bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



পার্থের চিঠি (১২তম পর্ব)
বোরহান উদ্দিন আহমদ

আগের অংশ



বাবলীর সাথে প্রথম বার ইষ্ট ওয়াকওয়েতেঃ
১৮ মে সোমবার। বিকেলে স্ত্রী বাবলীকে নিয়ে হাঁটতে গেলাম। বাবলী আগের ৫দিন ডাক্তারের নির্দেশ মতো পায়ের বিশ্রাম দিয়েছে, ঔষধ খেয়েছে। তার পায়ের ব্যথা অনেকটা কমেছে। আজ সে গত ১১ মে'র পরে প্রথম বার সোয়ান নদীর পারে আসলো আমার সাথে। তাকে নিয়ে প্রথমে পূর্ব দিকে বা বাম দিকে ইষ্ট ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটলাম কিছুক্ষণ। এই ইষ্ট ওয়াকওয়েতে সে আগে হাঁটেনি। দুপাশের বনভূমি, সবুজ গাছপালা আর বাম পাশে পাহাড়ের উপরে লোকজনের ঘরবাড়ী তার ভাল লাগল। কিন্তু বনভূমিতে সাপ আছে এই সতর্কবাণী দেখে তার ভয়ও লাগল। কিছুদূর হাঁটবার পর সে একজন লোক দুটো প্রকাণ্ড বড় বড় কুকুর চেইনে বেঁধে নিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসছে দেখে উলটো দিকে হাঁটা শুরু করলো। আমিও ফিরে এলাম। পরে ইয়ট ক্লাবের সবুজ চত্বরের পাশে সোয়ান নদীর পারে বেঞ্চে কিছুক্ষণ বসলাম। পরে চত্বর দিয়ে হাঁটলাম। বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়া থাকায় আগের দুই দিন সোয়ান নদীর সোয়ানেরা কোথায় যেন উধাও হয়েছিল। আজ সকালেও কোন সোয়ান দেখিনি। এখন আবার আগের মত চারটা কালো সোয়ান/রাজহাঁস দেখলাম আগের মত। ওয়েস্ট ওয়াকওয়ে দিয়ে ডান দিকে বা পশ্চিম দিকে কিছুদূর হাঁটলাম। দুই জায়গায় ওয়াক ওয়ের পাশের কাঠের ব্রিজ পার হলাম বাবলীকে নিয়ে এই প্রথম। বাবলীর ও আমার খুব ভাল লাগল। নীচে ঝর্নার মত। তাতে বুনো হাঁস খেলা করে। পরে হিলটপ পার্কে উঠবার পাহাড়ের ঢালে কিছুক্ষণ বসলাম দুজনে। খুব ভাল লাগল। নীচে ওয়াকওয়ে দিয়ে সাইক্লিষ্ট আর পদচারীরা যাচ্ছে। দুরে সোয়ান নদী। উপর থেকে দেখে খুব ভাল লাগে। জীবন কত সুন্দর!

বাড়ীওয়ালার এজেন্টের বাড়ী পরিদর্শন:
পরদিন ১৯ মে ২০১৫ মঙ্গলবার । আজ মিতিদের বাড়ীওয়ালার এজেন্টের মিতিদের এই বাড়ী পরিদর্শন'এর নির্দিষ্ট দিন। গতকাল থাকে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আজ সকাল থেকে তা' তুঙ্গে উঠেছে। সব কিছু পরিষ্কার করা হচ্ছে। গোছানো হচ্ছে। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে ধুলা সাফ করা হয়েছে। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে আমাদের কামরায় ঘুমাতে গেলাম। ঘুম থেকে জেগে দেখি তানভীর অফিস থেকে ফিরেছে। তার একটু পরে বাড়ীওয়ালার এজেন্ট আসলেন তার পরিদর্শনের জন্য। সব কামরা, বাথরুম টয়লেট, কিচেন ইত্যাদি সব কিছু চেক করলেন। তানভীর সঙ্গে ছিল। এই ভদ্রলোক তানভীরের পূর্ব পরিচিত। তানভীর যখন এই বাড়ী ভাড়া নেয় তখন এই এজেন্ট তার সব ব্যবস্থা করেছেন। ফলে কোন অতিরিক্ত কড়াকড়ি বা ধরপাকড় হয়নি।

মেল্যান্ডস পেনিন সুলা গলফ কোর্স আবিস্কারঃ
বিকেলে আমি একা হাঁটতে বের হলাম। সোয়ান নদীর পারে যেয়ে ইষ্ট ওয়াক ওয়ে দিয়ে হাঁটলাম। ২ কিমি হাঁটার পর একটা মোড়ে পৌঁছলাম। মোড়ের আগে বেশ কিছুটা জায়গায় ওয়াকওয়ে গলফ কোর্সের বাম পাশ দিয়ে গেছে। এখান থেকে দুপাশে অনেক দূর পর্যন্ত বনভূমি নেই। মোড়ে একটা মোটা খেজুর গাছের মতো পাম গাছ। মোড় থেকে ডান দিকে মোড় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গলফ কোর্সের গেটের কাছে চলে আসলাম। সাইন বোর্ডে গলফ ক্লাবের নাম লেখা দেখলাম। মেল্যান্ডস পেনিন সুলা গলফ কোর্স। এভাবে এই গলফ কোর্স ও তার নাম আবিষ্কার করলাম। এই গেটের কাছাকাছি উলটো দিকে একটা উঁচু চিমনী দেখা যায়। সম্ভবতঃ কয়লা পোড়ানো হতো এখানে গরম পানি পাইপ দিয়ে সরবরাহের জন্য। এখানে গলফ কোর্সের গেট ছাড়িয়ে হাতের ডানে প্রথম হোল থেকে খেলা শুরুর জায়গা বা টি আউট করার গ্রিন। লোকজন সেখানে ও গলফ কোর্সের ভিতরে গলফ খেলছে। মোড় থেকে সবুজ গলফ কোর্স চোখ জুড়িয়ে গেল। যাবার পথে গলফ কোর্সের শেষ প্রান্তের কাছে একজন ওয়াকারকে এই ওয়াকওয়ের নাম কি জিজ্ঞেস করেছি। সে নাম বলতে পারেনি। গলফ কোর্সের গেট ছাড়িয়ে ওয়াক ওয়ের দু'ধারে আবার বনভূমি শুরু হয়। সেখানে আধা কিমি পর্যন্ত আগালাম বনভূমির ভিতরে। বেলা পড়ে আসছিল বলে সেখান থেকে ফিরলাম। বনভূমির ভিতরে দেখলাম একজন সাইক্লিষ্ট সাইকেল চালাচ্ছে ওয়াকওয়ে দিয়ে। আগেই বলেছি ওয়াক ওয়েতে কেবল সাইক্লিষ্ট আর পদব্রজ-কারীরা চলতে পারে। কোন গাড়ী চলার অনুমতি নেই সেখানে। এই সাইক্লিষ্টের কুকুর চেইন দিয়ে বেঁধে রেখেছেন তিনি। তিনি সাইকেল চালাচ্ছেন। আর তার কুকুর তার সাথে সমান তালে দৌড়াচ্ছে। বেশ মজার ব্যাপারটা।

অষ্ট্রিয়ার দাদীর সাথে প্রথম পরিচয়ঃ
ফিরবার পথে ওয়াক ওয়েতে একজন বৃদ্ধাকে দেখলাম হাঁটছেন। সাদা চুল তার মাথায়। ছোটখাটো মহিলা। ফর্সা চেহারা। সঙ্গে প্র্যামে করে একটা শিশুকে ঠেলে নিচ্ছেন স্নেহভরে। পরে জেনেছি বৃদ্ধার বাড়ী ইউরোপের অষ্ট্রিয়ায়। এই শিশু তার ছেলের ঘরের নাতী। ৪ মাস বয়স। শিশুকে দেখা ও লালন পালনে তার বাবা মাকে সাহায্য করার জন্য অষ্ট্রিয়া থেকে এই দাদী ছুটে এসেছেন পার্থে। তার সাথে আলাপ পরিচয় হল। তাকেও এই ওয়াক ওয়ের নাম জিজ্ঞেস করলাম যাতে করে জন্মদিনে আনিসা ও তার বাবা মায়ের দেয়া বইয়ে (Perth's Best Bush, Coast & City Walks) এটার নাম বের করতে পারি। ইনিও নাম বলতে পারলেন না। পরে এক সুন্দরী বৃদ্ধা যিনি উলটো দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন তার সাথে আলাপ পরিচয় হল। তাকেও এই ওয়াক ওয়ের নাম জিজ্ঞেস করলাম। ইনিও নাম বলতে পারলেন না। অবাক কাণ্ড। সবাই হাঁটছে ওয়াকওয়ে দিয়ে, কিন্তু তার নাম কেউ বলতে পারে না। এই সুন্দরী বৃদ্ধা বয়স কালে যে কত সুন্দর ছিলেন তা বলে বোঝানো যাবে না। বৃদ্ধা অত্যন্ত ভদ্র ও সদালাপী। পরে ফিরবার সময় ইষ্ট ষ্ট্রীটে এই সুন্দরী বৃদ্ধার সাথে আবার দেখা হল দূর থেকে। চিনতে পেরে উনি হাত উঠালেন। আমি জবাবে হাত উঠালাম। দূর দেশে এদের কত সৌজন্য!

নান্ডোজ রেস্টুরেন্টে ডিনারঃ
রাতে তানভীর, মিতি, মিতির বান্ধবী আবিদা ও তার স্বামী মনোয়ারকে বীচরক (Beachrock) নামের সিটিতে নান্ডোজ (Nandos) রেস্টুরেন্টে খাওয়ালো। আমি আর বাবলীও অংশগ্রহণ করলাম। তানভীর আমাদের নিয়ে গাড়ী চালিয়ে প্রথমে মনোয়ারের বাসায় গেল। পরে মনোয়ার তার গাড়ী আগে চালিয়ে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে গেল তানভীরকে। এই নান্ডোজ রেস্টুরেন্টগুলো মূলতঃ পর্তুগীজদের। পর্তুগীজদের আবিষ্কৃত পেরি পেরি নামে আফ্রিকার তীব্র ঝাল মরিচ এদের তৈরি খাবারে ব্যবহার করে। ২০১৩ সালে সিডনীতে তানভীরদের সাথে এই নামের রেস্টুরেন্টে খেয়ে সে অভিজ্ঞতা হয়েছিল। জনবিরল বিশাল পার্থ শহরে এই বীচরক এলাকা খুন নিরিবিলি। তবে এই রেস্টুরেন্টের বিশেষ খ্যাতি আছে। তাই মনোয়ার এর খোঁজ দিয়েছিল তানভীরকে। রেস্টুরেন্টের কাঠের ফ্লোর, সিলিং কাঠের। চেয়ার টেবিল সুন্দর মসৃণ কাঠের। খাবার ছিল আমার, বাবলীর আর মিতির জন্য রোষ্ট, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্পেশাল রাইস। মনোয়ার আর তানভীর নিল নান্ডোজের পেরি পেরি'র বেশী ঝালের চিকেন। আনিসার জন্য উঁচু ছোট্ট চেয়ার দেয়া হয়েছিল যথারীতি। আনিসা তার চেয়ারে বসল না। আবিদা আর মনোয়ার তাকে কোলে নিয়ে রাখল অধিকাংশ সময়। সেজন্য তারা দুজনে ভাল করে খেতে পারল কিনা জানি না। অনেক গল্পগুজব হলো। খুব আনন্দময় পরিবেশ। তারপর বিদায়। বিদায় নিয়ে যাবার পথে মনোয়ারের গাড়ীর পিছে পিছে চলছে তানভীর তার গাড়ী নিয়ে । কারণ এই জায়গাটায় তানভীর আগে কখনও আসেনি। এক জায়গায় Drive Thru (ড্রাইভ থ্রু) নামের ম্যাকডোন্যাল্ডের (একটা চেইন রেস্টুরেন্টের)রেস্টুরেন্ট থেকে দুই মগ চায়ের অর্ডার দিল তানভীর। এই ড্রাইভ থ্রু'গুলোতে বসে খাবার কোন ব্যবস্থা নেই। গাড়ী চালিয়ে এসে গাড়ীতে বসে অর্ডার, মূল্য পরিশোধ ও খাবার সংগ্রহ করতে হয়। ড্রাইভ থ্রু ছাড়াও ভিতরে বসে খাওয়া যায় এমন ম্যাকডোল্যাল্ড রেস্টুরেন্টও আছে। আমাদের দুজনের জন্য স্প্লেন্ডা (মানে সুগারলেস সুইটেনার) দিয়ে আর তানভীরের জন্য সুগার বা চিনি দিয়ে চায়ের অর্ডার। কিন্তু আনিসা জেদ ধরলো তাকে ঐ আগুন গরম চা দিতে হবে। তার মুখ পুড়ে যাবে বলে তাকে তা দেয়া হল না। সে অসম্ভব কান্না শুরু করল। হয়তো তার দুধ খেতে হবে, খিদে লেগেছে এমন হতে পারে। তাকে আর সামাল দেয়া যাচ্ছিল না। ফলে মনোয়ারকে মোবাইলে জানিয়ে মনোয়ারের পিছনে পিছনে তাদের বাড়ীতে গেল তানভীর আমাদেরকে নিয়ে। সেখানে যাবার পর আনিসা শান্ত হল। ঐ বাসায় আবিদা আমাদেরকে চা বানিয়ে খাওয়ালো। দুধ চা। খুব মজার। সেখানে আবিদাদের বাসার তিন জন পার্টনারের আরেক পার্টনার রাকেশের সাথে দেখা হল ও আলাপ পরিচয় হল। বাঙ্গালী তরুণ, মনোয়ারের বন্ধু। এর আগে বাবলীকে তার পায়ের জন্য প্রথম বার দেখানোর দিনে আরেক পার্টনার রনীর সাথে দেখা হয়েছিল। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হল। তবে নান্ডোজে খাওয়ার এই পার্টি খুব আনন্দময় ও উপভোগ্য হয়েছিল। (চলবে)



আগের অংশ



বোরহান উদ্দিন আহমদ, পার্থ থেকে



Click for details



Share on Facebook               Home Page             Published on: 7-Jan-2016

Coming Events: