bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



আমার দেখা ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ
ফারুক কাদের



মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে

১৯৭১ এর ২৬শে মার্চের গভীর রাতে ঢাকায় পাক আর্মির ক্র্যাক-ডাউনের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের অপমৃত্যু ঘটে। এর আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে, যখন ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর অসহযোগিতার অজুহাতে ৭০ নির্বাচন পরবর্তী পাক পার্লামেন্ট অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে।

আমি তখন ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান ও সফররত কমনওয়েলথ একাদশের মধ্যে অনুষ্ঠিত চারদিন ব্যাপী বেসরকারি টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ দেখছিলাম। পাকিস্তান টীমের আজমত রানা প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করলে দর্শকরা মাঠে যেয়ে রানাকে ফুলের মালা দিয়ে অভিনন্দন জানায়। এর পরদিন ইয়াহিয়া খানের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা শুনে স্টেডিয়ামের বিক্ষুব্ধ বাঙ্গালী দর্শক মাঠে ফিল্ডিংরত পাকিস্তানী ক্রিকেটারদের উইকেটের ষ্ট্যাম্প দিয়ে প্যাভিলিয়ন পর্যন্ত তাড়া করে। এ থেকেই ধারনা করা যায় অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা মুক্তিকামী বাঙ্গালী জনতাকে কতটা বিক্ষুব্ধ করেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের নেতৃত্বে বাঙ্গালী জনতা তৎকালীন সারা পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তোলে। আন্দোলনের সময় ঢাকা শহরে ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্ষোভরত জনতার সাথে সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সংঘর্ষ ছিল সাধারণ ঘটনা। রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্রমশই অবনতি হতে থাকে। একদিকে চলছিল ইয়াহিয়ার লোক দেখান বঙ্গবন্ধুর সাথে সমঝোতা আলোচনা আর অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্ট গুলোতে সমরাস্ত্রের স্তূপিকরন।

২৫শে মার্চের রাতেই ঢাকা শহরের অলি গলিতে সাধারণ মানুষ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে, বিডিআর (তৎকালীন ইপিআর) পীলখানায় বাঙ্গালী পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে যা পাক সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত চরম নিষ্ঠুরতা ও গণহত্যার মধ্য দিয়ে দমন করে। এরপর বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত-বর্তী এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ দানা বাঁধতে শুরু করে।



মুক্তিযুদ্ধের সূচনায়

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৬ বছর; সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুলের ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। থাকতাম আমরা ২০ নং পাটুয়াটুলী, জগন্নাথ কলেজের বাউন্ডারি ওয়ালের পাশে এক বাড়ীতে। বাবা মোঃ আবদুল কাদের জগন্নাথ কলেজের বাংলার অধ্যাপক পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৬৫ সন থেকে অসুস্থ। আমাদের এলাকায় ২৬শে মার্চের দিনভোর পাক আর্মি তাণ্ডবলীলা চালায় এলাকার পুলিশ ফাঁড়ী, থানা আর শাঁখরীবাজার ও তাঁতি বাজারের হিন্দু সম্প্রদায় প্রধান এলাকাগুলোতে। তাণ্ডবের সময় রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিন গানের গুলির কর্ণপট বিদারী ভয়াবহ শব্দ আমাকে চরম আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছিল। বাতাসে ছিল বারুদের গন্ধ, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো (স্বাধীনতার অনেক দিন পরেও আমি বাতাসে যেন বারুদের গন্ধ পেতাম)। চারিদিক থেকে দুঃসংবাদ আসছিল ভেসে: কোতোয়ালী থানা মেশিনগানের গুলিতে বিধ্বস্ত, বাবুবাজার ফাঁড়ীর দরজায় নিহত পুলিশের ক্ষত বিক্ষত লাশ পড়ে আছে, শাঁখারিবাজার ও তাঁতি বাজারে আর্মি ঘরে ঘরে ঢুকে মানুষ ব্রাশ ফায়ারে মানুষ হত্যা করছে।

শাঁখারিবাজার ও তাঁতিবাজার আমাদের পাটুয়াটুলী বাসা থেকে দূরে ছিলনা। ক্ষণে ক্ষণে গুলির শব্দ ও গ্রেনেড ফুটার আওয়াজ, আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের চিৎকার, রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী সৈন্য-বাহী ট্রাক ও ভারী যানবাহনের দূর্বীনিত চলাচলে কম্পিত রাস্তার ভারী শব্দ বাতাসে ভেসে আসছিল। ২৭শে মার্চ কারফিউ তুলে নিলে শাঁখরীবাজার ও তাঁতিবাজার থেকে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের ঢল নামে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা ও বসিলায় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেবার জন্য। হানাদার বাহিনীর উদ্দেশ্যই ছিল গণহত্যার মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী জাতিকে পদানত করে তাদের প্রাণের প্রিয় স্বাধীনতার দাবী দাবায়ে রাখা। অগণিত মানুষ নদীর ওপারে উন্মুক্ত আকাশের নীচে, খোলা উঠোনে, আস্তাবলে, অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণ করে।

২৭শে মার্চ অনেকের মত আমিও বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে ওপারে কেরানীগঞ্জে এক চাচার বাড়ী আশ্রয় নেই; উদ্দেশ্য ছিল বিক্রমপুরের নানাবাড়ি যাওয়া। নৌকায় পার হবার সময় দেখি নদীর ঘাটে গুলিতে নিহত বাঙ্গালীদের লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। লাশের দৃশ্য দ্বিতীয়বার দেখার মত মানসিক দৃঢ়তা আমার ছিলনা, কারণ আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত হিংস্র রক্তপিপাসু এক সামরিক বাহিনীর দ্বারা ঘটিত নিরস্ত্র গন-মানুষ হত্যা আমাকে হতচকিত ও ভীত সন্ত্রস্ত করে দেয়। চাচার বাড়ী একটা ছোটখাটো আশ্রয় ক্যাম্পে পরিণত হয়। অনেকেই ঢেঁকী ঘরে, গোলা ঘরে, উন্মুক্ত উঠানে সাময়িক ভাবে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী লক্ষ্য গ্রামে গঞ্জে নিজের ভিটে বাড়ী বা আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে নিরাপদ ঠাঁই খুঁজে নেওয়া।

বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে আশ্রয়গ্রহণকারী অনেকেরই বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের আশা ছিল ফেলে আসা অরক্ষিত বাড়ী ঘরে আবার ফিরে যাবে। তা আর হয়নি, কয়েক দিন পর নদীর ওপারেও হানাদার বাহিনী অতর্কিতে হামলা করে। অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। এরপর শুরু হয় ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের অন্তহীন মিছিল নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে, অনেকের জন্যই সে মিছিল শেষ হয় সীমান্তের ওপারে।

কেরানীগঞ্জে চাচার বাড়ী থেকে কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে, কিছুটা নৌকায় চড়ে শেষ পর্যন্ত নানাবাড়ি কুসুমপুরে উপস্থিত হই। পথে ঢাকা শহর থেকে পালিয়ে আসা অনেক মানুষ আমার সহযাত্রী ছিল। বিপর্যস্ত,ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত মানুষদের কষ্ট লাঘবের জন্য গ্রামবাসীরা পানীয় ও খাদ্য দিয়ে পথে পথে স্বাগত: জানায়। মনে আছে গ্রামবাসীর দেওয়া এক গ্লাস আখের গুড়ের শরবত অমৃতের মত লেগেছিল।

নানাবাড়ি কুসুমপুরে দুমাসের মত ছিলাম। শহরে থাকা অসংখ্য আত্মীয় স্বজন গ্রামের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিল; অনেক আত্মীয় যাদের জীবনে দেখিনি তাদের সাথে এই প্রথম দেখা। গ্রামে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করত; গভীর রাতে মাঝে মাঝে কামানের গোলার আওয়াজ ভেসে আসত ঢাকা থেকে আসা উত্তুরে হাওয়ায়। ঘুমে ভেঙ্গে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে জেগে থেকেছি। গ্রামে গঞ্জে হানাদার বাহিনীর আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ মানুষ হত্যার ঘটনা কানে আসতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ দানা বাঁধতে শুরু করে তলে তলে। দিনের বেলা প্রায় প্রতিদিনই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র, আকাশবাণী, শুনতাম; রাতে গোল হয়ে সবাই শুনতাম বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা। রেডিও তে প্রচারিত মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথা উজ্জীবিত করত।

তারপর হানাদার বাহিনীর আরোপিত কবরের নিস্তব্ধতার মত স্বাভাবিকতা ফিরে এলে ঢাকায় ফিরে আসি।



অবরুদ্ধ নয় মাস

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস অবরুদ্ধ ঢাকা শহরেই ছিলাম। আমি অনেকের মত মুক্তিযুদ্ধে যাইনি, বলতে বাধা নেই আমি ভীতু ছিলাম। কিন্তু বিবিসি বা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের জয়গাঁথা আমাকে উদ্বেলিত ও শিহরিত করত। জগন্নাথ কলেজের কেমেষ্ট্রী ল্যাবের এক টেকনিশিয়ান জহরুল ভাল রেডিও মেকার ছিল। ও আমাকে বিভিন্ন পার্টস যোগাড় করে একটা ট্রানজিস্টার রেডি বানিয়ে দিয়েছিল, ও রেডিও টা ফিট করেছিল একটা হার্ডবোর্ড বাক্সের মধ্যে, বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিলনা ভেতরে কি! আমি রেডির সাথে কান লাগিয়ে লো ভলিউমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনতাম।

ঢাকায় সাবধানে চলাফেরা করতাম; রাতে বাড়ীতেই থাকতাম; দিনের বেলা আমাদের স্কুল সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুলে ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী বন্ধু বান্ধবদের সাথে সময় কাটাতাম। বাংলাদেশে আমাদের ব্যাচের মধ্য থেকে কেউ মুক্তিযুদ্ধে গেছে বলে শুনিনি; হয়ত বয়স একটা ফ্যাক্টর ছিল। পরে জেনেছি ঢাকা ক্র্যাক প্লাটুনের তিন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধাই ছিল আমাদের স্কুলের: রুমী, আজাদ ও কাজী কামাল। এপ্রিল মে মাসে আমাদের ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা। ক্র্যাক প্লাটুনের তৎপরতা চলছে কিন্তু দেশ কবে স্বাধীন হবে এরকম একটা অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে ভয়ে ভয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে গেলাম। সীট পড়ে ছিল পাশেই মুসলিম সরকারী হাই স্কুলে। দু একটা পরীক্ষার পর যখন একাধিক সেন্টারে বোমা ফুটল, তখনই আমাদের পরীক্ষায় ইতি।

গ্রামে গঞ্জে ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধ তীব্রতর হতে শুরু করল, হানাদার বাহীনির হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। ক্র্যাক প্লাটুন এক রাতে যাত্রাবাড়ীর ব্রিজ বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। বোমা বিস্ফোরণের আওয়াজে জগন্নাথ কলেজের পাশে আমাদের বাসা কেঁপে উঠল। আমার বিশ্বাস হল দেশ স্বাধীন হবে, কিন্তু কবে তা জানা ছিলনা। তবে আমাদের সাহস গেল বেড়ে; রাস্তাঘাটে আর্মি দেখলে ভয় পেতামনা; জানতাম ওরাই এখন ভীত সন্ত্রস্ত; ওদের দিন শেষ হয়ে আসছে।

জগন্নাথ কলেজে আমাদের বাউন্ডারি ওয়ালের ওপারে একটা আর্মি ক্যাম্প ছিল, পরে এটা বিডিআর বাহিনীর মত একটা সিভিল আর্মড ফোর্সেস বাহিনীর ক্যাম্পে পরিণত হয়। জগন্নাথ কলেজের এই ক্যাম্পে হানাদার বাহিনী সন্দেহভাজন গেরিলা ও রাজনৈতিক কর্মীদের ধরে এনে অত্যাচারের পর অনেককেই হত্যা করত। হানাদার বাহিনী কলেজের মাঠে বেশ কয়কটি গণকবর খনন করেছিল, যেখানে অত্যাচারের পর নিহত বাঙ্গালীদের নিক্ষেপ করা হত। এর মধ্যে অনেকেই ছিল শাঁখারিবাজার ও তাঁতিবাজারের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। স্বাধীনতার পরে লোকমুখে খবর পেয়ে গণকবর উন্মোচিত করা হয়। উদ্ধারকৃত অনেক মহিলা লাশের অবশিষ্টের মধ্যে হাতের কঙ্কালে জড়ানো শাঁখার চুড়ি, শাড়ীর আঁচলের কোনার খুঁটিত গাঁথা কাগজের নোট, ঘরের চাবি আমি দেখেছি। দেখেছি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার জ্বলন্ত পরমান।

ডিসেম্বরে বম্বিং শুরু হলে এবার দেশের বাড়ী বিক্রমপুরের ভাগ্যকূলে চলে যাই, তারপর শত্রুমু্ক্ত হলে আবার ঢাকা ফিরে আসি। এর মধ্যে আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। দশ মাস রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের পর হানাদার পাক আর্মি ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।



আত্মপোলব্ধি

মুক্তিযুদ্ধে কেন যাইনি এ প্রশ্ন আমি এখন নিজের কাছেই করি! মুক্তিযুদ্ধের আগে তীব্র ও রক্তক্ষয়ী স্বাধিকার আন্দোলন, গণহত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এই ঘটনাপ্রবাহ আমাকে হতবাক করেছিল ও নতুন আত্মপোলব্ধির জীবনপ্রবাহে আমাকে সামিল করেছিল। আমরা ঢাকা শহরবাসীরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বলয়ের মধ্যে অবস্থান করছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোল, যুদ্ধ থেকে উদ্ভূত টানাপোড়ন শহরবাসীকে এতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেনি যতটা ফেলেছিল গ্রামের মানুষের জনজীবনকে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাপ তারাই বেশী অনুভব করেছিল। পুলিশ, বিডিআর ও ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রশিক্ষিত বাহিনী ছাড়া গ্রামের যে অগণিত সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, মজুর, কিশোর, যুবা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, তারা কোন সন্দেহ নাই গণহত্যা ও দেশমাতৃকার অপমানের বদলা নেওয়া, দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য জান বাজী রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমরা শহরবাসীরা অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে মানসিক ভাবে শরীক থাকলেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মত সাহস ও ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলামনা। আমরা অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করতামনা দশ মাসে দেশ স্বাধীন হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারত, যুদ্ধ আরও তীব্রতর হতো, রক্তের নদী আরও বেশী বইত, গৃহচ্যুত মানুষের মিছিল আরও দীর্ঘ হত, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে নয় মাসেই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা লাভ করে।

গ্রামের সাধারণ মানুষ দেশ স্বাধীন করে ঘরে আপন জনের কাছে ফিরে গেছে। প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে আগামী ফসলের বীজ বপনের জন্য, কল-কারখানা চালু করবার জন্য। তাদের অনেকেই শহরে এসে সিক্সটিন ডিভিশনের তকমা গায়ে লাগায়নি। তারা মুক্তিযুদ্ধর সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্যও আগ্রহী ছিলনা, কারণ এ জন্য তো তারা মুক্তিযুদ্ধ করেনি। সার্টিফিকেটের মধ্যে হয়তো স্বীকৃতির একটা ব্যাপার ছিল, কিন্তু বৈষয়িক প্রাপ্তির বিষয়টিও লুক্কায়িত বা ইঙ্গিত দেওয়া ছিল, নাহলে এত তাগিদ দেখা গেল কেন সার্টিফিকেট সংগ্রহের জন্য!



স্বাধীনতার সুফল কারা পেল

পরবর্তী কালে স্বাধীনতার সুফল ও সোনালী ধান আমরাই বেশী ঘরে উঠিয়েছি, যারা প্রত্যক্ষ ভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি। অধ্যাপক রেহমান সোবহান তার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ, From Two Economies to Two Nations: My Journey to Bangladesh, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সত্যিকার অর্থেই একটি জনযুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, It remained essential to build a society where the common people are given a sufficient material stake in the rewards of independence and a commensurate democratic stake in shaping a modern Bangladesh. Instead, we have built a more inegalitarian society than we inherited where the fruits of independence have been appropriated by a narrow elite who have come to dominate the economic and political life of contemporary Bangladesh.

আমার স্কুলের সকল হিন্দু বন্ধু মুক্তিযুদ্ধের সময় সঙ্গত কারণেই ভারতের পশ্চিম বাংলায় অবস্থান করছিল। যুদ্ধাবসানে সবাই স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে। এর মধ্যে শেষ পর্যন্ত দুই বন্ধু বাংলাদেশে টিকেছে। বাকী ৫/৬ জন একে একে পশ্চিম বাংলায় স্থায়ী ভাবে থেকে গেছে। আমার এই বন্ধুদের দেশান্তরী হবার বাস্তবতা ও বেদনা অনেকটাই অনুভব করি, কারণ আমি নিজেই এখন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।

আজ বিজয় দিবসে প্রশ্ন উঠতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মধ্যে কি বৈষয়িক ব্যাপারটি জড়িত ছিল, নাকি জনগণের স্বাধিকার ও সবাইকে নিয়ে সুখী হবার বিষয়টি মুখ্য ছিল!



ফারুক কাদের, সিডনি, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 24-Dec-2016