bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন





কাতারের সুখ দুঃখ - ১৪
আব্দুল্লাহ আল-মামুন



আগের পর্ব পরের পর্ব


গাড়ী নিয়ে যাচ্ছিলাম অফিসের কাজে। সাথে আমার একজন সহকর্মী। ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছি। বহুক্ষণ হয়ে গেলো, লালবাতি সবুজ হবার কোনো লক্ষণই নেই। হঠাৎ দেখি সমুখের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে ৮/১০টা বিশাল আকারের সাদা রংয়ের টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার। প্রতিটি গাড়ীরই জানালা খোলা। চোখে সানগ্লাস এবং আরবি পোশাক পরিহিত ভেতরের সব আরোহীদের দেখতে অবিকল একই রকম মনে হল। আমার চোখে বিস্ময় দেখে পাশের সহকর্মী বললেন, এই গাড়ী বহরের কোনো একটিতে চড়ে কাতারের আমীর যাচ্ছেন। হামলাকারীদের ধাঁধায় ফেলে দেবার জন্যই এই ব্যবস্থা। একই রকম গাড়ী এবং একই ধরনের চেহারার মানুষের মধ্য থেকে কোনটা আমীর তা খুঁজে বের করা চাট্টিখানি কথা নয়। মনে পড়ে গেলো, ইরাকের সাদ্দামে হোসেনের নাকি অনেক ডুপ্লিকেট ছিলো, যারা সময় সময় সাদ্দামের প্রক্সি দিতো।

আজকের বিশ্বে, রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তা একটি গুরুতর বিষয়। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বহু দেশে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয় থেকে বেরুলে নিরাপত্তার খাতিরে রাস্তা-ঘাট অচল করে দেয়া হয়। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও যে নেই তা নয়। যেমন কানাডা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের জনপ্রতিনিধিদের সাধারণ মানুষের সাথে অনেক সময় ট্রেনে চড়তেও দেখা যায়।

আগের যুগে অনেক রাজা-বাদশাহ রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে রাজধানীর রাস্তায় ঘুরে ঘুরে প্রজাদের সুখ-দুঃখের খবর নিতেন। একজন দুস্থ নারীকে সাহায্য করার জন্য হজরত উমর রাদি. ও আবু বকর রাদি.-এর মধ্যে প্রতিযোগিতার কথাও আমরা জানি। এ ছাড়া আরব্য উপন্যাসের ১০০১ রজনীর কাহিনীতে পড়েছি, ছদ্মবেশ ধারণ করে খলিফা হারুনুর রশিদের বাগদাদের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর কথা। কিন্তু এই আধুনিক যুগের একজন শাসক দেশের সাধারণ নাগরিকের এতটা কাছাকাছি যাবেন, অন্তত নিরাপত্তার খাতিরেও এমনটি ভাবা যায় না। তা ছাড়া জনসংখ্যা যে হারে বেড়ে চলেছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ মানুষের খোঁজ নেওয়াটাও অবাস্তব বলেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু দোহার রাস্তায় একজন বাঙালির ভাগ্য পরিবর্তনের অবিশ্বাস্য কাহিনী শোনার পর মনে হলো, আরব্য রজনীর যেসব গল্প পড়েছি, তার সবই নিছক কল্পকাহিনী নয়।

কিছুদিন আগে দোহার রাস্তায় যে ঘটনা ঘটেছে, তার সাক্ষী ছিলেন দোহা-প্রবাসী একজন বাংলাদেশি নাগরিক। ওই ঘটনার প্রাণপুরুষ হলেন বর্তমান আমীরের বাবা আমির শেখ হামাদ বিন খালিফা আল-থানি। দোহার মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগ নিতে যিনি হেঁটে নয়, নতুন মডেলের ল্যান্ডক্রুজারে করে ঘুরে ফেরেন দোহা শহরের অখ্যাত গলিতে। অবাক করা কথাই বটে!


ঘটনা-১

গভীর রাত। রাস্তায় গাড়ি চলাচল নেই বললেই চলে। দোহার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ন্যাশনালের একটি সড়কের ফুটপাতে বসে আছেন একজন মধ্যবয়সী বাঙালি। পরনে লুঙ্গি, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সিগারেট ফুঁকে চলেছেন জোরে, দৃষ্টি আকাশের দিকে। কপালে চিন্তার ভাঁজ, আশপাশে কী ঘটছে সেদিকে ভ্রক্ষেপ নেই কোনো। দেখে মনে হচ্ছিলো, ভদ্রলোকের মাথায় জট পেকে আছে দুশ্চিন্তার ধূম্রজাল; একটু শান্তির স্নিগ্ধ ছোঁয়া পেতে যেন হাঁসফাঁস করছে ব্যাকুল হৃদয়।

ঠিক এ সময় রাস্তার পাশে এসে দাঁড়ালো একটি বিশাল আকারের সাদা ল্যান্ডক্রুজার। গাড়ি থেকে নেমে এলেন একজন দীর্ঘকায় কাতারি ভদ্রলোক, মুখের অর্ধেক সাদা কাপড়ে ঢাকা। মাঝরাতে রাস্তায় হঠাৎ করে উদয় হওয়া এই আগন্তুক বাঙালির পাশে এসে দাঁড়ালেন।

এত রাতে রাস্তায় বসে কী করছো?

মনটা ভালো নেই, ঘুমও আসছে না।

বাঙালি এতই আনমনা ছিলেন যে, কাতারির মুখের দিকে না তাকিয়েই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। দীর্ঘদিন কাতারে থাকার সুবাদে বাঙালি ভাই আরবিতে কথাবার্তা চালিয়ে নিতে পারেন, আর এমন অনেক কাতারির সঙ্গে তিনি আগেও কথা বলেছেন। কথোপকথন চলছিলো।

কী নাম তোমার?

জমির আলী।

কত দিন ধরে কাতারে আছো?

প্রায় ১০ বছর।

কী কাজ করো?

ঠিকাদারির কাজ করি।

দেশ কোথায়?

বাংলাদেশ।

তোমার মনটা কী কারণে খারাপ?

দেশে যেতে পারছি না, বউ-বাচ্চার মুখ দেখি না অনেক দিন হলো। কী আর বলবো, কাতারিরা আর আগের মতো নেই। কাজের শেষে ঠিকমতো মজুরি দেয় না। পেমেন্ট ঝুলিয়ে রাখে। টাকা-পয়সার বড্ড অভাবে আছি।

তাই নাকি?

দ্যাখো, সামনের রাস্তার কী হাল? এত দিন হলো, রাস্তাটাও কেউ ঠিক করছে না। বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে জমির আলীর মুখে।

তুমি থাকো কোথায়?

ওই তো, সামনের বিল্ডিংয়ের দোতলায়।

বাক্যালাপ আর না বাড়িয়ে কাতারি ভদ্রলোক গাড়িতে করে চলে গেলেন। বাঙালি বেশ কটি সিগারেট শেষ করে ঘরে গেলেন ঘুমুতে। পরদিন খুব ভোরে রুমমেটের ডাকে অকস্মাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠলেন জমির আলী।

ভাই, বাড়ির চারদিকে মিলিটারি পুলিশের লাল গাড়ি, ওরা এই বিল্ডিংয়ে কাকে জানি খুঁজছে।

আমিরের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীকে বলা হয় Lekhwiya. এরা এলিট ফোর্স। লাল টুকটুকে ল্যান্ডক্রুজার নিয়ে চলাফেরা করে। এদের ক্ষমতা অনেক। ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বাইরে কী ঘটছে তা আঁচ করার চেষ্টা করলেন জমির আলী। কিছুক্ষণ পর তাঁদের ফ্ল্যাটের দরজাতেই কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেলো। সবাই মোটমুটি আতঙ্কে জড়সড়। কোন আপদ আসছে কে জানে? ভয়ে ভয়ে জমির আলী দরজা খুলে দেখেন তাকেই খোঁজা হচ্ছে। আত্মা দেহ-খাঁচা থেকে উড়াল দিলো বলে! রাতে ওই কাতারির কথা মনে পড়ে গেলো। দুশ্চিন্তার ঘোরে কী আবোল-তাবোল বলেছিলেন, তা-ও ঠিক মনে করতে পারছিলেন না। যা-ই হোক, কী আর করা!

পুলিশ জমির আলীকে সোজা তাদের হেডকোয়ার্টারে নিয়ে গেলো। তাঁর সামনে এসে বসলেন স্বয়ং পুলিশ চিফ।

তোমার পরিবার কোথায়?

বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের কোথায়?

ফেনী।

ওদের কি পাসপোর্ট আছে।

না।

জেনারেল সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিলেন বাংলাদেশ দূতাবাসে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে অবিলম্বে জমির আলীর পরিবারের সবার জন্য পাসপোর্টের ব্যবস্থা করতে বললেন। তিনি আরও বললেন, এই বাঙালি ভদ্রলোকের পরিবারকে এক সপ্তাহের মধ্যে দোহায় দেখতে চান কাতারের আমির শেখ হামাদ।

তার মানে, রাতের সেই আগন্তুক হলেন স্বয়ং কাতারের আমির!

সবকিছু এত দ্রুত ঘটছিলো যে, জমির আলীর কাছে পুরো ব্যাপারটাই এলোমেলো এবং খুব নাটকীয় মনে হচ্ছিলো। কিন্তু শেখ হামাদের নির্দেশেই সবকিছু হচ্ছে জেনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন তিনি। আমিরের জন্য কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধায় ভিজে এলো খেটে খাওয়া মানুষ জমির আলীর দুটো চোখ।

যেমন বলা তেমনই কাজ। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ফেনী থেকে দোহায় পা রাখলো তার পরিবার। পরিবারসহ থাকার জন্য জমির আলীকে দেওয়া হলো একটি বিশাল বাড়ি, সঙ্গে চাকরিরও সুব্যবস্থা।


ঘটনা-২

কাতারের আমির শেখ হামাদের ছোটবেলাকার কথা। বাড়ির অনেক গৃহকর্মীর মধ্যে একজন হায়দরাবাদি গৃহকর্মীর সমবয়সী সন্তানের সঙ্গে শেখ হামাদের বেশ সখ্য গড়ে ওঠে। শেখের খেলার সাথি ছিলো গৃহকর্মীর ঐ সন্তান।

দিন গড়িয়ে গেছে। পরিণত বয়সে শেখ হামাদ হলেন কাতারের আমির, আর অন্যদিকে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান খুলে বসলেন আমিরের বাল্যবন্ধু। গৃহকর্মীর সন্তান হলেও ছেলেবেলাকার কথা ভুলে যাননি শেখ হামাদ। এখনো কুশল বিনিময় করতে বাল্যবন্ধুর ছোট্ট দোকানে নিয়মিত চা খেতে আসেন আমির।

আমিরের এই চা খাওয়ার কথা কিংবদন্তি হয়ে ফিরছে দোহা শহরের মানুষের মুখে মুখে। আমাদের দেশে একজন দুবাইফেরত গ্র্রামে গিয়ে যে ধরনের দাপট দেখান, সত্যিকার ক্ষমতাবানদের কথা আর নাই-বা বললাম।

ঘটনা-৩

আনুমানিক ১৯৮১ সাল। দোহার একমাত্র বাংলাদেশ স্কুলের তখন মাত্র যাত্রা শুরু। ছোটখাটো একটি বিল্ডিং ভাড়া নিয়ে স্কুলের কাজ চালানো হচ্ছিলো। দোহার রিয়েল এস্টেট নীতিমালা বড্ড একপেশে, যা মালিকের লাভটাই বেশি দেখে। ভাড়াটেদের তেমন কোনো অধিকার নেই বললেই চলে। বাড়ি ভাড়ার মেয়াদ শুরু হওয়ার আগেই মালিককে পুরো মেয়াদের বাড়িভাড়া বাবদ সব চেক গুনে গুনে জমা দিতে হয়। আর কোনো কারণে যদি চুক্তি শেষ হওয়ার আগে বাড়ি ছাড়তে হয়, তাহলে বাকি চেকগুলো ফেরত পাওয়া যায় না।

ছাত্রসংখ্যা অত্যধিক বেড়ে গেলে বাংলাদেশ স্কুল একটি বড় ক্যাম্পাস ভাড়া নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু আগের মালিকের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ তখনো শেষ হয়নি, তাই বাকি সময়ের পুরো ভাড়া দাবি করে বসেন মালিক, যা ছিলো প্রায় তিন লাখ কাতারি রিয়াল। এত টাকা পাবে কোত্থেকে বাংলাদেশি স্কুল? এর একটা বিহিত করার জন্য বাংলাদেশ স্কুল আদালতের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু আদালতও মালিকের পক্ষে রায় দেন। উপায়ান্তর না দেখে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আমির শেখ হামাদের শরণাপন্ন হয়ে তাঁর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সবকিছু শোনার পর শেখ হামাদ তাঁর চেক বই বের করে তিন লাখ রিয়ালের চেক লিখে দিয়ে বললেন, দেখুন, আদালতের রায় আমি বদলাতে পারবো না, কিন্তু আশা করি এই টাকায় আপনাদের সমস্যার সমাধান হবে।

দোহার রাস্তার নৈরাজ্য, কাতারিদের বর্ণবৈষম্য ও স্বেচ্ছাচার আমার মর্মপীড়ার কারণ হয়েছে বহুবার, এ নিয়ে লিখেছিও অনেক। কিন্তু আমির শেখ হামাদের বদান্যতা ও মহানুভবতার গল্প শুনে রোমাঞ্চিত হচ্ছি বারবার। অর্থ, বৈভব আর প্রতিপত্তির আড়ালে এমন একটি ভালো মানুষ লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটা অন্তত এই আরব দেশে কখনো আশা করিনি। মনের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের জায়গায় মনে হলো, কে যেন মলম লাগিয়ে দিচ্ছে। নিজের অজান্তেই দোহা শহরের প্রতি কেমন এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেছি। (চলবে)




আগের পর্ব পরের পর্ব



আব্দুল্লাহ আল-মামুন, কাতার থেকে



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 4-Apr-2018