bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন










- আপনার ছেলে-মেয়েরা বাংলা কথা বলে?

- হ্যাঁ বলে।

- ওদের বাংলা স্কুলে দিয়েছেন?

- নারে ভাই। বাড়িতেই আমাদের সাথে বাংলা বলে।

- মেয়ে টাকে নাচের ক্লাসে দেননি?

- দিয়েছিলাম। কিন্তু ওর আগ্রহ দুদিনেই শেষ।

- আপনাদের তো বাংলা মেলাতেও দেখি না। ছেলে মেয়ে দুটো বাংলা সংস্কৃতি ভুলে যাবে না?

আমি তো লোকজনের কথা শুনে চমকে যাই, থমকে যাই। মৌসুমী চিন্তিত হয়। আহারে আমাদের বাচ্চা দুটা বাংলা সংস্কৃতি ভুলে যাবে? দেশের মাটির কথা জানবে না? দেশের পাখ -পাখালী আর মাটির গন্ধ ভুলে যাবে?

আমি একটু চিন্তায় পড়ে যাই। যে গান শুনে আমার মন উড়ে যায়, সেই গান শুনে আমার বাচ্চাদের মন কাঁদে না। কাঁদবে কি করে? ওদের বেড়ে উঠা আমার বড় হবার মধ্যে যে অনেক তফাৎ। ওরা জানে, 'ওটা মা'র প্রিয় গান, এটা বাবার পছন্দের গান। ' আমি তাতেই খুশী। কিন্তু মনে মনে উত্তর খুঁজি। ওদের কি শিখাতে চাই? হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইবে, 'লাল ঝুটি কাকা তুয়া, ধরেছে যে বায়না, চাই তার লাল ফিতে, চিরুনি আর আয়না।' নাকি মেয়েটি পায়ে ঘুঙুর লাগিয়ে নাচবে, 'তা তা থৈ থৈ তা তা থৈ থৈ তা তা থৈ থৈ।'

অমন করে নাচলে আমার ভাল লাগবে। বুকটা ভরে যাবে। ছেলের গান আর মেয়ের নাচের তালের সাথে আমার ফেলে আশা বেড়ে উঠার স্মৃতিগুলো ও নাচবে। আমি জাদুর স্পর্শে ডুবে থাকবো আমার শৈশবে। অবাক হয়ে বলবো, 'সার্কেল অফ লাইফ। '

কিন্তু আমার বাচ্চা দুটা আমার ফাঁদে পা দিবে না। আমি ভাবি বাচ্চা দুটাকে আমরা কি শিখাতে চাই? শুধু নাচ, গান, গল্প, কবিতা? আমাদের সংস্কৃতি কি শুধু এই দাগের ভিতর আটকে আছে? মানুষ হচ্ছে আমার সংস্কৃতির শক্তি। মানুষ যা করে তা, যে ভাবে জীবন-যাপন করে তা হয়ে উঠে আমাদের বেঁচে থাকার রীতি, আমাদের সংস্কৃতি। আমার বাচ্চাদের কি দেশের মানুষদের ভালোবাসার কথা শিখাতে পারি? ওদের শেখাতে পারি যে তোমার বাবা-মা যে দেশের মানুষের অর্থে পড়াশুনা করেছে, যে দেশে তোমরা জন্মেছ - সেই দেশের আলো -বাতাস তোমাদের চিনে। তোমরা ওই দেশে যখন পা দাও - আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ - সেদিন আকাশের রং অনেক গাঢ় নীল হয়ে উঠে, মেঘগুলো চঞ্চল হয়ে ছুটে যায় এই মাথা থেকে আরেক মাথায়। তোমাদের যে ওদের ভাষা শিখতে হবে।

মেয়ে আমার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, 'বাবা, আমি তো বাংলা বলতে পারি। আমি তো ওদের কথা বুঝি।'

আমি বলি, 'শুধু আকাশ আর মেঘের কথা শুনলে তো হবে না। মানুষের কথাও শুনতে হবে যে। '

মেয়ের উত্তর তৈরি, 'আমি তো আমার সব রিলেটিভদের সাথে কথা বলি। আমার কাজিনদের সাথে কত গল্প করলাম - অল নাইট।'

-হ্যারে মা। তোমার রিলেটিভরাই তো শুধু তোমার কাছের না। দেশে আরো কত মানুষ আছে না? ওদের কথা ভাববে না? ওরা বিপদে থাকলে তুমি সাহায্য করবে না?

- অফ কোর্স করবো।

আমি ইচ্ছে করেই আবার জিজ্ঞেস করি, 'কেন ওদের সাহায্য করবে? তুমি তো ওদের চেন না, জানো না। '

মেয়ে আমার মুখ ভার করে বলে, 'ওরা তো পুওর।'

উত্তরটি পছন্দ হয়নি। আমার মনে হলো - ও ভাবছে দরিদ্র কাউকে ডোনেশন দিচ্ছে। আমি তো এটা চাচ্ছি না। আমি চাই ও আমার মতো করে বুঝুক - এটা আমাদের দায়িত্ব।

- আচ্ছা মা, তুমি তো মাঝে মাঝে স্কুল থেকে এক বাক্স চকলেট নিয়ে আসো। তারপর তোমার নেইবারদের কাছে ওটা বিক্রি কর।

- তোমার কাছেও বিক্রি করি।

- হ্যাঁ। কিন্তু স্কুলের জন্য তুমি কেন টাকা তুলো?

- ওই টাকা দিয়ে আমরা স্কুলের জিনিস কিনি। কিছু ভেঙে গেলে ঠিক করি, খেলার জিনিস কিনি।

- কিন্তু তুমি কেন টাকা তুলবে?

- ওটা টি আমার স্কুল। আমার একটা রেসপনসিবিলিটি আছে না।

মেয়ে আমার উত্তেজিত হয়ে উঠে।

আমি আদর করে বলি, 'তোমার স্কুল কি পুওর?'

মেয়ে এবার আরেকটু উত্তেজিত হয়ে বলে, ' বাবা তুমি বুঝছো না। মাই স্কুল ইজ নোট পুওর। ওটা আমার স্কুল। আমার স্কুলের জন্য আমি সব করতে পারি।'

আমি এই কথাটির অপেক্ষায় ছিলাম।

- শোন মা। আমাদের দেশের মানুষ পুওর বলে কি আমরা হেল্প করবো? নাকি ইট ইজ আওয়ার কান্ট্রি। আমার দেশের জন্য আমরা সব করতে পারি।

- অফ কোর্স। আমরা ওদের হেল্প করতে পারি।

- আমরা ওদের পাশে দাঁড়াতে পারি। কারণ ওদের এখন অনেক বিপদ।

- কেন ওদের কি হয়েছে?

আমি মেয়েকে বন্যার কথা বলি। ওকে বন্যার উপর একটি এসাইনমেন্ট দেই। আর বলি তুমি কি ভাবে সাহায্য করবে ঠিক করো।

রাতে মেয়ে আমার লম্বা লিস্ট নিয়ে এলো। ওমা। লিস্টে সবার উপরে ওর বাবা আর মায়ের নাম। তারপর ওর আপুমনি আর দাদার নাম।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, 'এটা কিসের লিস্ট?'

- এরা আমাকে ডোনেট করবে। আমি সব আঙ্কেল আর আন্টিদের কাছে ফোন করে বলবো যেন সবাই আমাকে বাংলাদেশের মানুষের জন্য ডোনেট করে। কারণ ওখানে বন্যা হচ্ছে। ওদের ঘর নেই, কাপড় নেই, টয়লেট নেই এন্ড উই শুড হেল্প।

মেয়ে আমার টাকা তুলেই ক্ষান্ত নয়। সিডনিতে বন্যার জন্য অর্থ সংগ্রহের একটি প্রচেষ্টা চলছে। ওখানে দুপুরে সবাই খিচুরি চড়া দামে কিনে খাবে আর ওই টাকা বন্যার জন্য তহবিলে দেবে। ২০০ মানুষের খিচুড়ি রান্নার দায়িত্ব অনেকে ভাগ করে নিয়েছে। আমরাও ২৫ জনের জন্য খিচুড়ি আর ডিম্ রান্না করে দিবো। মেয়ে আমার ওর মা আর আপুমনির সাথে সকাল থেকেই খিচুরি রান্না করবে। ওর জন্য নয়। সিডনির মানুষের জন্য নয়। বাংলাদেশের মানুষের জন্য। আর ওর জমানো টাকা ও আনিস আঙ্কেলকে দিবে।

মেয়েটি ভাবুক এই টাকা ওর দেশের মানুষের কাছে যাবে। মানুষগুলো একটু স্বস্তি পাবে। শুকনো কাপড় পড়বে, না খেয়ে থাকবে না। তারপর পানি যখন শুকিয়ে যাবে এই মানুষগুলো আবার দাঁড়াবে শক্ত পায়ে।

আগামী কদিন আমার মেয়ের মননে দেশের মানুষের গল্প জুড়ে থাক। মানুষের কষ্ট, বেঁচে থাকার যুদ্ধ ওকে জাগিয়ে রাখুক। কি হবে ও বাংলা গান না গাইলে? পায়ে ঘুঙুর দিয়ে না নাচলে? ও এই মানুষগুলোকে নিজের ভাবলে ওর মুখে বাংলা গান এমনিতেই সুর তুলবে, পায়ে নূপুরের শব্দ লেগে থাকবে। আমার কাছে এটাই বাংলা সংস্কৃতি।



পুনশ্চ :
১) আগামী নভেম্বরে ঋষিতার জন্মদিন। আমি বলেছি ওর জন্মদিনের খরচের টাকাটি ও বন্যার সাহায্যে দিবে কিনা। ও এখনো আমতা আমতা করছে। ওর দাদা একবার জন্মদিনের পুরো টাকা বন্যার জন্য দিয়েছিলো। ভাইকে হারানোর এমন সুযোগ মেয়ে আমার মনে হয় না হারাবে।

২) আমি শুধু আমার গল্পটি বললাম। এমন অনেক গল্প আপনি ও আপনার সন্তানদের জন্য তৈরি করতে পারেন। ওদের ও কিছু করার জন্য উৎসাহিত করতে পারেন। যে ব্যথা আপনার বুকে ঢেউ তুলে, সেই কষ্টের গল্প ওদের ও স্পর্শ করবে। শুধু পরিবেশটি তৈরি করতে হবে।



জন মার্টিন, অগাস্ট ২০১৭, সিডনি



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 25-Aug-2017