bangla-sydney
bangla-sydney.com
News and views of Bangladeshi community in Sydney












এই লিংক থেকে SolaimanLipi ডাউনলোড করে নিন



গল্প


পরিধি
আনিসুর রহমান



বিজ্ঞান শিখতে চাও নাকি শুধু পরীক্ষায় পাশ করতে চাও? প্রথম দিন ক্লাসে এসে হুদা স্যার প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। এই গ্রামের স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্ররা এমন সরাসরি প্রশ্নের মুখোমুখি আগে কখনো হয়নি। কে একজন বলে উঠলো বিজ্ঞান শিখতে চাই স্যার। হুদা স্যারের দ্বিতীয় প্রশ্ন, তাহলে বল পৃথিবীর পরিধি কত? সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। কারো মুখে কথা নেই। হুদা স্যার বললেন জানা না থাকলে মেপে বলো। ছোট খাটো একটা হাসির গুঞ্জন উঠলো ক্লাসে। কাদের আলী মুখে বিশাল একটা হাসি টেনে বললো, স্যার দুই বিঘা জমি মাপতে আমিন লাগে - পৃথিবী মাপা কি মুখের কথা! হুদা স্যার বলতে লাগলেন কাজটা সহজ নয়। তিন মাস সময় দিলাম, দেখি তোমরা কোনো পদ্ধতি বের করতে পারো কি না। বিজ্ঞান শিখতে চেয়েছিলে, তাই একটা সমস্যা দিলাম। শুধু বই পড়ে বিজ্ঞান শেখা যায় না।

সমস্যাটা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ছোট খাটো একটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ক্লাসের অনেকেই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করলো। হুদা স্যারের ক্লাসে প্রথম কয়েক মিনিট এটা নিয়েই আলাপ হতো। অদ্ভুত অদ্ভুত সমাধান নিয়ে হাজির হতো একেক জন। স্যার রাগ করতেন না। তিনি সমাধানটির নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতেন। একদিন কাদের আলী বললো, স্যার পৃথিবীর পরিধি মাপা খুব সহজ লম্বা একটা দড়ি হলেই চলবে। কিভাবে? হুদা স্যার জানতে চাইলেন। কাদের আলী বললো, স্যার পৃথিবীতো গোল লম্বা একটা দড়ি নিয়ে সোজা একদিকে হাঁটতে শুরু করবো। হাঁটতে হাঁটতে আবার যখন এখানে ফিরে আসবো তখন দড়িটা মাপলেই পৃথিবীর পরিধি বের হয়ে যাবে। হুদা স্যার হেসে বললেন বুঝলাম, কিন্তু দড়িটা মাপবে কিভাবে। কাদের আলী বললো দড়িটা ছাড়ার সময় মেপে মেপে ছাড়তে হবে। স্যার বললেন অত বড় দড়ি কেনার পয়সা দেবে কে? এমন অনেক হাস্যকর প্রস্তাব আসতো ক্লাসে। হুদা স্যার কোনো প্রস্তাবই হেসে উড়িয়ে দিতেন না। যুক্তি তর্ক দিয়ে ত্রুটি ধরিয়ে দিতেন। এর ফলে ধীরে ধীরে বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করার প্রবণতা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

রহমত ক্লাসের সবচেয়ে খারাপ ছাত্র। বসতো সবার পেছনে। শেষ বেঞ্চে। তবে সে দিন দিন বেশ মনোযোগী হয়ে উঠতে লাগলো; বিশেষ করে হুদা স্যারের ক্লাসে। একদিন ক্লাসে প্রশ্ন করলো এই কাজে কি কি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে স্যার? হুদা স্যার প্রশংসার সুরে বললেন খুব ভাল প্রশ্ন। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন যে কোনো যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে তবে আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে না হলে তো কোনো লাভ নেই। কাদের আলী বললো স্যার গ্লোব ব্যবহার করা যাবে? হুদা স্যার হ্যাঁ সূচক ভঙ্গীতে মাথা নাড়লেন। কাদের আলী হেসে বললো, তাহলে তো স্যার পৃথিবীর পরিধি মাপা খুব সহজ। গ্লোবটা মাপলেই হলো। গ্লোবের প্রতি ইঞ্চি সমান কত মাইল সেটা তো গ্লোবের গায়েই লেখা আছে। হুদা স্যার প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, না না কদের আলী, ও ভাবে হবে না। ও ভাবে হলে তো অত কষ্ট করারও দরকার নেই। যে কোনো সাধারণ জ্ঞানের বই খুললেই হয়। সেখানেই তো লেখা আছে পৃথিবীর পরিধি কত। আমাদের ধরে নিতে হবে পৃথিবীর পরিধি জানা নেই। আমরাই প্রথম তা নির্ণয় করার চেষ্টা করছি। হাতের কাছে যা আছে, যেমন ফিতা, কম্পাস, কাগজ, কলম, ঘড়ি এসব দিয়েই মাপতে হবে।

এভাবে কেটে গেল ছয় সাত মাস। এর মধ্যে ঘটে গেছে অনেক কিছু। স্কুলে নতুন বিজ্ঞান শিক্ষক এসেছেন। কয়েক মাস আগে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন হুদা স্যার। বলা নেই কওয়া নেই মাত্র তিন দিনের জ্বরে মারা গেলেন তিনি। তার মতো একজন শিক্ষককে হারিয়ে পুরো স্কুলটা যেন মুষড়ে পড়েছিল। কিন্তু সময়ে সব সয়ে যায়। ধীরে ধীরে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো। তাঁর দেওয়া সমস্যাটাও ধীরে ধীরে ভুলে গিয়েছিল ক্লাস এইটের ছাত্ররা। তবে একজন ছাড়া। তার নাম রহমত।

সেদিন প্রথম ক্লাসে শিক্ষক আসেন নি। ছেলেরা সবাই হৈ চৈ করছে। এমন সময় রহমত ক্লাসে ঢুকলো। হাতে একটা কাঠের টুকরা। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে প্রায় এক হাত। সেটার মাঝামাঝি জায়গায় একটা ছয় সাত ইঞ্চি উঁচু সরু কাঠি পোতা। সবাই জানতে চাইলো, এটা কি। রহমত তার স্বভাব সুলভ লাজুক হাসি হেসে একটু ভয়ে ভয়ে বললো, আমার মনে হয় এটা দিয়ে পৃথিবীর পরিধি মাপা যাবে। পৃথিবীর পরিধি প্রসঙ্গ আসতেই এতদিনের ছাইচাপা আগুনটা যেন আবার দপ করে জ্বলে উঠলো। কিভাবে? কিভাবে? একসাথে প্রশ্ন করলো কয়েক জন। রহমত কাচুমাচু করে বললো এটা একটা সূর্য ঘড়ি। একজন হেসে বললো, সূর্য ঘড়ি দিয়ে ঠিক মত সময়ই মাপা যায় না পরিধি মাপবি কিভাবে। সকলের চাপাচাপিতে রহমত বোর্ডে এসে ওর সূর্য ঘড়ি দিয়ে কিভাবে পৃথিবীর পরিধি মাপা যাবে তা ব্যাখ্যা করতে লাগলো। ও কাঠের টুকরাটা সামনে ধরে বললো, এ জিনিসটা সূর্যের আলোতে রাখলে নিচে কাঠির একটা ছায়া পড়ে। ছায়াটা সকালে দিকে লম্বা থাকে। সূর্য যখন ওপরে উঠতে থাকে তখন ছায়াটা ধীরে ধীরে ছোট হয়। সূর্য যখন মাথার ঠিক ওপরে কাঠির ছায়া তখন সবচেয়ে ছোট। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশের দিকে ঢলতে থাকে তখন কাঠির ছায়া আবার ধীরে ধীরে লম্বা হয়। কাদের আলী বললো এটা তো জানা কথা। এর সাথে পরিধির সম্পর্ক কি? জড়তা কাটিয়ে রহমত এখন অনেক সহজভাবে কথা বলছে। ও বললো সম্পর্ক আছে বলছি।

তখন আর বলার সময় পায়নি রহমত। পরের পিরিয়ডের টিচার এসে পড়ায় আলোচনা সেখানেই বন্ধ করতে হলো। তবে ছুটির পরে সবাই আবার সূর্য ঘড়ি নিয়ে মেতে উঠলো। রহমত ওদের বুঝিয়ে বললো, ধর পৃথিবী স্থির, সূর্য আমাদের চারদিকে ঘুরছে। একবার ঘুরতে সময় লাগে চব্বিশ ঘণ্টা। সূর্য এক মিনিটে কয় মাইল যায় সেটা যদি বের করতে পারি তাহলে চব্বিশ ঘণ্টায় কতদূর যায় তা বের করা কোনো ব্যাপারই না। কুদ্দুস খুব ধীর-স্থির ধরণের ছেলে। সে এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে রহমতের কথা শুনছিল। সে ধীরে ধীরে বললো, বুঝলাম কিন্তু সূর্য এক মিনিটে কত দূর গেল সেটা কিভাবে বের করবি? রহমত তার সূর্য ঘড়িটা দেখিয়ে বললো এটা দিয়ে। এরকম দুইটা সূর্য ঘড়ি লাগবে। একটা থাকবে এখানে আরেকটা এখান থেকে পঁচিশ-তিরিশ মাইল পশ্চিমে। পূর্ব ঘড়ি আর পশ্চিম ঘড়ি। সূর্য কখন ঠিক মাথার ওপরে আছে সেটা সূর্য ঘড়ির ছায়া দেখে বের করবো। আমাদের মাথার ওপর থেকে ওদের মাথার ওপর যেতে কয় মিনিট লাগে সেটা বের করতে হবে। কাদের আলী ইউরেকা ইউরেকা বলে চেঁচাতে লাগলো। একজন টিপ্পনী কেটে বললো আবিষ্কার করেছে রহমত তুই ইউরেকা বলে চেঁচাচ্ছিস কেন? কাদের আলী দমবার পাত্র নয়। সে বললো দলের মধ্য থেকে একজন বললেই হলো।

পরের কয়েক সপ্তাহে পৃথিবীর পরিধি মাপার আয়োজন অনেক দূর এগুলো। দ্বিতীয় সূর্য ঘড়ি বানানো হয়েছে। নতুন বিজ্ঞান শিক্ষক ফরিদ স্যারকে জানানো হলো পুরো ব্যাপারটা। তিনি অত্যন্ত খুশী হয়ে সাহায্য করতে রাজী হলেন। সারা স্কুলে বিষয়টা ধীরে ধীরে পৃথিবীর পরিধি প্রজেক্ট সংক্ষেপে পিপি প্রজেক্ট নামে পরিচিত হয়ে উঠলো। প্রায় প্রতিদিন স্কুলের পরে ফরিদ স্যার ছাত্রদের নিয়ে বসতেন। প্রজেক্ট নিয়ে আলাপ করতেন। ঘড়ি দুটোকে দুজায়গায় রাখতে হবে। একটা পূর্ব দিকে অন্যটা পঁচিশ থেকে তিরিশ মাইল পশ্চিম দিকে। এটাই হয়ে দাঁড়ালো প্রজেক্টের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা। পথ ঘাট, রেললাইন, নদ-নদী সব চলে একেবেকে। কখনো পূর্ব থেকে উত্তরে আবার কখনো উত্তর থেকে পশ্চিমে। পূর্ব-পশ্চিমে টানা পঁচিশ তিরিশ মাইল একবারেই অসম্ভব। অনেক চিন্তা ভাবনা করেও যখন কোনো কুল কিনারা পাওয়া গেল না তখন একদিন ফরিদ স্যার বললেন নিজেরা মাপা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

ফরিদ স্যারের নির্দেশে স্কুলের খেলার মাঠের একপাশে একটা খুঁটি পোতা হলো। তিনি এক হাত খুঁটির ওপর রেখে অন্য হাতে সোজা পশ্চিম দিক নির্দেশ করে বললেন, এখান থেকে তিরিশ মাইল পশ্চিমে আরেকটা খুঁটি পুঁততে হবে। দুই খুঁটির কাছে থাকবে দুইটা সূর্য ঘড়ি। সূর্য আমাদের মাথার ওপর থেকে ওদের মাথার ওপর যেতে কয় মিনিট লাগছে সেটা বের করতে পারলেই বাকিটুকু সোজা হিসাব। কুদ্দুস প্রশ্ন করলো, অত দূরে যাবার দরকার কি। দ্বিতীয় খুঁটিটা এক মাইল পশ্চিমে পুঁতলে হয় না? ফরিদ স্যার জবাব দেবার আগেই কাদের আলী বললো, দূরত্ব যত বেশী হবে হিসাব তত সঠিক হবে। পৃথিবীর পরিধি, হাজার হাজার মাইলের ব্যাপার। ইন্ডিয়ার পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকইতো প্রায় এক হাজার মাইল। দুই ঘড়ির মধ্যে দূরত্ব কম হলে হিসাবে ভুল হতে বাধ্য। ফরিদ স্যার কাদের আলীর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, সাবাস। রহমত বললো পঁচিশ-তিরিশ মাইলে না হলে আরো দূরে যেতে হবে।

সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ফরিদ স্যার পৃথিবীর পরিধি মাপার জন্য চার জনের একটা টিম গঠন করে ফেললেন। কাদের আলী, কুদ্দুস, সালাম এবং শমশের এই কঠিন কাজের জন্য যোগ্য বলে মনোনীত হলো। কাদের আলীকে বানানো হলো টিম লিডার।

১৭ই জুন সকালে চার জনের এই দলটি যাত্রা শুরু করলো। কাদের আলীর হাতে একটা কম্পাস, কুদ্দুসের হাতে ১০০ ফুট একটা জমি মাপার ফিতা, সালামের হাতে ৩০০ ফুট লম্বা একটা সরু নাইলনের দড়ি, কিছু ছোট-বড় লোহার শিক আর শমশেরের কাঁধে একটা বাহক; থানা থেকে ধার করা দুটো ছোট তাবু, কিছু চাল-ডাল, হাড়ি পাতিল এবং কাপড়-চোপড়ের বোঝা চাপানো হয়েছে তাতে। চার জন মানুষের কয়েক দিনের জন্য যা যা দরকার সব আছে সেখানে। ফরিদ স্যার কাদের আলীর হাতে কিছু টাকা আর হেড স্যারের একটা চিঠি দিয়ে বললেন, এগুলো সাথে রাখো, প্রয়োজনে কাজে দেবে। ফরিদ স্যার পকেট থেকে দুটো হাতঘড়ি বের করলেন। একটা পরিয়ে দিলেন রহমতের হাতে অন্যটা টিম লিডার কাদের আলীর হাতে। ঘড়ি দুটোর সময় মেলানো আছে। ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড সম্পূর্ণ এক। একটা ঘড়ি থাকবে এখানে, অন্যটা কাদের আলীর টিম নিয়ে যাবে পঁচিশ তিরিশ মাইল পশ্চিমে। ওরা কাজ শুরু করলো।

কাদের আলী স্কুলের মাঠে পোতা খুঁটির কাছে দাঁড়িয়ে কম্পাস দেখে বললো এই দিক পশ্চিম। কুদ্দুস, সালামের হাত থেকে নাইলনের দড়ির এক প্রান্ত টেনে নিয়ে ৩০০ ফুট দূরে হাতুড়ি ঠুকে মাটিতে একটা শিক পুঁতলো। তারপর এক টুকরো কাগজে ৩০০ শিখে সেটাকে গেঁথে দিলো শিকের সাথে। এই ভাবে একের পর এক খুঁটি পোতা হবে আর তাতে নাম্বার লাগানো হবে ৬০০, ৯০০, ১২০০। একটা নতুন শিক পুঁতে নাম্বার লাগানোর পরেই আগের শিকটা তোলা যাবে। মাপে যেন ভুল না হয় তাই এই ব্যবস্থা। এই ভাবে যেতে হবে তিরিশ মাইল। দিনে ছয় মাইল করে ধরলে পাঁচ দিনের কাজ। অজানা অচেনা পথে অনেক বাধা আসতে পারে, খাল-বিল, নদী-নালা, ঘর-বাড়ি, বন-জঙ্গল। সব কিছু অতিক্রম করে এগিয়ে যাবে কাদের আলীর টিম। লাইন বাঁকা করা যাবে না কিছুতেই। সোজা পথে চলা বড় কঠিন কাজ। এ অঞ্চলে পঁচিশ-তিরিশ মাইলের মধ্যে কোনো বড় নদী নেই তা ওরা জানে। কিছু কিছু বাধা অতিক্রম করার জন্য জ্যামিতির জ্ঞান প্রয়োজন। ওরা সে জ্যামিতি শিখে নিয়েছে। পঁচিশ-তিরিশ মাইল দূরে একটা সুবিধাজনক জায়গায় দ্বিতীয় খুঁটিটি পুততে হবে। বসাতে হবে সূর্য ঘড়ি। একটা পূর্ব নির্ধারিত সময়ে শুরু হবে এক্সপেরিমেন্ট।

আজ বাইশে জুন। বছরের দীর্ঘতম দিন। কাদের আলীর টিম রওনা হয়ে গেছে পাঁচ দিন হলো। ওরা পশ্চিমের সূর্য ঘড়িটা সঠিক জায়গায় বসাতে পেরেছে কিনা জানবার কোনো উপায় নেই। সে যুগে মোবাইল ফোন ছিল না। কথা মত সকাল এগারোটার দিকে ফরিদ স্যার তার ছাত্রদের নিয়ে স্কুলের মাঠে চলে গেলেন। প্রথম খুঁটিটার কাছে। সেখানে বসানো হলো সূর্য ঘড়ি। কাঠের টুকরার ওপরে আঠা দিয়ে একটা সাদা কাগজ সেটে দেয়া হয়েছে। তার ওপর পড়েছে কাঠির ছায়া। রহমত হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। সে ঠিক সাড়ে এগারোটার সময় বললো স্টার্ট। একজন কাগজের ওপর কাঠির ছায়ার ঠিক মাথায় সরু পেন্সিলের একটা দাগ দিয়ে পাশে লিখলো ১১:৩০। এখন থেকে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত কাজ হলো ঠিক এক মিনিট পর পর ছায়াটার মাথায় কাগজের ওপর একটা করে দাগ দেয়া। ষাট মিনিটে ষাটটা দাগ। এগিয়ে চলেছে এক্সপেরিমেন্ট। দাগগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে কাঠির ছায়া। তার পর এক সময় ছায়া আবার বড় হতে শুরু করলো। কাদের আলীদেরও ঠিক একই সময়ে ছায়া মাপার কথা। ওরা এখন কি করছে? ওরা কি পেরেছে গন্তব্যে পৌঁছতে? ফিরে না আসা পর্যন্ত জানবার উপায় নেই।

তিন দিন পর গ্রামে ফিরলো কাদের আলীর টিম। রোদে পুরে হাড়ির তলার মত চেহারা হয়েছে সবার। ওদের ফিরে আসতে দেখে সারা স্কুল জুড়ে একটা হৈ চৈ পড়ে গেল। যেন পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ক্যাপ্টেন কুক ঘরে ফিরেছেন। সবার মনে একটাই প্রশ্ন কিন্তু কেউ ঠিক সাহস করে জিজ্ঞেস করছে না। কাদের আলী যেন সবার মনের কথা বুঝতে পেরে পকেট থেকে অতি যত্নে ভাঁজ করা একটা কাগজ রহমতের হাতে তুলে দিয়ে বললো, এই নে। রহমত প্রশ্ন করার আগেই কাদের গর্বিত হাসি হেসে বললো আটাশ মাইল।

পরদিন সারা স্কুলে চাপা উত্তেজনা। ক্লাস এইটের ছাত্র-ছাত্রীদের গর্বে মাটিতে পা পড়ে না। আজ পৃথিবীর পরিধি হিসাব করা হবে। আটাশ মাইল দূরত্বে রাখা দুই সূর্য ঘড়ি থেকে নেয়া দুটো কাগজ পাশাপাশি রাখা হলো। প্রথমটিতে সবচেয়ে ছোট ছায়া পড়েছিল দুপুর বারোটা বেজে আট মিনিটে। অন্যটায় বারোটা বেজে দশ মিনিটে। দুই মিনিট পরে। ক্লাসের সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ফরিদ স্যারের টেবিলের ওপর। আটাশ মাইল পথ যেতে সূর্যের সময় লেগেছে দুই মিনিট। তার মানে মিনিটে চৌদ্দ মাইল। একদিনে মোট ১৪৪০ মিনিট। প্রতি মিনিটে চৌদ্দ মাইল গেলে ১৪৪০ মিনিটে কত মাইল যাবে? প্রশ্ন করলেন ফরিদ স্যার। ঐকিক নিয়মের সহজ হিসাব। কয়েকজন একসাথে হিসাব করতে লেগে গেল। কে একজন পেছন থেকে বলে উঠলো বিশ হাজার একশো ষাইট মাইল স্যার। কিছুক্ষণ কারো মুখে কথা নেই। নিজেদের আবিষ্কারের মুখোমুখি এসে সবাই যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সৌর জগতের তৃতীয় গ্রহটিকে মেপেছে গণ্ডগ্রামের কিছু ছেলে-মেয়ে, যেন বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুতেই। কাদের আলী প্রথম মুখ খুললো, স্যার, হিসাব ঠিক আছে তো? পৃথিবীর পরিধি আসলে কত?

(প্রথম প্রকাশঃ সিডনি থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা প্রবাহ, অক্টোবর ২০০১)



আনিসুর রহমান, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া



Share on Facebook                         Home Page



                            Published on: 30-Jul-2018