bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney













সত্তুর দশকের সিডনী
মোস্তফা আব্দুল্লাহ



১৯৭৭ সনের সেপ্টেম্বর মাসে সিডনী আসার মাস ছয়েক পর আমার স্ত্রী সিডনী এসে পৌঁছালে আমরা রেন্ডউইকে আলম ভাই-ভাবীদের মুখোমুখি একটা এক বেডরুমের ফ্ল্যাট বাড়ীতে ডেরা বাঁধি। রান্না ঘড়, বসার ঘর আর খাবার ঘড় ছাড়াও একটা কাঁচের জানালা ঘেরা বারান্দা মত ছিল, যেটাকে কিনা একটা ছোট-খাট ঘড় বলে চালিয়ে দেয়া যায়। বাড়িটা একটা ঢালু জায়গাতে হওয়াতে, বসার ঘড়ের জানালা থেকে পাশের বাড়ীর ছাদের ওপর দিয়ে কুজি বিচের সমুদ্রের ঢেও দেখতে পেতাম। শুরুতে ভাড়া গুনতে হতো সাকুল্যে সপ্তাহে ৩৫ ডলার, যা দুই বৎসরের মাথায় এসে ৪০ ডলারে দাড়ায়! এই রেন্ডউইকেই পাঁচ দশ মিনিটের হাটার দূরত্বের মধ্যেই বাস করতাম আমরা গোটা বিশেক পরিবার। আর সিডনীর অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আরও পনেরো ষোলটি পরিবার। খুব কাছেই, মাত্র মিনিট পাঁচেকের এর হাটার রাস্তায় ছিল উলউয়ার্থ। তখনকার দিনের উলউয়ার্থ অবশ্য এখনকার থেকে ছিল ভিন্ন ধরনের। এখনকার বিগ ডাবলু বা কে-মার্টের মত ডিপার্টমেন্ট স্টোর। আর আজকের কোলস বা উলউয়ার্থ যেমন মূলত তৈজস পত্রের ডিপার্টমেন্ট স্টোর, তেমনি ছিল ফ্রেঙ্কলিন্স, যা এখন আর কোথাও নাই। মাংস, শাকসবজি ও ফলমূলের দোকানও কাছেই ছিল। তবে মাছের জন্য যেতে হত কিংসফোর্ড। দেশী মাছের স্বাদ খুঁজতাম কার্প ও মালেটের মধ্যে। এক দিন মাছের দোকানে গিয়ে দেখি কিছু গুড়া বা ছোট মাছ, যা আগে কখনো এখানে দেখিনি। লোভ সম্বরণ করতে না পেরে সবটাই, প্রায় কেজি খানেকের মত দিয়ে দিতে বললাম। দোকানদার কিছুটা আশ্চর্য হয়েই আমার দিকে তাকিয়ে বলল “You must be fishing a lot”। তখনও জানতাম না যে এটার নাম Bait Fish যা দিয়ে এরা তখনকার দিনে শুধু মাত্র বড়শীতে গেঁথে মাছই ধরত।

মাছের কথা মনে হলেই ইলিশের মৌ মৌ গন্ধটার কথা মনের মধ্যে জানান দিয়ে জিভে পানি চলে আসত। এমনই দিনে ডঃ ফজলুল হক ভাইয়ের টুঙ্গাবির নতুন বাড়িতে দাওয়াত। এসে জানতে পারলাম কে একজন ঢাকা থেকে মেলবোর্নে একটা নোনা-ইলিশ নিয়ে এসেছেন আর সেটারই কিছু অংশ এসেছে হক ভাইয়ের বাড়িতে। হক গিন্নী তা চুলোয় বসিয়েছেন। মনে হোল সেই ইস্টার্ন সাবার্ব থেকে প্যারামাটা পার হয়ে এতটা আসাটা নিতান্তই সার্থক। কেননা সাতাত্তরের দিকে আমরা যারা ওই দিকে থাকতাম তাদের কাছে প্যারামাটা পার হওয়াকেই অস্ট্রেলিয়ার প্রায় আরেক প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া বলে মনে করতাম। নোনা-ইলিশের কথায় ফিরে আসি। শুনলাম অতিথির সংখ্যাধিক্যের কারণে ওটাকে অনেকটা সবজির সাথে ঝোল করা হয়েছে। সেটাই যখন পরিবেশিত হোল তাতে আসলে কতটা ইলিশের ঘ্রাণ ছিল তা হলফ করে বলতে পারবো না তবে আমাদের সবার মনের মধ্যে পদ্মার টাটকা ইলিশের গন্ধ যে মৌ মৌ করছিল সেটা কেউই অস্বীকার করতে পারবেনা। খাবার পর মনে হয়েছিল দুই এক দিন যদি হাতটা না ধুয়ে থাকা যেতো!

কাচা মরিচের অভাবটা সবাই খুব উপলব্ধি করতো, সচরাচর খুব একটা পাওয়া যেত না। কালে ভদ্রে কোন দোকানে কারো নজরে পড়লে সে নিজে তো যতটা পারত নিয়েই নিত, আর সাথে সাথে অন্য সবাইকে ফোন করে এই দুষ্প্রাপ্য বস্তুটির কথা জানান দিয়ে দিত। প্রয়াত মনসুর ভাই একদিন ফ্লেমিংটন মার্কেটে গিয়ে দেখতে পান এক দোকানীর কাছে বেশ কিছু কাচা মরিচ। তিনি দোকানীর কাছে জানতে চাইলেন - মরিচ গুলো ঝাল হবে কিনা। দোকানী মাস্তানি চালে জবাব দিল “Man – this is poison”। মনসুর ভাই সাথে সাথে একটা মরিচ নিয়ে তার সামনেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলাতে দোকানীর মাথায় হাত। সে মনসুর ভাইয়ের হাত ধরে বলল “Boss it’s all yours if you want it. You do not have to pay anything, if you don’t want to”!

এদেশে যে দেশীয় তৈজসপত্রের দোকান থাকবে চিন্তাও করিনি। এমন সময় খোঁজ পেলাম যে বণ্ডাইএ ‘ইজি অ্যান্ড সন্স’ বলে একটা দোকান আছে যেখানে সবই পাওয়া যায়। প্রয়াত শাহাদাত আলি ও আমি পরিবারসহ হাজির হলাম সেখানে। দোকান ঘুরে দেখি যা চাই তাই আছে। শাহাদাত আলি এতই উল্লসিত হয়ে পড়ল যে সে এখন তেঁতুল আছে কিনা খোঁজ করতে লেগে গেল। অনেক খোজা খুঁজির পরও না পেয়ে দোকানীকেই জিজ্ঞাসা করা সাব্যস্ত হোল। কিন্তু সমস্যা হোল যে আমরা কেওই তেঁতুলের ইংরেজি জানি না। শাহাদাত আলি দমার পাত্র নন। আমরা নানা ভাবে long long, short short, brown brown, sour sour ইত্যাদি বলে যখন দোকানীকে বোঝাতে গিয়ে হয়রান হয়ে যাচ্ছি তখন দোকানী আমাদের কাছে জানতে চাইল; “Are you looking for tetul?”।

গরু, ভেড়া বা মুরগীর মাংস হলেই হালাল মাংস বলে ধরে নিতাম। আমার মা সিডনী এসে খাবার টেবিলে বসে যখন জানতে চাইলেন যে আমারা যে মাংস খাচ্ছি সেটা হালাল কিনা, তখনি আমাদের টনক নড়েছিল। অনেক খোজ খবর করে আনজাক প্যারেডের মাথায় ক্লিভল্যান্ড রোডে একটা হালাল মাংসের দোকানের হদিস পেয়েছিলাম। তখনকার দিনে মাংস কেনার জন্য অত দূরে অবার্ন বা লেকেম্বা যাওয়ার কথা মনেও আসত না!

আমরা সিডনী আসার বছর দুই একের মাথায় ১৯৭৯ সনে আম্মা এসেছিলেন সিডনীতে আমাদের কাছে বেড়াতে। ওনার ওই বয়সের কোন বাংলাদেশী মহিলা তখন এখানে ছিল না, তাই অতি সহজেই তিনি সবার একমাত্র খালাম্মা বনে গেলেন। কদিন আগে ব্যারিস্টার সালাউদ্দিন ভাইয়ের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে পুরনো দিনের কথা বলতে বলতে উনি বললেন যে আমার মাকে নাকি উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন; ঢাকা থেকে এতটা পথ আপনি একা একা আসলেন কি ভাবে? উত্তরে তিনি বলছিলেন;

- পুরো রাস্তাটাই আমি যতটা বোকা নই, তার চেয়েও আরও অনেক বেশি বোকার ভান করাতে, সবাই যে যেখানে পেরেছে, সাহায্য করে আমাকে একেবারে সিডনী পর্যন্ত ছেলের কাছে পৌঁছে দিল!

এখানে এসে ছেলে-বৌকে কাছে পেয়ে কদিন আম্মার ভালই কাটল। উপরি পাওনা হিসাবে পেয়ে গেলেন পাশের বাসার আলম ভাই-ভাবির বছর চারেক এর সন্তান নন্দিতকে একেবারে রেডিমেড নাতি হিসাবে। তবে কদিন পরেই এখানকার সামাজিক নিঃসঙ্গতা তাকে পেয়ে বসল। দেশে যিনি সর্বক্ষণ আত্মীয় পরিজন পরিবেষ্টিত হয়ে সদা ব্যস্ত থাকেন, ছুটে বেড়ান কার কি প্রয়োজন তার খোঁজে, তাকে হটাত করে এই বন্দি পরিবেশে দেখে আমাদেরও মায়া লাগছিল। কদিন পর তিনি ফিরে যাওয়া মনস্থ করলেন। বললেন আবার আসব – আর তোমরাতো একটু গুছিয়ে গাছিয়ে মাঝে মধ্যে দেশে আসবেই। বুঝলাম এদেশ তার জন্য নয়।

তিনি ফিরে যাবার মাস ছয়েক এর মাথায় আমাদের প্রথম কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। তদানীন্তন বাংলাদেশ ট্রেড কমিশনের উপ-প্রধান, মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর হাসপাতালে আমাদের মেয়েকে দেখতে এসে বলে উঠলেনঃ

- এযে দেখছি খালাম্মার কার্বন কপি, অবিকল একরকম দেখতে!

কথাটা মনের মধ্যে এমন ভাবে গেঁথে গেল যে, কন্যার মুখের দিকে চাইলে কেবল আম্মাকেই দেখি। চোখ বুজলেই দেখতে পাই, আমার মা’টা ছট ফট করছে তার একমাত্র সন্তানের একমাত্র নাতনীটাকে কোলে জরিয়ে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে দিতে। মনের ভিতরটা কেবলই খা খা করে উঠে। কি করব, কি করতে পারি, কি করা উচিৎ, ভেবে কূল কিনারা পাই না। অবশেষে যে কূল কিনারার সন্ধান একটা করতে পেরেছিলাম তা নিয়ে লেখার আশা রইল আগামীতে।




মোস্তফা আব্দুল্লাহ, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া


Share on Facebook               Home Page             Published on: 27-Sep-2020


Coming Events: