bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



অন্ধকার গলি
এম এস আরেফীন



বেইলি রোড থেকে বের হয়ে হাতের বাম দিকে শান্তিবাগের দিকের রাস্তাটা ধরলেন রহমত আলী সাহেব। গন্তব্য পশ্চিম শান্তিবাগ গাউসুল উলুম মাদ্রাসা। আর মিনিট কুড়ি বা বড়জোর পঁচিশ মিনিট হাঁটলেই বাড়ি। হাত ঘড়ির দিকে তাকালেন রহমত সাহেব। রাত ১১টা ৫০। এতো রাত করে বাড়ি ফেরা কেন, এত রাত জেগে থাকাও উনার নিয়মে পড়েনা। রহমত আলী সাহেব মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক, তাই উনার সব কিছুই কঠিন নিয়মের আওতায় পরে এমনকি শুধু উনার নিজের রুটিন নয় উনার সব ছাত্র ছাত্রীদের রুটিনও একবারে মাপা, ঘড়ির কাটা মেপে চলে। শুধুমাত্র মাদ্রাসার একটা ঘটনার সমাধানের তদবির করতে এসে এতো রাত হয়ে গেলো। ঢাকা শহরে রাত ১১ টা ৫০ কোন রাতই না, বরং বলা যায় সন্ধ্যা রাত। কিন্তু প্রচণ্ড শীতের কারণে রাস্তা জনমানব শূন্য। এমনকি লাওয়ারিশ কুকুরদেরকেও আজ দেখা যাচ্ছেনা। শান্তিবাগ মোড়ে আসতেই রহমত সাহেব ডান দিকের একটা গলিতে ঢুকে গেলেন, শর্টকাট মারার জন্য। গলিটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু গলির শেষ মাথায় একটা অসহায় ষ্ট্রীট ল্যাম্প এখনো সজাগ আছে। রহমত সাহেব হনহন করে হাঁটছেন যেন তাড়াতাড়ি ঐ ষ্ট্রীট ল্যাম্পটার কাছে পৌঁছানো যায়। উনার কাছে মনে হচ্ছে পথ শেষ হচ্ছেনা। রহমত সাহেবের বুকটা হঠাৎ কেমন যেন শূন্য হয়ে গেলো। তার সাথে সায় দিয়ে উনার শরীরের সমস্ত লোমগুলোও জেগে উঠলো, গায়ে কাটা অনুভব করলেন। গলির আলোকিত মাথায় পৌঁছে গেছেন। উনার কলিজার নদীতে পানি আসলো। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন শিষ দিয়ে উঠলো। পেছনে তাকালেন রহমত সাহেব, কর্কশ গলায় কে যেন বলে উঠলো-

- অতো রাইতে কই যাও ডার্লিং, আমাগোরে কিছু দিয়া যাও।

রহমত সাহেব পেছনে তাকালেন। গলির ঐ প্রান্তটা অন্ধকার, কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। তবে আবছায়া আলো আধারিতে বুঝতে পারলেন শাড়ি আর শাল গায়ে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। সাথে সাথেই খটকা লাগলো। শাড়ি পরা মানুষের গলাতো কর্কশ হবে না। তাহলে কি এই মানুষটা হিজরা? ভাবতেই, আবার শিউরে উঠলেন রহমত সাহেব। মনে মনে লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ যোয়ালেমীন পড়লেন। সামনে পা বাড়াবেন, অমনি স্পষ্ট দেখলেন সামনের ষ্ট্রীট লাইটের ঠিক নীচে আরো একটা নারীবেশী নর উনার রাস্তা রোধ করে দাড়িয়ে আছে। সেও বলে উঠলো,

- আরে হুজুর দেহি? এতো রাইতে কই যাও। কিছু দিয়া যাওনা, চুইট হার্ট।

রহমত সাহেবের গলা শুকিয়ে গেলো। তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন। মুহূর্তেই তার মেয়ে আয়েশার চেহারা ঘড়িতে ভেসে উঠলো। তার ২৮ বছরের মেয়ে আয়েশা, পরিবার বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে সৌদিতে থাকে। তাদের বেশ সুখের সংসার। গতবার ছুটিতে তারা দেশে এসেছিলো, তখন এই ঘড়িটা তিনি উপহার হিসেবে পান। মেয়ের কথা মনে আসতেই রহমত সাহেবের চোখে পানি এসে গেলো। ঠিক তখনই সামনের হিজরাটা বলে উঠলো।

- আরে হুজুর, আপনেরেতো আমি চিনি।

হকচকিয়ে গেলেন রহমত সাহেব।

- হ, আমি আপনেরে চিনসি। গত সপ্তাহে পশ্চিম শান্তিবাগ মসজিদে গেসিলাম টেকা চাইতে। আমাগো নাকি মসজিদে ঢুকন হারাম, তাই আপনে আমাগো দুইজনরে বেত দিয়া কি মাইরটাই না দিলেন। ও হুজুর, আপনি হুজুর আর আমরা হিজরা। আমরা দুইজইনই মানুষ আবার নামেও মিল। প্রবলেম কি ডার্লিং। কি হুজুর কথা কও।

বলতে বলতেই সামনের হিজরাটা জোড়ে একটা শিষ দিল আর মুহূর্তেই আরো তিন চারটা লোক চলে আসলো। রহমত সাহেব কিছু বুঝার আগেই পেছন থেকে কেউ একজন উনার মুখ চেপে ধরলো। আর বাকিরা উনার হাত পা বেধে উনাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো। চোখের নিমিষেই খুব কাছেই একটা অন্ধকার বাসায় উনাকে ঢুকানো হলো।

ফজরের আযানের শব্দে রহমত সাহেবের জ্ঞান ফিরলো। চোখ খুলতেই বুঝলেন এক অচেনা গলির রাস্তার উপর পড়ে আছেন। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেন, পারলেন না। সমস্ত গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলেন, উনার মনে হচ্ছে কেউ হাত পা বেঁধে উনাকে পিটিয়েছে। এবার গায়ের সব জোর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুহূর্তেই সম্বিত ফিরে পেলেন আর সাথে সাথেই জড়ো হতে লাগলো গত রাতের সব স্মৃতি। অপহরণ, গণধর্ষণ সব। ডুকরে কেঁদে উঠলেন রহমত সাহেব। রহমত সাহেবের চোখ দিয়ে নোনা জলের ঝর্না প্রবাহিত হতে লাগলো। তবে আজকে রহমত সাহেব নিজের কথা ভেবে কাঁদছেন না। তিনি সেই সব মেয়েদের কথা ভেবে কাঁদছেন যারা গত ১২ বছরে তার কামনার শিকার হয়েছে। যাদের উপর তিনি নিপীড়ন করেছেন। আজ প্রতিটি মেয়ের করুণা মাখা চেহারাটা রহমত সাহেবের চোখের সামনে ভাসছে। যে অনাচার তিনি চালিয়েছেন দীর্ঘ বারো বছর, সেই অনাচার গতরাতে তাকেই স্পর্শ করেছে। আজ উনি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন, তার অত্যাচারের শিকার হওয়া সেই মেয়েগুলোর কেমন অনুভূতি হয়েছিলো, তাদের কোমল হৃদয়ের উপর দিয়ে কি ঝড় বয়ে গিয়েছিলো।

১৩/০৪/২০২৬ - রহমত সাহেবের একার শ্রমে গড়ে তোলা আলোর পথে সংস্থার জন্য বেশ বড় একটা ফান্ডিং আনতে এবং তাকে দেয়া ইউনিভার্সিটি অব নটরডেমের খেতাব ও সনদ গ্রহণ করতে তিনি আজ আমেরিকা যাচ্ছেন।

সেই রাতের অন্ধকার গলি রহমত সাহেবকে অন্ধকার গলি থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছে। সেই ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ পরেই আলোর পথে জন্ম নেয়। পশ্চিম শান্তিবাগের গাউসুল উলুম মাদ্রাসার একই ক্যাম্পাসের অর্ধেকটা জুড়ে এখন আলোর পথে র কার্যক্রম চলে। আলোর পথের প্রধান কার্যক্রম দুটি।

১. ধর্ষণের শিকার হওয়া নারী ও শিশুদের সার্বিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ।
২. সমাজের সকল স্তরের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মাঝে ধর্ষণ বিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

গত সাত বছরে অনেক নারী ও শিশু এই প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় আবারো আলোর পথ দেখেছেন। এবং প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ অন্ধকার গলি ছেড়ে আলোর পথে এসেছেন।



এম এস আরেফীন, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া


Share on Facebook               Home Page             Published on: 27-Apr-2019


Coming Events:








সেলিনা হোসেন এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি - শাখাওয়াৎ নয়ন








BEN Seminar on

Dengue Disaster in Dhaka