bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



পিংক সিটি
ফারুক কাদের



(১)

ঢাকা শহরের বাইরে অনেক পরিকল্পিত আবাস গড়ে উঠেছে: কতটা পরিকল্পিত বা কতটা ডেভেলপারদের বিজ্ঞাপনের মায়াজালে সৃষ্ট স্বপ্নের আবাস কে জানে! যমুনা সিটি, পূর্বাচল সিটি, নর্দান সিটি - যেখানে ঢাকা শহরবাসী মানুষের ঠাঁই খোঁজার স্বপ্নেরা এসে ভিড় করছে, উঁকি দিচ্ছে, দানা বাঁধছে। পিংক সিটি ঢাকা শহরের বাইরে এমন এক বর্ণীল স্বপ্ন-জাগানিয়া আবাসস্থল অনেক পরিবারের জন্য। আমি ঢাকার পিংক সিটির কথাই বলছি, ভারতের রাজস্থানের পিংক সিটি জয়পুর নয়।

পিংক সিটি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ইমরানের শ্বশুর বাড়ী। ইমরান যখন বিয়ে করে, শ্বশুর বাড়ী ছিল তখন পশ্চিম ধানমন্ডীর মধুবাজারে। পিংক সিটি আর মধুবাজার - এ দুয়ের মধ্যে তাই স্থানকালের অনেক তফাত। শ্বশুরের নয় পুত্র ও কন্যা সন্তানের মধ্যে বয়জৈষ্ঠ্যা কন্যা হাসিনাকে বিয়ে করার সুবাদে ইমরান শ্বশুর বাড়ীতে পা রাখা প্রথম জামাই, পুত্রবধূ বলতে কেউ ছিলনা তখন। এ বাড়ীতে ইমরান জামাই হয়ে আসার পরপর বিয়ে-শাদীর একটা ছোটখাটো ধূম লেগে গেল। ইমরানের ডেনটিষ্ট শালী আঁখির বিয়ে হোল ওরই ক্লাসমেট শরীফের সাথে। শরীফকে ইমরান ওর বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখেছে। শিখা পরিচয় করে দিয়েছিল: দুলাভাই, শরীফ আমার বন্ধু ও ক্লাসমেট। বিয়ের ডামাডোলে শরীফকে অতটা মনে রাখেনি ইমরান। পরে জানল এরা ডেন্টাল কলেজে ফার্স্ট ইয়ার থেকে প্রেম করে আসছে। ইমরানের বিয়ের সময় এরা ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র-ছাত্রী। ওদের ব্যাপারে দু পরিবারেই সম্মতি ছিল। একমাত্র ও বড় জামাই হিসেবে ইমরানই বিয়ের পয়গাম নিয়ে শরীফের বাসায় যায়।

ওদিকে ক্যালিফোর্নিয়া-সিলিকনভ্যালী প্রবাসী ইমরানের সম্বন্ধী রেজা প্রবাসী আর এক বাঙ্গালী মেয়ের সাথে বিয়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ঢাকায় খবর পাঠাল সে বিয়ে করতে চলেছ। পাত্রীর অরিজিন পশ্চিম বাংলা, কিন্তু বড় হয়েছে আমেরিকাতে। ইমরানের শ্বশুর বাড়ী থেকে সামান্য ওজর আপত্তি উঠেছিল কিন্তু রেজা তার সিদ্ধান্তে অটল। প্র্যাকটিকাল কারণেই তার পক্ষে এই মুহূর্তে দেশে এসে বিয়ে করা সম্ভব ছিলনা। রেজার বিয়ে সহীহ সালামতেই সিলিকনভ্যালীতে সম্পন্ন হোল। এর পর ইমরানের সকল সম্বন্ধী ও শালা-শালীর একে একে বিয়ে হয়েছে তেমন কোন ঘটন-অঘটন ছাড়াই। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ইমরানের অন্য সম্বন্ধী তারা ওর অজি মহিলা বান্ধবী কে সিভিল কোড মোতাবেক বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়া থেকে যাবার প্রাথমিক পদক্ষেপ সারল। তারার এ পদক্ষেপ ছোট করে দেখার সুযোগ নেই এরপর ইমরানের বেশ কয়েক জন শালা শালী তারার আগ্রহে ও স্পন্সরশীপে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী হয়েছে। বাকীরা হয়েছে আমেরিকায়, তাতে বড় সম্বন্ধী রেজা ভূমিকা রেখেছে। একমাত্র মেজো শালী জুঁই দেশে থেকে গেছে।

(২)

বিয়ের আগে ইমরানরা থাকত রায়েরবাজারে। রায়েরবাজার আর মধুবাজার পাশাপাশি দু পাড়া। মধুবাজারকে পশ্চিম ধানমন্ডী ও ডাকা হয়। ১৯ নম্বর রোড মধুবাজারকে ধানমন্ডী আবাসিক এলাকা থেকে আলাদা করেছে। ধানমন্ডী ছিল পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, মধুবাজার নয়। এটা অবশ্য এখন অপ্রাসঙ্গিক। ধানমন্ডীর পরিকল্পিত থেকে অপরিকল্পিত আবাসনে রূপান্তর নাটকীয় ও লাগামছাড়া, সেখানে মধুবাজারের পরিবর্তন অবধারিত মনে হয়।

এমন নয় যে ইমরান রায়েরবাজার থেকে মধুবাজারে যেয়ে হাসিনার সাথে প্রেম করত বিয়ের আগে। বিয়ের আগে ইমরান একবার শুধু মধুবাজার গিয়েছিল, ওর নজর কেড়েছিল - গাছ গাছালি ভরা পাড়া। শিউলি, জবা, রঙ্গন, আম, জাম, কাঁঠাল, নারিকেল গাছ যেন জড়াজড়ি করে আছে ফুল বাগান আর ফল বাগান একাকার। সাত মসজিদ রোডের ওপারে মূল ধানমন্ডীর পশ আবাসিক এলাকার তুলনায় মধুবাজার কিছুটা চাপাচাপি। রাস্তা সরু ও আঁকাবাঁকা। পাড়ায় কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার বাস করেন। এর মধ্যে একজন পিডব্লিইডির সুপারটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার রাজ্জাক সাহেব আর এক জন ইমরানের শ্বশুর, ওয়াপদার রিটায়ার্ড সুপারটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার মতিনউদ্দিন সাহেব। মনে হতে পারে ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরা স্কেল দিয়ে মেপে রাস্তার জন্য জায়গা ছেড়েছেন, যাতে দুটো গাড়ী কোনরকমে গা ঘেঁষা ঘেঁষি করে পার হয়। ইমরানের রায়েরবাজার তখনও কুমার পাড়ার কাল-লাল কাদামাটির প্রলেপ আর মাটির ঘরের আদল বজায় রেখেছে, ফাঁকে ফাঁকে একটা দুটো করে টীনশেডের আধপাকা বিল্ডিং উঠছে শেরে বাংলা রোডের দু পাশে। ইমরান কি জানত মধুবাজারের সাথে একদিন ওর পারিবারিক বন্ধন গড়ে উঠবে! বিয়ের পর সপ্তাহে কয়েক দিন আসা যাওয়া করতে হবে!


(৩)

ইমরান হাসিনা দুজনেই বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, এদের মধ্যে ইমরান হাসিনার দু বছরের সিনিয়ার বা হাসিনা ইমরানের দু বছরের জুনিয়ার, যে যেভাবে দেখে। দুজনেই চাকরী করত ওয়াপদায়, হাসিনা ডিজাইনে আর ইমরান প্ল্যানিং-এ। পাশ করে প্রাইভেট ফার্মে কিছুদিন চাকরী করার পর ইমরানের মনে হোল একটা স্থায়ী সরকারী চাকরী দরকার জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য। শেষ পর্যন্ত ওয়াপদাতে চাকরী নিল। ওয়াপদাতে পাঁচ বছর চাকরী করার পর মনে হোল এবার বিয়ে করা দরকার। শেষে ওয়াপদার কলিগ বন্ধুরা উদ্যোগ নিয়ে হাসিনার সাথে ইমরানের বিয়ে ঘটাল, অবশ্য দুই পক্ষের মুরুব্বীদের ও আশীর্বাদ ছিল।

এনগেজমেন্টে আর বিয়ে এর মাঝের সময়টা ইমরান আর হাসিনা বেশ উপভোগ করেছিল। এনগেজমেন্টের পর দিন ছিল পহেলা বৈশাখ। ইমরান হাসিনাকে এই প্রথম টেলিফোন করল, হাসি আজ বাংলা নববর্ষ, চল আমরা বাইরে কোথায় ঘুরে আসি। ইমরান এই প্রথম হাসিনাকে হাসি ডাকা শুরু করল। হাসি হেসে বলল কেন বাইরে যেতে হবে কেন? কি হয়েছে? হাসির কণ্ঠ এত মিষ্টি লাগল ইমরানের কাছে, ইমরান একেবারে প্রেমে পড়ে গেল হাসির।

ইমরান কিছুক্ষণ নীরব রইল। জীবনে যা সে করেনি, কোনদিন ভেবে ও দেখেনি, তাই করল। ধীরে সুস্থে গুছিয়ে বলল, হাসি আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি। আজ তোমার সাথে আমার দেখা করতে হবে। অপর প্রান্তে নীরবতা নেমে এল। তারপর মুচকি হাসি মেশান কণ্ঠ, আমিতো তোমাকে এখনও ভালবেসে উঠতে পারিনি। ইমরান শুধু বলল, তুমি রেডি হও, আমি আসছি।

ইমরান আর হাসি শেরে বাংলা নগরের ক্রিসেন্ট লেক আর সংসদ ভবনের খোলা জায়গায় বেশ কিছু সময় কাটিয়েছিল। সংসদ ভবনের চত্বরে ওরা বসে গল্প করেছিল ওদের ভাল লাগার বিষয় গুলি যেমন কি গান ওদের ভাল লাগে, কারা ওদের প্রিয় শিল্পী। আকাশ ছিল একেবারেই মেঘশুন্য, নীল আকাশ আর মাতাল করা রোদ চরাচর কি এক আবেশে অবশ করে রেখেছিল যেন। রিকশা করে ক্রিসেন্ট লেকে আসার সময় ওদের দুজনের কি কাছে আসার সচেতন প্রয়াস ছিল, কথা বলেছিল কি দুজনে? কোথায় থেমে দুজনে মুখোমুখি বসে কথা বলে হৃদয় বিনিময়ের পালা শুরু করবে এটাই যেন ওরা দুজন চাইছিল।

ইমরানের ভাল করে মনে আছে হাসি কি রঙ্গের শাড়ী পড়েছিল একটা মেঘডম্বুর রঙ্গের শাড়ী। এখন ইমরানের মনে হয় হাসি একটা বাসন্তী রঙ্গের শাড়ী পড়লে পারত এমন বসন্ত দিনে। ইমরানের শালী যূঁই হাসিকে খুব সম্ভবত: সাজতে হেল্প করেছিল। এটা যূঁই কে জিজ্ঞেস করতে হবে। হাসি কপালে বড় কাল টিপ পড়েছিল, মেঘ-রঙ্গের শাড়ীর সাথে চমৎকার ম্যাচ করেছিল - এটাও নিশ্চয় যূঁই র আইডিয়া। হাসির লম্বা শ্যামলা চেহারা মুখে কপালের কাল টিপ এখনও ইমরানের চোখে ভাসে ভরা জল পুকুরের শাপলা ফুলের মত। (চলবে)


ফারুক কাদের, সিডনি




Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 23-Jun-2016