bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন




কাতারের সুখ দুঃখ - ১৯
ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন



আগের পর্ব পরের পর্ব


কাতারে আসার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন চট্টগ্রামের মো. ইউসুফ। ষাট দশকের মাঝামাঝির কথা। মো. ইউসুফের পরিচিত দুজন মানুষ জাহাজে করে করাচী থেকে কাতার আসেন। জাহাজ থেকে আলওয়াকরায় নামার পর প্রচণ্ড গরমে ও পিপাসায় তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। দোহা শহরে যাওয়ার জন্য তাঁরা একটি ট্যাক্সি ভাড়া করলেন। আলওয়াকরা থেকে দোহার ভাড়া ছিল তখন মাত্র ৩-৪ রিয়াল। তখন বাংলাদেশের



মত ফেরি করে রাস্তায় আইসক্রিম ও ঠাণ্ডা পানীয় বিক্রি হত। কিছুদূর গিয়ে ট্যাক্সিচালক গাড়ী থামিয়ে রাস্তায় একজন ফেরিওয়ালার কাছ থেকে তাঁদের ঠাণ্ডা কোক খেতে দিলেন। দুইটি কোকের দাম ছিল মাত্র ৪ আনা! তখন মুদ্রা হিসাবে কাতারে ভারতীয় রুপির প্রচলন ছিল। ১৯৬৬ সালে থেকে কাতারি রিয়াল চালু হয়। মরুর বুকে বৃষ্টির মত হঠাৎ করে কোকা কোলার স্বাদ তাঁদের কাছে অমৃতের মনে হল। ট্যাক্সিচালকে এজন্য কিভাবে ধন্যবাদ দেবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। সেই কোকের স্বাদ এখনো তাঁদের মুখে লেগে রয়েছে বলে জানালেন, মো. ইউসুফ।

অর্থের বিনিময়ে অনেকে মাছ ধরার ট্রলারে করেও কাতার সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ঢুকে পড়তেন। তবে অনেক সময় ট্রলারের চালক এবং তাঁর সঙ্গীরা যাত্রীদের সাথে প্রতারণা করে ভুল গন্তব্যে নামিয়ে দিত। জীবনের প্রবল ঝুঁকি নিয়ে জাহাজ বা নৌকায় চড়ে অসংখ্য শরণার্থী এখন ইউরোপ পাড়ি দিচ্ছেন। গভীর সমুদ্রে মর্মান্তিক নৌকা ডুবিতে তাঁদের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। অতীতেও এমন বহু ঘটনা ঘটেছে আরব সাগরের বুকে। ট্রলারে চেপে নতুন জীবনের খোঁজে দুবাই যাওয়ার সময়, বহু বাংলাদেশির
সলিলসমাধি হয়েছে।



এখন কাতারে সুপেয় পানির শতকরা ৯৯ শতাংশ সমুদ্রের লোনা পানিকে পরিশোধিত করে সরবরাহ করা হয়। আগের দিনে এখনকার মত বোতল-জাত কিংবা কাহরামা লাইনের পানি ছিলনা। ভূগর্ভস্থ কুপ অথবা কুয়াই ছিল দৈনন্দিন ব্যবহার ও খাবারের পানির একমাত্র উৎস। আমাদের দেশের মত প্রতি বাড়ীতেই কুপ খনন করা হত। বড় বড় মসজিদের উঠোনেও কুয়া থাকতো। তবে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু বড় বড় কুয়া ছিল। ঘরের রান্না-বান্না ও ধোয়ামোছার কাজের জন্য ইরানি ঠিকাদার ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি বালতি হিসাব করে পানি সরবরাহ করতো। কুয়ার পানি ছিল কিছুটা লবণাক্ত। লবণাক্ত পানিতে ডাল সহজে সিদ্ধ হতোনা। তাই অনেকেই ডাল রান্নার জন্য উম সাইদ থেকে বোতলে করে মিষ্টি পানি নিয়ে আসতো।

কাতার প্রবাসী চট্টগ্রামের মোঃ হারুন, দোহা শহরে চাকুরী নিয়ে আসেন ১৯৮২ সালে। তাঁর কাছ থেকে জানতে পারলাম, আলরাইয়ান, উম্ম সালালার বারজান টাওয়ার এবং আবু বকর মসজিদ ও আলওয়াকরার মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত কাতারের পুরনো প্রবাসীদের কাছে সুপরিচিত তিনটি কুয়ার কথা। দুহাইল পার্ক সহ দোহা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু পুরনো কূপ এখনো সংরক্ষিত আছে।

যাইদা ফ্লাই ওভারের কাছে ফিরিজি বিন মাহমুদ এলাকায় ছিল আমির সিনেমা হল। ছাদ বিহীন সিনেমা হলে দর্শকদের বসার জন্য কোনো আসন ছিলনা। সাদা দেয়ালে প্রজেক্টর দিয়ে সিনেমা দেখানো হত। সত্তর দশকের শেষের দিকে কাতারের বাড়ী ঘরে টেলিভিশন ও এসির প্রচলন হয়। টেলিভিশন আসার আগে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আমির সিনেমা হলে ভারতীয়, পাঞ্জাবী ও ইরানী ছায়াছবি দেখাই ছিল বিশাল বিনোদন। একবার বৃষ্টির সময় ছাতি ধরে সিনেমা দেখেছিলেন বলে হাসতে হাসতে বললেন আরেকজন প্রবীণ বাংলাদেশি। পকেটে টাকা না থাকলে বাকীতে সিনেমা দেখে পরে টিকিটের টাকা দিয়ে দিলেও চলত।

এখন কাতারে গাড়ী-বাড়ী সবখানে এসির শীতল পরশ থাকার পরও গ্রীষ্মের তীব্র গরমে অতিষ্ট হয়ে হাপিত্যেশ করেন সবাই। এসিবিহীন কাতারের মরুর বুকে সাধারণ নিবিত্ত প্রবাসীরা তখন কিভাবে দিন কাটাতো, ভাবলেই অস্থির মনে হয়। তখন ছিলনা আজকের কর্নিশ। পুরানো সালতা পার্কের গা ঘেঁষে ছিল সমুদ্র। সেই সমুদ্র ভরাট করে এখন হয়েছে ইসলামিক আর্ট মিউজিয়াম পার্ক। গরম অসহনীয় হলে অনেকে পুরনো সালাতা এলাকার সমুদ্র পাড়ে গিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত বসে থাকতেন। কেউবা আবার বাড়ীর ছাদে গিয়ে উন্মুক্ত আকাশে ঘুমাতেন।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি মুশাইরিব এলাকায় ন্যাশনাল কোম্পানির একটি শোরুম খোলা হয়। এর সত্ত্বাধিকারী ছিলেন নাসির বিন আব্দুল্লাহ এন্ড মোহাম্মদ সিদ্দিকুর ট্রেডিং কোম্পানি। ধীরে ধীরে এই শোরুম ঘিরে বাংলাদেশি রেস্তোরা, গ্রোসারি ও অন্যান্য দোকানপাট গড়ে উঠতে থাকে। এভাবে একসময় শোরুম সংলগ্ন এলাকা প্রবাসী কমিউনিটির কাছে ন্যাশনাল বা কাতারের বাঙলা টাউন হিসাবে পরিচিতি পায়। আজ যারা কাতারে নতুন আসছেন, তাঁরা অধুনালুপ্ত ন্যাশনালের কথা বললে হয়তো অজানা বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাবেন। বলবেন, এটা আবার কি? কিন্তু একসময় কাতারের প্রবাসী বাংলাদেশিদের একমাত্র ঠিকানা ছিল মুশাইরিবের এই ন্যাশনাল এলাকা। বেলা শেষে কিংবা ছুটির দিনে ওই এলাকা বাংলাদেশিদের মিলন-মেলায় পরিণত হত, চলত খবরাখবর ও ভাবের আদান-প্রদান।

ন্যাশনাল শোরুম হবার আগে ওই এলাকায় একটি বিশাল জেনারেটর ছিল। তখন দোহা শহরতলী বলতে মুশাইরিব এলাকাকেই বোঝাতো। এই জেনারেটর দিয়ে দোহা শহরতলীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হত। জেনারেটর থাকার কারণে মুশাইরব এলাকাকে পাওয়ার হাউস বলা হত।

তবে ন্যাশনাল জমে উঠার আগে সুক ওয়াকিফের ঐতিহাসিক বিসমিল্লাহ হোটেল ছিল প্রবাসী বাংলাদেশীদের বাতিঘর। দেশের খবরাখবর নেয়া ও অন্যদের সাথে দেখা সাক্ষাতের জন্য সবাই বিসমিল্লাহ হোটেলে ভিড় জমাতেন। দেশ থেকে কাতারে আসার পর পরিচিত কারো দেখা না পেলে সবাই বিসমিল্লাহ হোটেলে গিয়েই উঠতেন। বিসমিল্লাহ হোটেলর মালিক ছিলেন একজন ভারতীয়। তিনি একজন খুবই পরোপকারী এবং হৃদয়বান ব্যক্তি ছিলেন। টাকার জন্য কাউকে জোর-জবরদস্তি করতেন না। কাতারের আসার পর অনেকেই চাকুরী না পাওয়া পর্যন্ত দিনের পর দিন বিসমিল্লাহ হোটেলে থাকতেন। থাকা ও খাওয়া-দাওয়ার খরচ বাকীর খাতায় লিখে রাখা হত। চাকুরী পেলে কিংবা সামর্থ্য হলে সবাই বাকীর টাকা পরিশোধ করে দিতেন। তখন হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো হতো। আর চিঠি ছিল স্বদেশের সাথে একমাত্র সেতুবন্ধন। সচরাচর বিভিন্ন গ্রোসারি দোকানে রাখা ডাক বাক্স থেকেই সবাই নিজের চিঠি যোগাড় করে নিতেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশীদের বাঙালি কমিউনিটি নামে কেবল একটি সামাজিক সংগঠন ছিল। যদিও সংগঠনের সংখ্যা বেড়ে এখন পঞ্চাশোর্ধ। সেই বাঙালি কমিউনিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে জনাব ইয়াকুব খান ও মৌলবি মোমেন। একাত্তরের পরে নাম বদলে সংগঠনটি বাংলাদেশ কমিউনিটিতে পরিণত হয়। এছাড়া কাতারের আরেকটি সবচেয়ে পুরনো সংগঠন হচ্ছে ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত নিখিল বঙ্গবন্ধু পরিষদ। ১৯৯০ সালে নিখিল শব্দটি বাদ দিয়ে কেবল বঙ্গবন্ধু পরিষদ নামে সংগঠনটির কার্যকরী পরিষদ গঠিত হয়। যার সভাপতি ছিলেন ব্যাংকার জনাব সাইফুদ্দিন খালেদ এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশর।

আগের দিনে দেশ থেকে কেউ আসলে সবাই সদলবলে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে যেতো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মুঠোফোন বিহীন সেই যুগে, ফেলে আসা প্রিয়জন ও স্বদেশের খবর জানার জন্য উদগ্রীব, সবাই ছুটে যেতো কাতারে আগত নবাগত অতিথির কাছে। কেউ আর্থিক সমস্যায় থাকলে তখনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতো সবাই। কাতারে এসে চাকুরী না পেলে, যেভাবেই হোক কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দিতো কেউ না কেউ।

মো. ইউসুফ আক্ষেপের সুরে বললেন, আর এখন? সবাই কেমন যেন বদলে গেছে, পর হয়ে গেছে। মানুষের মধ্যে আগের মতো আর ভালোবাসা নাই। দুঃখ জাগানিয়া নস্টালজিক স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে মনে হল ভদ্রলোক হারিয়ে যাচ্ছিলেন অতীতের মেঘলা ধূসর প্রহরে। তাঁর দৃষ্টির সীমান্তে দেখতে পেলাম উদাসী বনের ছায়া। আর চোখের তারায় চিক চিক করছিল নিখোঁজ সুখস্বপ্ন ফিরে পাবার আকুতি। দুচোখের কোনে ভর করে থাকা সূক্ষ্ম জলের কণা গাল বেয়ে পড়বে কি পড়বে না, সেই ভেবে যখন দিশেহারা; ঠিক তখনই আমাদের অদূরে বসে থাকা একজন প্রবাসীর মুঠোফোনে বেজে উঠলো একটি খুবই প্রিয় গানের সুর - আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা... আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম...
(চলবে)



আগের পর্ব পরের পর্ব




ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন, কাতার থেকে


Share on Facebook               Home Page             Published on: 11-Jan-2019


Coming Events:









South Asian Film Arts and Literature Festival...



কলকাতার জনপ্রিয় ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দু সিডনি আসছে। ১৯৮৯ সালে যাত্রা শুরু করে চন্দ্রবিন্দু। ব্যান্ডটি কথ্য ভাষায় বিদ্রুপাত্নক গানের কথার জন্য পরিচিত। এসব কথায় সাম্প্রতিক ঘটনা এবং সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের সূত্র দেয়া থাকে। এছাড়াও নিজেদের লেখা ভিন্ন ধাঁচের গানও পরিবেশন করে থাকে চন্দ্রবিন্দু...বিস্তারিত...