bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



নাগরিকত্ব আইন পরিবর্তন:
অপেক্ষমাণ অভিবাসীদের দুঃস্বপ্ন

কাউসার খান



অভিবাসনের দেশ অস্ট্রেলিয়া। আর সে অভিবাসনের দেশই জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রধান কারণ দেখিয়ে নাগরিক হতে হলে স্থায়ীভাবে বসবাসের মেয়াদ বৃদ্ধি ও আইইএলটিএস এ ৬ স্কোর করা সহ বেশ কয়েকটি শর্ত আরোপ করতে চাচ্ছে সরকার। তবে এ কারণে বিরোধিতার মুখোমুখিও হয়েছে তারা। এ নিয়ে অভিবাসীদের নাগরিকত্ব প্রদানের প্রস্তাবিত নতুন আইনটি বিল আকারে ফেডেরাল সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। বিলটি লেবার পার্টির তীব্র বিরোধিতায় পড়েছে এখন। বিরোধিতার কারণে এ বিলের পক্ষে-বিপক্ষে ক্রসবেঞ্চ ভোট নেয়ার জন্য পাঠানো হচ্ছে উচ্চ-কক্ষ, সিনেটে। এ বিলকে রুখে দেয়ার জন্য বিরোধী দলের নিজেদের ভোট ছাড়াও আরও ১০টি ক্রসবেঞ্চ ভোট প্রয়োজন পড়বে। সে ভোটগুলো তাদের পক্ষে যদি পড়ে তাহলে সরকারি দল উত্থাপিত এই বিল পাস হবে না। আর পাস না হলে নাগরিকত্বের প্রস্তাবিত নতুন আইনে অন্যান্য শর্তের সাথে যে চার বছর স্থায়ীভাবে বসবাস ও আইইএলটিএস পরীক্ষায় ৬ স্কোর করার আবশ্যিক শর্ত রাখা হয়েছে সেগুলো পূরণ না করেই আগের নিয়মে অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিক হতে পারবেন স্থায়ীভাবে বসবাসকারী অভিবাসীরা।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লিবারেল পার্টি আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সহায়তা নিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে এবং দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে লেবার পার্টি হয় প্রধান বিরোধী দল। প্রথম থেকেই লিবারেল পার্টির সাথে জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো অভিবাসী ও মুসলিম ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে ছিল তার মাঝে সিনেটে অবস্থান রয়েছে অধিকতর কঠোর পোলীন হ্যান্সনের ওয়ান ন্যাশন দলটি, যারা আদর্শগত-ভাবেই অভিবাসন বিরোধী। গত এপ্রিলে যখন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসীদের নাগরিকত্ব প্রদানের আইনে ব্যাপক পরিবর্তনের ঘোষণা দেন তখন ওয়ান ন্যাশন দলটির প্রধান সিনেটর পোলীন হ্যান্সন বলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাহলে প্রধানমন্ত্রী আমাদের উপদেশ গ্রহণ করেছেন। রাজনৈতিক দল ছাড়া যারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হোন তারা ক্রসবেঞ্চার হিসেবে পরিচিত। সাধারণত কোন বিলের পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণ না হলে ক্রসবেঞ্চ ভোটের প্রয়োজন পড়ে। তাঁদের ভোটের উপরই বিলটি আইনে পরিণত হবে কি না সেটা নির্ধারণ হয়। যেহেতু ক্রসবেঞ্চ ভোটে পোলীন হান্সনদের প্রভাব নেহাত কম নয় তাই অনেকই ধারণা করছেন বিলটি সম্ভবত আইনে পরিণত হয়েই যাবে। এমনটাই ইঙ্গিত করে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পুরনো উদারমনা পত্রিকা সিডনি মর্নিং হেরাল্ড তাদের এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, রাজনীতিবিদরা কোনটা সঠিক সেটা নয়, কোনটা জনপ্রিয় সেটা করে। এখন নাগরিকত্ব প্রদানের প্রস্তাবিত নতুন আইনটির বিলের ভাগ্যে কি নির্ধারণ হবে তার জন্য পরবর্তী সংসদ সেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ জরুরী কিছু না হলে পরবর্তী সংসদ সেশন শুরু হবে এ বছরের ৮ আগস্ট।

পোলীন হান্সনরা রাজনৈতিক মাঠে আগে থেকে সরব থাকলেও অ্যামেরিকার ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পর আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে সরকারকে নির্দেশনা দিতে থাকে। ধারণা করা হয়, পোলীন হ্যান্সনদের জনপ্রিয়তার সূত্র ধরেই ২০১৮ সালের ফেডেরাল নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দল লিবারেল পার্টি অস্ট্রেলিয়া প্রথম শ্লোগান তুলে এই সব চমকদার পরিবর্তনের ঘোষণা দিচ্ছে। তবে প্রবাসী বাংলাদেশী বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি ও উদার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক শেখ শামীম, যিনি এখানকার উভয় রাজনৈতিক দলের সাথে ঘনিষ্ঠ, তিনি বলেন, বিল যদি পাস হয়েও যায় নির্বাচনের পর সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে লিবারেল পার্টি এ অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য।

জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রধান কারণ দেখিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের মেয়াদ বৃদ্ধি ও আইইএলটিএস এ ৬ স্কোরের শর্তের কঠোর সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় নাগরিকত্ব ও বহু-সাংস্কৃতিক ছায়া মন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা-ই যদি কারণ হবে তাহলে তারা এতদিন ধরে এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে কিভাবে?



এদিকে অস্ট্রেলিয়ার স্বায়ত্বসাশিত প্রভাবশালী সংবাদ প্রতিষ্ঠান এসবিএস তাদের নিউজ পোর্টালে এ যদি দুঃস্বপ্ন হতো তবেই ভালো হতো শিরোনামে নাগরিকত্ব প্রদানের আইন পরিবর্তনের জটিলতাকে কী করে দেখছেন দেশটিতে বসবাসরত নাগরিকত্বের জন্য অপেক্ষমাণ অভিবাসীরা, সেটার করুণ কাহিনী তুলে ধরেছে।

আট বছর আগে ভারতের পাঞ্জাব থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন সতিন্দর পাল সিং। নাগরিকত্ব আইনের পরিবর্তনে অনেকটাই ভেঙে পড়েছেন তিনি। চোখেমুখে হতাশার ছাপ নিয়ে সতিন্দর বলেন, 'মনে হচ্ছে সব সুযোগ হারিয়ে ফেলেছি যার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছিলাম, সরকারের এমন সিদ্ধান্ত রাতের ঘুমকেই উধাও করে দিয়েছে'। অনেকদিন ধরেই নাগরিকত্বের অপেক্ষার কথা জানিয়ে সতিন্দর আরও বলেন, তিনি একটি সরকারী চাকুরীর জন্য আবেদন করেছেন যেখানে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হওয়াটা প্রধান শর্ত। তার সকল পরিকল্পনায় যেন ভেস্তে যাবার পথে। ৮ বছরেও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ার ক্ষোভ নিয়ে সতিন্দর জানান, গত বছরগুলিতে তিনি সকল রাষ্ট্রীয় কর প্রদান করে যাচ্ছেন, দেশটির বাসিন্দা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন, তবে কেন তাদের নাগরিকের মর্যাদা মিলছে না! এছাড়া নাগরিকত্বের নতুন আইনের ধারায় ইংরেজি ভাষা দক্ষতা প্রমাণের বিষয়ে তিনি বলেন, 'কতবার ইংরেজি ভাষার পরীক্ষা দিতে হবে, গত ৮ বছর কি আমি অস্ট্রেলিয়ায় ইংরেজি ভাষার ব্যবহার ছাড়াই বাস করছি, বার বার এমন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়া ছাড়াও আমাদের কোনো উপায় নেই'। এ নিয়ে অনেকটা দুঃখ প্রকাশ করেই সতিন্দর বলেন, হাস্যকর ভাবে অস্ট্রেলিয়ার সরকার একজন অভিবাসীকে কমপক্ষে চার বার আইইএলটিএস এর পরীক্ষায় বসায়, শিক্ষার্থী ভিসায় আবেদন করলে একবার,অস্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করলে একবার, স্থায়ীভাবে বসবাসে জন্য আরেকবার আর এখন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করলেও আরেকবার বসতে হবে। বার বার এমন ভাষা পরীক্ষার হয়রানির কারণ তিনি জানেন না।

ভারতীয় নাগরিক সতিন্দর পাল সিং এর মত অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী রয়েছেন যাঁদের কাছে এ পরিবর্তন দুঃস্বপ্নের মত। বিশেষ করে অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী যারা বৈবাহিক সূত্রে অস্ট্রেলিয়া এসেছেন তাদের সাধারণ দৈনন্দিন কাজ চালানোর ইংরেজি ভাষার দক্ষতা আছে কিন্তু আইইএলটিএস পরীক্ষায় ৬ স্কোর করার ইংরেজি তাদের নেই কিংবা ভবিষ্যতেও অর্জন করতে পারবেন না বলে জানান। তারা অভিযোগ করে বলেছেন, এ আইন সরকার পরিবর্তন করলেও, পরিবর্তনের আগে যারা এদেশে এসেছে তাদের ক্ষেত্রে এ নতুন আইন প্রযোজ্য হওয়া উচিত হতে পারে না।

তবে যাই হোক, বর্তমান প্রেক্ষাপট দেখে অনেকে শঙ্কা করছেন, এতে করে এমনও হতে পারে, একজন তার জীবনের বেশিরভাগ সময়টুকু অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস করেও কোনদিন হয়তো 'আমি অস্ট্রেলিয়ান বলতে পারবে না। তবে অনেকই আশা করছেন এমনটা যেন না হয়।


কাউসার খান, সিডনি
অভিবাসন আইনজীবী - ইমেইল: kawsark@gmail.com




Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 5-Jul-2017