bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












সুন্দর ফন্টের জন্য SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন...


মেঘের সাথে খেলা
জন মার্টিন


আমাদের বাচ্চাগুলো বড় হয় খাঁচার মধ্যে। দালানের খাঁচা, সুপার মার্কেটের খাঁচা, গাড়ির খাঁচা এবং সব চেয়ে বড় খাঁচা হচ্ছে না এর খাঁচা।

-এটা ধরবে না।

-ওখানে যাবে না।

-দৌড়াবে না।

-জোড়ে হাসবে না ।

শুধু না না আর না। হাজার না দিয়ে ওদের পৃথিবীটা বেঁধে দিয়েছি। ভাবুনতো এমন না এর খাঁচায় বাচ্চাগুলো কি শিখবে?

এমনিতেই খাঁচার মধ্যে থেকে থেকে ওরা অনেক কিছুই দেখেনি । ওই যে গাছে উঠা, বৃষ্টিতে ভেজা, মুরগীর ডিম নিয়ে দৌড় দেয়া, আর মা মুরগীর তাড়া খাওয়া, ভাঙ্গা কাঁচ দিয়ে কটকটি কেনা !

একটা গল্পের কথা মনে হোল।

পশ্চিমা এক দেশে একটি স্কুলে বাচ্চাদের মুরগী আঁকতে বলা হয়েছিলো। বাচ্চাদের কাগজ দেয়া হোল, রঙ্গিন পেন্সিল দেয়া হোল। বাচ্চারা মন দিয়ে মুরগীর ছবি আঁকলো। কিন্তু তাদের ছবি দেখে তো শিক্ষকদের চোখ কপালে উঠল। ওমা ওরা এগুলো কি এঁকেছে? মুরগি কই? এতো দেখি শুধু মুরগীর রান, মুরগীর বুক, মুরগীর উইংস। মুরগী নেই ।

ওই বাচ্চাগুলো তো শুধু মুরগী খায়। ওরা ফাস্ট ফুডের দোকানে অর্ডার দেয়, ক্যান আই হেভ ড্রাম স্টিক? ওটা পছন্দ না হলে বলে, আই লাইক চিকেন ব্রেস্ট। ব্যাস। ওই ওদের মুরগী দেখা। মুরগীর যে পাখা আছে, ওরা যে ডিম পাড়ে, ডিমে উম দেয়, তারপর ডিমের খোসা ভেঙ্গে বাচ্চা বেড়িয়ে আসে এগুলো ওই খাঁচার বাচ্চাদের কাছে ফেইরি টেলস।

আমাদের ঋষিতাও শহুরে খাঁচায় বড় হচ্ছে। আমাদের বেড়ে উঠার গল্প শুনে ওর ইচ্ছে হোল মুরগীর ডিম কুড়াবে, গরুকে ঘাস খাওয়াবে, ভেড়ার বাচ্চার সাথে খেলবে। ওর কত প্ল্যান।

আমরা একটা ফার্মে বাড়ি ভাড়া নিলাম। তিন পরিবার। বাহ বেশ জম্পেশ গল্প হবে, ডিম কুড়ানো হবে, ডিমের হালুয়া হবে!

এক মেঘলা সকালে শহর ছেড়ে দৌড় দিলাম। কিন্তু আমাদের সাথে সাথে মেঘও পিছু ধরল। যখন ওখানে পৌঁছলাম তখন আমাদের ফার্ম মেঘে ঢাকা পড়েছে। পাহাড়ের উপরে সেই ফার্ম। চারিদিকে মেঘ। আমার মনিপুর, শিলচরের কথা মনে হোল। সেই কত পুরানো কথা। পাহাড়ের উপর দিয়ে যখন গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম, আমার সহকর্মী বলল , ডিড ইউ রিয়ালাইজ উই আর ইন সাইড দা ক্লাউডস?

বলে কি? আমরা মেঘের ভিতর?

আমি গাড়ির জানালা নামিয়ে মেঘ ধরার চেষ্টা করি। বিশ্বাস হয়নি আমি মেঘ ধরছি। মেঘ ও আবার ধরা যায়?

আমরা ফার্মে পৌছালাম দুপুরে। তখনও সূর্যের দেখা নেই। আমি হাত দিয়ে মেঘ ধরি। গা ভিজে যায়। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে।

ফার্মের মুরগীগুলো ওদের খোঁয়াড়ে, ভেড়াগুলো একবার বাইরে আসে তো আবার তাদের ঝুপড়িতে গিয়ে বসে থাকে। আর আমরা মুরগি-ভেড়ার মত ঘরে বসে ফায়ার প্লেসে গাছের গুড়ি পুড়িয়ে আগুন পোহাচ্ছি। আমার দিদিমা শীতের সময় একটা মাটির বাটিতে কয়লার আগুন নিয়ে বসে থাকতো। আমরা ওই গরম বাটি নিয়ে খেললে দিদিমা সাবধান করত, রাইতে আগুন দিয়া খেইলো না। তাইলে বিছানা ভিজাইবা কিন্তু।

ঋষিতা রাতে আমাদের সাথে আগুন দিয়ে খেলে। আমি ওকে বিছানা ভিজানোর গল্প বলি। ও চোখ মাথায় তুলে বলে। হোয়াট? ইম্পসিবল।

সারাদিনের কাজের পর সন্ধ্যায় ঘুমানোর আগে দিদিমা ওই আগুন নিয়ে বসত। আমরা তার সাথে বসে তার পান-সুপারিতে ভাগ বসাতাম। ওই ছিল তার সারাদিনের বিশ্রাম। তার প্রিয় সময়। দিদিমা আমার বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। কিছু একটা তাকে করতেই হবে। বৃষ্টির সময় আমরা ঘরে বসে থাকতাম আর দিদিমাকে বলতাম, ও দিদিমা, এখন কি করুম?

দিদিমার তৈরি করা উত্তর, নাই কাজ তো খৈ ভাঁজ।

বৃষ্টিতে আমরাও ফার্মে বসে খৈ ভাঁজার প্ল্যান করছিলাম। কিন্তু সমস্যা তৈরি করল জিয়া ভাই আর মোস্তফা ভাই। তারা ক্যামেরা, জি-বাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

জিয়া ভাই কিছুক্ষণ পর পর বলছিল , একটা স্ক্রিপ্ট লিখেন তো ? এখনি শুটিং করি।

কিন্তু শর্ত হচ্ছে সব ইনডোর দৃশ্য লিখতে হবে। কারণ বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।

আমি ভাবলাম পাগলদের একটা বল দেই তারপর সেটা নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে খেলুক, ব্যস্ত থাকুক আর সেই ফাঁকে আমি আমার কাজ গুছিয়ে নেই।

আমি একটা দৃশ্য লিখে দিলাম। মৌসুমি তো ভীষণ উত্তেজিত। বৃষ্টি আমাদের দিন মাটি করতে পারবে না। মোস্তফা ভাই আর মৌসুমি রিহার্সাল করল, জিয়া ভাই ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত হোল আর ঋষিতা অ্যাকশন, কাট বলে বেশ মজা পেল। আমিও বসে বসে ষ্টোরী লাইন ঠিক করি।

কিছুক্ষণের মধ্যে দ্বিতীয় দৃশ্যের ফরমায়েশ এলো। সেই সাথে ঋষিতার আবদার, বাবা, আমাকে একটা রোল দাও।

আমি অবাক হয়ে বলি, মানে? কিসের রোল?

আমার জন্য একটা রোল লিখো। আমি একটিং করবো।

আমি ওকে যতই বলি , তুমি মার নাটকের ডিরেক্টর। ওখানে গিয়ে অ্যাকশন আর কাট বল।

উহু। মেয়ে আমার নাছোড়বান্দা। ওর জন্য আমাকে কিছু লিখতে হবে।

তুমি আমার জন্য একটা পার্ট লিখ তারপর মার পার্টের সাথে ওটা জয়েন্ট করবে।

ওর উত্তেজনা দেখে আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। এর পর কি আর দ্বিতীয় দৃশ্য লেখা যায়?

আমি ওটা বাদ দিলাম। ঋষিতার সাথে বসলাম। কিছু একটা লিখলাম।

ঋষিতার মলি চাচীর সাথে রিহার্সাল করলাম। মলি ভাবী ভাবল এটা আমার পাগলামি। তারপর শীতে কাঁপতে কাঁপতে শুটিং শেষ করলাম। লেখা থেকে শুটিং - মোট সময় লাগলো ২৫ মিনিট। ওখানে বসেই এডিটিং শেষ হোল তারপর জিয়া ভাই ফিরে এসে ছবিটা একটু ঘষামাজা করল।

তিন মিনিটের ছবিটা দেখে মনে হোল ঋষিতাকে খাঁচা থেকে বেড় হয়ে আসার গল্প বললাম। আর মেয়ে আমার পাখির মত উড়াল দিল।

আমাদের বাচ্চাগুলো তো আসলেই পাখী। ওদের যে কেন আমরা খাঁচায় আটকে রাখি ?








Share on Facebook                         Home Page




                            Published on: 13-Apr-2015