bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



অমর গজল শিল্পী জগজিৎ সিং
আব্দুল্লাহ আল মামুন



"হোঁটোসে ছুলো তুম, মেরা গীত অমর কার দো" (তোমার ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দাও, আমার এ গান অমর হয়ে যাবে)। জগজিৎ সিং-এর সুরের ছোয়া পেয়ে তাঁর সঙ্গীত যেমন হয়েছে অমর, তেমনি মৃত্যুকে বরণ করে নিলেও গজল ভক্তদের কাছে তিনি লাভ করেছেন অমরত্ব। ২০১১ সালের ১০ই অক্টোবর মুম্বাইর লীলাবতী হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি গজল শিল্পী জগজিৎ সিং।

তাঁর চলে যাওয়ার পর অর্ধ-দশক কেটে গেলেও ২০১১ সালের সেই দিনটির কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। অফিসে বসেই অন-লাইন সংবাদ মাধ্যমে মৃত্যুর খবর জানতে পারি। খবর পড়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ি। আমার কাছে জগজিৎ শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পীই ছিলেন না, আমার সুখ-দুঃখ ও কষ্টের সাথে একাকার হয়ে মিশে ছিল তাঁর সঙ্গীত। সুরের ইন্দ্রজালে দর্শক-শ্রোতাদের সন্মোহিত করতে গজলের আসরে আর কখনোই ফিরে আসবেননা জগজিৎ সিং, এ কথা বিশ্বাস করতে মন চাইছিলোনা।

ভালোবেসে কেউ তাকে বলে গজল সম্রাট, কেউবা গজলরাজ (কিং অব গজল)। হোক সে গজল, ভজন, লোক সঙ্গীত, গীত, কিংবা ফিল্মী গান, অসাধারণ গায়কীর মোহন মায়া দিয়ে শ্রোতাকূলের হৃদয় জয় করে তিনি রাজত্ব করেছেন সঙ্গীতের সাম্রাজ্য। তবে চূড়ান্ত সাফল্যের দেখা পেতে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ, করতে হয়েছে প্রচুর সংগ্রাম। কঠোর পরিশ্রম, সাধনা ও অপেক্ষার পরই রাজস্থানের শ্রী-গঙ্গানগরের একটি অখ্যাত মঞ্চ থেকে খ্যাতি এবং সফলতার শীর্ষে পৌছতে সমর্থ হন জগজিৎ সিং। আজ হাতে গীটার নিয়েই অনেকে মঞ্চ মাতানোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েন। কিন্তু দেখা দেখা যায় কিছুদিন পরই সেই শিল্পীর পায়ের নীচ থেকে সরে গেছে মঞ্চের তল। সঙ্গীতের আসল মানে হল সাধনা। শুরুতে মঞ্চের কথা না ভেবে সঙ্গীত শেখার দিকে মনোযোগ দিলে মঞ্চের পেছনে ছুটতে হবেনা। মঞ্চ এবং খ্যাতিই উল্টো শিল্পীর পেছন পেছন ছুটবে।

জগজিৎ-এর জন্ম পাঞ্জাবের একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন একজন সরকারী চাকুরে। তারা এতই দরিদ্র ছিলেন যে রেডিও কিংবা বাদ্যযন্ত্র দুরে থাক, এমনকি একটি ঘুড়ি কেনারও ছিলনা তাদের সামর্থ্য। জন্মের পর পরই তার নাম রাখা হয় জগমোহন। কিন্তু গুরুর পরামর্শে তার বাবা নাম বদলে রাখেন জগজিৎ। পরবর্তীতে সঙ্গীতের দুনিয়া জয় করে জগজিৎ তার নামের সার্থকতা প্রমাণ করেছেন। ছোটবেলায় তিনি শিখ গুরদুয়ারাতে ভজন পরিবেশন করতেন। জগজিৎ এর বাবাই সন্তানের সঙ্গীত প্রতিভা শনাক্ত করেন এবং অন্ধ সঙ্গীত শিক্ষক পণ্ডিত ছগনলাল শর্মার কাছে সঙ্গীত শিক্ষার তালিম নিতে পাঠান। পরবর্তীতে তিনি সাইনিয়া ঘরানার গুরু জামাল হোসেনের কাছে শেখেন খেয়াল, ঠুমরী এবং ধ্রুপদ সঙ্গীত।

জগজিৎ মঞ্চে প্রথম সাফল্যের স্বাদ পান আনুমানিক ১৯৫৫/৫৬ সালে, তিনি তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। রাজস্থানের একটি অনুষ্ঠানে জগজিৎ নিজের কম্পোজিশনে একটি পাঞ্জাবী গীত পরিবেশন করেন, যা দর্শকদের মধ্যে সাড়া জাগিয়ে দেয়। করতালিতে ফেটে পড়ে উপস্থিত দর্শক-স্রোতা। তিনি মুগ্ধ স্রোতাদের কাছ থেকে সম্মাননা সরূপ সর্বমোট ১২৫ রুপি লাভ করেন। এই ঘটনা তাকে অনুপ্রাণিত করে। কলেজে পড়াকালীন তিনি জলন্ধর অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বি-গ্রেড শিল্পী হিসাবে গান করার সুযোগ পান। রেডিওতে গাওয়া তার নিজস্ব কম্পোজিশন, "গুম সুম ইয়ে জাহা হেয়/ হাম দাম তু কাহা হেয়/গাম জাদা হো গেয়ি/ জিন্দেগী আভি যা" বেশ জনপ্রিয়তা পায়। জগজিৎ-এর কলেজ জীবনের একটি অসাধারণ কম্পোজিশন হল আনোয়ার মির্জাপুরীর লেখা গজল - "রুখছে পর্দা উঠাদে জারা সাকি, বাছ আভি রাঙ্গ মেহফিল বাদাল যায়েগা"। এতো অল্প বয়সের কম্পোজিশন যে কতটা উঁচু মানের তা শুনলে বিস্মিত হতে হয়।

ষাট দশকের শুরুতে ভাগ্যের অন্বেষণে তিনি বলিউডের ছায়াছবির জগতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু অবাক করা কথা হল, যে মখমলি গলার জন্য তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন সেই গলাই বাধ সেধে বসে।

কারণ তখন মোহাম্মদ রফি, কিশোর ও মুকেশের বাইরে অন্য কারো গলা, মুম্বাই ফিল্ম হিরোদের মুখে চলতে পারে এ কথা কেউ ভাবতেই পারতেননা। তবে জীবন্ত কিংবদন্তী লতা মুঙ্গেশকর ছিলেন ব্যতিক্রম। রেডিওতে শোনা জগজিৎ এর গজল তাকে আলোড়িত করে। লতা, বিশিষ্ট কম্পোজার মদন মোহনকে তার ছবির গানে জগজিৎকে নিতে অনুরোধ করেন। সুরকার জয়কিষণও চেষ্টা করেন। কিন্তু ফিল্মে জগজিৎ এর গলা বেমানান, এই একই যুক্তিতে মুম্বাইয়ের ছবিতে তার আর গান গাওয়া হয়না। মুম্বাইয়ে ব্যর্থ জগজিৎ-এর আর্থিক অবস্থা এতোটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে, বাড়ী ফেরার জন্য টিকিট কেনার টাকাও পকেটে ছিলনা। ফলে মুম্বাই থেকে জলন্ধর তাঁকে বিনা টিকেটে ট্রেনের বাথরুমে লুকিয়ে যেতে হয়েছিলো।

তবে মুম্বাইয়ের ব্যর্থতা ভারতের মৃতপ্রায় গজল শিল্পের জন্য যেন শাপে বর হয়। তিনি উপলব্ধি করলেন, গজলই হবে তার গন্তব্য-স্থল, সাফল্যের সিঁড়ি। এরপর জগজিৎ একের পর এক সৃষ্টি করে চললেন অসাধারণ গজল। জগজিৎ-এর সুরের যাদুতে গজল শিল্প ভারতে ফিরে পায় নতুন জীবন। পরবর্তীতে বোম্বের ফিল্ম জগৎ তার পদতলে এসে ধর্না দিতে থাকে। এখন ভাবি, ছায়াছবির প্লেব্যাক শিল্পী হিসাবে ক্যারিয়ারের শুরুতেই যদি জগজিৎ সুযোগ পেতেন, তাহলে গজলের অবতার হিসাবে হয়তো আজকের জগজিৎকে আমরা পেতামনা। জনপ্রিয় গীতের আড়ালে হয়তো হারিয়ে যেত জগজিৎ এর রাগ মিশ্রিত গজল কম্পোজিশনের দুর্লভ দক্ষতা। ছবিতে গান করার সুযোগ না পেলেও গতানুগতিক প্লেব্যাক শিল্পীদের মতো জগজিৎ নিজেকে বদলে দেননি। নিজস্ব স্টাইল বজায় রেখে তিনি সৃষ্টি করেন নতুন ধারা, আর সেখানেই আসে চূড়ান্ত সাফল্য।

১৯৭০ সালে সঙ্গীত শিল্পী চিত্রার সাথে জগজিৎ এর বিয়েটা হল তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৭৫ সালে বের হয় জগজিৎ ও চিত্রার ডুয়েট গজলের এলবাম "দি আনফরগেটেবল"। এই এলবামের গানগুলোর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা জগজিৎকে বানিয়ে দেয় সুপারস্টার। ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশেও তৈরি হয় তার সঙ্গীতের ভক্ত বলয়। ১৯৮০ সালে মহেশ ভাটের কম বাজেটের ছবি "সাথ সাথ"এ তিনি কাজ করার সুযোগ পান। স্টুডিওর খরচ দেয়ার সামর্থ্য ছিলনা ছবির পরিচালকের, তাই রেকর্ডিংয়ের খরচ জগজিৎ নিজের পকেট থেকেই দিয়ে দেন। একই বছর অন্য একটি ছবি "আর্থে"ও মিউজিক দেন জগজিৎ। এই দুটো ছবির গানই সুপার ডুপার হিট হয়। শুধু তাই নয়, ছবি দুটোর গানের ক্যাসেট এইচএমভির সর্বকালের অন্যতম বিক্রিত ক্যাসেট হিসাবে স্বীকৃতি পায়। পরবর্তীতে সরফারোশ, মুধমন, প্রেমগীত ও তুমবিন ইত্যাদিতে তার গাওয়া গান পায় তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

লতা মুঙ্গেশকরের প্রিয় গজল শিল্পী হলেন জগজিৎ। জগজিৎ এর "আহিস্তা আহিস্তা" গজলটি রেডিওতে শোনার পর লতার মগজের মধ্যে এমনভাবে ঘুরপাক খেতে থাকে যে তিনি সাথে সাথেই গানের এলবামটি কিনে নেন। ১৯৯১ সালে লতার সাথে করা "সাজদা", সর্বকালের ক্লাসিক গজল এলবাম হিসাবে স্বীকৃত। প্রথমে জগজিৎ এর সুরে কেবল লতারই গাইবার কথা ছিল। কিন্তু জগজিৎ এর সাথে গাইবার সুযোগ লতা এতো সহজে হাতছাড়া করতে চাননি। তিনি জানিয়ে দেন, এলবামে জগজিৎ এর গান চাইই। "সাজদা"র কয়েকটি গজল হল - "আদমি আদমি কো কেয়া দেগা" (মানুষ মানুষকে কি দিতে পারে), "হার তারাফ হার জাগা বেশুমার আদমি/ ফিরভি তানহাই কা শিকার আদমি" (আশেপাশে চতুর্দিকে অসংখ্য মানুষ/ তারপরও মানুষ নিঃসঙ্গতায় ভোগে)।

জগজিৎ ঐতিহ্যবাহী দেশীয় বাদ্য যন্ত্র যেমন তবলা, ঢোলক, বঙ্গো, সিতার, সন্তুর, বাঁশী, হারমোনিয়াম ইত্যাদির সাথে পশ্চিমা গীটার ও কী-বোর্ড যোগ করে রীতিমত বিপ্লব ঘটান। গজল গায়কীর সাথে গীতের মেলোডির সংমিশ্রণে প্রচলিত ধারার চেয়ে ভিন্নতর লয়ে তিনি নতুন ধারার সৃষ্টি করেন, যা গজলকে সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে। ভিন্নতার স্বাদ পেয়ে তার কনসার্টে জিনস্ পরিহিত নতুন প্রজন্মকেও ভিড় করতে দেখা যায়।

মির্জা গালিব থেকে শুরু করে গুলজার, কায়ফি আজমি, ফিরাক গোরখাপুরী, কফিল আজার, নিদা ফাজলি, সুদর্শন ফকির, কাতিল শিফায়ী সহ প্রায় সব খ্যাতিমান উর্দু কবিদের রচিত গজল তাঁর কণ্ঠের যাদুতে পেয়েছে জীবন। জগজিৎ তার পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে বের করেছেন ৮০টি এলবাম। তার জনপ্রিয় গানের তালিকা এতই বড় যে এত স্বল্প পরিসরে তা লিখে শেষ করা যাবেনা। উর্দু, পাঞ্জাবী, হিন্দি, গুজরাটি, সিন্ধি, নেপালি ভাষায় গাওয়া অসংখ্য গীত ও গজল ছাড়া বাংলাতেও তিনি গেয়েছেন অসাধারণ কিছু গান, মিটিয়েছেন বাঙালি সঙ্গীত প্রেমীদের তৃষ্ণা। তার গাওয়া "বেদনা মধুর হয়ে যায় তুমি যদি দাও", "বুঝিনিতো আমি" কিংবা "তোমার চুল বাঁধা দেখতে দেখতে" কি কখনো ভোলা যায়?

জগজিৎ কেবল একজন বড় শিল্পীই ছিলেন না তার হৃদয় ছিল আকাশের মত উদার। তিনি কোনো কিছু চাইবার আগেই মানুষকে দুহাত ভরে দিতেন। জগজিৎ কখনো নিজের কম্পোজিশন দিয়ে, কখনো আবার নিজের নাম ব্যবহার করতে দিয়ে উঠতি গজল শিল্পীদের প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছেন, যা এ যুগে মেলা ভার। ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কুমার সানুকে জগজিৎ প্রথম গান গাইবার সুযোগ করে দেন। এছাড়া অভিজিৎ, তালাত আজিজ, অশোক খোসলা, সুজা রায়, বিক্রম সিং, বিনোদ সেগালের মত শিল্পীদের ক্যারিয়ার গড়তেও তিনি সাহায্য করেছেন।

জগজিৎ হলেন একজন মানবতার শিল্পী। মানবতার জন্য তিনি ধর্ম, বর্ণ, ভৌগলিক সীমারেখা ছাড়িয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। পাকিস্তানের অসুস্থ গজল কিংবদন্তী মেহেদী হাসানের চিকিৎসার জন্য তিনি এক কোটি রুপীর তহবিল সংগ্রহ করে সংগৃহীত অর্থ নিজে মেহেদী পরিবারের হাতে তুলে দেন। তার এলবাম বিক্রির একটা বিরাট অংশ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা হয়; যার মধ্যে রয়েছে রিলিফ এন্ড ইউ, অরবিন্দ আশ্রম, স্যামনার এসোসিয়েশন অব ব্লাইন্ড, মুম্বাই হাসপাতাল, CRY, Save the Children, ALMA ইত্যাদি।

জগজিৎ-এর গজলের মধ্য দিয়ে স্রোতারা নিজেদের হাসি, কান্না, রাগ অনুরাগ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পায়, তাইতো সাধারণ মানুষের কাছে তার গজল এতোটা প্রিয়। সঙ্গীতের ভুবন থেকে হারিয়ে যাবার পার আজ আমরা অনুভব করছি জগজিৎ-এর চলে যাওয়াটা আমাদের কতটুকু নিঃস্ব করেছে, আমরা কতটুকু হারিয়েছি - "তুম চালে যাওগেতো সোচেঙ্গে/ হামনে কেয়া খোয়া হামনে কেয়া পায়া......"



আব্দুল্লাহ আল মামুন, সিডনি



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 10-Oct-2016