bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Australia













বিভূঁইয়ে বাংলা থিয়েটার:
রেনেসাঁ ড্রামা সোসাইটি, মেলবোর্ন
কামরুজ্জামান বালার্ক



জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে চিরকালের ঘরকুনো ভেতো বাঙালিরা আজন্মের প্রিয় স্বদেশ পেছনে ফেলে সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সুখের নীড় গড়ে তুলেছে। সাথে করে বয়ে নিয়ে এসেছে মায়ের বোল, পদ্মা-মেঘনা পাড়ের শিল্প-সাহিত্য, কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মকর্ম। এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে শত ব্যস্ততার মাঝেও আমরা আমাদের যাপিত জীবনের পরম অনুষঙ্গ করে রেখেছি এই সব চর্চাকে, যেমন করেই হোক আমাদের পূর্ব পুরুষ আর উত্তর পুরুষের মাঝে একটা মেলবন্ধন তৈরি করতেই হবে - এই যেন আমাদের একটি অলিখিত অঙ্গীকার, হাজার বছর পরও যেন জীবনানন্দীয় বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ তাদের চেতনার নদীতে ভালোবাসার দাঁড় টানে।

সংস্কৃতির জনপ্রিয় অনুষঙ্গ মঞ্চ নাটকের ইতিকথা নিয়ে একটু গৌরচন্দ্রিকা দিয়ে মূল আলোচনায় ফিরবো। কথিত আছে, বাংলা নাটকের ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো। আমাদের প্রচলিত সামাজিক, লোকজ ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানগুলোতে অভিনয় একটি প্রয়োজনীয় শিল্পকলা হিসেবে আষ্টেপৃষ্ঠে লেগেই ছিল; মন্দিরে দেবতার তুষ্টি অথবা চিরায়ত লোকগাথার উপস্থাপনে বাচিক ও শারীরিক অভিনয় সতত: বিদ্যমান ছিল - মনসা মঙ্গল থেকে গাজীর গান, সব খানেই এর বিস্তার। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে কলকাতায় তথা বাংলায় ব্রিটিশ উপনিবেশের হাত ধরেই ইউরোপিয়ান প্রসেনিয়াম থিয়েটার নাগরিক জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, যেখানে ইংরেজি নাটক ইংরেজ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দ্বারা শুধুমাত্র ইংরেজদের বিনোদনের জন্যই অভিনীত হতো। ১৭৯৫ সালে গেরাসিম লেবেদেফ নামের একজন রাশিয়ান পণ্ডিত, সংগীতজ্ঞ ও ভাষাবিদ কলকাতায় প্রথম 'বেঙ্গলি থিয়েটার' প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে ইংরেজি নাটক বাংলায় অনুবাদ করে মঞ্চের পাদপ্রদীপের আলোয় উপস্থাপন করেন।


কঞ্জুস, নির্দেশনা: কামরুজ্জামান বালার্ক, নাট্যকার: মলিয়ের, রূপান্তর: তারিক আনাম খান

সূচনা পর্বের আরো অনেক পরে ১৮৭২ সালে 'ন্যাশনাল থিয়েটার' সর্ব প্রথম কলকাতায় পেশাধারী নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে এবং বাঙালীদের দ্বারা রচিত ও অভিনীত বাংলা নাটক মঞ্চে আনে।


দেওয়ান গাজীর কিসসা, নির্দেশনা: নাঈম মিরাজ, নাট্যকার: বার্টোল্ট ব্রেখ্ট, রূপান্তর: আসাদুজ্জামান নূর

আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে প্রবাসী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেবার প্রত্যয়ে জুলাই ২০০০ সালে রেনেসাঁ ড্রামা সোসাইটি-র যাত্রা শুরু যা আজও দেদীপ্যমান। 'রেনেসাঁ' নামটি প্রস্তাব করেছিলেন বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা-র দৌহিত্র মেলবোর্নের প্রয়াত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ক্যাপ্টেন প্রদীপ আনোয়ার যিনি আমৃত্যু এই দলটির শুভানুধ্যায়ী ছিলেন। প্রথম প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল আমার তৎকালীন আবাস ২ পাইনহিল ড্রাইভ, রোভিল, ভিক্টোরিয়া-৩১৭৮ তে। কিছু আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে 'রেনেসাঁ' যাত্রা শুরু করেছিল: ১. আমরা পদ্মা-মেঘনা বিধৌত গাঙ্গেয় উপত্যকার ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা, প্রচার ও প্রসারে নিবেদিত থাকবো , ২. আমরা মঞ্চ শ্রমিক, নাটক আমাদের মেধা ও মননের ফসল যা দেখতে হবে দর্শনীর বিনিময়ে, ৩. সাধ্যের মধ্যে একই নাটকের অনেকগুলো প্রদর্শনী হবে ভিন্ন স্থানে ভিন্ন প্রসিনিয়ামে এবং ৪. নিজস্ব মৌলিক শিল্প প্রয়াস নির্মাণ ও উপস্থাপনে আমরা বিশ্বস্ত থাকবো ইত্যাদি।



সাধ ও সাধ্যের মধ্যে প্রযোজনা:

বিগত ২২ বছরে আমরা বিভিন্ন ধরনের নাটক দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করেছি, দর্শক চাহিদা বিবেচনা করে জগত সংসার তন্ন তন্ন করে আমরা যেমন সেরা ব্যঙ্গ, কৌতুক ও হাস্য রসাত্মক নাটক খুঁজে নিয়েছি তেমনি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে জীবন ঘনিষ্ঠ নাটকেরও দ্বারস্থ হয়েছি। আমাদের গৌরবময় সেরা অর্জন স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামের লাল সবুজের পতাকা - সেই অর্জনকে আমরা তুলে ধরেছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে যা আমাদেরকে শানিত করেছে এবং নতুন প্রজন্মকে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানে আগ্রহী করে তুলেছে। প্রযোজনায় বৈচিত্র্য আনার জন্য আমরা চিরায়ত সাহিত্য, সামাজিক, রহস্য ও ফোক ঘরানার নাটকও দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করেছি। গাঙ্গেয় উপত্যকার বাহিরে প্রবাসী বাঙালিদের নতুন আবাস ভূমি অস্ট্রেলিয়াতে বাংলা নাটকের দর্শক তৈরির নিমিত্তে আমাদের এত সব বিচিত্র আয়োজন।

রেনেসাঁ-র ২২টি প্রযোজনাকে (১৯টি নিয়মিত ও ৩টি অনিয়মিত) যেভাবে শ্রেণীভুক্ত করা যেতে পারে:
কমেডি নাটক - কঞ্জুস (মলিয়ের, ২০০১ ও ২০১৬), ঘর জামাই (মলিয়ের, ২০১৩), ভদ্দরনোক (মলিয়ের, ২০১০), চিরকুমার সভা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২০০৫), অচলায়তন (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২০২২) ও ইদানীং শুভ বিবাহ (মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, ২০১৪)।


নাগমন্ডল, নির্দেশনা: দীপ্ত চৌধুরী, নাট্যকার: গিরীশ কারনাড, অনুবাদ: স্বপন মজুমদার

জীবন ঘনিষ্ঠ নাটক -দেওয়ান গাজীর কিসসা (ব্রেখ্ট, ২০০২), জনতার রঙ্গশালা (ব্রেখ্ট, ২০০৮) ও সৎ মানুষের খোঁজে (ব্রেখ্ট, ২০১৯)। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাটক - ১৯৭১ (হুমায়ূন আহমেদ, ২০১২), খ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল (এস এম সোলায়মান), কবর (মুনির চৌধুরী) ও এখনো ক্রীতদাস (আব্দুল্লাহ আল মামুন, ২০১৭)। রাজনৈতিক নাটক - এলেকশান ক্যারিকেচার (এস এম সোলায়মান, ২০১৮) ও মুনতাসীর ফ্যান্টাসি (সেলিম আল দীন, ২০০৪)। চিরায়ত ও ফোক নাটক - শকুন্তলা (সেলিম আল দীন, ২০০৫), রূপবান (লোকগাথা) ও বেদের মেয়ে (জসীম উদ্দিন, ২০০৯)। সামাজিক ও রহস্য নাটক - মেরাজ ফকিরের মা (আব্দুল্লাহ আল মামুন, ২০০৭), নাগ মণ্ডল (গিরীশ কারনাড, ২০০৩) ও দ্যা মাউস ট্র্যাপ (আগাথা ক্রিস্টি, ২০১১)।

আমাদের ৩টি অনিয়মিত প্রযোজনা বিশেষ দিনগুলোতে মঞ্চায়িত হয়েছিলো (বৈশাখী মেলা এবং একুশে ফেব্রুয়ারি)।

ঘটনার ঘনঘটা - চর্বিত চর্বণ:

রেনেসাঁ-র এই দীর্ঘ পথচলা কখনো কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, ভাঙ্গনের শব্দ শুনেছি বার বার, কখনো নাট্য প্রযোজনা ও কাস্টিং নিয়ে মতদৈত্বতা, আবার কখনো নিজেদের মধ্যে পদ-পদবি নিয়ে মান-অভিমান অথবা নতুন সংগঠন তৈরির অভিপ্রায়ে অনেকে পিছু হটেছেন, কেউ কেউ আবার ফিরেছেন কিন্তু সবার সাথেই আমরা একটা সুন্দর সদ্ভাব বজায় রেখেছি। সব বাঁধা অতিক্রম করে আমরা সামনে এগিয়ে গেছি শিল্পের পদাতিক।

কঞ্জুস! কঞ্জুস! (২০০১, ২০১৬):

বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়, মঞ্চ নাটকের কমেডি কিং মলিয়ের এর 'দ্যা মাইজার' অবলম্বনে নন্দিত নাট্যজন তারিক আনাম খান রূপান্তরিত বাংলাদেশের সর্বাধিক মঞ্চায়িত ও দর্শকপ্রিয় নাটক 'কঞ্জুস' এর মাধ্যমে ২০০১ সালে রেনেসাঁ-র পথচলা শুরু। পনেরো বছর বিরতি দিয়ে ২০১৬ সালে আমরা আবার 'কঞ্জুস' মঞ্চে উপস্থাপন করি কয়েকটি চরিত্রে পরিবর্তন ও প্রায় সম্পূর্ণ নতুন কুশীলব নিয়ে। এই নাটকের প্রাণ উর্দু-বাংলার সংমিশ্রণে ঢাকাইয়া ভাষায় হাস্য রসাত্মক চটুল সংলাপ, বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি, দ্রুত লয়ে সংলাপ প্রক্ষেপণ ও জমকালো পোশাক-আশাক। দুই কিস্তিতে এটিই রেনেসাঁ-র সর্বাধিক মঞ্চায়িত নাটক। এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ষাট বছরের যুবক, বিপত্নীক হায়দার আলী যাকে সঙ্গত কারণে কঞ্জুস আলী নামে মহল্লার সকলে ডাকে। অঢেল ধন সম্পদের মালিক কঞ্জুস আলীর টাকা-পয়সার প্রতি সকলের লোভ, যার জন্য সদা সতর্ক কঞ্জুস আলী, খানা-পিনা থেকে শুরু করে সর্ব ক্ষেত্রেই তার কৃপণতা কিন্তু পেয়ার-মহব্বতের ব্যাপারে দিল বহুতই নাজুক, নয়া দুলহান নিয়ে তার ভালোবাসার বাকবাকুম ডাক পুরো নাটকে জারি থাকে যা থেকে দর্শকরা নির্মল আনন্দ পায়।

'কঞ্জুস' নাটকের প্রিমিয়ার শো-র সময় একটি অঘটন ঘটেছিলো, সিকোয়েন্স অনুসারে নাটকের শুরুতে দুই সদস্যের গায়েন দল মঞ্চে এসে গান গেয়ে ঘুরে যাবার কথা; গায়ক চঞ্চল মণ্ডল গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে উইংস-এ এসে দাঁড়িয়েছে কিন্তু তাকে খোলে সঙ্গত করার জন্য পলাশ দত্তকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তড়িঘড়ি করে চঞ্চল আমার কাছে ছুটে এসে খবরটা জানালো, আমার তো চক্ষু চড়ক গাছ, বলো কি! চঞ্চল বললো: এখন কি উপায়? আমি বললাম: নাটক ঠিক সময়ে শুরু করতে হবে, দেরি করা যাবে না, শুধু হারমোনিয়াম দিয়েই কাজ সারতে হবে, মঞ্চে ঢুকে যাও। পরে জানলাম, আগের রাতে পলাশ বাংলাদেশে ফ্লাই করেছে যার কিছুই আমরা জানতাম না। এই হলো আমাদের দায়িত্ববোধ!

এই নাটকে কঞ্জুস হায়দার আলীর চরিত্রে আমি অভিনয় করেছিলাম, নাটকের জন্য আমাকে দুর্বোধ্য ঢাকাইয়া ভাষা রপ্ত করতে হয়েছিল, চরিত্রের প্রয়োজনে সারাক্ষণ কুঁজো হয়ে থেকেছি এবং ডান হাত কিছুটা বাঁকা করে রেখেছি। নাটকের পুরো দুই ঘণ্টা একটা দৌড়ের মধ্যে থাকতে হতো, অনেক শারীরিক কসরতও ছিল, প্রচণ্ড ঘেমে যেতাম, তাছাড়া হলে এসি ছিলো না, উইংস এর পাশে সারাক্ষণ একটা ফ্যান অন করে রাখতাম একটু ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য। এই নাটকের গতি ছিল ধাবমান ট্রেনের মতো, ২০০১ সালে এটা করতে আমার কোনো সমস্যা হয়নি কিন্তু ১৫ বছর পর ২০১৬ সালে কিছুটা সমস্যা হয়েছে ,কারণ বয়স বেড়েছে ও কিছুটা মুটিয়ে গেছি। আর একটি সমস্যা হতো, নাটকের পরও অনেকদিন লেগে যেত চরিত্র থেকে বের হতে। নিঃসন্দেহে আমার অভিনয় জীবনে এটি ছিল একটি প্রিয় চরিত্র।
দু'বারে দু'জন নির্দেশকের (নাঈম মিরাজ/কামরুজ্জামান বালার্ক) ভাবনায় প্রাণ পায় মঞ্চের 'কঞ্জুস', জনপ্রিয়তার দিক থেকে নিঃসন্দেহে এটি আমাদের একটি মাইলস্টোন প্রযোজনা।

২০০২ সালে আমরা যখন বিখ্যাত জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখট এর 'Mr Puntila and his Man Matti' অবলম্বনে 'দেওয়ান গাজীর কিসসা' মঞ্চায়নের উদ্যোগ নেই তখন অনেকেই এই নাটকের বিরোধিতা করেছিলেন এই বলে যে, নাটকে বারবনিতার চরিত্র আছে এটা করা যাবে না, আমরা ভদ্র ঘরের মেয়েছেলে, মানুষ ছি ছি করবে। আমরা দমে যাইনি, এগিয়ে গেছি। পরবর্তীতে এটি আমাদের একটি উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা হিসাবে বিবেচিত হয়, মেলবোর্ন ও সিডনিতে আমরা এর সফল মঞ্চায়ন করেছি। পুরো নাটকের দল নিয়ে আন্তঃরাজ্য বাস ভ্রমণের মজাই আলাদা - সারাটা পথ গান-বাজনা, হৈ-হুল্লোড় আর নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ভুলেছি। মনে পড়ে সেই যাত্রায় আমাদের দলের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন প্রয়াত সুনন্দা চৌধুরীও। 'দেওয়ান গাজীর কিসসা' নাটকের সিডনি শো-র জন্য আমরা তিন দিনের জন্য বাস ভাড়া করে পুরো রেনেসাঁ দল সিডনি যাই, আমাদের একজন অভিনেত্রী সন্তান সম্ভবা হওয়ার কারণে বাস ভ্রমণে উপযুক্ত ছিল না, তাকে আমরা হাওয়াই জাহাজে করে সিডনি নেওয়ার ব্যবস্থা করি। আহা! তখন কী প্রাণ প্রাচুর্য ছিল সবার মাঝে!


জনতার রঙ্গশালা, নির্দেশনা: জাকিরুল হায়দার বাবু, নাট্যকার: বার্টোল্ট ব্রেখ্ট, রূপান্তর: মজিবুর রহমান দিলু

২০০৩ সালে আমাদের আর একটি মাইল স্টোন প্রযোজনা দক্ষিণ ভারতীয় নাট্য-গুরু গিরীশ কারনাড এর 'নাগমণ্ডল' যা মাইম, বাচিক অভিনয় ও গল্প বলার মাধ্যমে লাইভ মিউজিক এর সমন্বয়ে উপস্থাপন করা হয়। একেবারে নতুন আঙ্গিকের এই নাটকে অনেক শিল্পকলার যৌগিক ব্যবহারে মুনশিয়ানার ছাপ ছিল যা দর্শকদের আপ্লুত করেছে। এই নাটকে এনিম্যাল ক্যারেক্টার ছিল, আবার লাইট-সাউন্ড-মুভমেন্ট এর মাধ্যমে এনিম্যাল টু হিউম্যান ট্রান্সফরমেশন - এক চমৎকার নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি করে যা দর্শকদের অন্য রকম সাসপেন্স দিয়েছিলো। গভীর রাতের আঁধারে এক পোড়ো মন্দিরে জোনাকি পোকাদের গল্পের আসর বসে - প্রেমিক নাগ আর নিঃসঙ্গ নায়িকার প্রেম রূপকথার গল্পের মতো মঞ্চে উঠে আসে। নাটকে সেট এর ব্যবহার খুবই সামান্য, মাইমের সাহায্যে অনেকাংশে সেট উপস্থাপন করা হয়েছে। এই নাটকের নির্দেশক দীপ্ত চৌধুরীকে সাধুবাদ জানাই এই রকম ভিন্নধর্মী একটি নাটক নির্বাচনে দলকে সহযোগিতা করার জন্য। গিরীশ কারনাড এর এই নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ 'নাগা মণ্ডলা' আমার সংগ্রহে আছে, ইচ্ছে আছে সময় সুযোগ হলে ভবিষ্যতে ইংরেজিতে এই নাটকটি মঞ্চে আনবো।

২০০৫ সাল বিভিন্ন কারণে আমাদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বছর, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে প্রথম বারের মতো দলটির ভিত নড়ে উঠে। কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেরা কাব্য-নাটক সৈয়দ শামসুল হকের কালজয়ী সৃষ্টি 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়' এ বছর আমরা মঞ্চে আনবো, কাজও খানিকটা এগিয়েছিল কিন্তু বাঁধ সাধলো কাস্টিং সিলেকশন- আমার সাথে অন্যদের মতপার্থক্য দেখা দিলো যা থেকে আমরা কেউই বের হয়ে আসতে পারিনি, ছোট্ট একটি ইসু বিরাট আকার ধারণ করলো। নিজেদের মধ্যে দেন-দরবার, উপদেষ্টাদের সলা-পরামর্শ, এমন কি অফিস-আদালত পর্যন্ত গড়ালো। প্রত্যেকেই আমরা নাছোড় নিজস্ব যুক্তিতে - 'বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী'। ফলে 'রেনেসাঁ' ছেড়ে নতুন দল 'বাঙলা থিয়েটার' গড়ে তোলে প্রিয় ক'জন নিবেদিত নাট্যকর্মী যাদের অভাব আমরা এখনো অনুভব করি। এতকাল পর এখন ভাবি, কাস্টিং নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও পারতাম। এক সঙ্গে নাটক না করলেও আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কে কখনো ছিঁড় ধরেনি, শুধু পারিবারিক ভাবে আসা-যাওয়াটা হচ্ছেনা। তাদের সবার জন্য সতত: আমার শুভ কামনা, কে জানে ভবিষ্যতে একসাথে কাজ করার সুযোগ হলেও হতে পারে - সেই সুদিনের অপেক্ষায় থাকলাম।


Click for details

কিছুটা হতাশ ও ভগ্ন মনোবল নিয়ে নতুন উদ্যোগে নাট্যকর্মী সংগ্রহ করে আবার কাজে নেমে পড়ি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রেনেসাঁ সেই বছর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'চিরকুমার সভা' নাটকের সফল মঞ্চায়ন করে যেখানে অনেক কুশীলবের সমন্বয় ঘটেছিলো, সেট ডিজাইন করেছিলেন সিডনি প্রবাসী নাট্যজন জন মার্টিন।
এই নাটকের তিনটি উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মানিক চক্রবর্তী, শাশ্বতী ব্যানার্জি ও প্রফুল্ল রায়। বার্ধক্যের কারণে প্রফুল্ল দা অভিনয় থেকে অবসর নিয়েছেন, মানিক দা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ আর শাশ্বতী দি অনেক আগেই অগস্ত্য যাত্রা করেছেন। রেনেসাঁ এই ত্রয়ী বয়োজ্যেষ্ঠ নাট্যজনদের কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছে।

২০০৬ সালে আমরা মহাকবি কালিদাসের 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম্' অবলম্বনে নাট্যাচার্য সেলিম আল-দীনের 'শকুন্তলা' নাটক মঞ্চায়নের সিদ্ধান্ত নেই। এবার শুরু হলো আরেক বিড়ম্বনা, শুরু থেকেই কিছু মানুষ না জেনে না বুঝে এই নাটক মঞ্চায়নের বিরোধিতা করে, বেনামে পাবলিক ডোমেইনে ই-মেইল ছাড়া হলো এই বলে যে, এই নাটকে সেলিম আল-দীন 'শকুন্তলা'-র কাহিনী বিকৃত করে উপস্থাপন করে সনাতন ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত দিয়েছে। ভেতরে ভেতরে কমিউনিটিতেও অনেক জনসংযোগ করা হয়েছে যাতে করে এই প্রযোজনাটি আলোর মুখ না দেখে কিন্তু আমরা নাছোড়, একচুলও পিছ পা হইনি, কারণ আমরা জানতাম তারা সত্যের অপলাপ করছে - এটিও আমাদের আর একটি দর্শকনন্দিত সফল মঞ্চায়ন ছিল। নিয়মিত কুশীলবদের সাথে এই প্রযোজনায় আরও সম্পৃক্ত ছিলেন প্রফুল্ল রায়, প্রতীশ বন্দ্যোপাধ্যায়, মৌলিনাথ গাঙ্গুলি ও গৌতম দত্ত। এখানে উল্লেখ্য যে, নাট্যাচার্য সেলিম আল-দীনের নাটক পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন তাঁর নাটক পড়ানো হয়। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা নাট্য সাহিত্যে তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

দ্যা মাউস ট্র্যাপ, নির্দেশনা: মাসুদুজ্জামান, নাট্যকার: আগাথা ক্রিস্টি, অনুবাদ: আবদুস সেলিম

মেলবোর্নের সাংস্কৃতিক বলয়ে এই সময়ে আবৃত্তির সংগঠন 'কথক' এর আবির্ভাব রেনেসাঁ-র জন্য শুভাশুভ - শুভ বলছি এই জন্য যে, মেলবোর্নে শিল্পচর্চার অঙ্গন বৃদ্ধি পেলো, আবার অশুভও, কারণ রেনেসাঁ-র শক্তি ক্ষয় হলো, কেননা এই উদ্যোগের কর্তাব্যক্তিরা প্রায় সবাই আমাদেরই লোক, রেনেসাঁ-র নিয়মিত মঞ্চ শ্রমিক। 'কথক' এ সময় দিয়ে রেনেসাঁ-র জন্য নিয়মিত সময় দেয়া অনেকের পক্ষেই আর সম্ভব হয়নি, তবু আমাদের পারস্পরিক সৌহার্দ ও শুভ কামনা সতত: বিরাজমান থেকেছে । কয়েক বৎসর আগে 'কথক' পরিবারেও দৃশ্যত: গৃহদাহ শুরু হয়, যার ফলশ্রুতিতে আর একটি আবৃত্তি সংগঠন 'কবিতায়ন' এর জন্ম হয়। যদ্যপি আমরা বিভক্ত কিন্তু সবাই শিল্পের সারথি, তাই প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির জোয়ালটা মিলেমিশেই টানছি। এটাই বা কম কিসের!

২০০৭ সালে আমরা গুণী নাট্যজন আব্দুল্লাহ আল মামুনের 'মেরাজ ফকিরের মা' মঞ্চে উপস্থাপন করি, এটিও আমাদের আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা। এই নাটকের বক্তব্য প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দেয়, মা-ছেলের সম্পর্ক কি ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার কাছে হার মানবে নাকি সব কিছু ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে - নাট্যকার এই দ্বান্দ্বিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। আমাদের প্রচলিত ধর্মীয় কুসংস্কারগুলোকে তিনি আর একবার নতুন করে চোখের সামনে তুলে ধরেছেন যেমনটি আমরা দেখেছি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর 'লাল সালু' কিংবা 'বহিপীর' নাটকে। এই নাটকের প্রদর্শনীর সময় আবার একটি অঘটন ঘটে যায়, শো ছিল উইলিয়ামস টাউন- এর টাউন হলে; নির্ধারিত সময়ে আমাদের একজন অভিনেতা উপস্থিত হয়নি, বিপদে পড়ে গেলাম, শো শুরু হতে মাত্র ১৫ মিনিট বাকি। কি করা যায়? তড়িৎ সিদ্ধান্ত হলো, একজনকে দিয়ে দু'টি চরিত্র করানো হবে, আমরা পেছন থেকে প্রম্পট করে দেবো। যথারীতি শো হয়ে গেলো, কেউ বুঝতে পারেনি এই ব্যাপারটা। পরে জেনেছি, ভুল ট্রেনে উঠে আমাদের অভিনেতা আজমীরুল হক ফ্রাঙ্কস্টোন চলে গিয়েছিলো, ট্রেনে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে পথে আর টের পায়নি। এই নাটক নিয়ে আমরা সিডনিতেও গিয়েছিলাম, এক দিনে দু'টি শো করেছি; নাটকে মায়ের ভূমিকায় মীনা মজুমদার, মেরাজ ফকির চরিত্রে মাসুদ জামান ও গেদা ফকির চরিত্রে শুভ্র শামসুদ্দোহার প্রাণবন্ত অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

২০১১ সালে আমরা ব্রিটিশ নাট্যকার আগাথা ক্রিস্টির বিখ্যাত মার্ডার মিস্টেরি 'দ্যা মাউস ট্র্যাপ' মঞ্চায়ন করি। পৃথিবীর সব চেয়ে বেশি দিন শো চলা জগৎ বিখ্যাত এই নাটকটি লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ড এর সেন্ট মার্টিন থিয়েটারে ১৯৫২ সাল থেকে অবিরাম মঞ্চস্থ হয়ে আসছে, শুধুমাত্র কোভিড এর কারণে কিছুদিন বন্ধ ছিল। আমাদের সীমিত আয়োজনে ভিন্ন আঙ্গিকের এই চমৎকার নাটকটি দর্শক সমাদৃত হয়। আমরা সঙ্গত কারণে এই নাটকের সেট, প্রপস, লাইট, কস্টিউম ও আবহাওয়া সংগীতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে চেষ্টা করেছি। এক শীতার্ত বরফ পড়া ঝড়ো রাতে মেনর ম্যানশন গেস্ট হাউসে ঘটে যাওয়া মার্ডার মিস্টেরির রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য দর্শকদের মধ্যে টান টান উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা নাটকের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখাই এই নাটকের বড় সাফল্য বলে মনে করি। ওইতো মেনর ম্যানশন এর রেডিও তে বেজে উঠেছে সেই গান :
“Three blind mice/See how they run..”

২০১৫ সালে আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর 'প্রাগৈতিহাসিক' মঞ্চায়নের সিদ্ধান্ত নেই এবং প্রায় আড়াই মাস মহড়ার পর দলের কয়েকজন সদস্যের হঠাৎ অসহযোগের কারণে মাঝ পথে মুখ থুবড়ে পড়ে এই প্রযোজনাটি, তবুও আমরা হাল ছাড়তে চাইনি কিন্তু আরো একজন অতি প্রয়োজনীয় কুশীলব ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বাংলাদেশে থাকায় আমাদের বিরামহীন শিল্পচর্চার বাঁধভাঙা জোয়ার ক্ষণিকের জন্য থমকে যায়, যার কারণে সেই বছর নতুন কোন নাটক আমরা মঞ্চে উপস্থাপন করতে পারিনি। মূলতঃ দলের ত্রিরত্ন খ্যাত সদস্যরাই এর জন্য দায়ী - রেনেসাঁর জন্য এটি একটি ব্ল্যাক স্পট হয়ে রইলো। তবে আমাদের ভাবনায় আছে সময় সুযোগ মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ঘনিষ্ঠ 'প্রাগৈতিহাসিক' এর গল্পটি একদিন আমরা মঞ্চে তুলে আনবো।

২০১৭ সালে আমরা আব্দুল্লাহ আল মামুনের 'এখনও ক্রীতদাস' নাটক মঞ্চে আনি, এই নাটকে বস্তিবাসী একজন পুঙ্গ মুক্তিযোদ্ধার যাপিত-জীবনের টানাপোড়ন মঞ্চে উঠে এসেছে, সেই সাথে নাটকের ভাষা হিসাবে এসেছে বস্তিবাসী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের খিস্তি খেউর যা কথিত ভদ্র সমাজে অচল, মধ্যবিত্ত জীবনে অভ্যস্ত আমাদের নাটকের পাত্র-পাত্রীরা সেই ভাষা ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ বোধ করছিলো না, ভাষা পরিবর্তনের আবদার করেছিল আমার কাছে। আমার সাফ কথা, আত্ম প্রতারণা করতে পারবো না, বস্তির ভাষাই থাকছে, মনে রাখতে হবে আমরা বস্তিবাসীদের চরিত্রায়ন করছি। এই নাটকের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র কান্দুনি'র ভূমিকায় ডিনা চৌধুরী অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।

২০১৮ সালে আমরা মঞ্চায়ন করি এস এম সোলায়মানের 'এলেকশান ক্যারিকেচার' যা ৮০'র দশকের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ কিন্তু ২০১৮ সালে এই নাটকের যৌক্তিকতা কতটুকু সেই প্রশ্ন ছিল অনেকেরই। আমরা দেখছি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, খুন, গুম। উন্নয়ন আর গণতন্ত্র পাশাপাশি নেই। মোদ্দা কথা, যা হবার ছিল তা হয়নি, আমরা তাই নতুন বাস্তবতার সাথে সাজিয়েছি পুরনো 'এলেকসশান ক্যারিকেচার' - যা নাটকটিতে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।

২০১৯ সালে আমরা আবার প্রিয় নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখ্ট-কে মঞ্চে উপস্থাপন করি 'সৎ মানুষের খোঁজে' নাটকের মাধ্যমে। সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিশ্বাসী ব্রেখ্ট এর মূল ভাবনার সাথে মিল রেখে এর উপস্থাপনায় আমরা আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসি যা ঢাকা-র প্রোডাকশন থেকে একেবারে ভিন্ন। নাটকটি হয়ে উঠে সমাজের নিচুতলার মানুষদের সত্যিকারের এক জীবন্ত আখ্যান, যাদের প্রয়োজনে আকাশের ভগবানরা খুব একটা সাড়া দেন না। পৃথিবী নামক এই জঞ্জালখানায় আসল ভালো মানুষটি কে? এই নাটকের ব্লকিং রিহার্সাল চলাকালীন মুখ্য চরিত্রের অভিনেত্রী কাকতালীয় ভাবে একক সিদ্ধান্তে নিজেকে নাটক থেকে সরিয়ে নেন। তখন নাটকের নির্ধারিত প্রদর্শনীর মাত্র দেড় মাস বাকি, আমরা এক মহাবিপদে পড়ে যাই, সেই আপদ-কালীন সময়ে ত্রাতা হিসাবে এগিয়ে আসে দলের একজন পরীক্ষিত অভিনেত্রী নাহিদ নাজনীন সিলভী কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে ও একটা শর্ত জুড়ে দেয়। সিলভী তখন হিজাব পরা শুরু করেছে এবং হিজাব পরেই এই চরিত্রটি করতে চায়। অগত্যা মধুসূদন, আমরা ওর কথায় রাজি হয়ে যাই। এখানে সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এতো কম সময়ে এই কঠিন চরিত্র দুইটি (ফুলি ও ফুল মোহাম্মদ) ফুটিয়ে তোলা, যা সিলভী অত্যন্ত সুচারুভাবে করতে পেরেছিল। নির্ধারিত দিনে হিজাবের উপর কস্টিউম পরে সিলভী চরিত্রগুলো উপস্থাপন করেছিল, দর্শকদের পক্ষে সেই ক্যামাফ্লাজ ধরা সম্ভব হয়নি। ধন্যবাদ সিলভী, এটাই টীম স্পিরিট! এই নাটকের অন্য দুইটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন শক্তিশালী অভিনেত্রী ও গায়িকা হীরা চৌধুরী; খুব কম সময়ে নাটকের থিম সং এর সাথে সুন্দর কোরিওগ্রাফি এবং একই দৃশ্যে নিজেকে ছেলে ও মেয়ে হিসেবে উপস্থাপন সত্যি দুরূহ কাজ - যা তিনি খুব সহজেই করেছেন, শুধুমাত্র দলের প্রতি নিষ্ঠা ও অঙ্গীকার থাকাতেই এটা সম্ভব হয়েছে, ধন্যবাদ হীরা চৌধুরী। শান্তি নিকেতন ফেরত পূরবী চৌধুরী এই নাটকের কোরিওগ্রাফি করেছেন যা দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জীবন ঘনিষ্ঠ এই নাটকের থিম সং আমরা যেভাবে সাজিয়েছি:
“অপেক্ষার পালা শেষ, সুদিন তো বেশী দূরে নয়
লাল মোরগের ডাকে, হবে নবীন সূর্যোদয়।”

২০২০ সালে আমরা মলিয়ের এর নাটক 'বাবা তার্তুফ' মঞ্চায়নের সিদ্ধান্ত নেই এবং সেই মোতাবেক মহড়া শুরু করি কিন্তু মার্চ থেকে করোনার কারণে সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। করোনাকালে আমরা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছি:

ঘর জামাই, নির্দেশনা: মম মজিদ, নাট্যকার: মলিয়ের, রূপান্তর: গোলাম সারোয়ার


রেনেসাঁ-র ২০ বছর ফুর্তি উদযাপন:

২০২১ সালে আমরা অনলাইনে রেনেসাঁর ২০ বছর ফুর্তি উদযাপন করি, ১৪ সপ্তাহব্যাপী এই আয়োজনে বাংলাদেশের বহু প্রথিতযশা নাট্যজন অংশগ্রহণ করেন। নাটক, নাট্যকার, নাট্য বিষয়ক আলোচনা ও নির্বাচিত নাটকের ভিডিও প্রদর্শনী এই উৎসবের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই মিলন-মেলায় রেনেসাঁর বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নাট্যকর্মী অংশগ্রহণ করে যা নতুন করে সবার সাথে মেলবন্ধন তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। অতিমারী করোনার কারণে যখন থিয়েটারের আলো আর জ্বলছিল না, তখন আমাদের ভিন্নধর্মী এই আয়োজন দেশ-বিদেশের গৃহবন্দী নাট-প্রেমীরা দারুণভাবে উপভোগ করেন। আমাদের ফেসবুক পেজে (RenaissanceDrama) এগুলো আপলোড করা আছে, আগ্রহীদের দেখার আমন্ত্রণ জানাই।


সাধ্যের মধ্যে বাড়াই হাত:

রেনেসাঁ নাটক প্রযোজনার পাশাপাশি মানবিক কাজে হাত দেয় শুরু থেকেই, আমাদের প্রত্যক্ষ উদ্যোগেই ২০০১ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশ ডিজাস্টার রিলিফ ফান্ড ইনক যেখানে আমরা কমিউনিটির প্রায় সব সংগঠনকে মানবিক কাজে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলাম এবং সেই থেকে আমরা ওতপ্রোতভাবে এই সংগঠনটির সাথে জড়িয়ে আছি। বিভিন্ন সময়ে নাটকের শো, সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম ও ফান্ড রাইজিং ডিনার ও নিজেরা অর্থ দিয়ে আর্ত মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছি। করোনা-পীড়িত মানুষের জন্য সাধ্যের মধ্যে রেনেসাঁ মানবিক হাত বাড়িয়ে দেয় - বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে ও সাময়িকভাবে বিপদগ্রস্ত দুই বাংলার নাট্য-বন্ধুদের মাঝে এককালীন কিছু অর্থ তুলে দেয়।


কণ্ঠ-শীলন, অভিনয় ও মূকাভিনয় কর্মশালা:

২০২১ সালের আমাদের আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রজেক্ট ছিল কণ্ঠ-শীলন, অভিনয় ও মূকাভিনয়ের উপর ১০ সপ্তাহব্যাপী অনলাইন কর্মশালা, এই কর্মশালা পরিচালনা করেন বাংলাদেশের এই প্রজন্মের স্বনামধন্য নাট্য নির্দেশক, প্রশিক্ষক, সংগঠক ও 'স্বপ্নদল' বাংলাদেশের দলনেতা জাহিদ রিপন। কর্মশালা শেষে ১৪ জন নাট্যকর্মীর হাতে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। মেলবোর্ন প্রবাসী নাট্যকর্মীদের সার্বিক মান উন্নয়নে এই কর্মশালা অনেক সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।


সৎ মানুষের খোঁজে, নির্দেশনা: কামরুজ্জামান বালার্ক, নাট্যকার: বের্টোল্ট ব্রেখ্ট, রূপান্তর: আলী জাকের

করোনা-পীড়িত দুঃসময় কাটিয়ে ২০২২ সালে আমরা আবার মঞ্চে ফিরছি নতুন নাটক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'অচলায়তন’ নিয়ে। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে রেনেসাঁ সব সময়ই সোচ্চার যার ফলশ্রুতিতে বিগত দিনে 'মেরাজ ফকিরের মা', ‘বাবা তার্তুফ' আর এবার 'অচলায়তন' মঞ্চায়নের সিদ্ধান্ত। আশা করছি, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে নাটকটি দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করতে পারবো।

রেনেসাঁ-র এই ২২ বছরের আয়ুষ্কালে অনেকেই সংস্কৃতিচর্চার এই পোক্ত পাটাতনে হাতেখড়ি নিয়েছেন, ঋদ্ধ হয়েছেন এবং আলো ছড়িয়েছেন কিন্তু বিভিন্ন কারণে এখন আর সমান্তরালে পা চালাতে পারছেন না, চাইছেন না, কিংবা শহর ছেড়ে গেছেন, তাঁদের সবাইকে নির্দ্বিধায় আমরা প্রাণের প্রণতি জানাই।






কামরুজ্জামান বালার্ক, মেল্বোর্ন, অস্ট্রেলিয়া




Share on Facebook               Home Page             Published on: 5-Jun-2022

Coming Events:


আঙ্গিক থিয়েটার প্রযোজিত সিডনিতে প্রথমবার
লাইভ মিউজিক সহ যাত্রা-পালা