bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney













একেবারেই ছোট একটা গল্প
মোস্তফা আব্দুল্লাহ




যদিও শিরনামটা “ছোট গল্প” তবে এটাকে একেবারেই একটা গল্প মাত্র বলা যায় না। গল্প নয় এই জন্য বলছি যে, ঘটনটা সত্য – আমার মেয়ের কাছে শোনা। ওরা কিছু দিন আগে নিজেদের নূতন বাসায় উঠেছে। পাশের বাড়িটাও নূতন, ওই বাড়ির বাসিন্দারাও উঠে এসেছে কদিন আগে। নিখাদ ভদ্র ও সদালাপী স্বামী স্ত্রী ও সন্তানাদি। পরিচিত হতে গিয়ে ওদের মুখ থেকেই শোনা ঘটনাটি। আমার মেয়ের দুটি ছেলে সন্তান শুনে ভদ্রলোক গল্প-ছলে বললেনঃ

আমরাও তোমাদের দুই ছেলের ন্যায় দুই ভাই ছিলাম। বয়সটা ছিল পিঠা পিঠি, এক বৎসরের ছোট বড়। সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মত – লেখা পড়ার চেয়ে নানা রকম দুষ্টামি আর মেয়ে বন্ধুদের সাহচর্যের দিকে মন পড়ে থাকতো। বলা বাহুল্য বাবা মা অনেক বুঝিয়েছেন কিন্তু খুব একটা কাজ হয়নি। এমনি সময়ে নূতন বৎসরের আগমন উৎযাপনের উপলক্ষে আমাদের পাড়ায় এক সাজ সাজ রব চলছিল – আনন্দ মিছিল, বাদ্য বাজনা, নাচ গান, ব্যান্ড এসবের প্রস্তুতি। মেয়েরা কে কি পরবে, কিভাবে সাজবে, কে কার সাথে নাচবে এ নিয়ে গুঞ্জন। আর ছেলেরা ভাবছে কে কি করে মেয়েদের কাছ থেকে কতটা বাহবা নিতে পারে।

আমরা দুই ভাই মিলে মনস্থির করলাম যে এমন কিছু একটা করতে হবে যে মেয়েবন্ধুরা যেন তাক লেগে যায়। একটি লিমোজিন ভাড়া করলে কেমন হয়? লিমোজিন করে মেয়েবন্ধুদের উঠিয়ে নাচঘরে নিয়ে যেতে পারলে বাজি মাত – কারও সাধ্য হবে না আমদেরকে টেক্কা দেয়ার! আমাদের পরিকল্পনায় আমরা মহা খুশি, আমাদের এবার পায় কে?

এবার একটু হিসাব করতে বসলাম দুই ভাই মিলে। লিমোজিন ভাড়ার খরচ, এর ওপর রয়েছে আপ্যায়নের খরচাদি – হাজার হোক সঙ্গিনীদের তো আর তাদের নিজেদের পয়সা খরচ করতে দেয়া যাবে না – ইজ্জতের ব্যাপার বলে কথা। কিছুতেই হিসাব মিলছিল না – এতো অনেক টাকার মামলা। পকেট মানি হিসাবে যা পাই তাতো সাথে সাথেই কর্পূরের মত উবে যায়! এখন উপায়?

ঠিক করলাম দু ভাই মিলে কদিন কোন একটা কাজ করবো। বেরিয়ে গেলাম কাজের খোঁজে – কাছেই একটা ওয়ারহাউসে, মাল ওঠা-নামার কাজ। ফোরম্যান আমাদের দেখে জানালো – আমাদের দিয়ে ওটা হবে না, আরো শক্ত সামর্থ্য লোকের প্রয়োজন। মজুরিটা অপেক্ষাকৃত লোভনীয় এমন আরও কয়েকটি জায়গায় ধর্না দিলাম – একই সমস্যা, শক্ত সামর্থ্য লোকের প্রয়োজন। বাকি রইলো প্রতিবেশীদের বাগানের ঘাস কেটে দেয়ার কাজ কিম্বা গাড়ি ধোয়া বা কাগজ বিলি। কিন্তু ওতো অনেক দিন ধরে করতে হবে – তত দিনে নতুন বৎসর উঁকি দিয়ে আবার বাসিও হয়ে যাবে!

ধ্যাৎ – আমাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। মন মেজাজ খারাপ, খাওয়া দাওয়াতেও মন নাই। মার চোখে ঠিকই ধরা পড়ল আমাদের এই হঠাৎ করে অস্বাভাবিক আচরণ। খাবার টেবিলে বসে মা জানতে চাইলেন – কি ব্যাপার? কিছু একটা বলে তখন কার মতন বিষয় টাকে পাশ কাটিয়ে গেলাম। বাবা খাবার টেবিল থেকে উঠে যেতেই আমরা দুই ভাই মাকে পেয়ে বসলাম – মা, বাবাকে বলে আমাদের এই কটি টাকা জোগাড় করে দাও না। বাবাকে বল টাকাটা আমাদেরকে ধার হিসাবে দিতে, আমরা আস্তে আস্তে শোধ করে দিব নিশ্চয়ই। মা বললেনঃ

-আমি জানি না অতগুলি টাকা এই মুহূর্তে তোমাদের বাবার হাতে আছে কিনা – আর থাকলেও দিতে চাইবেন কিনা জানি না। তোমরা তো বাবার কোন কথাই শোন না, তোমাদের বাবা সুযোগের অভাবে নিজে খুব বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারেন নাই, তাই তার খুব বাসনা ছিল তোমাদের দিয়ে তা পূরণ হবে। তোমাদের তো সে দিকে তো কোন মনই নাই।

-আচ্ছা বাবা লেখা পড়া না শিখে কি খুব খারাপ আছেন? আমারা তো দিব্বি আছি – বাড়ি, গাড়ি, অন্নসংস্থান কোনটিরই তো আমাদের অভাব নাই – তাহলে কেন মিছেমিছি লেখাপড়া নিয়ে এত বাড়াবাড়ি? বাবা যদি লেখাপড়া ছাড়াই এমন বহাল তবিয়তে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারেন আমরা পারব না কেন? দাও না মা বাবকে বলে এই কটা টাকার বন্দোবস্ত করে। আপাতত ধার হিসাবেই দিতে বল, আমরা না হয় সময় মত পরিশোধ করে দিব।

বাবা আবার খাবার টেবিলে ফিরে আসলে মা যুৎ বুঝে আস্তে আস্তে কথাটা পাড়লেন। আমাদের দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা – বাবা কি বলেন। বাবা কিছুক্ষণ ভেবে আস্তে আস্তে বললেনঃ

-এই মুহূর্তে নগদ টাকা আমার হাতে খুব বেশি একটা নাই। কিছু টাকা আলাদা করে রেখেছিলাম বাড়ীর পেছনের জঙ্গলটা পরিষ্কার করে ওখানে কিছু মাটি ফেলার জন্য – ওখানকার মাটিটা আলগা হয়ে দিন দিন নিচের দিকে ঝরে যাচ্ছে।

বাবার কথাটা শোনা মাত্র আমাদের যেন দম ফিরে এলো – একই সাথে দুই ভাই সমস্বরে বলে উঠলামঃ
-আমারাই করে দিব, টকাটা আমাদেরকে দিয়ে দাও।
-ভেবে বল, কাজটা কিন্তু খুব একটা সহজ না, যথেষ্ট খাটুনীর, পারবে তো?

আমাদের দুই ভাই তখন মনের চোখে জ্বলজ্বলন্ত বো-টাই ও সুট পরিহিত ড্রাইভারকে দেখছি লিমোজিন এর দরজা খুলে দাড়িয়ে আছে আর আমরা আমাদের গার্ল ফ্রেন্ড দের হাত ধরে নেমে যেতে যেতে দুই পাশে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা গুণমুগ্ধ দের অভিবাদন গ্রহণ করতে করতে নাচঘরে ঢুকছি! সে যে কি অনুভূতি বলে শেষ করার নয়। বাবা যে এত সহজেই রাজি হয়ে যাবে তা আমরা ভাবতেও পারিনি আর ভাববার মতন তখন সময় নষ্ট করার সময় তখন আমাদের আছে নাকি? পারলে তখনি কাজে নেমে পরি।

-বাবা, আমরা কি আজকেই শুরু করে দিব?
-কাল খুব ভোর বেলা থেকেই শুরু করো, অনেকটা সময় লাগবে, আর রোদের তাপ বাড়ার যত আগে শুরু করতে পারবে ততটাই সুবিধা হবে তোমাদের।

রাতে কতটা যে ঘুমিয়ে ছিলাম মনে নাই – ভোর হওয়ার অনেক আগেই দুই ভাই প্রস্তুত। বাবা বুঝিয়ে দিলেন কাজটা – মহা উৎসাহে শুরু করলাম আমরা দুই ভাই মিলে। সকাল দশটা না বাজতেই মাঝ ডিসেম্বরের কাঠ ফাটা গনগনে রোদে গা-মাথা জ্বলে যাবার উপক্রম। কিন্তু রণে ভঙ্গ দেবার পাত্র তখন আমারা নই। এ সংগ্রাম যেমন করেই হোক চালিয়ে যেতেই হবে! মাঝ-বেলা পেরুতে পেরুতে শরীর আর কোন ভাবেই নড়তে চায় না – কিন্তু মন বলছে কিছুতেই এই রণে ভঙ্গ দেয়া যাবে না! বাবা পেছনের বারান্দায় বসে আমাদের কাজ দেখছেন আর মা যেন কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বাবার সঙ্গে কোন একটা বচসায় লিপ্ত হচ্ছেন। দুপুরের খাবার সময় পার হতেই মা বেশ তপ্ত কণ্ঠেই আমাদেরকে হাত মুখ ধুয়ে খেতে আসতে বললেন।

খাবার টেবিলে বাবা জিজ্ঞেস করলেন; কাজটা কেমন লাগছে? আমরা মিন মিন স্বরে জানালাম যে কিছুটা কষ্টের, তবে আমারা যে শেষ করে দিব সেটা বলে বাবাকে আশ্বস্ত করলাম। খাবার শেষে আমরা দুজন কিছুটা জিরিয়ে নেবার জন্য উঠে যেতে যেতে মায়ের তপ্ত কণ্ঠের তিরস্কার কানে আসলঃ

-তোমার প্রাণে কি একটু ও দয়া মায়া নাই – ওই কচি বয়সের নিজের সন্তানদের কি কেও কখনো এই ডিসেম্বরর মাসের কাঠ ফাটা রোদে এ ধরনের কাজ করতে পাঠায়?
-আমি কেন এ ধরনের শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করতে দিয়েছি তা তুমি এখন বুঝছ না – তবে তুমি ও তোমার ছেলেরা একদিন এজন্য আমাকে ধন্যবাদ দেবে, “and you will be proud of them someday”.

এ গল্পের শেষ টুকু না হয় ওদের মুখেই শুনুনঃ

“Our dad gave us a choice between the life of hard physical labour and that of an educated life. I am glad that the day under the sun, made us choose the later”.

“We don’t know how proud we could make our parents, but we know for sure that they passed away happily seeing both of our brothers go through Uni and settle in a reasonably good life”.




মোস্তফা আব্দুল্লাহ, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া


Share on Facebook               Home Page             Published on: 27-Mar-2020


Coming Events: