bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia












সুন্দর ফন্টের জন্য SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন...

ইস...যদি এমনটি হতো
মাসুদ পারভেজ

শুক্রবার ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১৪, সিডনী শহরের Surry Hills মসজিদ থেকে জুমার নামাজ শেষ হেঁটে ফিরছি কর্মস্থলের দিকে। Elizabeth Street- এর Crossing- এর কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় কানে ভেসে আসে মাইকে কণ্ঠস্বরের আওয়াজ। Crossing-এ এসে দেখলাম NSW Police-এর এক ঝাঁক নীল রঙের গাড়ী আর মোটরবাইকের পেছনে বিভিন্ন ধরনের পতাকা আর ছবি দিয়ে তৈরি প্ল্যাকার্ড হাতে লাইন ধরে প্রায় ২০০ জন Aboriginal Australian-দের বিক্ষোভ মিছিল। ২০০৪ সালের এই দিনে পুলিশের হেফাজতে TJ Hickey মৃত্যুবরণ করেন মাত্র ১৭ বছর বয়সে। গত ১০ বছর TJ-র মা' ন্যায়বিচারের দাবীতে আন্দোলন করছেন এবং তারই অংশ হিসাবে এই শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে সকাল সাড়ে দশটায় Redfern থেকে NSW Parliament House-এর অভিমুখে। মিছিলকারীরা সবাই TJ-র অকাল মৃত্যুর বিচারের দাবীর বিভিন্ন শ্লোগান দিতে দিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন - ধীরে ধীরে, শান্তিপূর্ণভাবে। আর পেছন থেকে নিরাপত্তা বিধান করছেন ঘোড়ায় আরোহী পুলিশের সদস্যরা। ব্যস্ত Elizabeth Street-এর পথচারী পারাপার দিয়ে রাস্তার পাশে এসে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে মিছিল/শোভাযাত্রার দৃশ্য দেখে মনের অজান্তে বলে উঠলাম - ইস...যদি এমনটি হতো - আমাদের দেশে। আর একই সাথে মনে পড়ে গেল...এই দিনে ৩১ বছর আগে মধ্য ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ সালে ঢাকা শহরে ছাত্র-আন্দোলনের ইতিহাস।

অনেকটা আনমনা হয়ে পড়েছি - আর ঠিক এমন সময় পরিচিত এক বাংলাদেশী সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন - ভাই কিছু বলছিলেন কি? নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে, সালাম বিনিময় করে আরেকবার বলেই ফেললাম নিজের মনের কথাটা - ইস...যদি এমনটি হতো - আমাদের দেশে। শান্তিপূর্ণভাবে এরকম মিছিল কি আমাদের দেশে কখনো দেখা যাবে? বয়সে তরুণ পরিচিত তিনি হেসে উত্তর দিলেন - "জালাও, পোড়াও ছাড়া আমাদের দেশে কি কেউ কারো কথা শোনে?"

Surry Hills মসজিদ থেকে হেঁটে কর্মস্থলে পৌঁছানোর দশ মিনিটের এই দূরত্বের পথে আবার হারিয়ে যাই - নিজ পরিবারের আর বাংলাদেশের কথা ভাবতে ভাবতে...
কর্মস্থলে ফিরে কাজে মনযোগী হয়ে উঠি দিনের অসমাপ্ত কাজগুলি নিষ্ঠার সাথে শেষ করার জন্য, আরেকটি দিন সততার সাথে, সরলভাবে অতিবাহিত করার জন্য, আর কয়েক ঘণ্টা পরে শুরু হওয়া কাঙ্ক্ষিত Weekend-এর জন্য…

বিকেল তিনটার দিকে ফোনে খোঁজ পেলাম সিডনী-নিবাসী এক বড়ভাইয়ের স্ত্রী-র গুরুতর অসুস্থতার সংবাদ। অস্ট্রেলিয়ার আধুনিক চিকিৎসা আর সকল চেষ্টা শেষে চিকিৎসকরা অশুভ সংবাদ - "আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকী" - জানিয়ে দিয়েছেন নিকটতম পরিবারকে। সংবাদটা শুনে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল...আর মন চায় না কাজে মনোযোগ দিতে। কিন্তু দিনের অসমাপ্ত কাজগুলি শেষ না করে বাড়ী ফেরার অভ্যাস না থাকায় আবারো ফিরে আসি বাস্তব জীবন।

Flexible Working Hours-এর ব্যবস্থায় পারিবারিক প্রয়োজনে প্রতিদিন বেশ সকালে কাজ শুরু করে বেলা চারটার দিকে কর্মস্থল ত্যাগের আমার দৈনন্দিন রুটিনে ব্যাঘাত হলো আজ...প্রতিদিনের নির্দিষ্ট সময়ের ট্রেনে আজ আর বাড়ী ফেরা হলো না...
সোয়া পাঁচটার দিকে কর্মস্থল বিশ তলা থেকে Lift-এ নামার সময় মনে হলো Lift-এর গতি কি এতই ধীর হয়, স্বার্থপরের মতো মনে হলো…কি প্রয়োজন ছিল প্রতি তলায় থামার…। Building থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই ট্রেন স্টেশনের দিকে অত্যন্ত ক্লান্ত আর আবেগ মিশ্রিত অনুভূতি নিয়ে ।কর্মস্থল থেকে হেঁটে সাত মিনিটের ট্রেন স্টেশনের এই পথে নেমেই মনটা অত্যন্ত ফুরফুরে হয়ে উঠলো - বিকেলের চমৎকার বাতাসে আর চারিদিকে ব্যস্ত মানুষদেরকে দেখে - হয়তো কেউ বাড়ীতে ফিরছে, অথবা কাজে যাচ্ছে, নয়তো যাচ্ছে কারো সাথে দেখা করতে...আরো ভাল লাগল চারিদিকে শুধু লাল গোলাপ হাতে মানুষের ছোটাছুটি দেখে... কিছু দূর পর পর দোকানীরা রাস্তার পাশে লাল গোলাপ সুন্দর করে সাজিয়ে বিক্রি করছে তা দেখে...হ্যাঁ আজ Valentine Day…।

ট্রেনে উঠে আরো ভাল লাগল...দেখা হলো আমার সহধর্মীনির সাথে। এই ট্রেন হলো তার কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার প্রতিদিনের নির্দিষ্ট সময়ের ট্রেন...ভাল লাগল আমার প্রতিদিনের নির্দিষ্ট সময়ের ট্রেন Miss হওয়ার জন্য…। বিশ মিনিটের এই সহযাত্রায় কথা হলো বিভিন্ন বিষয়ে...লুকিয়ে রাখি আমার আজকের আবেগ মিশ্রিত অনুভূতিগুলি। ট্রেন থেকে নেমে অল্প দূরত্বের বাসায় হেঁটে যাওয়ার পথে - বললাম…বড়ভাইয়ের স্ত্রী-র গুরুতর অসুস্থতার কথা...পরম করুণাময়ের কাছে আবার দোয়া চেয়ে বাসায় পৌঁছলাম।

রাত সাড়ে নয়টায় মৃত্যু সংবাদ পেলাম...চলে গেলেন না-ফেরার দেশে, রেখে গেলেন প্রিয়তম স্বামী, স্নেহময় দুই কন্যা, গুণী আত্মীয়স্বজন, অসংখ্য বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী, প্রতিবেশী। মনের অজান্তে বলে উঠলাম - ইস...যদি এমনটি হতো - আরো কিছুদিন নিকটতম প্রিয়জনদের সাথে তিনি জীবন উপভোগ করতে পারতেন, বিশ্ব ভ্যালেন্টাইন দিবসে প্রিয়জনদের ছেড়ে না গেলেই বা কি এমন হতো...?? পরম করুণাময়ের কাছে বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি এশার নামাজে।

Minto মসজিদে পরদিন শনিবার যোহরের নামাজ শেষে জানাজায় অংশ নিলাম। গুড়ি, গুড়ি বৃষ্টির মাঝে শোকার্ত সবার সাথে ভেজা চোখে চির বিদায় দিলাম। মনে হলো প্রকৃতিও অংশ নিয়েছে আমাদের সাথে। অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীদের অংশগ্রহণে, দোয়া আর সমবেদনায় আরো মনে হলো - একটু বেশী দিন সুস্থ, শান্তিপূর্ণ, সম্মানজনক আর সফলভাবে বাঁচার জন্যই তো এসেছি স্থায়ীভাবে উন্নত দেশে...-ইস...যদি এমনটি হতো - সবার জন্য।

mmparvez@yahoo.com

সিডনী
১৬/০২/২০১৪




Click for details



Share on Facebook               Home Page             Published on: 18-Feb-2014

Coming Events: