bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney














কাতারের সুখ দুঃখ - ২৩
ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন



আগের পর্ব পরের পর্ব


২০১৭ সালে কাতারের উপর অবরোধ আরোপের পর অনেকেই ভেবেছিল, কাতারের মত ছোট্ট একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো খুব সহজেই ভেঙ্গে পড়বে। আর অবরোধের চাপ নিতে না পেরে কাতারের জনগণই সরকার পতনের আন্দোলনে রাস্তায় নেমে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং কাতারের আপামর জনতা একজোট হয়ে কাতারের শাসক শেখ তামিমের পক্ষে রাস্তায় নেমেছে। অবরোধের সাময়িক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে কাতার অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনীতি সহ সকল ক্ষেত্রে প্রতিরোধ গড়ে তুলে আগের চেয়ে আরো বেশী শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে দাঁড়িয়েছে। সত্যি বলতে কি, এই অবরোধ, কাতারের জন্য শাপে বর হয়ে কাতারকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।


IAAF Doha 2019 and World Beach Games

সমুদ্র ও স্থলপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে কাতার এখন পুরো বিশ্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক নবায়ন করেছে। ফলে কাতারে বাণিজ্যের নতুন দ্বার খুলে গেছে, বৃদ্ধি পেয়েছে রপ্তানিও। কাতারের বন্দরগুলোতে পণ্যের ওঠা-নামা বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশ। এই বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩.১ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও পাকিস্তানের মত দেশগুলোর সাথেও বাণিজ্যিক সম্পর্কেও সূচনা করছে কাতার। ফলে এখন কাতারের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

কিছুদিন ধরে কাতারে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার যেন খই ফুটছে। গত সেপ্টেম্বরে খলিফা স্টেডিয়ামে সাফল্যের সাথে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ব ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ২০১৯ (IAAF World Athletics Championship). অক্টোবরে হয়েছে বিশ্ব বীচ গেমস (ANOC World Beach Games). ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৪তম গালফ কাপ ফুটবল এবং ফিফা বিশ্ব ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ। গালফ কাপ ফুটবলে অংশ নিয়েছে সৌদি আরব, বাহরাইন ও আরব আমিরাত। অবরোধ আরোপের পর এই প্রথম বৈরী সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের উত্তেজনা চলা তিনটি প্রতিবেশী দেশের ফুটবল দলের কাতারে আগমন, কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।

সুপার মার্কেটে কাতারে উৎপাদিত খাদ্য সামগ্রী


কাতারের খাদ্য সামগ্রীর সিংহভাগ আমদানি করা হত সৌদি আরব সহ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে। ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য পণ্য সামগ্রী ও কাঁচামালও আসতো আমিরাত ও অন্যান্য দেশ থেকে। কিন্তু এখন দোহা শহরের প্রতিটি সুপার মার্কেটের তাকে মেড ইন কাতার লেখা পণ্য চোখে পড়ছে। আগে কখনো কোন পণ্য কোন দেশে থেকে আসছে কিংবা কোন দেশের তৈরি তা খুঁটিয়ে দেখিনি। কিন্তু অবরোধের দুই বছর পর সুপার মার্কেটে বিস্ময়কর পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। দুধ, দৈ, বাটার থেকে শুরু সব ধরনের দুগ্ধজাতীয় পানীয়, জুস এখন কাতারে তৈরি হচ্ছে। এছাড়া প্যাকেট-জাত মুরগী, শাক-সবজি সহ রান্নার তেলও এখন মেড ইন কাতার মোড়কে বিক্রি হচ্ছে। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা থেকে কার্গো বিমানে করে উড়িয়ে আনা হয়েছে উন্নত প্রজাতির প্রায় দশ হাজার গরু। মরুভূমির মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে গড়ে উঠেছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দুগ্ধ খামার। যা সত্যিই বিস্ময়কর। এখন যাবতীয় দুগ্ধজাত পণ্যসামগ্রী কাতারেই উৎপন্ন হচ্ছে।

২০২৫ সালের মধ্যে আভ্যন্তরীণ খাদ্য সরবরাহে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কাতার। ফলে কাতারের কৃষিখাতে গত কয়েক বছরে রীতিমত বিপ্লব সাধিত হয়েছে। কাতারের শুষ্ক ও বৈরী আবহাওয়াতে সারা বছর কৃষিকাজ অব্যাহত রাখার জন্য গ্রিন হাউস প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। গ্রিন হাউসের সংখ্যা গত বছর হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৮ সালে শুধু কৃষিখাতেই প্রায় ২৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

কাতার আগামী চার বছরের মধ্যে ৩,৫০০টি গ্রিন হাউস নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া জাপানের সহযোগিতায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্মার্ট কৃষি প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সারা বছরব্যাপী শাক-সবজি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। মাটির বদলে বিকল্প পদার্থ ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এভাবে চললে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কাতার আভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদা পূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।

কাতারে বাংলাদেশী সবজি খামার


কিছুদিন আগে কাতারের উত্তর পূর্বাঞ্চলের আল-খোর এলাকার একটি সবজি খামারে বেশ কয়েকটি বাংলাদেশী পরিবার নিয়ে বনভোজন করতে গিয়েছিলাম। কয়েকজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী পরিচালিত এই খামারের অধিকাংশ শ্রমিক হল বাংলাদেশী। মরুর রাস্তা পেরিয়ে খামারে ঢুকেই সবুজের সমারোহ দেখে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে মনটা ভরে গেল। মনে হল যেন গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথে পা রেখেছি। বিবর্ণ মরুভূমির মধ্যে এমন সবুজে ভরপুর উদ্যান থাকতে পারে তা চোখে দেখেও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। লাউ, পটল, ঢেঁড়স, লাল শাক, করলা, পটল, কি নেই এখানে? সব ধরনের বাংলাদেশী শাক সবজির চাষ হচ্ছে এই খামারে। কাতার জুড়ে নাকি ছড়িয়ে আছে এমন বহু খামার। খুব ভাল লাগল দেখে।

আমদানি ও জ্বালানী-নির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে বহুমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য কাতারে নির্মিত হচ্ছে হাই-টেক শিল্প-কারখানা। তাই কাতারের কৃষি ও শিল্পখাত এখন দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র হতে পারে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হওয়ার পর, কাতারের নির্মানখাতে জনশক্তির চাহিদা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যাবে। কাতারে কর্মরত বহু শ্রমিকদের দেশে ফিরে যেতে হবে। তাই বাংলাদেশে সরকারকে সহসা নতুন শ্রম বাজারের সন্ধান করতে হবে।

বাংলাদেশে উদ্ভাবিত কৃষি প্রযুক্তি, কৃষিবিদ এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের বিশ্বব্যাপী সুনাম রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশেও বাংলাদেশে উদ্ভাবিত বিভিন্ন পদ্ধতি কৃষি খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। বৈদেশিক রেমিট্যান্স এবং জনশক্তি রপ্তানির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশেকে এখন থেকেই কাতারের ক্রমবর্ধমান কৃষি এবং শিল্পখাতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করার জন্য উপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। (চলবে)



আগের পর্ব পরের পর্ব




ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন, কাতার থেকে


Share on Facebook               Home Page             Published on: 23-Jan-2020


Coming Events: