bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney















কাতারের সুখ দুঃখ - ৬
আব্দুল্লাহ আল-মামুন



পরের অংশ

আগের পর্ব পরের পর্ব



চলছে পবিত্র রমজান মাস। বাংলা-সিডনির জন্য নতুন অধ্যায় লিখতে বসে ভাবলাম কাতারের রোজা-রমজান নিয়ে কিছু লিখলে কেমন হয়! রমজানের বিধান সব মুসলিমের জন্য এক হলেও সামাজিক আচার, দৈনন্দিন জীবন যাপনের ধরণ এবং খাদ্যাভ্যাসের জন্য পবিত্র রমজান মাস দেশে দেশে ভিন্ন আঙ্গিকে উদযাপিত হয়। কাতারের রমজানও তাই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপ-দাহের মধ্যে এখন কাতারে রমজান পালন করছেন সবাই।

কাতার আগমনের দুমাসের মাথায় অর্থাৎ ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হলো আমার মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম রমজান। একদিন অফিসের টেবিলে দেখলাম সার্কুলার - রমজানের জন্য পরিবর্তিত অফিস সময়সূচী। এ কদিনের ব্যস্ততায় বুঝতেই পারিনি পবিত্র রমজান শুরু হতে কেবল মাত্র সাতদিন বাকী। কাতারে অফিস টাইম হচ্ছে প্রাইভেট সেক্টরে দৈনিক ৯ ঘণ্টা আর সরকারী অফিসে ৭ ঘণ্টা। ব্যাংক, পোস্টঅফিস, টেলিফোন, পানি, বিদ্যুৎ সহ অন্যান্য অনেক সংস্থা দুবেলা খোলা থাকে যেমন সকাল ৮টা - ১২টা আবার বিকেল ৪টা - রাত ৮/৯টা। ফলে অফিস শেষ করে ব্যাংকিং, বিল দেয়া ইত্যাদি কাজ সেরে ফেলা যায়, যা খুবই উপকারী মনে হল। তবে রোজার আগমনে অফিসের সময়সীমা কমিয়ে আনা হয়। রমজানের কাজের সময় হচ্ছে বেসরকারি সেক্টরে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা আর সরকারী মন্ত্রণালয়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা, সকাল ৯টা থেকে ২টা। সিডনী থেকে কাতারে এসে এটা ছিল আমার জন্য একটি অপ্রত্যাশিত বোনাস! তবে কাতারী কর্মচারীদের জন্য এটা পোয়াবারো। ওরা আসবে দেরীতে অর্থাৎ সাড়ে নটার দিকে আবার যাবে সময়ের অনেক আগে। সাড়ে এগারোটা থেকে শুরু হবে যোহরের নামাজের প্রস্তুতি। বারোটায় যোহরের নামাজ শেষ করেই অফিস থেকে গায়েব! ফলে রমজান মাসে বিশেষ করে সরকারী অফিসগুলো অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। অন্যদিকে নির্মান খাতে কন্সট্রাকশন সাইটে খুব ভোরে কাজ শুরু হয়ে ১১টার মধ্যেই শেষ। অন্যদিকে প্রয়োজন হলে রাতেও একটা শিফট হয়।

এই প্রথম রোজা কাটাচ্ছি পরিবার থেকে অনেক অনেক দুরে। রমজানে বাসায় বানানো ইফতার খেতে পারবোনা ভাবতেই মনটা বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল বারবার। দোহায় এখন দিন বেশ ছোট। জুন জুলাইয়ের প্রচণ্ড গরমের আঁচটাও বেশ কমে এসেছে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ইফতারের সময় হচ্ছিল। সিডনীতে গ্রীষ্মকালের রোজার তুলনায় বলতে গেলে স্বর্গ। মনে পড়ে গেল নব্বই দশকের কথা যখন সিডনীতে ইফতারের সময় হত পৌনে নটার দিকে। চন্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ১১ দিন এগিয়ে আসার সুবাদে অস্ট্রেলিয়ায় রমজান এখন শীতকালে ঢুকে পড়েছে।



