bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ
মোস্তফা আব্দুল্লাহ



“The Divine Intervention” বা ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ শিরোনামে জীবন অভিজ্ঞতার আলোকে আমার একটা লেখা পড়ে এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু কৌতুক করে বলেছিলো যে – তোমার তো পোয়া বারো, কোন কিছু না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও কোন অসুবিধা নাই, যখনি প্রয়োজন পরবে – তখনি কোন ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপে তোমার কর্ম হাসিল! সেখানে লিখেছিলাম যে জীবনে যখনি কোন বাঁধার সম্মুখীন হয়েছি, তখনি আমার মনে হয়েছে যেন কোন এক ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের কারণে তা থেকে আমি উতরে যেতে পেরেছি।

বন্ধুর এই কৌতুকের জবাবে রসুলুল্লাহ (সা:) এর একটা হাদিস এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলি, যে কোন একজন নাকি উনাকে প্রশ্ন করেছিলেন; আমি কি আমার উঠটাকে আল্লাহর ওপর ভরসা করে ছেরে রাখব - না বেধে রাখব? রসুলুল্লাহ (সা:) জবাবে বলেছিলেন; আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেই উঠটাকে বেধে রাখ।

বন্ধুটি যথাসম্ভব কেবল মাত্র তর্কের খাতিরেই তর্কের জন্য প্রশ্ন রাখল “আমি যদি আমার নিজের সর্বোচ্চ যোগ্যতা ও চেষ্টা নিয়োগ করে কোন কর্তব সম্পাদনে ব্রতী হই – তাহলে কি সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা বা বিশ্বাস রাখাটা কি একেবারেই আবশ্যকীয়?” প্রথমেই সোজা সাপটা যে উত্তরটা মনে আসলো; হাঁ, যদি আল্লাহ্‌ তালা কে বিশ্বাস কর তবে নিশ্চয়ই আবশ্যকীয়, আর তা না হলে - যে যেটা মনে করবে সেটাই তার জন্য সঠিক। উত্তরটা খুব সোজা সাপটা হলেও তা খুব একটা জোরালো বা জুতসই হয়েছে বলে আমার মনে হয় নাই। তাই মনে মনে খুঁজতে থাকলাম দৈনন্দিন জীবন অভিজ্ঞতা থেকে কোন একটা উদাহরণ।

আপনারা সবাই নিশ্চয়ই খেয়াল করে থাকবেন ঢাকা শহরের রাস্তার জামে কিম্বা ট্রাফিক সিগনালে কোন গাড়ি দাঁড়ানো মাত্র এক পাল ভিখারি এসে হাত পাতে। প্রতিটা ভিখিরিই আপ্রাণ চেষ্টা আপনার মন গলাবার জন্য যাতে তারই প্রতি দয়া পরবশ হয়ে তাকেই দান করেন। আপনার পক্ষে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সবাইকে দেয়া সম্ভব হয় না – তাই আপনি যাকে সবার চেয়ে আপনার দান পাওয়ার উপযুক্ত বলে মনে করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। যারা হাত পাতছে, তারা কেওই নির্ধারণ করছে না যে কে পাবে – নির্ধারণ করছেন আপনি অর্থাৎ যিনি দেনেওয়ালা বা ওপরওয়ালা। জীবনের অন্য অন্য ক্ষেত্রেও কি এটা প্রযোজ্য নয়? চলুন আরও একটু বড় পরিসরে; অফিসে কে পদন্নোতি পাবে ঠিক করেন বড় কর্তা – তাকে ভাবতে হয় কাকে মনোনীত করলে সব দিক থেকে মঙ্গল। দেশ প্রধান ঠিক করেন কাকে নির্বাচন করলে দেশ বিদেশ ও দশের মঙ্গল। অর্থাৎ জীবনের সর্ব ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ণয়ের ভার আমার আপনার হাতে নয়। তবে তার মানে কি আমরা কোন কিছু অর্জনের চেষ্টা না করেই হাত গুটিয়ে বসে থাকব? ভেবে দেখুন ওই ভিখারি গুলি যদি তাই ভেবে হাত গুটিয়ে বাড়িতে বসে থাকে তা হলে তাদের কি উপায় হবে? আমাদের কাজ আমাদেরই করে যেতে হবে সর্বাত্মক প্রচেষ্টার সাথে - তবে বিশ্বাস রাখতে হবে যে এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যিনি ওপরওয়ালা তিনি সর্ব কাল, স্থান ও পাত্রের বিচারে যার জন্য যা সর্ব শ্রেষ্ঠ, সেটাই নির্দিষ্ট করেন তার জন্য। (দ্রষ্টব্য: পবিত্র কোরান শরিফের সুরা আল কাহফ এর ৬৫ থেকে ৮২ আয়াত) বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়েই যখন কথা হচ্ছে, চলুন না কথাটাকে নিয়ে আর একটু আলোচনা করা যাক। আমরা সিডনীতে ফিরে আসার পর যে পাড়াতে আস্তানা গেড়েছি তার আসে পাশে কোন সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে গেলে দেখা যায় যে আমিই মোটা মুটি অন্য সবার থেকে বয়সে জ্যেষ্ঠ আর সেই সুবাদে যদি কখনো কোন কিছুর কারণে কিম্বা কারোর জন্য দোয়া মোনাজাত করার প্রস্তাব আসে তাহলে সবাই আমার দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে। এতে আমি একটু বিব্রত বোধ করি। বিব্রত এই কারণে নয় যে দোয়া চাইতে আমার কোন আপত্তি বা অসুবিধা আছে – বস্তুত আমি মনে করি যে সবার জন্যই সর্বদাই আল্লাহ্‌ তালার করুণা কামনা করা কর্তব্য। আমার বিব্রত বোধ করার কারণ - দোয়া বা মোনাজাত পরিচালনার যে যোগ্যতার প্রয়োজন, তা আমার আছে কি নাই? এছাড়া মহান সৃষ্টি কর্তার কাছে হাত পাতা বা কোন কিছুর জন্য আবেদন করার পন্থা ও যোগ্যতা নিয়েও আমার নিজস্ব একটা দৃষ্টি ভঙ্গি রয়েছে।

আমরাতো সদা সর্বদাই কিছু না কিছু আকাঙ্ক্ষা করে যাচ্ছি, আর তা অর্জনের জন্য যত রকম প্রস্তুতি, মহরত, কোন কিছুরই কোন কমতি নাই; বিদ্যা বুদ্ধির উন্নয়নের জন্য অধ্যবসায়, আর্থিক উন্নয়নের জন্য মেধায় শান দেয়া, কর্ম ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য নিয়োগ কর্তার নজরে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করা – এ রকম আরও কত কি। তেমনি আল্লাহ্‌ তালার কাছে যখন কিছু চাইব বা দরখাস্ত করব তখন কি তেমনি কোন প্রস্তুতির প্রয়োজন নাই, নিজেকে আকর্ষণীয় ও যোগ্য করে তোলার? তার সম্মুখে দাঁড়ানোর বা হাত তোলার জন্য নূন্যতম যোগ্যতাটা কি আমার আছে? আমার বিশ্বাস, নিজেকে একজন বিশ্বাসী মুসলিম বলে গণ্য করাটা হবে কারো জন্য নূন্যতম যোগ্যতা – আল্লাহ্‌ তালার দরবারে হাত তুলে কোন কিছুর জন্য দরখাস্ত করার।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বিশ্বাসী মুসলমান এর সংজ্ঞাটা কি? এ ব্যাপারে আমার ধারনা ধর্মীয় মুরুব্বি বা আলেম উলেমাদের কাছে গিয়ে খুব একটা সুবিধা হবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওনাদের একজনের সংজ্ঞা আরেকজনের সংজ্ঞার সাথে সংঘাত-পূর্ণ হয়। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের লাহোর শহরে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী জাতীগত দাঙ্গা ঘটে। পাকিস্তানের মূল মুসলমান জনগোষ্ঠী আহমদিয়া সম্প্রদায়কে কখনোই মুসলমান বলে মনে করে নাই। দাঙ্গার কারণ অনুসন্ধানে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন পাকিস্তানের বিশিষ্ট উলেমাদের কাছে জানতে চান যে মুসলমান বলতে কি বুঝায় বা মুসলমানের সংজ্ঞা কি? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে উলেমাদের দেয়া সংজ্ঞাগুলি থেকে কোন একজনের সংজ্ঞা গ্রহণ করলে বাকি উলেমাদেরকে কাফের বলে ঘোষণা দিতে হয়! (সূত্র: “The Clash of Fundamentalism” by Tariq Ali)

এমতাবস্থায় আমি আবারো নিজের দৈনন্দিন জীবন অভিজ্ঞতা দিয়েই একজন বিশ্বাসী মুসলমান এর সংজ্ঞা খোজার চেষ্টা করি। আমরা আমাদের সামাজিক জীবনে বিভিন্ন সংগঠন সমিতি ক্লাব ইত্যাদির সদস্য হয়ে থাকি। যে কোন ধরনের সংগঠনের সদস্য হতে হলে সেই সংগঠনের নিয়ম কানুন সমূহ মেনে চলতে হবে এবং তবেই সেই সংঘটনের সদস্য বলে নিজেকে দাবি করা যাবে। ধরা যাক বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর কথা; এর সদস্যদের নূন্যতম যোগ্যতা সমূহের মধ্যে থাকতে হবে ; বাংলাদেশের নাগরিক, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা, বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য, সামরিক প্রশিক্ষণ, সামরিক পোশাক পরা, দেশের ডাকে যুদ্ধে যাওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের মুক্তি যুদ্ধের সময় অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধাই রণক্ষেত্রে প্রচণ্ড সাহসিকতা ও রণ কৌশলের মাধ্যমে শত্রুকে পরাজিত করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধিকার বলে এক একজন বড় মাপের যোদ্ধা। কিন্তু তার পরেও তারা কি কেও নিজেকে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর সদস্য বলে দাবি করে বা করতে পারেন? অর্থাৎ সব ধরেনের যোগ্যতা থাকার পরেও কেও কোন একটা সংঘটন বা দলের সদস্য বলে নিজেকে দাবি করতে পারে না – যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি উক্ত দলের নূন্যতম নিয়ম কানন গুলি পালন করবেন।

এই যুক্তিতেই আমার বিশ্বাস যে কাওকে মুসলমান হিসাবে আল্লাহতালার কাছে হাত তোলা বা দরখাস্ত করার জন্য মুসলিম উম্মাহর সদস্যভুক্ত হওয়া প্রয়োজন এবং তা হলেই আমাদের আবেদন/আরজ/আর্জি/দরখাস্ত যাই বলি না কেন, গ্রহণযোগ্যতার সম্ভাবনা পাবে। কাওকে এই মুসলিম উম্মাহর সদস্য হতে হলেও নিশ্চয়ই কিছু নূন্যতম নিয়ম কানুন পালন করতে হবে। আমার ধারনা কেও এ ব্যাপারে দ্বিমত করবেন না যে নিম্নক্ত নূন্যতম কার্য সমূহ সম্পাদনের মাধ্যমেই নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করা যেতে পারে:

- আল্লাহ্‌ ও রসুলের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য
- দিনে পাঁচ উয়াক্ত নামাজ আদায়
- রমজান মাসে রোজা রাখা
- নিয়ম মাফিক নিয়মিত যাকাত আদায় করা
- আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য সাপেক্ষে হজ আদায় করা

এই সমস্ত নূন্যতম যোগ্যতা অর্জনের পরও কেহ যদি আল্লাহতালার আরও অনুগ্রহ বা নিকটবর্তী হতে চায় তবে তার জন্য তো আরও জ্ঞান অর্জন ও অনুশীলনের মাধ্যমে তা অর্জনের পথতো খোলাই আছে। যে ভাবে একজন সৈনিক দিন দিন আরও প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন এর মাধ্যমে আরও চৌকস যোদ্ধা বা পেশাধারী হয়ে আরও উন্নতি করতে পারে।

একটা বিষয় স্পষ্ট করার প্রয়োজন যে সৃষ্টি কর্তার কাছে হাত পাতার অধিকার সবারই রয়েছে এবং যার যে বিশ্বাস তিনি তা তার মত করেই করবেন। তবে আমার ধারনা একজন মুসলমান হিসাবে আল্লাহ্‌ তালার কাছে হাত পাতার জন্য বিশ্বাসী মুসলমান হওয়াটাই কাম্য। আমার এরকম মনে হওয়াটা সঠিক নাও হতে পারে, তাই কোন ভুল ভ্রান্তির জন্য আল্লাহ্‌ তালার কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থী। আর এই সাথে সমগ্র মুসলিম জাহানের মুসলমানদের মোবারকবাদ জানাই রোজার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে রমজান মাসটিকে উদযাপন করার জন্য।



মোস্তফা আব্দুল্লাহ, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 3-Jun-2018