bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia













Mriya - The Dream
মাসুদ পারভেজ


Mriya (মৃয়া) একটি উড়োজাহাজের নাম। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিমান। ১৯৮০ সালে এই বিমানের নকশা প্রস্তুত করেন ভিক্টর টলমাচেভ। ইউক্রেনে নির্মিত ৩২ চাকা ও ৬ ইঞ্জিন বিশিষ্ট আকাশের এই দানবের দৈর্ঘ্য ৮৪ মিটার, পাখার বিস্তার ৮৮ মিটার, যা একটি ফুটবল মাঠের দ্বিগুণ। ১৯৮৫ সালে বিমানটি সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা হলেও ১৯৮৮ সালের ২১ ডিসেম্বর এই বিমান প্রথম আকাশ-পথে ওড়ে। মৃয়া ইউক্রেনের গৌরব হিসাবে পরিচিত।

সোভিয়েত মহাকাশ অভিযান কর্মসূচীর জন্য, পণ্য পরিবহনের কাজে বিমানটি তৈরি করা হয়েছিলো। এনারজিয়া রকেটসহ মহাকাশ-গামী অন্যান্য রকেট ও নভোযান বহন, সরঞ্জাম পরিবহনের কাজে ব্যবহার হয়েছে এই বিমানটি। সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ গবেষণা সংক্রান্ত প্রকল্পের সময় রকেটের বুস্টার এমনকি অন্য বিমানকেও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করতে ব্যবহার করা হতো। এটি মূলত: ছিল একটি সামরিক বিমান। এই বিমান একই সাথে বহন করতে পারে যুদ্ধে ব্যবহারের ১০টি ট্যাঙ্ক।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর ইউক্রেনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনটোনভ কিনে নেয় উড়োজাহাজটি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১সালে ভেঙ্গে যাবার কারণে এরকম বিশাল বিমান একটির বেশি নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ২০০১ সাল থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে বিমানটি।

রাশিয়ার আক্রমণে ব্যাপক ক্ষতির মুখে এখন ইউক্রেন। চলছে বিধ্বংসী আক্রমণ। ভেঙে পড়ছে একের পর এক স্থাপত্য, মরছে মানুষ। সেই সাথে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রর আঘাতে রাজধানী কিয়েভের কাছে থাকা পৃথিবীর বৃহত্তম বিমান মৃয়া ও ধ্বংস হয়েছে। রুশ গোলার আঘাতে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বিমানটি।

মুক্ত আকাশে পাখির মতো ওড়ার স্বপ্ন ছিলো রাইট ভাতৃদ্বয়ের। ধীরে ধীরে মেধা, শ্রম আর নিষ্ঠার সাথে সফলভাবে ১৯০৩ সালে নির্মাণ করেন ফ্লাইং মেশিন – “এরোপ্লেন”, যা সময় ও দূরত্বকে করেছে জয়। আকাশে আজ বাণিজ্যিকভাবে পাখা মেলে উড়ছে প্রায় সব দেশের পতাকাবাহী উড়োজাহাজ, গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে যাত্রী, পণ্য, সেবা। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রিয়জনকে ছেড়ে যাওয়া, প্রিয়জনের কাছে ফেরা, সফলতার আনন্দ, বিফলতার বেদনা, চির বিদায়, আরো কত না অনুভূতির নীরব সাক্ষী এই বিস্ময়কর আবিষ্কার। ১৯৪৮ সালে মৃত্যুর আগে প্লেনের অন্যতম আবিষ্কারক অরভিল রাইট প্লেনের ভয়ঙ্কর অপব্যবহার দেখে দুঃখ করে বলেছিলেন – “I lived long enough to see the dropping of the atomic bomb”.

জাপানের - হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম এবং নাগাসাকি অ্যাটমিক বোম মিউজিয়াম-এ দেখেছি - ১৯৪৫ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বিমান থেকে এটম বোমা ফেলার ভয়ঙ্কর দৃশ্যের চিত্র, সংরক্ষিত নমুনা, ধ্বংসাবশেষ, ধারাবর্ণনাকারী ভিডিও প্রতিবেদনে অসহায় মানুষের আহাজারি, ইত্যাদি, আর ভেবেছি - মানুষের কল্যাণে, সময় আর দূরত্বকে জয় করার জন্য যে উড়োজাহাজ আবিষ্কৃত হয়েছিলো - তা ব্যবহৃত হয়েছে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের হত্যাকাণ্ডে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করার জন্যে, নিউক্লিয়ার রেডিয়েশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আজও সাক্ষী দেয় সভ্য সমাজের বর্বর আচরণের। একই সাথে আরো ভেবেছি - দূর দৃষ্টিসম্পন্ন আবিষ্কারকরা শুধুমাত্র বিনোদন আর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্যই টেলিভিশন আর ক্যামেরা আবিষ্কার করেননি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা দানের জন্যও এর ভূমিকা আছে।

পঁচাত্তর বছর আগে ১৯৪৭ সালে মিখাইল কালাশনিকভ আবিষ্কার করেন স্বয়ংক্রিয় রাইফেল AK-47 যা আজ পৃথিবীর ১০০টিরও বেশী উন্নত-অনুন্নত দেশে, সরকারী ও বেসরকারিভাবে, বৈধ-অবৈধ যুদ্ধে, সংঘাতে, সন্ত্রাসে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৩ সালে মৃত্যুর আগে মিখাইল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন – “যুদ্ধ আর সন্ত্রাসে সর্বাধিক ব্যবহৃত AK-47কে অশান্তির জন্য দায়ী করা উচিত নয়। কারণ তার উদ্ভাবন অনেক দেশে এনে দিয়েছে স্বাধীনতা”!

যেকোনো আবিষ্কারের কিংবা নির্মাণের পেছনে রয়েছে এক বা একাধিক ব্যক্তির অনন্য মেধা, অক্লান্ত শ্রম, নির্ভেজাল সততা, একান্ত নিষ্ঠা আর চরম একাগ্রতা। আবিষ্কার কিংবা নির্মাণ যতোই ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ হোক না কেন, তার স্থায়িত্ব স্বল্প কিংবা দীর্ঘমেয়াদী হোক না কেন - প্রতিটি আবিষ্কার এনেছে ইতিবাচক পরিবর্তন, কল্যাণ। সহজ আরামপ্রদ হয়েছে মানুষের জীবন-যাত্রা। অন্যদিকে আবিষ্কারের বা নির্মাণের অপব্যবহারে শুরু হয়েছে যুদ্ধ, সংঘাত, সন্ত্রাস, বিঘ্নিত হয়েছে মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা; প্রকৃতি হয়েছে বিপন্ন।

পৃথিবীতে এখন খাওয়ার অভাবে প্রতিদিন ২১,০০০ মানুষ মারা যায়। পর্যাপ্ত খাবারের অভাব রয়েছে প্রতি ৯জনের মধ্যে ১জনের। প্রতিদিন ১.২৫ ডলার দিয়ে জীবন চলছে একশো কোটি মানুষের। এসব তথ্য আমাদের অনেকেরই জানা।

যুদ্ধে মানুষ মারার জন্যে পৃথিবীতে আজ যতো অর্থ ব্যয় হয় তা যদি চিকিৎসা গবেষণায় সদ্ব্যবহার হতো তাহলে হয়তো অনেক রোগ পৃথিবী থেকে বিদায় নিতো।

এই লেখার পরিসংখ্যান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রকাশিত। অনেক রিপোর্টের সত্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করতে অনেককেই শুনেছি। তবে রিপোর্টে প্রকাশিত সূচকের মানদণ্ডে কোনো দেশ কিংবা সংস্থার অবস্থান যেখানেই হোক না কেন প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সারাদিনে আমরা আমাদের নিজ নিজ কাজের মূল্যায়ন করলেই এর নির্ভুল বিশ্লেষণ পেতে পারি।

বিশ্বব্যাপী ক্ষমতা ও সম্পদের বৈষম্য এক জটিল বিষয় যা হয়তো দূর করা সম্ভব নয়। ক্ষমতা ও সম্পদের সুষম বণ্টন হয়তো আমরা করতে পারবো না। কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সামনে রেখে, নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসনের ভিত্তিতে, যেকোনো কল্যাণকর কাজ করে পৃথিবীতে আমাদের ফুট-প্রিন্ট রেখে যাওয়ার চেষ্টা তো করতে পারি।

আবারও ফিরে আসি “মৃয়া”-র প্রসঙ্গে। ১৯৮৮ সালে প্রথম উড্ডয়নের পর থেকে “মৃয়া” বিমান চালনার জগতে এক সেলেব্রিটি হয়ে উঠেছিলো। ২০১৬ সালের মে মাসে যখন প্লেনটি অস্ট্রেলিয়ার পার্থে আসে তখন ৩৫,০০০ এরও বেশি মানুষ তার আগমন দেখার জন্য জড়ো হয়েছিল বিমানবন্দরের চারপাশে। বিবিসি-কে দেয়া ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে প্রধান প্রকৌশলী নিকোলাই কালাশনিকভ বলেছিলেন, “মৃয়া এত বড় মেশিন যখন তারা প্রথম এটি ডিজাইন করেছিল তখন এটি উড়তে সক্ষম হবে কি না তা কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব ছিল”। নিকোলাই আরও বলেছিলেন – “এটি আমাদের সন্তানের মতো, এটি এমন কিছু যা নিয়ে আমাদের সন্তান এবং আমাদের নাতি-নাতনিরা গর্বিত হতে পারে”।

এক সাথে দ্রুত বিপুল পরিমাণ জরুরি সরবরাহ পরিবহন করার ক্ষমতার জন্য দুর্যোগ-ত্রাণ কার্যক্রমে এটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলির জন্য একটি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই বিমানটিকে করোনা সংক্রমণ কালে মানবিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনার অন্ধকারের সময়ে আশার প্রতীক বিশ্বের বৃহত্তম বিমান – “মৃয়া” সারা বিশ্বজুড়ে প্রচুর প্রাণ রক্ষাকারী পিপিই কিট, ওষুধ, ভ্যাকসিন পৌঁছে দিয়েছে।

প্রায় ৭৫ বছর আগে মহাত্মা গান্ধীর উক্তি – “…the world has enough for everyone’s need but not enough for everyone’s greed…”। ছোট বেলায় পড়েছিলাম - ত্যাগের আনন্দ তুলনাহীন। মার্টিন লুথার কিং এর এক স্মরণীয় বাণীতেও শুনেছি – “Life’s most persistent and urgent question is – what you are doing for others”.

ইউক্রেনীয় ভাষায় Mriya শব্দের অর্থ (The Dream) “স্বপ্ন”। আজ “স্বপ্ন” নেই। রুশ গোলার আঘাতে “স্বপ্ন” পুড়ে ছাই হয়ে গেছে! আশা-নিরাশার অরণ্যে স্বপ্নের বাস্তবায়নে তবুও আশাবাদী হতে চাই।





মাসুদ পারভেজ, সিডনি / mmparvez@yahoo.com



Click for details



Share on Facebook               Home Page             Published on: 1-Mar-2022

Coming Events:


আঙ্গিক থিয়েটার প্রযোজিত সিডনিতে প্রথমবার
লাইভ মিউজিক সহ যাত্রা-পালা