কাতারে দেশীয় ইফতারের স্বাদ পেতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ প্রায় প্রতি এলাকাতেই রয়েছে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ। ঢাকার মতই রেস্তোরাঁর সামনে রাস্তার উপর বিক্রি হয় হরেক রকমরে ইফতার । আমার এপ্যার্টম্যান্টের ৩০০ মিটারের মধ্যেই রয়েছে মসজিদ ও বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট। আমি খাবার কিনে এনে রুমে রেখে দিই আর আযান শুনেই ভাঙ্গি রোজা। ইফতার খেতে বসে মন ছুটে যায় সিডনীতে। ভাবতে থাকি বাসায় কি রান্না হচ্ছে আজ ? আমার প্রিয় খাবার হালিম কিংবা ডিপ ফ্রাইড সবজি ?? তবে দোহায় পবিত্র রমজান পালন করতে গিয়ে যেন দেশের আমেজ ফিরে পাচ্ছি। দিনে পুরো শহরটা ঘুমিয়ে থাকে আর রাত ১০টার পর জেগে ওঠে। জমে ওঠে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও শীশা খানা। গভীর রাত পর্যন্ত শহরতলির রাস্তায় গাড়ি, শপিং মল এবং রেস্তোরাঁয় থাকে মানুষের ভিড়। দোকান-পাট রাত আটটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। ফাস্ট ফুডের দোকানগুলো আয়োজন করে বিশেষ ইফতারের।

মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের তুলনায় মুসলিম সংখ্যালঘু দেশে রমজানের আমেজ পুরোপুরি ভিন্ন। সিডনি শহরের কথাই ধরা যাক। মুসলিম-অধ্যুষিত মহল্লায় না থাকলে আশপাশের মানুষ ও পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে পবিত্র রমজান মাস চলছে। কোয়েকার্স হিলের প্রথম দিকের দিনগুলোতে এলাকার বেশ কিছু বাংলাদেশি পরিবার মিলে পালাক্রমে বিভিন্ন বাড়ীতে আমরা তারাবীর নামাজ পড়তাম। একদিন বিশিষ্ট লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন সিডনীর শিক্ষক কাইউম পারভেজ ভাই ইউনিভার্সিটির কোয়েকার্স হিল ক্যাম্পাসে নামাজ পড়ার জন্য একটি রুমের ব্যবস্থা করলেন। তখন থেকে আমরা ওখানেই নামাজ পড়েছি।

সিডনিতে অফিস থেকে বাসায় ফিরতে দেরি হতো বলে প্রায় সিটি ট্রেনে বসেই ইফতারি সেরে নিতাম। তাই দেশের রমজান মাসের দিনগুলোর কথা ভেবে বেশ কষ্ট পেতাম। কিন্তু দোহায় এসে মনে হচ্ছে, যা হারিয়েছি তার কিছুটা হলেও এখন যেন ফিরে পাচ্ছি। তবে প্রবাসীদের কাছে সবচেয়ে সেরা হলো স্বদেশের রমজান। কোনো কিছুর সঙ্গেই যে এর তুলনা নেই। রমজান মাস এলে, বিশেষ করে কৈশোরের সেই সোনালি দিনগুলো আমাকে ভীষণ নাড়া দেয়। ভাবি, আহা! রোজার সেই দিনগুলো যদি আবার ফিরে আসতো?

কৈশোরে ইফতারির সময়টা ছিলো মাহেন্দ্রক্ষণ, সবচেয়ে আনন্দের। ইফতারির সময় হলে মহল্লায় বেজে উঠতো সাইরেন। কখনো আবার লম্বা বাঁশের ডগায় টাঙিয়ে রাখা হতো লাল রঙের ইলেকট্রিক বাল্ব। ইফতারের সময় হলেই জ্বলে উঠতো সেই লালবাতি। লালবাতি জ্বললেই বুঝতে হবে ইফতারির সময় হয়ে গেছে। বাতি জ্বললেই বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বয়ে যেতো খুশির বন্যা, শুরু হয়ে যেতো ছোটাছুটি। সবাই দল বেঁধে গেয়ে উঠতো, লাল বাত্তি জাল গ্যায়া, ইফতারির টাইম হো গ্যায়া! খেলার মাঠ থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতো বাড়ির পানে।

রাতে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে মসজিদে তারাবির নামাজ পড়তে যেতাম। নামাজ শেষ করে রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে বেশ কয়েক কাপ চা খেয়ে তবেই বাড়ি ফিরতাম। তখন সেহরির সময় এখনকার মত ছিলনা, এলার্ম দেয়া ঘড়ি কিংবা মোবাইল ফোন। কিন্তু তাতে কি? মহল্লা-বাসী জাগো, সেহরির সময় হলো বলে টিনে বাড়ি দিয়ে কিংবা ঘণ্টা বাজিয়ে উচ্চ স্বরে পাড়ার অলি-গলি থেকে সবাইকে ডাকা হতো। পালাক্রমে এই দায়িত্ব নিতো পাড়ারই লোকজন। শয়ন কক্ষের দেয়াল ভেদ করে ভেসে আসা ক্ষীণ এই ডাক শুনে সবাই সেহরির জন্য জেগে উঠতেন। আধো ঘুমে কানে ভেসে আসা সেই ডাক, দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার পর সাইরেন শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেহরির খাবার মুখ থেকে ফেলে দিয়ে ফজরের নামাজের জন্য ছোটা, সেই স্মৃতি কি কখনো ভোলা যায়? এখন অবশ্য মাইক দিয়েই সবাইকে ডাকা হয়।

কাতারে বসে রমজানের অনেক স্মৃতিকথা আজ ভিড় করছে বুকের ভেতর। ইফতারির সময় হালিম ছিলো আমার খুবই পছন্দের। মনে পড়ে, বিকেল হলেই বাড়িতে হালিম তৈরি হবে কি না সে বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতাম। বাড়ির ইফতারির মেন্যুতে হালিম না থাকলে চট্টগ্রামের চন্দনপুরায় ইকবাল হোটেলের বিখ্যাত হালিম কেনার জন্য বায়না ধরতাম। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারের ইফতারি দেশ-খ্যাত। চকের রকমারি ইফতারি খাওয়ার জন্য অনেকে মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে যেতেন।

রমজানের আগমনে কাতারের দোহা শহরের বিশেষ জায়গায় স্থাপন করা হয় কামান। ইফতারের সময় হলে এসব কামানের তোপধ্বনি নগরবাসীকে ইফতারের সময় জানিয়ে দেয়। কাতার টেলিভিশন চ্যানেলেও কামানের তোপধ্বনি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। কাতারের ঐতিহ্যবাহী এই রীতি সত্যিই উল্লেখ করার মতো।

কাতারে সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুতে ব্যাচেলর, শ্রমিক এবং নিম্নবিত্ত প্রবাসীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। এটা সবার জন্য থাকে উন্মুক্ত, ফলে অনেক অমুসলিমও এই ইফতারে শরিক হয়। ইফতারের সময় মুসলিম কিনা এ নিয়ে কোনো রকমের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না। ইফতারির জন্য খেজুর, পানীয় ছাড়াও বড় থালাতে পোলাও-এর সাথে মুরগির রোষ্ট কিংবা আরবি স্টাইলে রান্না করা মাটনের তরকারী দেয়া হয়। থালাতে যে পরিমাণ খাবার পরিবেশন করা হয় তা নূন্যতম চারজন থেকে ছয় জন রোজাদার খুব সহজে পেট পুরে খেতে পারবেন। ইফতারের এক ঘণ্টা আগেই এসব তাঁবুতে মানুষের সমাগম শুরু হয়, তাই দেরি করলে জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। খুব সুশৃঙ্খলভাবে তাঁবুতে সবাইকে বসানো হয়। ইফতারের জন্য একটি বড় আকারের থালাতে পোলাও-এর সাথে মুরগির রোস্ট কিংবা আরবি স্টাইলে রান্না করা মাটনের তরকারি দেয়া হয়। এছাড়া থাকে খেজুর ও জুস কিংবা লাচ্ছির মতো শরবত, যা এখানে লাবান নামে পরিচিত। অনেকে বাড়ী থেকে সাথে করে দুএকটি কাঁচা মরিচ, পিয়াজ কিংবা বাটিতে করে সালাদও নিয়ে আসেন।

কাতারে প্রতি রমজান মাসের একটি দিন আমি ওই তাবুতে যেয়ে আম-জনতার সাথে ইফতারি করি। একবার বেশ কয়েকজন বন্ধুকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম এমন একটি তাবুতে। তাবুর ভেতর ঢুকে দেখি হাউজ ফুল। চেহারা দেখে ও কথা শুনে মনে হলো রোজাদারদের অধিকাংশই হলো বাংলাদেশি। কোথাও বসার চেষ্টা করছিলাম। বেশ কিছু থালাতে দেখি মাত্র তিনজন করে বসে আছে। ওখানে বসতে চাইলে ওরা বলছিলেন, ভাই বসা যাবেনা, এই জায়গার মানুষটি একটু বাইরে গেছেন এখনই এসে পড়বেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, পরে দেখলাম তাদের কথামত যিনি বাইরে গেলেন তিনি আর ফিরে আসলেন না। তারা হয়তো ভাবছিলেন, যে খাবার রয়েছে তা হয়তো তিনজনের জন্য যথেষ্ট নয়। বাড়তি কেউ বসলে হয়তো খাবারে ঘাটতি পড়ে যাবে।

অথচ খাবার শেষে দেখলাম প্রায় অনেক থালাতে প্রচুর খাবার পড়ে আছে। যাইহোক খুব জড়সড় হয়ে একটা থালার পাশে বসে পড়লাম। ওখানে বসা বাকী চারজন বাংলাদেশি তেমন একটা কিছু বললেন না। অবাক হয়ে দেখলাম, বেশ কিছু মিসরি ও আরব মাত্র দুজন করে খাবারের থালা দখল করে আছে। ওখানে এমনকি তৃতীয় কাউকেও বসতে দিচ্ছেনা। এসব দেখে বিষণ্ণতায় ভরে গেলো মন। মনে হলো, আমার পবিত্র উদ্দীপনাতে কেউ যেন ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিলো। পবিত্র রমজানের মূল মন্ত্র হলো আত্মসংযম, আর রিপুর চাহিদাকে বলিদান দেয়া। কিন্তু পাঁচ তারা হোটেলের উচ্চবিত্তের ইফতার পার্টি বলুন কিংবা নিম্নবিত্তের জন্য নির্ধারিত তাবুই হোক; কোথায় খুঁজে পেলামনা রমজানের সহমর্মিতা।



রমজান মাসে স্থানীয় কাতারি নাগরিক এবং ধনী শেখেরা অকুণ্ঠচিত্তে দান-খয়রাত করেন। প্রতিটি মসজিদে বাংলাদেশের মতো মহল্লা-বাসী ইফতারি ও খাবার সরবরাহ করেন। আমি একটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর কথা জানি, যেখানে রমজান মাসের ৩০ দিন বিনা মূল্যে সবাইকে ইফতারি পরিবেশন করা হয়। রেস্তোরাঁর কাতারি মালিক ইফতারের যাবতীয় খরচ নিজে বহন করেন। তিনি এটা জাকাত নয়, বরং বাড়তি সোয়াবের জন্যই করেন।



পরের অংশ

আগের পর্ব পরের পর্ব






Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 16-Jun-2017