bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



"...আমিতো এসেছি
কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে"

দিলরুবা শাহানা



সব্যসাচী লেখক চলে গেলেন, অসংখ্য গুণীজন অজস্র কথামালা গাঁথবেন তাঁর স্মরণে। আর গাঁথারতো কথাই, তাঁকে উৎসর্গ করে কথামালা গাঁথার জন্য কতো কাজ যে করে গেছেন সৈয়দ শামসুল হক, সেই জন্যেই সব্যসাচী বলে অভিষিক্ত তিনি। সবাই যেমন জানে তেমনি তাঁকে জেনেছিলাম তাঁর সৃষ্টিশীল কাজ থেকে। তবে কোন একটি ব্যাপারে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পর আমি যারপর নাই কৃতজ্ঞ হই, মুগ্ধ হই, শ্রদ্ধায় আপ্লুত হই। পরে ভেবেছি সৈয়দ শামসুল হক যিনি লিখেছেন:

"তেরো শত নদী শুধায় আমাকে
কোথা থেকে তুমি এলে
...........
আমিতো এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে"

প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদ, বিদ্রোহতো তাঁর রক্তের মাঝেই বইছে। প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, প্রতিবাদী হবেন সৈয়দ শামসুল হকই। এটাইতো স্বাভাবিক।

স্বৈরাচারী শাসনামলের ঘটনা। ঘটনা সামান্য জঘন্য। সামান্য জঘন্য বলছি কারণ এর আগের স্বৈরশাসকের আমলেই আরও ঘৃণ্য, আরও জঘন্য ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। এমনি এক শাসনামলে তাদেরই আদরে একদা ধিক্কৃত দেশত্যাগী দালালেরা বাংলার মাটিতে আবার গৃহীত হয় সাদরে। তাদের নীরব প্রচ্ছায়ায় সৈয়দ শামসুল হকের ভাষায় "দেশ ছেয়ে যায় দালালের আলখেল্লায়"। এমনি এক কণ্ঠরোধ করা সময়ে নির্দেশ জারি হল সব বাসাবাড়ির দেয়ালে একই রকম নকশা আঁকতে হবে। একি কাণ্ড! এতো নাগরিক অধিকারের উপর নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপ। সব বাড়ীর দেয়ালে গম্বুজ আকৃতির নকশা আঁকার নির্দেশ। কোন কোন বাড়ীর মালিক মনে হল আনন্দে আত্মহারা হয়ে আবার কেউ কেউ ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে দেয়ালে গম্বুজাকৃতির নকশা তৈরিতে উঠে পড়ে লাগলেন। ঢাকা শহরেই কেউ সাদা চুন দিয়ে আঁকলেন নকশা, কেউ সিমেন্ট ও বালু মিশিয়ে শক্তপোক্ত স্থায়ী গম্বুজ নকশা দেয়ালে সাটলেন। আতংকে বা আনন্দে যেভাবেই হউক দেয়ালে গম্বুজ আকৃতির নকশা আবির্ভূত হতে শুরু করলো। বৈচিত্রহীন একই রূপ নয়ন-ক্লান্তিকর।

যে বাড়ীর দেয়াল বোগেনভিলিয়ার লতায় আচ্ছাদিত তাতে ফুলের উচ্ছ্বাস উপচে পড়তো তা কেটে সাফসুতরো করে ওই নকশা বসানো হয়ে গেলো। অফিস থেকে যাতায়াতের পথে অনেক কটা বাড়ীর দেয়াল ঘেঁসে থাকা জবাফুলের ঝাড়গুলোও যখন উধাও হয়ে যেতে দেখলাম কষ্ট লাগলো। মনে মনে পীড়িত হলাম। পত্রপত্রিকার পাতা উল্টাই। গভীর আগ্রহ নিয়ে খুঁজি এই বিষয়টি নিয়ে কোন প্রতিবাদ, বা নিদেনপক্ষে কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে কিনা। অবশেষে নিজেই পত্রিকায় চিঠি লিখলাম। এই নকশা আঁকার নির্দেশ যে সংবিধানবিরোধী। নাগরিকের ইচ্ছাকে গলাটিপে মারছে। দেয়াল ঘেঁষা দৃষ্টিনন্দন জবা, বোগেনভিলিয়ার ও আরও নানা লতানো গাছ উচ্ছেদ হচ্ছে। এটা অন্যায়, ভারী অন্যায়। চিঠিটা প্রকাশ হলনা। কেউ একজন একসময়ে প্রগতিশীলতার পট্টি মাথায় জড়িয়ে শহরে দাপিয়ে বেড়াতেন বর্তমানে পত্রিকার সাথে জড়িত। তাকে জিজ্ঞেস করলাম -
-দেয়ালে দেয়ালে এক রকম নকশা আঁকার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে আপনারা মানে পত্রপত্রিকার সাথে জড়িত আঁতেলরা কিছু বলছেন না কেন?
আমাকে হতভম্ব করে দিল আঁতেল ভাইয়ের জবাব
-এখন ষাটের দশক না।
আমি নিজেকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমিই শুধু ভাবছি বিষয়টা নিয়ে আর কেউই না! আমি বোধহয় বোকা। বোকারাই একা একা ভাবে। আর যারা এককাট্টা হয়ে ভাবছেন সময়টা ষাটের দশক না তারা Greatmen. কথায় বলেনা Greatmen think alike. কিন্তু না দু"দিন পরই দেখি সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক এই বিষয়টি (মানে সব বাড়ীর দেয়ালে একই নকশা আঁকার নির্দেশ যে অসাংবিধানিক, অযৌক্তিক) নিয়ে সারগর্ভ কলাম লিখেছেন। কি যে ভাল লাগলো! কেউ কেউ আছেন যারা সময় বুঝে মত প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন না, পিছপা হন না। তাদের উচ্চারণ সর্বসময়ে সর্বক্ষেত্রে আপোষহীন।

আমরা মেলবোর্নে বাংলা সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে অমর একুশে উদযাপনে সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা আবৃত্তির জন্য বেছে নিয়েছিলাম তারই পঙক্তি আজকের এই লেখার শিরোনাম। বাংলাভাষীর আত্মপরিচয় ইতিহাসের ঘাত-সংঘাত, রক্তপাত ছাড়িয়ে, চর্যাপদের অক্ষর থেকে উৎসারিত, বজ্রকন্ঠে জয়বাংলা উচ্চারণে মন্দ্রিত এরসবই অংকিত হয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায়।



দিলরুবা শাহানা, মেলবোর্ন



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 13-Oct-2016