bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia













বিশ্বাস
ড. ফেরদৌসী জাহান


অফিসের কাজে, এবং বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগ দিতে আমাকে অনেক দেশে যেতে হয়েছে। একা একা আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গিয়েছি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেক ধরনের মানুষের সাথে মিশতে হয়েছে। তাতে আমার অভিজ্ঞতার ঝুড়িও বড় হয়েছে। তবে আমি ভাগ্যবান কিনা জানিনা, বেশির ভাগ সময়ে ভাল মানুষের দেখা পেয়েছি।

২০০৫ সাল। সেবার আমি কলাবোরেটিভ প্রজেক্ট এ কাজের জন্য সাউথ কোরিয়াতে গিয়েছিলাম। আমার অফিস (Korean Research Institute of Science and Research, KRISS) ছিল ‘দাইজু’ (Daejeon) নামে একটা শহরে। ওখানে ৫ দিন থাকার পর সপ্তাহ শেষে সিউল (Seol) এ থাকার থাকার ইচ্ছা। শনিবার সকালে দ্রুতগামী রেলে রওনা হলাম দাইজু থেকে। দুপুরে পৌঁছলাম সিউল। ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে। খুব সুন্দর ছিল হোটেলটা। জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম পাশেই আছে একটা প্যালেস।


গিয়ংবকগুং (Gyeongbukgung) প্যালেস, সিউল

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ঘুরতে বের হলাম। একা একা হাঁটছিলাম বিশাল সবুজ ঘাসের গালিচা বিছানো মাঠ, সুন্দর বাগান, নানাধরনের ফুল ফুটে আছে। পড়ন্ত বিকেলে সোনালি আলোয় খুব ভাল লাগছিল। আরও অনেকে বেরাতে এসেছে। আমি ঘুরতে ঘুরতে ফাঁকা একটা বেঞ্চে বসলাম। হঠাৎ একটা অল্প বয়সী ছেলে ও মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, May we sit here?
আমি বললাম: yes, you can.
এমনিতেই ভাষা ইংরেজি নয় এমন দেশে ঘুরতে গেলে, যে অসুবিধা হয় সেটা হল কথা বলতে না পারা। তাই যখন ছেলেটা ইংরেজিতে কথা বলল, আমিও স্বভাবসুলভ মতো তাদের সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। মেয়েটা ইংরেজি বলতে পারেনা শুধু ছেলেটা পারে। তখন জানলাম সে অস্ট্রেলিয়াতে এসেছিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স ডিগ্রী করতে। তারাও আমার কথা শুনলো। আমি বলেছিলাম একা এসেছি, তাই শুধু হোটেল থেকে গাইডেড ট্যুর ছাড়া কোথাও যাই নাই। কোরিয়া যাবার আগে আমাদের এক বন্ধু বলেছিল সিউলের একটা মার্কেট কথা, যেটার নাম শুনে অদ্ভুত লেগেছিল। উনি জোক করে বলেছিলেন: কোথায় বেরাতে যাবেন? “নাম দিমু” না “দাম দিমু”?

আসলে একটার নাম “নামদিমুন” (Namdaemun) মার্কেট। এটা সাউথ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় এবং পুরাতন স্ট্রিট-মার্কেট। তার কাছেই আর একটা মার্কেট যার নাম ‘দামদিমুন’ (Dongdaemun)। আমার একটু যাবার ইচ্ছা ছিল মার্কেটে। দরকারও ছিল, আমার ক্যামেরার ব্যাটারি শেষ হয়ে গিয়েছিল। তখন তো মোবাইল ফোন ছিল না। শুধু ক্যামেরা দিয়ে ফটো তোলা, নতুন একটা জায়গায় বেরাতে যেয়ে ফটো তুলবনা – এটা ভাবাই যায় না। কিন্তু একা যেতে মন চাইছিল না, যেহেতু কথা বলতে পারবো না, ওরাও ইংরেজি বলে না, তাহলে কিভাবে কিছু কিনব। তখন ছেলেটা বলল আমাকে সময় দিবে, অর্থাৎ আমাকে নিয়ে যাবে মার্কেটে। টিউবে যাওয়া যাবে, আর টিউব ষ্টেশন কাছেই আছে। আমিও কি ভেবে রাজী হয়ে গেলাম। ওদের সাথে রওনা হয়ে গেলাম। আমার পরিবারের সবাই শুনে বলেছে কেন আমি এভাবে অপরিচিত মানুষের সাথে যেতে রাজী হলাম। কোন বিপদ তো হতে পারত, তারা কোন খারাপ লোক হতে পারতো। কিন্তু আমার কেন জানিনা কথা বলে ভাল মনে হয়েছিল আর তারা সত্যি ভাল ছিল। আমার সাথে পুরো বিকেলটা থাকল। ছেলেটা আমার ক্যামেরা নিয়ে দোকানে আলাপ করে ব্যাটারি কিনে দিল, ক্যামেরা ঠিক করে দিল। আমি আরও টুকটাক কিছু কিনলাম, ওরা আমাকে কেনাকাটায় সাহায্য করলো। নতুন কোন দেশে বেরাতে গেলে আমার কিছু না কিছু কিনতে ইচ্ছা করে স্মৃতি রাখার জন্য। ঘোরা শেষ হলে আমাকে একটা ট্যাক্সি ঠিক করে দিল। আমি সন্ধ্যার আগে হোটেলে চলে এলাম। পরেরদিন কয়েক ঘণ্টার গাইডেড ট্যুরে যেয়ে সন্ধ্যায় সিডনির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

এমন আরও একটি ঘটনা মনে পড়ছে, সেটা হয়েছিল জাপানে। জাপানের একটা শহর ‘সুকুবা’ তে ছিলাম প্রায় দুই মাস, সেটাও অফিসের কাজে (National Measurement Institute of Japan, NMIJ). আমি থাকতাম ওদের ক্যাম্পাসে, গেস্ট হাউসে। সেটা ছিল রবিবার, আমি বাস ধরে কাছের একটা ছোট শপিং মলে গিয়েছিলাম। সপ্তাহের টুকিটাকি কেনা কাটা করে, দুপুরে খাবার জন্য একটা প্যাকেট লাঞ্চ কিনতে চাইছিলাম। জাপানে যেয়ে কোন কিছু কিনতে অসুবিধা হত, সবকিছু জাপানিতে লেখা থাকতো । তাই প্যাকেটের উপর কি লেখা আছে বা খাবার টা কিসের তৈরি জানা মুশকিল হত। তখন সেখানে একজন জাপানী মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, প্যাকেটের উপর কি লেখা আছে বলতে। ভাগ্য ভাল সেই মহিলা দেখলাম ইংরেজি জানে, তাই বলে দিল আর সেই সাথে আলাপ শুরু হল তার সাথে। সে যখন শুনল আমি বাসে ফিরবো, সে বললো, যদি আমি রাজী হই, আমাকে লিফট দিবে, তবে তার আগে ওর বাসায় যেয়ে কেনা জিনিসগুলো রেখে আসবে। জানিনা কেন তার সাথে কথা বলে ভাল লাগল, আর আমিও রাজী হয়ে গেলাম। তখন তার গাড়ীতে আগে তার বাসায় যেয়ে বাজারের জিনিষপত্র রেখে আমাকে নামিয়ে দিল। ওর নাম ‘হিরোকো’। এভাবেই আমার ‘হিরোকো’র সাথে আলাপের শুরু। তারপর থেকে ওর পরিবারের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। এখনো পর্যন্ত হিরোকোর সাথে আমার ইমেইলে যোগাযোগ হয়। আমার ফ্যামিলির সবাই শুনে বলেছে কেন আমি অপরিচিত একজনের সাথে তার গাড়িতে উঠতে রাজী হলাম। এটা কোন বিপদ আনতে পারতো। তবে এরকম ঘটনা আমার জীবনে আরও ঘটেছে, তবে আল্লাহর কাছে লাখ শুকরিয়া, সব সময় আমি ভাল মানুষ পেয়েছি, মানুষকে বিশ্বাস করে ভুল করিনি।


শিকাগো

আরও একটা ঘটনা মনে পড়ছে। সেটা বেশ আগের কথা। আমি একটা কনফারেন্সে এ যোগ দিতে শিকাগো গিয়েছিলাম। কনফারেন্স শেষে ওখান থেকে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলাম, আমেরিকার “National Institute of Science & Technology” (NIST), Gaithesrsburg দেখতে। উইকেন্ড এ আমার কাজিনের বাসায় ভার্জিনিয়াতে কাটালাম। রবিবার সারাদিন ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস এবং স্মিথসনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম ঘুরে দেখলাম। যে বিশাল মিউজিয়াম, অনেক শাখা। শুধু ঐতিহাসিক এবং ন্যাশনাল এয়ার এবং স্পেস -এই দুটা দেখতেই সময় চলে গেল। আমার থাকার জায়গা ছিল অফিসের কাছাকাছি একটা হোটেলে। সেখান থেকে প্রতিদিন সাটল বাস আছে অফিসের। আমার কাজিন আমাকে টিউব স্টেশনে নামিয়ে দিল।


ওয়াশিংটন ডিসি

একটা টিউব ধরেই যাওয়া, শেষ স্টেশনে নামতে হবে। বলা বাহুল্য সেবার আমার প্রথম বার আমেরিকাতে যাওয়া, তাও একা। আমেরিকানদের এক্সেন্ট বুঝতে একটু অসুবিধা হত। যাহোক ট্রেনে বসে আছি, ট্রেন তার গতিতে চলছে। স্টেশনে থামছে, যাত্রী নামছে, আবার চলছে। মাঝে মাঝে নিয়ম মতো ঘোষণা হয়েছে, আমি ঠিক মতো শুনিনি, মানে মনোযোগ দেই নি। যেহেতু জানি আমি নামবো একদম শেষ স্টপে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ খেয়াল করলাম ট্রেন থেমে আছে একটা স্টেশনে, আর যাচ্ছে না। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার বগিতে কেউ নাই। এমনকি স্টেশনেও কাউকে দেখতে পারছিলাম না। মনটা অজানা আশংকায় কেপে উঠল। এমন সময় একজন ইউনিফরম পরা লোক এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, কেন আমি নামছি না এবং এটাও বললো এই ট্রেন আর যাবে না। ট্রেন লাইনে কাজের জন্য এই পরিবর্তন হয়েছে। এটা অন্যদিকে চলে এসেছে। এখন আমাকে অন্য একটা প্ল্যাটফর্ম থেকে আর একটা ট্রেন ধরে গন্তব্য স্থলে যেতে হবে। তখন সন্ধ্যার আঁধার নেমে এসেছে। স্টেশনে তেমন কেউ নেই, রবিবার রাতে সব জায়গায় একইরকম, ফাঁকাফাঁকা। ঘনঘন ট্রেন নাই। আমার তখন বুকে কাঁপুনি চলে এসেছে। শুধু দোয়া কালাম পড়ছি। তখন মোবাইল ফোনও ছিল না। নতুন একটা দেশে একাকী রাতের বেলা তখন পাঁচ মিনিট আমার কাছে পাঁচ ঘণ্টা মনে হচ্ছে। তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত ট্রেন এ উঠলাম। আমার বগিতে আর মাত্র দুইজন মানুষ ছিল। একটা আমেরিকান দম্পতি, ষাটের ঊর্ধ্বে বয়স হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের সাথে আলাপ শুরু করলাম। আমি বিজ্ঞানী শুনে এবং NIST তে যাচ্ছি শুনে লোকটি বেশ আগ্রহ নিয়ে আলাপ করছিল। সে ছিল আর্মিতে ইঞ্জিনিয়ার, এখন অবসর জীবনে। সে আমাকে তার কার্ড দিল, আমিও আমারটা তাকে দিলাম। তারা জিজ্ঞেস করলো কিভাবে আমি হোটেলে যাব। আমি যখন বললাম ট্যাক্সি নিয়ে যাব। ভদ্রলোকটি তখন বলল, এত রাতে যেন একা না যাই। তারা প্রস্তাব দিল যদি আমি রাজী থাকি, ওদের গাড়িতে আমাকে আমার হোটেলে পৌঁছে দেবে। তারা ঐদিক দিয়েই যাবে। ততক্ষণে আমি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছি মানসিক ভাবে। ভয়ে বুক দুরুদুরু করছে। তাদের সাথে কথা বলে আমার বেশ ভাল লেগেছিল। তাই ঠিক করলাম তাদের সাথেই যাব। আল্লাহ্ সহায় তারা আসলেই ভাল লোক ছিল। আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেল সেই রাতে। তবে সবাই এই গল্প শুনে বলেছে আমি ঠিক কাজ করিনি, কোন বিপদ হতে পারত। এভাবে অপরিচিত লোককে বিশ্বাস করে তাদের গাড়ীতে ওঠা ঠিক হয়নি। যাইহোক, এরকম আরও ঘটনা আছে, অনেক ভাল মানুষদের সাথে পরিচয় হয়েছে। তাই আমার মনে হয়, এখনও সুন্দর এই পৃথিবীতে অনেক ভাল মনের মানুষ আছে। আর আমিও মানুষ চিনতে ভুল করিনি।




ড. ফেরদৌসী জাহান, ক্যাসেল হিল, সিডনি




Click for details



Share on Facebook               Home Page             Published on: 30-Oct-2022

Coming Events: