েছেন। উনি খুব শান্তিপ্রিয় এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন পছন্দ করতেন এবং নিজের ও পারিবারিক জীবনে তা অক্ষরে অক্ষরে মেনেও চলতেন।

যে মানুষটাকে গত শুক্রবার ২৮ অক্টোবর বাসায় শায়িত অবস্থায় দেখে আসলাম, ৩০ অক্টোবর প্রেস্টন মসজিদে রোববার দুপুর ১ টায় তাঁর নামাজে জানাজায় শরিক হতে হলো। ভাবা যায়! তাঁর নামাজে জানাজায় আরো অনেকের সঙ্গে বাংলাদেশী কমিউনিটির বিপুল সংখ্যক লোকের সমাগম তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ বলেই আমি মনে করি। তাঁর জন্য আল্লাহ পাকের কাছে সব সময় দোয়া করি তিনি যেন তাঁকে পরকালে শান্তিতে রাখুন, জান্নাতুল ফেরদৌস এ জায়গা করে নেন এবং তাঁর পরিবারের সবাইকে হেফাজত করুন। না ফেরার দেশে যাওয়ার আগে তিনি তাঁর স্ত্রী, তিন ছেলে, ছেলের বউ এবং ৫ জন আদুরে নাতি রেখে গিয়েছেন।

সাইদুর রহমান ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ১৯৯০ শতকের প্রথম দিকে সাউদ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী এডিলেইড এ। আমি তখন ইমিগ্রেশন নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় আসি এবং এডিলেইডে বসবাস করছিলাম। ভাই তখন সাউদ অস্ট্রেলিয়ার মিনিপা (Minnipa) নামে একটি ছোট্ট শহরে চাকরি করতেন। মেলবোর্ন যাওয়ার পথে এডিলেইড শহরে একটি হোটেলে ওঠেন। আমি আমার কয়েকজন কৃষিবিদ বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাই। প্রথম দেখাতেই ওনার সুন্দর কথাবার্তা, ভদ্রতা, আচার ব্যবহার এবং অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হই। পরবর্তীতে আমি পরিবারসহ মেলবোর্নে আসার পর তাঁর সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগ এবং বড়ভাই হিসাবে বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠ হয়। কথাবার্তায় জানতে পারি উনি বাংলাদেশের রাজশাহীর চাঁপাই নবাবগঞ্জের মানুষ।

সাইদুর রহমান ভাই আমাকে খুবই খুবই পছন্দ করতেন। ছোট ভাই হিসাবে আমাকে খুবই আদর ও স্নেহ করতেন। আমি আপত্তি করা সত্ত্বেও সব সময় আমাকে তিনি মুনির সাহেব বলে ডাকতেন। তার একটা প্রধান কারণ ছিল আমি যে স্কুলে পড়াশোনা করেছি ১৯৫৮ সালে সেই স্কুল থেকে সাইদুর রহমান ভাইয়ের ব্যাচমেট সুচি দুলাল ধর নামে একজন তৎকালীন সারা পর্ব পাকিস্তানে মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। আমার স্কুলের নাম রাম কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুক্তাগাছা শহরে বাংলা ১৩০০ সালে। বর্তমানে শ্রী সূচী দুলাল ধর আমেরিকায় রয়েছেন বলে তাঁর কাছ থেকে শুনেছি। তিনি একজন সফল বৈজ্ঞানিক। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনে বেশ কয়েক বছর সাফল্যের সঙ্গে চাকরি করেছেন। সাইদুর রহমান ভাইও একই প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর চাকরি করেছেন। এসব কথা সাইদুর রহমান ভাইয়ের কাছ থেকেই শোনা।

ধর্ম কর্ম করলেও সাইদুর রহমান ভাই ছিলেন একজন সংস্কৃতি-মনা মানুষ। তিনি ছিলেন উন্মুক্ত মনের মানুষ ও সুন্দরের পূজারী। নাটক, সিনেমা, অভিনয়, গান, সবই পছন্দ করতেন। যা কিছু সুন্দর তাই তিনি উপভোগ করতেন। সুন্দর নাটক বা সিনেমার কলাকৌশল, অভিনয়, চমৎকার ও সুন্দর অভিনেতা, অভিনেত্রী বা শিল্পী ছিল তাঁর খুবই পছন্দের। তিনি রবীন্দ্র সংগীত এবং পুরানো দিনের আধুনিক গান খুব পছন্দ করতেন এবং নিয়মিত শুনতেন। তাছাড়া উত্তম - সুচিত্রা সেন অভিনীত বাংলা সিনেমা তাঁর ছিল খুবই প্রিয়। এসব এবং ঐ সময়কার আরও অনেক ভালো ভালো জনপ্রিয় ছায়াছবি দেখতে তিনি খুব পছন্দ করতেন। কোন সিনেমা বা গান তাঁর ভালো লাগলেই আমার সঙ্গে শেয়ার করতেন। বেশ অনেকবার তাঁর কাছ থেকে পুরানো দিনের সিনেমা ও গানের ভিডিও ক্যাসেট এনে শুনেছি এবং দেখেছি। খেলাধুলা বিশেষ করে ক্রিকেট, টেনিস, ফুটবল, তাস ইত্যাদি তিনি খুব পছন্দ করতেন। মেলবোর্নে বর্তমান মার্বেল গ্রাউন্ডে তাঁকে নিয়ে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দেখেছি এবং দারুণ উপভোগ করেছি। তিনি একজন সফল কৃষি বৈজ্ঞানিক ছিলেন। অনেক দেশে অনেক বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি করেছেন। শেষ জীবনে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থায় কনসালট্যান্ট হিসেবে অনেক দেশে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করেছেন। উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ফিলিপিন, বাংলা দেশ অন্যতম। তিনি ছিলেন খুবই শান্তিপ্রিয়। সময়নিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই সচেতন। সামাজিক আচার যেমন দাওয়াত, বিয়ে-শাদী, জন্মদিন ইত্যাদি অনুষ্ঠানে তাকে নিমন্ত্রণ করলে ঠিক সময়ে তিনি পৌঁছাতেন। এর কোন ব্যতিক্রম দেখিনি। কেউ বিলম্ব করলে তা তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁকে কোন অনুষ্ঠানে দাওয়াত করলে আমাদের সবাইকে খুবই সতর্ক থাকতে হতো বিশেষ করে সময়ের ব্যাপারে!

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন আকর্ষণীয় জায়গায় বেড়াতে এবং মাছ ধরতে যাওয়া সাইদুর রহমান ভাই খুবই পছন্দ করতেন। ভাই এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে বেশ কয়েকটি জায়গায় আমরা একত্রে গিয়েছিলাম। তার মধ্যে ইচুকায় মারী নদীতে মাছ ধরা এবং সারাদিনের জন্য উইলসন প্রমেন্টারিতে ঘুরতে যাওয়া উল্লেখযোগ্য। সেই সময়টা আমরা খুবই উপভোগ করেছি সাইদুর রহমান ভাই এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে।

সাইদুর রহমান ভাইকে কখনো অসুস্থ হতে দেখিনি। তিনি কিছু কিছু রোগ এবং তার নাম কখনো মুখে আনতে চাইতেন না। ধূমকেতুর মত সেরকমই একটা মরণ ব্যাধি হঠাৎ করেই তাঁকে আক্রমণ করলো গত বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে। যথাযথ চিকিৎসার পরে ভালো হয়ে গেলেন। তিনি এবং আমরা সবাই খুশি হলাম। হাসপাতালে থাকাকালীনই তার একটি বিশেষ জন্মদিন ছিল। হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ফুল দিয়ে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। তিনি তাদের কাছ থেকে শুভেচ্ছা পেয়ে খুব খুশি হয়েছেন সেদিন।

সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে তিনি খুবই খুশি। বাসায় এবং বাগানে দৈনন্দিন কিছু কাজকর্ম করতে শুরু করলেন। নিজেকে দিন দিন ভালো হয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করলেন। আমরাও বেশ কয়েকদিন তাঁর সঙ্গে সময় কাটাতে বাসায় গিয়েছি। কিন্তু ৭/৮ মাস না যেতেই আবার সেই রোগটা ফিরে এলো। আর সেই মরণ ব্যাধিই তাঁকে না ফেরার দেশে নিয়ে গেল। আমাদের সবাইকে একদিন এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে এই চিরন্তন সত্যি কথাটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু সাইদুর রহমান ভাই এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন এটা কখনো ভাবি নি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর কাছে তাঁর আত্মার মাগফেরাত এবং জান্নাত কামনা করছি। সাইদুর রহমান ভাইয়ের প্রয়াণে আমি একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ, বড় ভাই এবং একজন মুরুব্বী কে হারালাম। খুব তাড়াতাড়িই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। এই হারানোর ব্যথা সইতে হবে অনেকদিন। পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মে হয়তো সবাই নিজ নিজ কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক গতিতে চালিয়ে যাবেন। কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে আমার কাটানো চমৎকার ভালোলাগার স্মৃতি সারাজীবন মনে থাকবে।

আজ সোমবার ৩১ শে অক্টোবর বাদ জোহর ২.৩০ টার দিকে ফোকনার গোরস্থানে দাফন করে বাসায় আসি। একটা ভালো মানুষের জীবনের ইতি ঘটলো, চলে গেলেন মাটির নিচে, আমাদের অন্তিম গন্তব্যে! তিনি যেখানেই থাকুন শান্তিতে থাকুন এটাই আমার প্রার্থনা। মেলবোর্নে বাংলাদেশী কমিউনিটিও মনে রাখবে একজন হাসি-খুশি, শান্ত, নম্র, ভদ্র, সজ্জন ব্যক্তি ও ভালো মানুষ হারানোর কথা ও প্রাণের গভীরের ব্যথা। সাইদুর রহমান ভাইয়ের প্রয়াণে তাঁর পরিবার হারালো তাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় যত্নশীল ও দায়িত্বশীল পরিবার প্রধান, মেলবোর্ন বাসী হারালো একজন সত্যিকারের অভিভাবক ও মুরুব্বী আর আমি হারালাম আমার শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার প্রিয় বড় ভাইকে।


৩১ অক্টোবর ২০২২



ড. মুনির আহমেদ খান, মেলবোর্ন



Click for details



Share on Facebook               Home Page             Published on: 9-Nov-2022

Coming Events: