bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney













জীবন এর হিসাব নিকেশ
মোস্তফা আব্দুল্লাহ



দিন দিন করে অনেক জল গড়িয়ে গেল। ১৯৮০ সনে সিডনি থেকে ফিরে গিয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রে (আই সি ডি ডি আরবি) ১২ বৎসর কাজ করার পর ২ বৎসরের জন্য ইউ এন ডি পির কনসালটেন্ট হিসাবে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে, পরের পাঁচ বছর এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এর কনসালটেন্ট হয়ে পি ডি বি ও ডেস্কোতে ও সর্ব শেষে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ইউ এস এইডর হয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতিষ্ঠা করনের প্রোজেক্টের দল নেতা (চীফ অব পার্টি) হিসাবে বাংলাদেশে আমার কার্যকালের পরিসমাপ্তি ঘটাই।

ইতিমধ্যে নিজেদের মন মত, সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ঢাকায় আমাদের জন্য একটি বাসস্থান বানাই। দুই মেয়ে আর আম্মাকে নিয়ে আমার স্ত্রী তার তিন কন্যার দেখভাল আর ঘরকন্নার কাজ নিয়ে দিনাতিপাত করে। ইতিমধ্যে দুই মেয়েই এক এক করে বাংলাদেশে স্কুল শেষ করে অস্ট্রেলিয়াতে এসে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে আবার শেষ করে বেরিয়েও গেছে। বড় কন্যার বিয়ে হোল ২০০৪ সালে। ২০০৫ সালে আমাদের মা আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলেন। নিজেদের কাছে আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিল যে মাকে ছেড়ে আমরা কোথাও যাব না। সে সময় আমরা প্রায়ই বিদেশে যেতাম কাজকর্মে ও ভ্রমণের উদ্দেশে। আমাদের সব সময়ই প্রার্থনা ছিল যে আমাদের আগে যদি মার চলে যাবার সময় আসে, আল্লাহ্‌ তালা যেন আমাদেরকে সে সময় তার পাশে থাকবার সুযোগ দেন। আল্লাহ্‌ তালা আমাদের সে সুযোগ দিয়েছিলেন। আমার ও আমার স্ত্রীর কোলে মাথা রেখেই তিনি চিরদিনের জন্য আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।

মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। ১৯৮০ সনে যখন অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে ফিরে যাই তখন কখনো মনে করি নাই যে আবার ফিরে এসে এখানেই বস বাস শুরু করব। এমনি করেই চরাই উৎরাই এর চলতে থাকার শুরু সম্ভবত বিগত শতাব্দীর শুরু থেকেই যখন আমার বাবা, ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ এর বাজিতপুরের মোহাম্মদ ইয়াসিন ওরফে তারু মিয়ার আট সন্তানের সর্ব জ্যেষ্ঠ, মোহাম্মাদ ইসমাইল, তাদের পরিবারে প্রথম মেট্রিক পাস দিয়ে জীবিকার প্রয়োজনে বেরিয়ে পরেন। আমার স্কুল জীবনের শুরু ঢাকার তেজগাঁয়ে, পলিটেকনিক হাই স্কুলে। ক্লাস সিক্স থেকে টেকনিক্যাল হাই স্কুলে, তার পর ঢাকা কলেজ, সর্ব শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে বছর কয়েকের জন্য বিদেশে। মনে পড়ে তেজগাঁয়ের প্রথম বাসস্থানটির কথা, শুধু মাত্র একটি শোবার ঘড় ও লাগোয়া রান্নাঘর এবং অন্যদের সাথে মিলে ব্যাবহার করার গোসল খানা ও টয়লেট। সেখান থেকে স্বয়ং সম্পূর্ণ দুই রুমের বাড়ীতে উঠে আসা। কিছু দিনের জন্য ঢাকতে বাবার নির্মিত নিজেদের বাড়ীতে, আবারো ঢাকতেই আরও কিছু জায়গায় ভারা বাড়ীতে থেকে অবশেষে নিজে দাড়িয়ে থেকে তৈয়ার করা নিজস্ব বাড়ীতে উঠে আসা। এই যাত্রায় আমরা কজনা, জীবন যখন যেখানে যেমন, তেমনি করেই মানিয়ে নিয়েছি। এর কোন টাকেই, একটা থেকে আরেকটাকে ছোট বা বড় বলে মনে হয় নাই।

অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে যাবার ২৮ বছর পর ২০০৮ সনে আবার ফিরে আসি এই সিডনীতে। আবাস গড়ি সিডনীর উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে। এর মাঝে অবশ্য অনেকবারই সপরিবারে সিডনী আসা যাওয়া হয়েছে। এখানে ফিরে আসার পর মাঝে মধ্যেই একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি; আপনি তো দুই জায়গায়ই থাকলেন, কোনটা ভাল মনে হয়? বড় শক্ত প্রশ্ন, উত্তর খোঁজা আরও কঠিন।

এখানে এসে ঢাকার উপচে পরা ফুটপাথ, যনজটে কানায় কানায় পূর্ণ রাস্তাঘাট, গা ভেজা ভ্যাঁপসা গরমের লোডশেডিং, ভেজালের জয়-জয়কার, বায়ুদূষণের প্রতিযোগিতা; এসবের সব কিছুই ভুলে গিয়ে, আপন জনের মুখের হাসির আশায় বার বার ফিরে যেতে চাই সাত পুরুষের ভিটায়। বছর না পেরুতেই দেশের পথে রওনা দেই। দেশে যাওয়ার মোজেজাটা একটু থিতু হয়ে আসলেই মনে পরে যায় সিডনীর শুন শান নীরবতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছিম ছাম ঘড় বাড়িগুলির কথা, ঝঞ্ঝাট বিহীন পথ ঘাট, বাগানের বেড়ে ওঠা বেয়ারা আগাছা গুলির কথা, অতি উৎসাহী সবুজ ঘাস গুলির কথাও, পাড়া-পড়শির সম্ভাষণ ও হাসিমুখ, সর্বোপরি অতি উদগ্রীব নাতিদের কাছে ফিরে যাওয়ার হাতছানি। ফিরে আসি সিডনীতে আবার। ফিরে আসার কদিন পর থেকেই দিন গোনা শুরু হয়, কবে যে বছরটা আবার শেষ হবে। সব কিছু যেন তাল গোল পাকিয়ে যায়। কোনটা নিজভূম আর কোনটাই বা পরভূম?

এখন থেকে ৪০ বছর আগে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা যেমন সঠিক ছিল, তেমনি ১২ বৎসর আগের ফিরে আসার সিদ্ধান্তটার মাঝেও কোন ভুল ছিল না। সন্তান ও নাতিদের সান্নিধ্যে থাকতে পেরে আমরা আনন্দিত। অন্যদিকে জীবনের প্রায় সবটুকু সময়ই যেখানে কাটিয়েছি - তার আকাশ, বাতাস, গন্ধকে বার বার করে মনে পড়ে। ঢাকার জীবন ছিল এক ছন্দের আর এখানকার জীবন আরেক ছন্দের। কোনটা থেকে কোনটা যে ভালো, তার পরিমাপ করা যে বড়ই কঠিন।

সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের গৃহাভ্যন্তরে যে সুযোগ সুবিধা ও আরাম আয়েশের যোগান দেয়া সম্ভব হয়েছে এখানে তা নাই। অন্যদিকে ঘড়ের বাইরে এই দেশে যে ধরনের নিরাপত্তা, বাক-স্বাধীনতা ও সুযোগ সুবিধার ভাগীদার হই তা তুলনাহীন। বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাঙ্গালী পুরুষদের সাধারণত দুই ধরনের সামাজিক জীবন থাকে একটি পারিবারিক, স্ত্রী সন্তান ও নিকট পরিবার পরিজন ঘিরে আর অন্যটি বাইরের বন্ধু বান্ধব ও সহকর্মীদের নিয়ে। এখানে, অন্তত আমার ক্ষেত্রে, একটাই সামাজিক জীবন পরিবার ও পরিচিত জন নিয়ে। বাইরের বন্ধু বান্ধব ও সহকর্মীদের নিয়ে ফেলে আসা সামাজিক জীবনটাকে বড় মনে পড়ে। এদিক থেকে মহিলারা সম্ভবত পুরুষদের থেকে ভাল আছেন। তারা অনেকক্ষণ ধরে একজনের সাথে আরেকজন টেলিফোনে কথা বলে কাটিয়ে দিতে পারেন। তাদের দেখলে মাঝে মাঝে হিংসা হয়। এটা করতে পারলে আমাদের অনেকেরই আরও বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেন্সিয়ার সম্ভাবনা কম থাকতো।

সর্বক্ষণ নদীর অন্য পাড়ে কত না সুখের কথা ভেবে দিনাতিপাত করতে করতে এপারে যে কি সুখ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে সে কথা বেমালুম ভুলে যাচ্ছি। দিন গেলে আর সেদিন যে ফিরবে নারে ভাই তাই জীবন যখন যেখানে যেমন, তা নিয়েই বাকি জীবনটা উপভোগ করিনা কেন।

গৌতম বুদ্ধ এর অমর বানীতে খুঁজে পাই এই অবিসংবাদিত সত্যটি: সুস্থ মন ও শরীরের মূলমন্ত্র হোল, পেছনে ফেলে আসা দিনগুলির জন্য হাহুতাস না করা, সামনের দিনগুলি নিয়ে শঙ্কিত না হওয়া, আর বর্তমানের সময়ের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা। সবাই ভালো থাকবেন।




মোস্তফা আব্দুল্লাহ, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া




Share on Facebook               Home Page             Published on: 4-Feb-2021

Coming Events: