bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia













গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা (৪)
ড. নজরুল ইসলাম


ল্যাবরেটরি হাই স্কুল ১০.৭ একর জমির উপর অবস্থিত। কিন্তু শুরুতে আমাদের খেলার মাঠ ছিলোনা। ১৯৫৮ সালে স্কুল স্থাপনের সিদ্ধান্তের পরপরই সরকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন জমি দখল করে নেয়। ধানমন্ডি ছিল ঢাকার অভিজাত এলাকা। এই জমির প্রতি নজর ছিল অনেকেরই। সরকারের পরিকল্পনা বানচাল করার জন্য কিছু লোক সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। তারা চেষ্টা করেছিল নতুন স্কুলটা যেন ট্রেনিং কলেজ সীমানার মধ্যে স্থাপিত হয়। পরিকল্পনা বানচাল করার জন্য অনেকে জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রি করে দেয়। অধ্যক্ষ ওসমান গনি সাহেবের তীব্র প্রতিবাদে স্বার্থান্বেষী মহলের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। জমিটা এমনিতেই ছিল নিচু এবং ডোবা-নালায় ভরা। পুকুর এবং ডোবা ভরাট করে খেলার উপযোগী মাঠ তৈরি করতে অনেকটা সময় লেগেছিল। দুর্ভাগ্যবশত, ভরাট করার পর মাঠের একাংশের মাটি বসে যায়। বেশ কিছু দিন মাঠের সেই অসমতল অংশে আমাদের যাওয়া বারণ ছিল।

আমাদের স্কুলে খেলাধুলার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল কেননা খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। আমাদের প্রথম ফিজিক্যাল এডুকেশন শিক্ষক ছিলেন খবিরউদ্দিন আহমেদ স্যার। পরবর্তীতে আমরা মির্জা শামসুল হক স্যারকে ফিজিক্যাল এডুকেশন শিক্ষক হিসাবে পেয়েছি। টিফিনের পর আমাদের শারীরিক প্রশিক্ষণ ক্লাস হতো। সেই ক্লাসে আমরা বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম করতাম। এ ছাড়া আমাদের স্কুলে খেলাধুলার ভালো বন্দোবস্ত ছিল। প্রধান ভবনের সামনে ছিল বিরাট মাঠ। খেলাধুলার সরঞ্জামও ছিল অনেক রকমের। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, ভলিবল, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি তো ছিলই, এমনকি বেসবলও ছিল। টিফিনের পর খেলাধুলা করার অনুমতির জন্য দরখাস্ত নিয়ে যেতাম এসিস্টেন্ট হেডমাস্টার বাসিত স্যারের কাছে। উনার অনুমোদনের পর দরখাস্তটা নিয়ে যেতাম মোকসেদ ভাইয়ের কাছে। মোকসেদ ভাই ছিলেন আমাদের হেডমাস্টার সালেক স্যারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পিওন। স্টোররুমের চাবি থাকতো উনার কাছে। উনার কাছ থেকে খেলাধুলার সরঞ্জামাদি নিয়ে খেলতে যেতাম। খেলা শেষে উনাকে সেগুলো ফেরত দিতে হতো। মোকসেদ ভাইয়ের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল, প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টা বাজিয়ে পুরো স্কুলকে জানানো। আমরা উনার ঘণ্টার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, বিশেষ করে দুপুরে টিফিনের সময় এবং বিকেলে ছুটির সময়। সালেক স্যারের ঘরের পাশে দর্শনার্থীদের অপেক্ষা করার জন্য একটা ঘর ছিল। মোকসেদ ভাই সেখানে বসে থাকতেন। সালেক স্যারের সঙ্গে দেখা করতে হলে মোকসেদ ভাইয়ের মাধ্যমে যেতে হতো। আমরা এই জায়গাটা এড়িয়ে চলতাম। কেননা হেড স্যারের তলব মানেই কোনো খারাপ খবর অপেক্ষা করছে।

ফুটবল খেলাটা আমাদের স্কুলে খুব জনপ্রিয় ছিল। আমরা সবাই কমবেশি ফুটবল খেলার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলাম। অনেক সময় কাদা-বৃষ্টির দিনেও ফুটবল খেলতাম। ফলে আমাদের কাপড়ে কাদা লেগে যেত। এতে বাসায় ফেরার পথে বাসের অন্যান্য যাত্রীরা বিরক্ত হত। তাই কন্ডাক্টররা আমাদের বাসে উঠতে দিতে চাইতো না। পকেটে রিকশা ভাড়া থাকলে রিকশায় নতুবা পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতাম। প্রতি বছর আমাদের আন্তঃহাউস ফুটবল টুর্নামেন্ট হতো। আমাদের স্কুল প্রতিষ্ঠায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ ওসমান গনি সাহেবের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ টুর্নামেন্টের নাম রাখা হয়েছিল 'ওসমান গনি শিল্ড'। সেটা ছিল নক আউট প্রতিযোগিতা। সাধারণত সিনিয়র ভাইরা এতে খেলার সুযোগ পেতেন। ষষ্ঠ শিক্ষাবর্ষ (১৯৬৬) থেকে ছাত্রদের সিনিয়র, ইন্টারমিডিয়েট এবং জুনিয়র এই তিনটি গ্রুপে ভাগ করে আন্তঃহাউস ফুটবল লীগ প্রতিযোগিতা চালু করা হয়। খেলাগুলো ছিল খুবই প্রতিযোগিতামূলক এবং উত্তেজনাপূর্ণ। এ ছাড়া আমাদের স্কুলের ছাত্ররা আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতো। একটা খেলার কথা মনে পড়ে। সেটা ছিল তৎকালীন আন্তঃস্কুল চ্যাম্পিয়ন নবকুমার ইন্সটিটিউশনের বিরুদ্ধে ফাইনাল বা সেমিফাইনাল ম্যাচ। খেলায় হেরে গেলেও শেষ পর্যন্ত আমাদের স্কুলের ছেলেরা লড়েছিল। খেলার এক পর্যায়ে আমাদের দলের অধিনায়ক ভোলা ভাই আহত হয়েছিলেন।

খেলাধুলার জন্য সবচেয়ে ভালো সময় ছিল ডিসেম্বর মাস। বার্ষিক পরীক্ষার পর পড়াশুনা থাকতো না। আবহাওয়া থাকতো সুন্দর। আমরা সারাদিন খেলে কাটিয়ে দিতাম। প্রথম দিকে আমাদের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হতো ডিসেম্বর মাসে। পরবর্তীতে ডিসেম্বর মাসে রোজা এসে যাওয়ায়, ১৯৬৭ সাল থেকে বছরের শুরুতে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের রেওয়াজ চালু হয়। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হতো টিচার্স ট্রেনিং কলেজের মাঠে। মাঠটা বেলুন, রঙিন কাগজ, রিবন ইত্যাদি দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো হতো। শামিয়ানা টাঙিয়ে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা করা হতো। মাইকে থাকতো গান আর বিভিন্ন ঘোষণা। থাকতো একটা উৎসব উৎসব আমেজ। সারাদিন ধরে আমরা খুব মজা করতাম। বাইরে থেকেও অনেক দর্শক আসতো আমাদের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা দেখতে। অনুষ্ঠান শুরু হতো প্রধান শিক্ষকের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে। তারপর আমরা মার্চ পাস্টের মাধ্যমে অতিথিদের সম্মান প্রদর্শন করতাম। সিনিয়র, ইন্টারমিডিয়েট, জুনিয়র-এ, জুনিয়র-বি এবং ইনফ্যান্ট, এই পাঁচটি ধাপে ছাত্রদের ভাগ করে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় একটা ইভেন্ট থাকতো – ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’। আমরা সবাই ইভেন্টটা খুব উপভোগ করতাম। আমার সহপাঠী জামাল সেই ইভেন্টে বরাবর ভালো করতো। আমরা প্রতি বছর অপেক্ষা করতাম এইবার জামাল কি বেশে আবির্ভূত হবে। একবার সে এসে ছিল ভিক্ষুকের বেশে। তার সাজ এতই নিখুঁত ছিল যে সত্যিকারের ভিক্ষুক ভেবে তাকে মাঠে ঢুকতে দেয়া হচ্ছিলো না। দুঃখের বিষয়, জামাল এ বছর আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলা গেছে। মহান আল্লাহতালা তাকে বেহেশত নসিব করুন।

আউটডোর খেলার পাশাপাশি আমাদের স্কুলে ছিল নানান ধরণের ইনডোর খেলার সুযোগ। আমাদের কমনরুমে টেবিল টেনিস, ক্যারাম, দাবা, লুডু এবং বাগাডুলি সহ আরো অনেক খেলার ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া আমাদের কমনরুমে পড়ার জন্য ছিল বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম হলো - দৈনিক পাকিস্তান, Pakistan Observer, সওগাত, Reader’s Digest, খেলাঘর, সবুজ পাতা, টাপুর টুপুর এবং বিজ্ঞান সাময়িকী। আমরা অনেকে টিফিনের সময় কমনরুমে সময় কাটাতাম। বিশেষ করে বৃষ্টি বাদলের দিনে।

প্রথম বছর থেকেই আমাদের স্কুলের ছাত্ররা কাব (৮ থেকে ১১ বছর বয়স্কদের জন্য) এবং স্কাউট বাহিনীতে অংশ নেয়। স্কুলে স্কাউট গ্রুপ গঠনের প্রধান কৃতিত্ব হচ্ছে খবিরউদ্দিন আহমেদ স্যারের। উনার তত্বাবধানে আমাদের স্কুলের ছাত্ররা ১৯৬২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথমবারের মতো স্কাউট ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেছিল। ক্যাম্পটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কৌচাকুড়িতে (বর্তমান নাম মৌচাক)। এই ক্যাম্পে আমাদের স্কুলের ছাত্ররা তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল। ট্রুপ লিডার ছিলেন শহিদুল্লাহ খান বাদল। পরবর্তীতে বাদল ভাই সমগ্র পাকিস্তানে শ্রেষ্ঠ স্কাউট পুরস্কার পেয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৬৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় বাদল ভাই প্রথম হয়েছিলেন। আমাদের স্কুলের ছাত্রদের সাফল্য শুধু যে ভালো রেজাল্টের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বাদল ভাই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। লেখাপড়া ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্রদের সাফল্যের আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে। আমার প্রতিবেশী এবং ছোটবেলার বন্ধু নূরুল কবির কণা ১৯৬৩ সালে আন্তঃস্কুল এথলেট চ্যাম্পিয়ন এবং ১৯৬৪ সালে সিটি ইন্টার স্কুল স্পোর্টস চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ইউসুফ জাই ভাই ১৯৬৫ সালে এবং আলী নকী ভাই ১৯৬৬ সালে বিশ্ব শিশু দিবস চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রেসিডেন্ট পদক পেয়েছিলেন। সহপাঠী আবু তারেক ১৯৬৮ সালে বিশ্ব শিশু দিবস রচনা প্রতিযোগিতায় প্রেসিডেন্ট পদক লাভ করেছিল। আমাদের শিক্ষকরা সবসময় আমাদেরকে অলরাউন্ডার ছাত্র হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, “বইয়ের পোকা” নয়। (চলবে)




ড. নজরুল ইসলাম, কার্টিন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া





Click for details



Share on Facebook               Home Page             Published on: 18-Nov-2021

Coming Events:
আঙ্গিক থিয়েটার প্রযোজিত সিডনিতে প্রথমবার
লাইভ মিউজিক সহ যাত্রা-পালা