bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



একজন পাকিস্তানীর মুখে ১৯৭১ এর ডিসেম্বর
আশীষ বাবলু



আমাদের ওয়াটাল গ্রোভে থাকেন পাকিস্তানী জাভেদ ভাই। উনি বেলুচিস্তানের মানুষ। একদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাইজান আমার খুব পাকিস্তানে বেড়াতে যাবার ইচ্ছা আপনি একটা ব্যবস্থা করুন। উনি হাসতে হাসতে বললেন, "মরনা হ্যায়.... মরার যদি ইচ্ছা থাকে এদেশেই মর, এতদূরে যাবার কি দরকার!" তিনি আট বছর হয়ে গেছে দেশে যাননা, সন্তানদের দাদা, দাদীর সাথে দেখা করাতে নিয়ে যাবেন, সেটাও সম্ভব হচ্ছেনা।

জাভেদ ভাই মানুষটা ভাল। দেখা হলেই একগাল হেসে বলবেন, সাটারডে চ্যলেআনা, বয়ঠেগা। তার বয়ঠেগা মতলব হলো আড্ডা, সাথে হুইস্কি আর কাবাব। তার স্মৃতির ভাণ্ডার মজার মজার গল্পে ঠাসা। ভাবী, যাকে আমরা রুকসানা ভাবী বলি, উনি আমার জানা মতে বেষ্ট কাবাব বানান। অনেকেই তার কাছ থেকে রেসিপি নিয়েছে কিন্তু কেউ ধার কাছেও যেতে পারেনি।

গত সপ্তাহে তার বয়ঠেগার ডাকে সাড়া দিয়ে হাজির হয়েছিলাম তার বাসায়। আড্ডার এক অংশে জাভেদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, একাত্তরের ডিসেম্বর মাসে আপনি কোথায় ছিলেন? তিনি বললেন, আমিতো তখন করাচীতে কলেজে পড়ি।
তবেতো আপনার অনেক কিছুই মনে থাকার কথা, আমরা ইষ্ট পাকিস্তানের মানুষেরাতো জানতামই না কি হচ্ছে ওয়েস্ট পাকিস্তানে!

আমরাও তেমন কিছু জানতাম না ইষ্ট পাকিস্তানের খবর। রেডিওতে শুনতাম, ইস্ট পাকিস্তানে অনেক হিন্দু টিচার ছিল, তারা ইন্ডিইয়ার সাথে মিলে স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েদের ভড়কাচ্ছে। সে সব হিন্দুদের স্বায়েস্থা করবার জন্য পাকিস্তানী জোয়ান ভাইয়েরা অপারেশন সার্চলাইট চালাচ্ছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ডিসেম্বর মাসে যখন ফাইনাল যুদ্ধ শুরু হলো তখন? জাভেদ ভাই গেলাসে ছোট্ট করে চুমুক দিয়ে বললেন, আমার মনে আছে ৩রা ডিসেম্বর সাইরেনের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গলো। দেখলাম করাচীর আকাশে কালো ধোয়ায় ছেয়ে গেছে। ইন্ডিয়ান প্লেন এসে পেট্রল ষ্টেশন গুলোতে বম্ব ফেলেছে। আমরা সবাই আশ্রয় নিয়েছিলাম নিচতলায় সিঁড়ির নিচে। দিনের বেলা কখনো কখনো রাস্তায় নেমে দেখতাম আকাশে পাকিস্তান আর ইন্ডিয়ান প্লেনের ডগ ফাইট। আমরা পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে চিল্লাতাম। একবার একটা প্লেন ভেঙ্গে পড়লো। আমরা ছুটে গিয়ে দেখি প্লেনটা পাকিস্তানের। সত্যি কথা বলতে ইন্ডিয়ানরা এই যুদ্ধের জন্য বহুত প্রিপেয়ার্ড ছিল। জাভেদ ভাই এবার কাবাব মুখে তুললেন। তুলতুলে রেশমি কাবাব। এবার যে তথ্যটা দিলেন সেটা কাবাবের মত মজাদার। তিনি বললেন, আমরা জানতাম তাজউদ্দীন আহমেদ একজন ইন্ডিয়ান। উনি ইন্ডিয়ান আর্মির লোক। তাকে পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছে। লোক মুখে খবর ছিল ইষ্ট পাকিস্তানে সাদা পোশাক আর সাদা ঘোড়ায় চড়ে কিছু যোদ্ধা আকাশ থেকে নেমে এসে পাকিস্তানি জোয়ানদের সাহায্য করছে। (রাজাকার আলবদরদের কথা হয়তো হবে !) জাভেদ ভাই বললেন, ১৩ই ডিসেম্বর থেকে দুই তিন দিন সব পাকিস্তানীদের মুখে একটাই কথা, ও আয়েগা ও আয়েগা।

কি আসছে ?

সেভেন্থ ফ্লিট আসছে। তবে এটা ভাববেন না যে পূর্ব পাকিস্তান রক্ষা করতে সেভেন্থ ফ্লিট আসছে বলে আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম। এই আনন্দের মতলব ছিলো নিজেদের বাঁচানো। ইন্ডিয়া ওয়েস্ট পাকিস্তান ফ্রন্টে অনেকগুলো স্ট্রেটেজিক টেরিটোরি দখল করে ফেলেছিলো এবং আর যদি একটু এগোয় তবে লাহোর আর ইসলামাবাদের সাপ্লাই লাইন বন্ধ হয়ে যেতো। এমন রিউমারও ছিল যে ইন্ডিয়ান আর্মি ইসলামাবাদে ঢুকছে ইয়াহিয়াকে সারেন্ডার করানোর জন্য। একটা ব্যাপার পাকিস্তানের মানুষেরা বুঝে গিয়েছিল, দে হ্যাব বিন ফাইটিং এ লুজিং ওয়ার।

প্রশ্ন করলাম ১৭ই ডিসেম্বরে আপনাদের খবরের কাগজে কি খবর ছাপা হয়েছিল?

খবর ছিল আপাতত সেখানে যুদ্ধ স্থগিতের চুক্তি হয়েছে পাকিস্তানী জোয়ান আর ইন্ডিয়ান আর্মি আর লোকাল কমান্ডের সাথে। সব আন্ডার কনট্রোল।

জাভেদ ভাই আরো বললেন,একটা সময় এসেছিল যখন পাকিস্তানে বাঙ্গালীদের থাকা খুবই ভয়াবহ ব্যাপার হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধ বন্দীরা ফিরে আসছিল পাকিস্তানে, অনেক আহত সৈন্য এবং উর্দু স্পিকিং বিহারী। যে কোন সময় একটা রায়ট লেগে যাবার সম্ভাবনা। ক্ষিপ্ত বিহারীরা করাচীর বেশ কিছু বাঙ্গালী এলাকায় দাঙ্গাও করেছিল। মনে আছে একটি বাঙ্গালী পরিবার আমাদের বাসার আশ্রয় নিয়েছিল।

আপনারা বাঙ্গালী পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন? আমার চোখে মুখে নিশ্চয়ই একটা আশ্চর্য বোধ ফুটে উঠেছিল, জাভেদ ভাই সেটা টের পেয়েছিলেন। তিনি বললেন, তোমরা পাকিস্তানী বলতে শুধু পাঞ্জাবীদেরই চেনো। পাঞ্জাবীদের সংখ্যা সেনাবাহিনীতে খুব বেশি। দুর্ভাগ্যবশত এরাই পাকিস্তান চালাচ্ছে। একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, আমি মুজিবুর রহমানের সেই হিস্টোরিকাল স্পিচটা শুনেছি। আমি অর্থ তেমন কিছুই বুঝিনি। তবে ইট ইজ ইন্সপায়ারিং, ব্লাড বিগান টু বয়েল। রক্ত গরম করা ভাষণ। তিনি আরো বললেন, আমার আত্মীয় হলেন এডমিরাল আহসান। উনি হচ্ছেন লাস্ট গভর্নর অফ ইষ্ট পাকিস্তান। ইয়াহিয়া যখন মুজিবুর রহমানের সাথে কথা বলতে যাবেন তখন আহসান চাচাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ঐ ছয় দফা ব্যাপারটা কি? চাচা বলেছিলেন স্যার আমি আপনাকে ডকুমেন্টটা দিচ্ছি একটু পড়ে দেখুন। ইয়াহিয়া বললেন থাক দরকার নেই, আমি ম্যানেজ করে নেব। এতেই বোঝা যায় ইষ্ট পাকিস্তানের উপর পাকিস্তানী শাসকদের সিরিয়াসনেস কত কম ছিল। ওদের ওনারা গোনার খাতায়ই ধরতেন না। তানা হলে ইলেকশনে আওয়ামী লিগ এতগুলো আসন পেলো অথচ ন্যাশনাল এসেম্বলিতে বসতে দেওয়া হলোনা!

মুজিবুর রহমানকে শেষ পর্যন্ত আপনাদের ছেড়ে দিতে হলো। আমি বললাম। জাভেদ ভাই বললেন, এ ব্যাপারেও একটা ছোট্ট মজদার কাহানী হ্যায়।
ইয়াহিয়ার কাছ থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতা নিলেন। তিনি এই যুদ্ধের পরাজয়ের দায় দিলেন সম্পূর্ণ ভাবে ইয়াহিয়া খানের উপর। এটাতো সত্যি এই পরাজয়ের পেছনে তার ক্ষমতার লোভ অনেকটা দায়ী। যাইহোক, ইন্ডিয়া এবং রাশিয়ার চাপের মুখে ভুট্টো বুঝতে পারলেন, মুজিবকে আর ধরে রাখা যাবেনা। অথচ এতদিন ট্রেটর, গাদ্দার বলে তিনি বক্তিতায় তাকে অনেক গালাগাল করেছেন। এখন তাকে বিনা বিচারে ছেড়ে দিলে জনগণ তার নোংরামিটা ধরে ফেলবে। তিনি তাই একটা নতুন চাল চাললেন। তিনি করাচীতে একটা বিশাল জনসভা ডাকলেন। মনে রাখতে হবে তখনও পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। সেই জনসভা সরাসরি প্রচার করা হয়েছিল পাকিস্তানের রেডিও এবং টিভিতে। জুলফিকার আলী ভুট্টো বললেন, ইন্ডিয়ান তাজউদ্দীন এবং কিছু হিন্দু এডমিনিস্ট্রেটর মিলে আজ ইস্ট পাকিস্তান শাসন করছে। সেখানে আমার মুসলিম ভাইয়েরা ইন্ডিয়ার হাতে জিম্মি। আমি মুজিবকে পাঠাতে চাই সেখানে গিয়ে এডমিনিস্ট্রেশন চালাতে, আপনারা কি বলেন? জনসমুদ্র চেঁচিয়ে উঠল ইয়েস ইয়েস জরুর জরুর পাকিস্তান জিন্দাবাদ।



আশীষ বাবলু, সিডনি, ashisbablu13@yahoo.com.au



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 15-Dec-2016